নাজ্জাশীর দরবারের ঘটনা

হাবাশা অধিপতি নাজ্জাশীর দরবার। নাজ্জাশীর দু’পাশে বিশেষ পোষাকে বসে আছেন পাদ্রীগন। সামনে তাদের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ। সম্মুখে, মাক্কা থেকে আগত আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনু আবী রাবী’আ। 

নওমুসলিমগন হাবাশায় পৌছে নিরাপদে ও সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করছেন এ খবর মাক্কার কুফরী শক্তির অন্তরর্জ্বালা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন দ্বীনের এ অনুসারীরা শুধু তাদের পিতৃধর্মকে অসম্মান করেনি, অন্য দেশে আশ্রিত হয়ে তারা খ্যাতিমান কুরাইশী গোত্রের মান ইযযতও সব ডুবিয়ে দিয়েছে। এরই একটি বিহিত করতে এ দু’ব্যক্তির আগমন। 

আমর ইবনুল আস প্রথমে কথা বলা শুরু করলো: “হে মহামান্য বাদশাহ, আমাদের কিছু দুষ্ট প্রকৃতির ছেলে আপনার সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছে। তারা এমন একটি ধর্ম আবিস্কার করেছে যা আমরাও জানিনে, আপনিও জানেননা। তারা আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে। আপনাদের দ্বীনও গ্রহণ করেনি। তাদের পিতা, পিতৃব্য এবং গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তাদের সৃষ্ট অশান্তি ও বিপযয় সম্পর্কে তাদের গোত্রীয় নেতারাই অধিক জ্ঞাত”। 

নাজ্জাশী তার দরবারে উপস্থিত পাদ্রীদের দিকে তাকালেন। (বলা আবশ্যক, নাজ্জাশীর পাদ্রীদেরকে নিজেদের পক্ষে রাখতে আমর ইবনুল আস এবং আবদুল্লাহ ইবনু রাবী’আ হাবাশায় পৌছে প্রথমেই পাদ্রীদেরকে মুল্যবান উপহার উপঢৌকন প্রদান করে)।

পাদ্রীগন বললেন: “মহামান্য বাদশাহ তারা সত্য কথাই বলেছে। কারন তাদের গোত্রীয় নেতারাই তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। গোত্রীয় নেতাদের নিকট আপনি তাদের ফেরত পাঠিয়ে দিন”।

পাদ্রীদের কথায় বাদশাহ দারুণভাবে ক্ষুদ্ধ হলেন। বললেন: “আল্লাহর কসম! তা হতে পারেনা। তাদের প্রতি যে অভিযোগ আরোপ করা হচ্ছে সেসম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ না করে আমি কিছুতেই তাদেরকে এদের হাতে সমর্পণ করবোনা”।

বাদশাহ নাজ্জাশী নওমুসলিমদেরকে দরবারে ডেকে আনতে লোক পাঠালেন। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এ আশংকায় মুসলিমদের এ দলটি ভীত সন্ত্রস্ত ছিলেন। তারা অনুমান করলেন: নিশ্চয়ই বাদশাহ তাদের এ দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। সিদ্ধান্ত হলো: যা তারা বিশ্বাস করেন এবং মানেন তা-ই হুবহু সেখানে তারা বলবেন। আর, সবার পক্ষ থেকে জাফর ইবনু আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কথা বলবেন। 

মুসলিমগন দরবারে এসে স্থির হয়ে বসার পর, বাদশাহ অত্যন্ত শান্তভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন: “সে কোন ধর্মমত যা তোমরা আবিস্কার করে নিজেদের খান্দানী ধর্মকে পরিত্যাগ করেছো এবং আমার ধর্মকেও গ্রহণ করোনি?”

জাফর ইবনু আবী তালিব (রা) সবার পক্ষ থেকে বললেন: “মহামান্য বাদশাহ, আমরা ছিলাম একটি মুর্খ জাতি। মুর্তির উপাসনা করতাম। মৃত জন্তুর গোশত খেতাম। পাপ ও অশ্লীলতা ছিলো আমাদের নিত্য সংগী। আমাদের সবলেরা দুবলকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতো। এমনিতরো সময়ে আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিকট একজন রাসুল পাঠালেন। আমরা তার বংশ, সততা, আমানাতদারী, চরিত্রের পবিত্রতা ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানালেন, যেন আমরা তার একত্বে বিশ্বাস করি, তার ইবাদাত করি এবং যেসব গাছ, পাথর ও মুর্তির পূজায় আমরা লিপ্ত তা যেন পরিত্যাগ করি। 

তিনি আমাদেরকে আরও নির্দেশ দিলেন, সত্য কথা বলার, গচ্ছিত সম্পদ যথাযথভাবে প্রত্যর্পণের, আত্বীয়তার বন্ধন অক্ষুন্ন রাখার, প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার, হারাম কাজ ও অবৈধ রক্তপাত থেকে বিরত থাকার। 

তিনি আমাদেরকে আরও নির্দেশ করেছেন, এক আল্লাহর ইবাদত করার, তার সাথে অন্য কিছু শরিক না করার, নামায কায়েম করার, যাকাত দানের এবং রমাদানে রোজা রাখার। 

আমরা তাকে সত্যবাদী জেনে তার প্রতি ইমান এনেছি। তিনি আল্লাহর নিকট থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তার অনুসরণ করেছি। যা তিনি আমাদের জন্য হালাল ও হারাম ঘোষণা করেছেন আমরা তা হালাল ও হারাম বলে বিশ্বাস করেছি।

মহামান্য বাদশাহ, অত:পর আমাদের জাতি আমাদের শত্রু হয়ে গেল। শুরু হলো আমাদের উপর অমানুষিক অত্যাচার ও নিযাতন। তারা আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়াল। দুনিয়া আমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেল। তাই আপনার দেশে এসে আশ্রয় নিয়েছি। আমরা আশা পোষণ করেছি, এখানে আমাদের উপর কোনো যুলুম অত্যাচার সইতে হবেনা”।

নাজ্জাশী অত্যন্ত মনোযোগের সাথে এসব শুনলেন। এবার প্রশান্ত চিত্তে বললেন: “তোমাদের এ রাসুল আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন তার কিছু আমাকে শোনাওতো”

জাফর রা. সুরা মারিয়ামের প্রথমদিকের আয়াতগুলো পাঠ করলেন: “কাফ-হা-ইয়া-আইন-সাদ। এটি তোমার রবের অনুগ্রহের বিবরণ, যা তিনি তার বান্দা যাকারিয়ার প্রতি করেছিলেন। যখন সে তার রবের নিকট প্রার্থনা করেছিল গোপনে। সে বলেছিল: অামার অস্থি দুবল, বার্ধক্যে আমার মস্তক সাদা হয়ে গিয়েছে। হে আমার প্রভু তোমার নিকট প্রার্থনা করে আমি কখনো বিফল হইনি..................”।

কুরআন শুনে বাদশাহ নাজ্জাশী অবিরত কাদা শুরু করলেন। এতো কাদলেন যে, তার দাড়ি ভিজে গেল। দরবারে উপবিষ্ট পাদ্রীরাও কেদে তাদের সম্মুখে রাখা ধর্মগ্রন্থসমুহ ভিজিয়ে দিলো।

কিছুটা শান্ত হয়ে নাজ্জাশী বললেন: “তোমাদের নাবী যা নিয়ে এসেছেন এবং তার পুবে ইসা আ. যা নিয়ে এসেছিলেন, উভয়ের উৎস এক। অত:পর তিনি আমর ও তার সংগীর দিকে তাকিয়ে বললেন: হে আমর, তোমরা চলে যাও। আল্লাহর কসম তোমাদের হাতে আমি কিছুতেই তাদেরকে সমর্পণ করবোনা”।

বাদশাহর নির্দেশে আমর ইবনুল আস ও তার সংগী দরবার থেকে বেরিয়ে এলো। যাবার সময় জাফর রা. ও তার সাথীদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো: আল্লাহর কসম, আগামীকাল তাদের বিরুদ্ধে এমন কথা বাদশাহকে বলবো, যাতে তাদের শিকড় কেটে যাবে। আবদুল্লাহ ইবন রাবী’আ বললো: “না, তার দরকার নেই। ওরা যদিও আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে কিন্তু ওরাতো আমাদেরই স্বজাতি”। কিন্তু আমর তার সিদ্ধান্তে অটল রইল।

পরদিন সত্য সত্যই আমর ইবনুল আস বাদশাহের দরবারে আবার হাজির হল। এবার বললো: “হে বাদশাহ, ওরা ইসা ইবনু মারিয়াম সম্পর্কে এক মারাত্বক কথা বলে”।

বাদশাহ পুনরায় জাফর রা. ও তার সকল সংগীকে দরবারে হাজির করালেন। 

জাফর রা. কোনরুপ ভয় না পেয়ে দৃঢ়চিত্তে বললেন: “হে মহামান্য বাদশাহ, আমরা ইসা আ. সম্পর্কে তা-ই বলে থাকি যা আমাদের নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: ইসা আ. আল্লাহর বান্দা ও রাসুল, তার রুহ এবং তার কালিমা যা আল্লাহ তায়ালা কুমারী ও পবিত্রা মারিয়ামের (আ.) প্রতি প্রক্ষেপ করেছেন”।  

একথা শুনে নাজ্জাশী মাটি থেকে এক টুকরো খড় তুলে নিয়ে বললেন: “আল্লাহর কসম, তোমাদের নাবী যা কিছু ইসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেছেন তা এ খড়ের সমানও বেশী কিছু ছিলেননা”।

এরপর নাজ্জাশী জাফর রা. ও তার সাথীদের দিকে তাকিয়ে বললেন: “হে জাফর, তোমরা আমাদের দেশে নিরাপদ। আমি চাইনা কেউ তোমাদেরকে কষ্ট দিক আর তার পরিবর্তে আমি সোনার পাহাড় লাভ করি”।

অত:পর বাদশাহ আমর ও তার সংগীর উপঢৌকন ফিরিয়ে দিয়ে বললেন: “আমার ওগুলোতে কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহর শপথ, তিনি যখন আমাকে আমার দেশ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তখন আমার কাছ ‌থেকে কোন ঘুষ নেননি। আমি কেন তার পথে ঘুষ নেবো? এছাড়া আল্লাহ তায়ালা আমার ব্যাপারে অন্য লোকদের কথা গ্রহণ করেননি। আমি কেন আল্লাহর ব্যাপারে অন্য লোকদের কথা মানবো?”

এঘটনার বর্ণনাকারী উম্মু সালামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: “এভাবে আমর ইবনুল আস ও তার সংগীর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলো এবং তারা ভগ্ন হৃদয়ে পরাজিত ও হতাশ অবস্থায় দরবার থেকে বেরিয়ে গেল। আর, আমরা উত্তম বাসগৃহে বাদশাহর সম্মানীত প্রতিবেশীর মতো সেখানে বসবাস করতে লাগলাম”।

অত:পর জাফর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তার সংগীগন নাজ্জাশীর আশ্রয়ে দশ বছর সেখানে অবস্থান করেন। 

তথ্য সুত্র: (১) আর রাহিকুল মাখতুম (২) ড. মুহাম্মাদ আবদুল মা’বুদ প্রণিত “আসহাবে রাসুলের জীবন কথা।    

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None