শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) : হাদীস চর্চায় তাঁর কালজয়ী অবদান

যে সব উলামায়ে কেরামের অসামান্য খিদমত, নিরন্তর দাওয়াত, নিরবচ্ছিন্ন তা’লীম, সুগভীর আধ্যাত্ম সাধনা, ক্ষুরধার লেখনী, সম্মোহনী ওয়ায-বক্তৃতা এবং তাগুতী শক্তির বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াইয়ের কারণে বাংলাদেশে দ্বীনের অনুকুলে সজীব পরিবেশ ও বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের (রহ.) নাম সমসাময়িক কালে শীর্ষে রয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৬৫ বছর ব্যাপী হাদীসের খেদমত শায়খুল হাদীসের জীবনকে করেছে সফল ও বর্ণাঢ্য। ভারতীয় উপমহাদেশের বিস্ময়কর মননের অধিকারী বিপ্লবী উলামায়ে কেরামদের দীর্ঘ সাহচর্য, কঠোর অধ্যবসায়, প্রখর মেধা শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) কে সফলতা ও স্বার্থকতার তুঙ্গে শৃঙ্গে নিয়ে গেছে। নিরবচ্ছিন্ন সাধনা ও কঠোর অধ্যবসায় মানুষকে যে সফলতার স্বর্ণদ্বারে পৌঁছাতে পারে শায়খুল হাদীস তার প্রকৃষ্ট স্বাক্ষর। অনুবাদ ও হাদীস শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেকের মূল্যবান অবদান রয়েছে কিন্তু শায়খুল হাদীস
আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) অন্যদের ছাড়িয়ে গেছেন। ‘শায়খুল হাদীস’ ও ‘আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)’ একে অপরের পরিপূরক ও সম্পূরকরূপে পরিগণিত। এদেশের মানুষ শায়খুল হাদীস বলতে আল্লামা আজিজুল হককে বুঝেন যেমন শায়খুল হিন্দ, শায়খুল ইসলাম ও হাকিমুল উম্মাত বলতে যথাক্রমে আল্লামা মাহমুদুল হাসান (রহ.), আল্লামা সাইয়িদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) ও আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) কে বুঝায়। ভারতে শায়খুল হাদীস বলতে আল্লামা যাকারিয়া (রহ.) কে বুঝায় আর বাংলাদেশে বুঝায় আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) কে।

শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এর বর্ণাঢ্য জীবন, জ্ঞান সাধনা ও অমর কীর্তি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়। জ্ঞান আহরণ, জ্ঞান বিতরণ ও জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে জাতি ও দেশ গঠনে তার অবদান বিশাল ও বিপুল। দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী ব্যাপী তিনি ঢাকার লালবাগ জামেয়া কোরআনিয়া, বরিশাল মাহমুদিয়া মাদরাসা, মোহাম্মদ জামিয়া মোহাম্মদিয়ায় সিহাহ সিত্তার শীর্ষে অন্তর্ভূক্ত অন্যতম বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ বুখারী শরীফের দরস দিয়েছেন। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত যুগপৎ পাঁচটি মাদরাসায় পালাক্রমে বুখারী শরীফের দরস পরিচালনা করেন। হযরতের নিকট বুখারী শরীফ পড়ার জন্য ছাত্রদের মাঝে একটি বিশেষ আগ্রহ ও উৎসুক্য লক্ষ্য করা যেত। তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় ও যুক্তগ্রাহ্য উপস্থাপনায় বুখারী শরীফের যে তাত্ত্বিক দরস দেন তা যে কোন ক্যাটাগরীর ছাত্রদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। যে কোন অধ্যায় শুরুর আগে তিনি উক্ত অধ্যায়ে অন্তর্ভূক্ত হাদীসগুলোর বিষয়বস্তু ও সারসংক্ষেপ সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করতেন। ফলে সামনের হাদীসগুলোর অর্থ মর্ম বুঝতে শিক্ষার্থীদের বেগ পেতে হয়নি। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এর দরসে শায়খুল হাদীস
আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.), আল্লামা ইদরিস কান্দেলভী (রহ.) ও হযরত আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.) এবং আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরি (রহ.) এর ফয়েয ও জ্ঞান সাধনার আলোক দ্যুতি ছিল লক্ষ্যণীয়।

সর্বোচ্চ প্রামাণ্য হাদীস গ্রন্থ সহীহ আল বুখারীর সাত খণ্ডে বাংলার অনুবাদ ও ভাষ্য শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এর অসাধারণ ও অমর কীর্তি। বাংলা ভাষায় এটাই সর্বপ্রথম বুখারী শরীফের তরজমা। কেবল অনুবাদ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি বরং গুরুত্বপূর্ণ হাদীসের যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলতে গেলে এটা বিশ্লেষণধর্মী অনুবাদ। পঞ্চম খণ্ডটা সীরাতুন্নবী সংকলনরূপে তিনি তৈরী করেছেন। অন্যান্য হাদীস গ্রন্থ থেকে তথ্য এনে তিনি এটাকে প্রামাণিক করার প্রয়াস চালিয়েছেন। এটাই এ খণ্ডের বৈশিষ্ট্য। ভারতের সুরাটের ডাভিলস্থ ইসলামিয়া মাদরাসায় অধ্যয়নকালীন শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.) সহীহ বুখারীর বিভিন্ন হাদীসের যে তথ্য ও তত্ত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করতেন আল্লামা আজিজুল হক তাৎক্ষণিক তা নোট করে রাখতেন এবং পরবর্তীতে হাদীসের ব্যাখ্যা সম্বলিত পান্ডুলিপি তাকে দেখিয়ে সংশোধন করে দিতেন। এ ভাবে তিনি ছাত্র জীবনে ১৮০০ পৃষ্ঠার বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ রচনা সম্পন্ন করেন উর্দূ ভাষায়। বর্তমান তা পাকিস্তানে মুদ্রিত হয়ে সুধী ও আহলে ইলমদের নিকট বেশ সমাদৃত। আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.) এই ব্যাখ্যা গ্রন্থের বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা ও যুক্তির কারণে বেশ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। বুখারী শরীফের বাংলা ভাষ্যে আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.), আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.), আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরি (রহ.) এর ফয়েয ও চিন্তাধারার প্রভাব অপ্রতিহতভাবে লক্ষ্যণীয়। লালবাগ জামেয়া কোরআনিয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরি (রহ.) তার প্রিয়তম ছাত্র আল্লামা আজিজুর হকের দ্বারা যাতে বাংলা বুখারী শরীফের অনুবাদ কর্ম সম্পাদন হয় সেজন্য তিনি পবিত্র মক্কা মদীনায় বিনয় সহকারে দু’আ করেছেন আল্লাহ তা‘আলার দরবারে। আল্লাহ পাক এ দু’আ কবুল করেছেন। ১৯৫৭ সালে লিখিত বাংলা বুখারী শরীফের ভূমিকায় আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরি (রহ.) শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এর মূল্যায়ন করে যে মুখবন্ধ লিখেন তা এ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।

“আমার পরম দোস্ত মাওলানা আজিজুল হক সাহেবের দরজা আল্লামা বুলন্দ করিয়া দিন। তিনি এত বিরাট কাজে হাত দিতে সাহস করিয়াছেন তিনি জওয়ানে সালেহ, তিনি বাস্তবিকই এ কাজের যোগ্যতা রাখেন। যতদূর আমার জানা আছে বুখারী শরীফ বর্তমান যুগে বাংলাদেশে তাহার চাইতে অধিক যত্নসহকারে আদ্যপান্ত বুঝিয়া আর কেহ পড়েন নাই এবং বুখারী শরীফের খিদমতও এতদুর কেহ করেন নাই। ... কাজেই তাহার যোগ্যতায় ও বিশুদ্ধতায় কোন সন্দেহ থাকিতে পারে না। ... যখন বাংলাদেশের অভাব মিটাইবার জন্য তিনি বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদ করা শুরু করিয়াছিলেন তখন আমার খুশীর আর সীমা রহে নাই। আল্লাহর শোকর করিয়াছি, মক্কা শরীফে গিয়া হাতীমে, মাতাফে, মাকামে ইব্রাহীমে দু’আ করিয়াছি, মদীনা শরীফের রওজা পাকে দাঁড়াইয়া দু’আ করিয়াছি এই বিরাট খেদমত আল্লাহ পাক তাহার দ্বারা নিন; বাংলার মুসলমানদের জরুরত মিটান।”

মাওলানা আজিজুল হক সাহেব লিখিয়া আমাকে দেখাইয়াছেন; অনেক জায়গায় আমি তাহাকে বুঝাইয়া দিয়াছি; অনেক জায়গায় দেখিয়া কিছু কিছু সংশোধন তাহার দ্বারাই করাইয়াছি। আল্লাহ পাক তাহার দরজা বুলন্দ করুন, কবুল করুন এবং পাঠকগণকে ইহা হইতে ফয়েয দান করুন। ইহ-পরকালের ভাল করুন। আমি গোনাহগার আল্লাহ পাকের দরবারে করুণ সুরে দু’আ করি আমিন। ছুম্মা আমিন।”

হযরত ফরিদপুরি (রহ.) এর এই করুণ দু‘আ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে অক্ষরে অক্ষরে। আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)এর জীবদ্দশায় বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদ এমন ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে যে, ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঢাকার হামিদিয়া লাইব্রেরী এর দ্বাদশ সংস্করণ বের করেছে। ষাটের দশকে আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) বাংলা ভাষায় বুখারী শরীফের তরজমায় যখন হাত দেন তখন এদেশের আলিমগণ বাংলা চর্চায় ছিলেন দুঃখজনকভাবে পিছিয়ে। তারা বাংলার চাইতে উর্দূ ভাষার চর্চায় স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন বেশী। বুখারী শরীফের বাংলায় অনুবাদের প্রয়াস মাতৃভাষার প্রতি শায়খুল হাদীসের গভীর অনুরাগের পরিচয় মেলে। কারণ তিনি সম্যক বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভিন দেশী ভাষার জ্ঞান চর্চা ও সাধনার দ্বারা স্বদেশী ভাষাভাষী বঞ্চিত থেকে যাবে। অপরদিকে ঐতিহ্য, বৈভব ও বিশ্বজনীনতার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ভাষা ও প্রগতির বাহক। আধুনিক বাংলার অন্যতম পথিকৃৎ উইলিয়াম কেরির মন্তব্য এ ক্ষেত্রে অভিনিবেশযোগ্য Convinced I am that Bengali intrinsically superior to all other Indian languages.

“বাংলা ভাষা ভারতীয় অন্যান্য সব প্রচলিত ভাষার চেয়ে সর্বতোভাবে শ্রেষ্ঠ, এটা আমার ধ্রুব বিশ্বাস।”

প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, ভাষার ব্যবহার, বাক্যরীতি, বাক্যগঠন ও বানান পদ্ধতি সতত পরিবর্তনশীল। বিগত দু’শ বছরে বাংলা ভাষার রূপ ও বানান এমনভাবে বদলেছে যে, আগে তা কল্পনা করাও ছিল কঠিন। পঞ্চাশ বছর আগে লিখিত বুখারী শরীফের ভাষার প্রয়োগ, বাক্য বিন্যাস, শব্দ চয়ন এবং বর্তমানে ভাষার রূপ ও চেহারায় পার্থক্য এসেছে স্বাভাবিকতার পথ ধরে। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের পাঠকের মানস ও রুচির দিক বিবেচনা করে একটি শক্তিশালী সম্পাদনা পরিষদের মাধ্যমে সাত খণ্ডের বাংলা বুখারী শরীফের আদ্যন্ত সম্পাদনা করা হলে অনাগত দিনগুলোতে এর আবেদন অব্যাহত থাকবে কালজয়ী অনুবাদ কর্মরূপে।

সুদীর্ঘ ৯৩ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি মুসলিম লীগের পক্ষে ইংরেজ বিরেধী আন্দোলন, আইয়ুব খানের আপত্তিকর মুসলিম পারিবারিক আইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রথম সারিতে অবস্থান, বাবরি মসজিদ পুননির্মাণের লক্ষ্যে অযোধ্যা অভিমুখে লংমার্চের নেতৃত্ব দান, পার্বত্য শান্তি চুক্তির প্রতিবাদে লংমার্চের নেতৃত্বদান এবং সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিবাদের কারণে কারাবরণ করে ইতিহাসের সোনালী অধ্যায় রচনা করেছেন। উপর্যুক্ত গুরু দায়িত্ব ও কঠিন কাজ সম্পাদন করেও হাদীসের পঠন-পাঠন থেকে তিনি নিজেকে কোনদিন দূরে রাখেননি-এটা আশ্চর্য। শায়খুল হাদীসের উস্তাদ আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.) ও আল্লামা যফর আহমদ উসমানী (রহ.) যেমন কারাবরণ ও ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার পরও জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞান বিতরণ করে যথাক্রমে তাফসীরে উসমানী ও এলাউস সুনানের মত বিখ্যাত গ্রন্থ লিখে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন- তেমনি যোগ্য উস্তাদের যোগ্য উত্তরসুরি হিসেবে শায়খুল হাদীস বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদসহ আটটি গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ কর্ম সম্পাদন করে অক্ষয় কীর্তি রেখেছেন। তিন খণ্ডে সমাপ্ত ‘মুসলিম শরীফ ও অন্যান্য হাদীসের ছয় কিতাব’ নামক হাদীস শাস্ত্রের উপর তাঁর লিখিত গবেষণাধর্মী গ্রন্থটি বিদগ্ধ ও অনুসন্ধিৎসু হাদীস পাঠকদের কাছে বিপুলভাবে সমাদৃত।

একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে বাংলাদেশ খিলাফত মজলিশের কেন্দ্রীয় আমীরের গুরু দায়িত্ব পালন করেও পাঁচটি মাদরাসায় বুখারী শরীফের দরস দিয়েছেন। হাদীস চর্চা ও হাদীসের আলোকে সমাজ বিনির্মাণ ছিল শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এর লাইফ মিশন। এ জ্ঞান সাধক, জ্ঞান তাপস ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় মনীষীর রূহের মাগফিরাত কামনা করি আল্লাহ তা‘আলার দরবারে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

আল্লাহ ওনাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন।

-

সূর আসে না তবু বাজে চিরন্তন এ বাঁশী!

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)