কঠিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। (পর্ব-০১)

তখন সকাল ৯.০০টা অফিস থেকে আমাকে পাঠানো হয়েছিল একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিঙয়ের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করে আসার জন্য। আমিও দেরী না করে ছুটে গেলাম পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে। আমি গাড়ী থেকে নামতেই চোখে পড়ল একদল শ্রমিক বসে আছে খোলা আকাশের নিচে। কাজে ফাঁকি দিচ্ছে ভেবে আমার মেজাজ চরমে উঠে গেল। তাদের কাছে গিয়ে রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা আপনারা কাজ ফেলে এখানে বসে আছেন কেন? উত্তরে উনারা আমাকে যা জানাল তা শুনে আমিতো অবাক!!! 

কয়েকজন একসাথে বলে উঠল আমরা এইমাত্র নাস্তা করতে বসেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম সকাল থেকে আপনারা কি করেছেন? সকাল থেকে কেন নাস্তা করেননি? উনারা বলল এই সময়ইতো প্রত্যেকদিন আমরা নাস্তা করি। উল্লেখ্য যে আমি ইতিপূর্বে আরও কয়েকবার সাইট পরিদর্শনে এলেও এই সময়টাতে আসা হয়নি, তাই এই কঠিন সত্যটি ছিল আমার অজানা। তবে কথাটি শুনে আমি ব্যথিত হয়েছি, আর তাই লিখতে বসা। 

এমন দৃশ্য সবসময়ই চোখে পড়ে প্রবাস জীবনে। 

খুব সম্ভবত ২০০৬ সালে এইচ, এস, সি পরীক্ষার পরে, আমি বাসায় কম্পিউটারের সামনে বসে বাংলাদেশের বিখ্যাত নাট্যনির্মাতা/ পরিচালক সালাহ উদ্দিন লাভলু পরিচালিত নাটক “রঙ্গের মানুষ” দেখছিলাম। সেই নাটকটি দেখতে অনেক বেশী ভাল লেগেছে বিধায়, আমি একাধারে অনেকগুলো পর্ব দেখেছিলাম। সেই নাটকের কোন এক পর্বে, একজন রোগী ডাক্তারের কাছে গেলে, ডাক্তার তাকে একটি প্রেসক্রিপশন দেয়। যেখানে ঔষধের নাম হিসেবে লেখা ছিল, “প্রাতহ্রাস পূর্বক প্রাতভ্রমণ” শব্দটি শুনে আমি কয়েকবার এর অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। পরে খুব সম্ভবত ঐ নাটকেরই কোন এক দৃশ্যে এর ব্যাখ্যা করা হয়। যে ব্যাখ্যাটিতে এই শব্দটির মানে বলা হয়েছিল “ সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে কোন কিছু না করেই কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করাকেই বলা হয়, “প্রাতহ্রাস পূর্বক প্রাতভ্রমণ” 

আজ আবার আমার হঠাৎ করে সেই শব্দটির কথা স্মরণে আসল। কারণ হচ্ছে এই যে এখানে কর্মরত শ্রমিকগন। তাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা এই মাত্র হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা করতে এসেছেন। অর্থাৎ ইতিপূর্বে উনারা হাত মুখ ধোয়ার সময়টুকুও পায়নি অথবা দেয়া হয়নি। তারমানে এই দাঁড়াল যে, সেই ভোর ৪ টা থেকে সকাল ৯:৩০ অব্দি উনারা প্রাতহ্রাস পূর্বক প্রাতভ্রমণে বেস্ত ছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই, যে শ্রমিকগুলো এতক্ষণ যাবত প্রাতহ্রাস পূর্বক প্রাতভ্রমণে বেস্ত ছিলেন, তা কিন্তু কোন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে অনুযায়ী না। অথবা শীতের রাতে ঝরে পড়া কুয়াশায় ভোরবেলায় শিশিরে ভিজে থাকা ঘাসের উপর নগ্ন পদচারনে নিজের শরীরকে হালকা করার জন্যও নয়। 

তাহলে কেন এত বেস্ততা? স্বভাবতই এখন এই প্রশ্নটি উঠা স্বাভাবিক। এই যে শ্রমিকগুলো সেই সকাল থেকে এত বেস্ত ছিলেন, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে তারা প্রবাসী শ্রমিক। আর একজন প্রবাসী শ্রমিককে পূর্ব রাতে হিসেব করে ঘুমোতে হয়, আগামী কালকে সে কত ঘণ্টা ওভার টাইম করলে তার পকেটে আরও ২০ টি রিয়াল বেশী আসবে। তাকে পূর্ব রাতে হিসেব করে ঘুমোতে হয়, আগামী কালকে যদি সে কোনভাবে তার ডিউটিতে না যেতে পারে তাহলে তার বেতন থেকে কত টাকা কেটে রেখে দিবে। জীবনের এসমস্ত কঠিন এবং বাস্তব হিসেব করতে গিয়েই প্রবাসী শ্রমিকদের করতে হয় এমন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রম। 

যাই হোক সকাল বেলার নাস্তা সেরে এরা আবারও ছড়িয়ে পড়ে এদের নিজ নিজ কর্মস্থলে। আপনাদের সকলেরই হয়তো জানা আছে বর্তমান প্রজন্মের একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী বাপ্পা মজুমদার তার “সূর্য স্নানে চল” শিরোনামে একটি গানের এ্যালবাম বাজারে প্রকাশ করে। ঐ এ্যালবামেরই সূর্য স্নানে চল শিরোনামের গানটি যারা শুনেছেন তাদের কাছে গানটি মোটেও খারাপ লাগেনি বলে আমার বিশ্বাস। সেই গানটির কথাগুলো ছিল এমন 
“কৃষ্ণচূড়ার লাল পদ্মপাতার জল 
অঙ্গে মেখে, আজকে সখি সূর্য স্নানে চল” 

এমন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে দেখা যায় প্রবাসীদের 

অর্থাৎ এই গানটি দ্বারা সবাইকে আহ্বান জানানো হচ্ছে সূর্যের রোদ্দুর গায়ে মেখে নিজেকে সতেজ করার জন্য। আরও সহজ ভাষায় বলতে গেলে সমুদ্র পাড়ে খালি শরীরে সূর্যের কিরণে নিজেকে পেতে রাখা। আর এইযে শ্রমিকগুলো আছে, তারা সূর্য স্নানে প্রতিদিন নিজেদেরকে অর্পণ করতে হয়। তবে সমুদ্র পাড়ে গিয়ে আনন্দের সাথে নয়, নয় কোন উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য। এরা সকলেই প্রতিদিন সূর্য স্নান করে বাধ্য হয়ে। তবে এরা যখন সূর্য স্নান করে তখন এদের চোখে মুখে থাকেনা কোন উৎফুল্লতা, থাকেনা কোন অহংকারের ছাপ। কারণ এরা যখন সূর্য স্নান করে তখন রোদ্রের প্রখর তাপের কারণে এদের আপাদমস্তক নিজেদের শরীরের পানি নির্গত হতে থাকে। আর সেই পানিতে ডুব দিয়েই প্রতিনিয়ত এদেরকে স্নান করতে হয়। হোক সেটা ইচ্ছায় আর হোক অনিচ্ছায়। 

আপনাদের কারো কি কখনো চৈত্রের খর রোদ্দুর দুপুরে দাঁড়িয়ে, ফাঁকা মাঠে পায়ের নিচে ফাটা মাটিতে বসে প্রচণ্ড সূর্য কিরণের ভিতরে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে? যদি কারো এই অভিজ্ঞতাটা থেকে থাকে তাহলে তারা হয়তো কিছুটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। আর যদি না থাকে তাহলে উপলব্ধিতো দূরের কথা আপনি এদের পরিশ্রম সম্পর্কে চিন্তা করাটাও দুঃস্যাধ্য। তবুও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ অবিরাম যুদ্ধ করেই চলেছে। 

চলবে............

ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড : প্রবাসী শ্রমিক
বিষয়শ্রেণী: সাহিত্য
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (3টি রেটিং)

আমাদের কষ্টটা দেশের মানুষ বুঝে না রে ভাই। সুন্দর পোস্ট এর জন্য ধন্যবাদ।

-

imam

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ভাই মানুষ যেন বুঝে সে চেষ্টা করে যাচ্ছি দোয়া করবেন।

-

 


 

সত্যিই, প্রবাস জীবনে কঠিন হিসাব নিকাষ করে জীবন যাপন করতে হয়। অনেকেই বলে থাকেন যে, দেশে যদি এমন হিসাব নিকাষ মাথায় ঢুকতো, তাহলে আর প্রবাসের ঘানি টানতে হতো না।

সত্য আমরা অনেকেই এই ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত, আর তাই মানুষকে আরও সচেতন করে তোলার চেষ্টা চালাতে হবে। দোয়া করবেন।

-

 


 

ভাই আপনারা প্রবাসী হয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। আর আমার বোনেরা আপনাদেরকে দুরে রেখে কষ্ট পাচ্ছে। বলুন কষ্ট কি আপনারাই পাচ্ছেন? না কি অংশীদারও আছে। তাহলে আর শুধু আপনাদের কষ্ট না বলে বলুন উভয়ের কষ্ট

ধন্যবাদ আপনাকে

আমি আসলে দুঃখিত বোন, আমি হয়তোবা আমার জ্ঞানের দৈন্যতার কারণে বিষয়টি খুব স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারিনি। তবে আমার উদ্দেশ্য হল প্রবাসী মানুষগুলোকে দেশের প্রত্যেকটি মানুষ বুঝতে শিখুক।

-

 


 

ভাইয়া,

যাদের আত্মীয়, স্বজন, ভাই, বাবা, স্বামী, ছেলে প্রবাসে আছে তারা স্বল্প পরিমাণে হলেও প্রবাসীদের ব্যথা বুঝে।

লিখে যান আপন মনে, অবশ্যই আপনাদের কষ্ট এদেশের লোকেরা বুঝবে।
সময়ই বুঝার শক্তি দেবে।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

সে দোয়াই করছি আল্লাহ্‌ যেন সবাই বুঝার তাউফিক দান করেন আমীন। আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

-

 


 

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (3টি রেটিং)