যিনা

কুরআন এ কর্মকে পরিবার, সমাজ ও মানবীয় সভ্যতার প্রধানতম শত্রু বলে ঘোষণা করে। কারন এ দুস্কর্মটি সভ্যতার মূল বুনিয়াদকেই ধ্বংস করে দেয়। কুরআন বলে যে, “যিনার নিকটেও যেয়োনা” (সুরা আল ইসরা ৩২)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “দু’চোখ যিনা করে, জিহবা যিনা করে, দু’হাত যিনা করে, দু’পা যিনা করে অত:পর যৌনাংগ তার সত্যতা (অর্থাৎ পরিপুর্ণতা সাধন করে) কিংবা অসত্য হওয়া প্রমাণ করে (তিরমিযি, আবু দাউদ)।

উকবা ইবন আমের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত: রাসুল সা: বলেন: “সাবধান, নিভৃতে নারীদের নিকট যেয়োনা। জনৈক আনসার সাহাবী বললেন: হে আল্লাহর রাসুল দেবর সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কি? রাসূল সা: বললেন: সে তো মৃত্যুর ন্যায়”। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি)

অন্য এক হাদিসে এসেছে: “স্বামীর অনুপস্থিতিতে তোমরা কোনো নারীর নিকটে যেয়োনা। কারন শয়তান তোমাদের যেকোন একজনের মধ্যে রক্তের ন্যায় প্রবাহিত হবে” (তিরমিযি)।

আর একটি হাদিসে এসেছে: “ যদি কেউ এমন কোনো নারীর হস্ত স্পর্শ করে যার সাথে তার কোন বৈধ সম্পর্ক নাই, তা হলে মৃত্যুর পর তার হাতের উপর জলন্ত অগ্নি রাখা হবে।

ইসলাম পরপুরুষ বা পরনারীর সৌন্দয অবলোকনে তৃপ্তিলাভ, কন্ঠস্বর শুনে কর্ণকুহরে আনন্দ উপভোগ, মিষ্টিস্বরে কথোপকথন, পুন: পূন: দৃষ্টি, গায়ের মুহাররাম নর নারী, যুবক যুবতীদের বিবাহপুব প্রেম এবং প্রেম সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকান্ডকে যিনা নামে আখ্যায়িত করে। ইসলামে এসব সবোতভাবে হারাম। কারন এহেন কর্মকান্ডের ফলেই মানব সমাজ পরকীয়া, দাম্পত্য জীবনে অশান্তি এবং ঘর ভাংগার মতো বিপদের সম্মুখীন হয়। 

শুনতে অবাক লাগলেও সত্য যে, আমাদের দেশে এমন বহু কর্মকান্ড বা রসম রেওয়াজ এখানকার সংস্কৃতি বা সামাজিকতা নামে অভিহিত যা ইসলামী শারিয়াতে সুস্পষ্ট হারাম। এদেশে গায়ে হলুদের দিন ভাবীরা দেবরকে গোসল করিয়ে দেয়, শ্যালিকারা দুলাভাইয়ের মুখে হলুদ মাখায় এবং আরও কতকি হয় – এসকল কাজ তাদের কাছে নিস্পাপ ফুর্তি বা প্রচলিত সামাজিকতা, পাপের কিছু নয়। এ চেতনারই ফসলস্বরুপ এদেশে কবিতা রচিত হয়: “শালী নেই যেথা, বিয়ে করোনা সেথা” ।

পুরুষ বসের কাছে যুবতী সেক্রেটারী, কমার্শিয়াল ফেভার বা সাকসেসের জন্যে সুন্দরী সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ – এসব, (কিছুটা হলেও) এ সাংস্কৃতিক চেতনারই ফলশ্রুতি। 

যিনার দুনিয়াবী ফলাফল এত তিক্ত ও কলংকজনক যে তা বলে শেষ করার নয়। যিনাকার/যিনাকারীনিদের দুনিয়া দু:খ ও অনুশোচনায় ভরা। শয়তানের প্ররোচনায় প্রথমে এ কাজটি তারা করলেও পরক্ষণেই তারা  অনুশোচনার আগুনে দ্গ্ধ হতে থাকে। একারনে যিনাকে তুলনা করা হয় ঐ মধু বা মিষ্টান্নের সাথে যা পান বা খাওয়ার সময় তৃপ্তি বোধ হয় বটে কিন্তু এর ক্রিয়া রক্তকে দুষিত করে ছাড়ে। আইন যেসকল দেশে যিনাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয় সেসকল দেশেও যিনাকার/যিনাকারীনিদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়না। যিনার প্রভাব ও কুফল শুধু বহিরাংগনকেই বিষময় করেনা এটি দেহকেও রোগাক্রান্ত করে ছাড়ে। এইডস এবং বিভিন্ন রতিজ ব্যাধি এর মধ্যে অন্যতম।

যিনা নামক এ ক্রিয়াটি দ্বীতিয় যে আর একটি অনুসংগ বা অপকর্মকে ডেকে আনে তা হচ্ছে মানুষ হত্যা। এক পরিসংখানে দেখা গেছে বাংলাদেশে যত মানুষ খুন হয় তার একটি উল্লেখযোগ্য কারন হচ্ছে যিনা। শয়তান প্রথমে একাজটি করতে প্ররোচিত করে অত:পর এর যাতে কোন প্রমাণ বা সাক্ষী সাবুদ কোথাও অবশিষ্ট না থাকে সেই সুতোয় সে এর সাক্ষীকেও হত্যা করিয়ে ছাড়ে।

যিনার ফলে যদি কোন সন্তান জন্মলাভ করে তখন অবস্থা হয়ে উঠে আরও অসহনীয়। সমাজ এ সন্তানকে কবুল করেনা।

এখানেই শেষ নয়, এ সন্তান অত:পর তার সারাটি জীবন আপন ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত অবস্থায় এক নিষ্ঠুর জালা, অপমান ও নিগ্রহ নিয়ে দুনিয়াতে জীবনযাপন করে এবং এ দু:খময় জীবনের জন্য সে জীবনভর তার অবৈধ জনক জননীকে অভিশাপ দিতে থাকে। 

যিনা মানুষের ইমানকেও ছিনিয়ে নেয়। রাসূল সা: বলেছেন: “ইমান হলো একটি জামা। যখন কোন মু’মিন বান্দা ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তখন আল্লাহ তার থেকে ইমানের জামাটি খুলে নেন। অত:পর যদি সে তাওবা করে (এবং কখনো একাজে আর ফিরে না আসে) তাহলে আল্লাহ তার সে জামা তাকে ফিরিয়ে দেন। (বুখারী)।

যিনাকার/যিনাকারীনির মুত্যু পরবর্তী ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “মিরাজের রাতে আমাকে একদল লোককে দেখানো হল। তাদের সামনে রয়েছে উৎকৃষ্ট মানের সুস্বাদু গোশত, পাশে একটু দুরে রাখা আছে উৎকট দুর্গন্ধযুক্ত পচা গোশত। লোকগুলো ভাল গোশত বাদ দিয়ে ঐ দুর্গন্ধযুক্ত পচা গোশত খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম: হে জীবরীল, এরা কারা? তিনি বললেন: এরা হচ্ছে ঐসব লোক যাদের বৈধ স্ত্রী/স্বামী থাকা সত্বেও পরনারী/পরপুরুষের নিকট গমন করতো”। (বুখারী)।

আর একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: রাসুল সা: বলেছেন: “মিরাজের রাতে আমার নিকট জীবরীল ও মিকাল (আলাইহিমাস সালাম) এলেন। আমরা পথ চলতে শুরু করলাম। কিছু দুর যাওয়ার পরই তন্দুরের মত একটি বস্তু দেখতে পেলাম, যার উপরের অংশ ছিলো সংকীর্ণ এবং নীচের অংশ প্রশস্ত। ভিতর থেকে তীব্র চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ আসছিলো। আমি ভেতরে তাকিয়ে দেখলাম অনেক উলংগ নারী পুরুষ। খানিক পর পর তন্দুরের নিম্নভাগ থেকে লেলিহান আগুন এসে তাদেরকে গ্রাস করছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা হে জীবরীল? তিনি জওয়াব দিলেন: এরা হচ্ছে যিনাকার। (বুখারী)।

আর একটি হাদিসে এসেছে: ব্যভিচারীদের যৌনাংগের দুর্গন্ধ জাহান্নামীদেরকে সবাধিক বেশী কষ্ট দেবে”। (বুখারী)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)