"বিধবা"

সমাজে বিধবাদের প্রতি বাঁকা দৃষ্টি নিক্ষেপের প্রবণতা এখনো আছে বৈকি। আর বিধবা কম বয়সী হলে তো কথাই নেই। তার সাথে আশপাশের অনেকেই ভিন গ্রহের কোন এক আজব প্রাণীর মত আচরণ করতে শুরু করেন। কথায় কথায় 'অপয়া' বিশেষণটি তার নামের সাথে জুড়ে দিতেও পিছপা হন না।যেকোন মূহুর্তে তাদের মা, বোন, কন্যা,
এমনকি নিজেরাও যে এই পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন- তা হয়ততখন তারা বেমালুম ভুলে বসেন।

 

বিধবাদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্রত নিয়ে এখন থেকে প্রতিবছর ২৩ জুন 'আন্তর্জাতিক বিধবা দিবস' পালনের জন্য জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে এক সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে বিধবাদের পক্ষ থেকে বক্তারা সমাজে বিধবাদের নানা-মুখি সমস্যার কথা তুলে ধরেন। কুসংস্কার, অজ্ঞতা
ও সচেতনতার অভাবে যে তাদেরকে প্রতিনিয়ত বিরূপ অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ অবস্থার জন্য মূলত সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব ও হীনমন্যতাই দায়ি। মূলত এরই সুযোগে কতিপয় ধর্মান্ধ ও ছদ্মবেশী স্বার্থবাদী ব্যক্তিরা এর পেছনে মদদ দিয়ে ধর্মের উপরে তাদের অশুভ কর্তৃত্ব ফলানোর অপপ্রয়াসে ব্যস্ত। ফলে মূল বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারনা সৃষ্টি হওয়ার কারনে অনেকে না বুঝেই ইসলামের কটাক্ষ করতে নেমে পড়েন।

 

স্বামীর মৃত্যুর কারনে কোন নারী তার নিজস্ব অধিকার থেকে বঞ্চিত হন না, বরং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপনের অধিকার রাখেন। বিশেষ করে ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় বিধবাদের জন্য কোনরূপ বৈধব্য বেশ ধারনের বা স্বতন্ত্রভাবে জীবন কাটানোর কোন রীতি নেই। বরং সংগত কারনেই একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার পর অন্য নারীদের মত বিধবারাও সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তা হিসেবে জীবন কাটাতে পারেন। এমনকি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে
মন চাইলে তারা বিধিমত বিয়ে করে আবার নুতুন জীবন শুরু করতে পারেন।

 

এতকাল পর জাতিসংঘ বিধবাদের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা ভাববার প্রয়োজন অনুভব করছে। অথচ মহান স্রষ্টা আল্লাহতায়ালা
তার প্রেরিত কিতাব আল- কোরআনে সেই ১৪৫০ বছর পূর্বেই তাদের অধিকার রক্ষার কথা ব্যক্ত করেছেন। স্বামী হারা নারীরা যেন সমাজে হেয় প্রতিপন্ন না হন সেইজন্য স্রষ্টার পক্ষ থেকে সর্বযুগের উপযোগী বিধান দেয়া হয়েছে। যা সঠিকভাবে জানা, অপরকে
জানানো ও মানার মধ্যেই তো সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ নিহিত। বিশেষ করে নারীদেরকে এ বিষয়টি ভালভাবে জানতে হবে এবং প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। তাহলেই প্রকৃত মুক্তি মিলবে, নচেৎ নয়।

 

আল-কোরআন- সূরা বাকারা-

(০২:২৩৪) তোমাদের
মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মৃত্যুবরণ করবে, তাদের স্ত্রীদের কর্তব্য হলো চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা। অতঃপর যখন ইদ্দত (চার মাস দশ দিন) পূর্ণ
করে নেবে, তখন তারা নিজেদের ব্যাপারে বিধিমত ব্যবস্থা নিলে তাতে কোন পাপ নেই। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবগত আছেন।

 

আল-কোরআনে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীদেরকে
(ইদ্দত পালনের) চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই সময় অতিবাহিত হবার পর বাকি জীবন কিভাবে কাটাবেন সে ব্যাপারে সেই নারীরা বিধি অনুযায়ি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাখেন।

 

আল-কোরআন- সূরা বাকারা-

(০২:২৩৫) আর যদি তোমরা আভাসে- ইঙ্গিতে
সেই নারীদেরকে বিয়ের প্রস্তাব কর, কিংবা নিজেদের মনে তা গোপন রাখ, তবে তাতে তোমাদের কোন দোষ হবে না। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা
অবশ্যই তাদের কথা আলোচনা করবে। কিন্তু বিধিমত কথাবার্তা ছাড়া গোপনে তাদের কাছে কোন অঙ্গীকার করবে না; আর নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করার সংকল্প করো না। আর একথা জেনে রেখো যে, আল্লাহ
তোমাদের মনের কথা জানেন। কাজেই তাঁকে ভয় কর। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও ধৈর্য্যশীল।

 

'Wedlock, Marriage (Nikaah)' of
Sahih Bukhari. 

69: Narrated Khansa bint Khidam
Al-Ansariya: that her father gave her in marriage
when she was a matron and she disliked that marriage. So
she went to Allah's Apostle and he declared that marriage
invalid.

 

56: Narrated Zainab bint
Salama: Um Habiba said to Allah's Apostle "We have
heard that you want to marry Durra bint Abu-Salama." Allah's Apostle said, "Can she be married along with Um Salama
(her mother)? Even if I have not married Um Salama, she
would no be lawful for me to marry, for her father is
my foster brother." 'And thereis no blame on you if you make
hint of betrothal or conceal it in your hearts. Allah is Oft-Forgiving, Most Forbearing.' (2.235) Ibn 'Abbas said,
"Hint your intention of marrying' is made by saying (to the widow)
for example: "I want to marry, and I wish that Allah
will make a righteous lady available for me.' "
Al-Qasim said: One may say to the widow: 'I hold all respect for
you, and I am interested in you; Allah will bring you much
good, or something similar 'Ata said: One should hint his
intention, and should not declare it openly. One may say:
'I have some need. Have good tidings. Praise be to
Allah; you are fit to remarry.' She (the widow) may say in reply: I
am listening to what you say,' but she should not make a
promise. Her guardian should not make a promise (to
somebody to get her married to him) without her
knowledge. But if, while still in the Iddat period, she makes a
promise to marry somebody, and he ultimately marries her,
they are not to be separated by divorce (i.e., the marriage
is valid).

 

সৃষ্টিগত ভাবেই সবার মন মানসিকতা একরম নাও হতে পারে। একারনেই ইদ্দত পালনের পর বিয়ে করবেন কি করবেন না সে ব্যাপারে সেই নারীরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। যাদের সাথে বিয়ে বৈধ এমন পুরুষেরা এ সময় তাদেরকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করতে ও আদবের সাথে প্রস্তাব পাঠাতে পারবেন। কোন বিধবা নারী যদি আপাতত বিয়ে না করার বা বাকি জীবনটা বিয়ে না করেই কাটিযে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন, সেক্ষেত্রে এ ব্যপারে তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। তাদের অমতে বিয়ের জন্য কখনই জোর-জবর্দোস্তি করা যাবে না। চার মাস দশ দিন অপেক্ষার সময় (ইদ্দত)
পার করেই বিয়ের সংকল্প বা বিয়ে করার নির্দেশ এসেছে। আর এক্ষেত্রে কোন গোপনীয়তা নয়, বরং প্রকাশ্য আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিয়ের নির্ধারিত বিধান অনুসারেই তা সম্পন্ন করতে হবে।তাদের দুর্বলতার সুযোগে কোনরূপ গোপন অঙ্গীকার করা বা অবৈধ পন্থা অবলম্বনে তাদেরকে বাধ্য করা সম্পূর্ণভাবে
নিষিদ্ধ।

 

আল-কোরআন- সূরা বাকারা-

(০২:২৪০) আর তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তারা তাদের স্ত্রীদের জন্য এই 'অসিয়ৎ' করবে যে, তাদেরকে যেন এক বছর পর্যন্ত ভরণপোষণ দয়া হয় এবং গৃহ থেকে বের করে দেয়া না হয়। কিন্ত যদি তারা নিজে থেকে বেরিয়ে যায়, তবে নিয়ম মত নিজেদের ব্যাপারে যে উত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তাতে তোমাদের কোন পাপ নেই। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী বিজ্ঞতা সম্পন্ন।

 

এছাড়াও স্বামীর মৃত্যুর পর তারা এক বছর পর্যন্ত ভরণপোষণ পাবার অধিকার রাখেন। স্ব-ইচ্ছায় অনত্র যেতে না চাইলে শ্বশুর বাড়ির লোকজন যেন তাদের বাড়ি থেকে জোর করে বের করে না দেন সে নির্দেশও দেয়া হয়েছে। তবে ইদ্দত পালনের পর তারা যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে অন্য কোথাও যেতে চান (যেমন প্রাপ্য সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে সন্তান অথবা বাবার বাড়িতে থাকতে চান বা ব্যাবসা কিংবা চাকরি করে স্বাধীনভাবে জীবন কাটাতে চান) বা বিধিমত অন্য কাউকে বিয়ে করতে চান তবে তাতে কোন দোষ নেই। এক্ষেত্রে তাদের বাধা দেয়া যাবে না।

 

আল-কোরআন- সূরা নিসা-

(০৪:১৯) হে ঈমাণদারগণ! বলপূর্বক
নারীদেরকে উত্তরাধিকারের
পণ্য হিসেবে গ্রহন করা তোমাদের জন্যে বৈধ নয় এবং তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ তার কোন অংশ তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেবার জন্য তাদেরকে আটকে রেখো না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর, এমন কি তোমরা যদি তাদেরকে পছন্দ নাও কর, এমনও তো হতে পারে যা তোমরা অপছন্দ কর, তাতেই আল্লাহ অনেক কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।

 

Narrated Ibn Abbas:
"Regarding the Divine Verse: "O you who believe! You are forbidden
to inherit women against their will, and  you should not
treat them with harshness that you may take back part of
the (Mahr) dower you have given them." (4:19) (Before
this revelation) if a man died, his relatives used to have the
right to inherit his wife, and one of them could marry her if
he would, or they would give her in marriage if they
wished, or, if they wished, they would not give her in marriage
at all, and they would be more entitled to dispose her,
than her own relatives. So the above Verse was revealed in
this connection. (Translation of Sahih Bukhari, Prophetic Commentary on the Qur'an (Tafseer of the
Prophet (pbuh)), Volume 6, Book 60, Number 103)"

 

বিয়ের সময় স্বামীর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত মোহরানা, স্বামীর
মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত সম্পত্তি এবং পিতার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত যে সম্পদ নারীরা পান তা একান্তভাবেই তাদের। তাদের প্রাপ্য সম্পদ জোর করে ভোগ করার মতলবে তাদেরকে আটকে রাখার বা তা নিয়ে নেবার অধিকার কারো নেই। সরাসরি কোন অশ্লীল কাজে লিপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে সদ্ভাব রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নারী/পুরুষ কেউই ইসলামের বিধানের বাহিরে নয়। শালীনতা বজায় রাখা প্রতিটি মুসলিমের ইমানী দায়িত্ব।তাই অন্য সব নারী ও পুরুষের মত বিধবাদেরও প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা উচিত।অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়লে অন্যান্যদের মত তাদের উপরেও তিরস্কার ও শাস্তি প্রযোজ্য হবে। অনেক সময় দেখা যায় স্বামীর মৃত্যু পর পরিবারের কেউ কেউ তাদের সাথে খারাপ আচরণ করেন। তা মোটেই উচিত নয়। বরং পরিবারের অন্য সবার মত তাদের সাথেও সদ্ভাব ও সৌহার্দমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভাল- মন্দ মিলিয়েই তো মানুষ। দুর্বলতার সুযোগে শুধুমাত্র তাদের অপছন্দের দিকগুলোকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করে কথায় কথায় কটাক্ষ ও খারাপ আচরন করতে নিষেধ করা হয়েছে। তুচ্ছ কারনে কাউকে অপছন্দ হলেও তার মাঝে স্রষ্টা প্রদত্ত অনেক ভাল গুণও থাকতে পারে, যা পরিবারের জন্য প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। মহান আল্লাহতায়ালা যা জানেন আমরা তা জানিনা।

 

সুতরাং এ থেকে বোঝা যায় যে, কোন বিধবাকে সারা জীবন বৈধব্য বেশ ধারন কিংবা অবিবাহিত অবস্থায় একাকিত্ব জীবন কাটানোর কোনরূপ বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। বরং অন্য আর দশজন মুসলিম নারীর মত স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্যই উৎসাহিত করা হয়েছে এবং তিনি কি করবেন সেই সিদ্ধান্ত নেবার সম্পূর্ণ স্বাধীনতাও তাকে দেয়া হয়েছে।

 

ইসলামে বিধবাদের জন্য কোনরূপ বৈষম্য নীতি নেই। কিন্তু তারপরও কেন যেন এদেশের মুসলিম সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই বিধবাদের প্রতি অন্য ধর্মের আচরণ বিধি আরোপের মনোভাব পোষণ করা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারছে না। কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তারপরও শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত পরিবারে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অজ্ঞতা বশত বিধবাদের বিজাতীয় বৈধব্যের বেশ পরিয়ে বশে রাখার এবং বাঁকা চোখে দেখার প্রবণতা রয়েই গেছে। ইসলামের বিধান পালন করা সধবা, বিধবা ও স্বাধীন নারীদের বেলায় সমানভাবে প্রযোজ্য। স্বামীর মৃত্যুর কারনে ধর্মের নামে নারীর উপর দমন পীড়ন চালানো বা বাকী জীবন সাদা শাড়ি পরিয়ে একঘরে করে রাখার কথা কখনই ইসলাম বলে না। মূল বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারনা সৃষ্টি হওয়ার কারনে অনেকে না বুঝেই ইসলামের বিষোদগারে নেমে পড়েন। অথচ সমাজে বিধবাদেরও যে আর দশজন মানুষের মত করে বাঁচার অধিকার আছে সেই সুসংবাদই মহান স্রষ্টা আল-কোরআনে জানিয়ে দিয়েছেন। মুসলিম হয়ে আল্লাহর বিধানের প্রতি অবজ্ঞা করা মোটেই উচিত নয়। কারন তাতে অশান্তিই মেলে। নানা মুনির নানা মত ও পথের অনুকরণ নয়, বরং মুসলিমদের মৌল বিধান আল- কোরআন ও রাসূলের (সাঃ) সুন্নাহর সঠিক বাস্তবায়নই আমাদেরকে সকল কুসংস্কার ও হীন মনোভাবের হাত থেকে রক্ষা করতে ও শান্তি দিতে পারে।

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (টি রেটিং)