কঠিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। (পর্ব-০২)

কোন ভাষায়, কিভাবে দিব এদের এই পরিশ্রমের মূল্য? 
http://bishorgo.com/user/592/post/1358 

প্রথম পর্বের লিঙ্ক উপরে।
আর বিরতিহীন ভাবে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাবার কারণ শুধু একটাই এরা সবাই প্রবাসী শ্রমিক। আর আমি পূর্বে যে তপ্তার বর্ণনা দিয়েছি তা হল শীতের দিনে দুপুর ১১ টার বর্ণনা। শীতের দিন না হয়ে যদি এটা অন্য কোন সময়ে অর্থাৎ গ্রীষ্মের সময় হয় তাহলে সেটা আমার বর্ণনার অতীত। 

আর এই হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের বিনিময়ে সে, যে সামান্য পারিশ্রমিক পায় তা দিয়েই তাকে প্রবাসে নিজের চাহিদা পূরণ করার পর, পরিবার পরিজন এবং বন্ধুমহলসহ সবাইকে সামাল দিতে হয়। এতকিছু করা সত্ত্বেও যদি কোন মাসে টাকা না পাঠাতে পারে তাহলে পরিবারের একেক জনের একেক ধরনের কথা তাকে খুব মনযোগ সহকারে শুনে এবং বুঝে হজম করতে হয়। 

যাই হোক সেই ভোর ৪ টা থেকে শুরু করে সকাল ১২ টা পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তাদের দুপুরের খাবারের সময় দেয়া হয়। নির্দিষ্ট একটি সময় বেঁধে দেয়া হয় দুপুরের খাবার এবং নামাজের জন্য। ১২ টা থেকে ১ টার ভিতরে নামাজ এবং খাওয়া শেষ করে তাদেরকে আবার কাজে নামতে হয়। কিন্তু সেই দুপুরের খাবারটুকুও কি তারা শান্তিতে খেতে পারে? অনেকেই হয়তো পারে আবার অনেকেই হয়তো পারেনা। 

এইতো কিছুদিন পূর্বে আমি আমার ভিসা নবায়ন করতে শহর থেকে গিয়েছিলাম অনেক দুরে একটি গ্রাম্য এলাকায়। সেখানে যার কাছে গিয়ে উঠেছিলাম তিনিও একজন প্রবাসী শ্রমিক। সন্ধ্যা বেলায় খুব ক্লান্ত শরীর নিয়ে তার আগমন ঘটল। তাকে দেখতে অন্য দিনের চাইতে বেশ খানিকটা ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কি ভাই কি হয়েছে? মন খারাপ কেন? উনি বললেন “ভাই সবই হচ্ছে আমার কপাল দুপুর বেলায় খেতে বসেছি হঠাৎ করে একটা দমকা হাওয়া এসে সব খাবার নষ্ট করে দিয়ে গেল” অর্থাৎ দুপুর বেলায় খোলা আকাশের নিচে বসে খাবার গ্রহণের সময় হঠাৎ একটি বালির ঝড় তার দুপুরের খাবারটা নষ্ট করে দিয়ে চলে গেল। এভাবে কত সময় কত স্থানে প্রবাসী শ্রমিকদের খাবার নষ্ট হচ্ছে তা আল্লাহ্‌-ই ভাল জানে। 

দুপুরের খাবার গ্রহণ শেষ হলে তারা আবার নিজেদের কাজে মননিবেশ করে। কারণ একটু খানি দেরী হলেইতো আবার সুপারভাইসারের (supervisor) বকুনি শুনতে হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব দুপুরের খাবারটা কোনভাবে শেষ করেই আবার জীবন যুদ্ধে শামিল হয়। কেউবা তপ্ত মরুবালুর উপর দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করে, আবার কেউ শুরু করে খোলা আকাশের নিচে কার্পেটহীন ফাঁকা উত্তপ্ত ছাদের উপর দাঁড়িয়ে। তখন অসহায় এসব প্রবাসী শ্রমিকদের বুকের ভিতর ফুঁপিয়ে উঠে বোবা কান্না, কিন্তু শুনার মত কোন মানুষ থাকেনা, থাকেনা কোন উপলব্ধি করার মত মন। তবুও অনবরত ভাবে এরা শ্রম দিয়েই চলেছে। কারণ শ্রম বিক্রি করেই যে এদের জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। 

একজন বৃদ্ধ শ্রমিক রাস্তার পাশে কাজ করছে 

একটু পরেই দুপুর যখন বিকেলের উপর উপুড় হয়ে পড়ে, ঠিক তখন সবাই কাজ ছাড়ে। এক এক করে সকল শ্রমিক একজায়গায় জড়ো হতে থাকে তাদের বর্তমান এবং অস্থায়ী নীড়ে ফেরার আশায়। গোধূলি লগ্নে এসে সবাই গাড়ীতে বসে পড়ে। গোধূলি ফুরিয়ে যাবার মুহূর্তে এরা নিস্তেজ, নিথর দেহ নিয়ে গাড়ীতে ঘুমিয়ে পড়ে। রাস্তার যানজটের ভিতর দিয়ে গাড়ী যখন এসে যায় গন্তব্যে, তখন এক এক করে সবাই ফিরে তাদের সেই অস্থায়ী নীড়ে। 

এভাবেই শ্রমিকরা কাজ শেষে গাড়ীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে 

ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন রুমে প্রবেশ করে তখন কি তারা শান্তি পায়? না, তারপর শুরু হয় আরেকটা যুদ্ধ। আমরা যারা টেলিভিশন নিয়মিত দেখি, তারা হয়তো বলতে পারব। বেশ কিছুদিন থেকে টেলিভিশনে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। যেখানে বিজ্ঞাপনের চিত্রে দেখা যায় একজন প্রবাসী শ্রমিক যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে কাজ থেকে ফিরে এসে ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাবারের পাত্রের কাছে যায়, তখন পাত্রের ভিতরে হাত দিয়ে দেখে একটি সাদা কাগজে লেখা আছে “ভাই খাবারটা রাইন্দা রাইখ” আপনারা যারা বিজ্ঞাপনটি দেখেছেন তারা হয়ত ক্ষণিকের জন্য আফসোস করেছেন, আবার কেউ হয়তো ভেবেছেন না বাস্তবে কি আসলে এমন হয় নাকি? তবে আসল কথা হল এটাই হচ্ছে বড় কঠিন বাস্তব। আর এভাবে প্রতিনিয়ত নানাবিধ প্রতিকূলতার মাঝেই বেঁচে থাকতে হয় একজন প্রবাসীকে। 

এই ব্লগের ক্ষুদ্র একজন ব্লগার নিজেই ডিম ভাজি করছে। 

যাই হোক এই বিজ্ঞাপনটি হচ্ছে তার একটি ছোট উদাহরণ। এর পরে শুরু হয় তার রান্না-বান্নার কাজ। থালা বাসন পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে মাছ কাটা পর্যন্ত সবকিছুই তাকে নিজ হাতে সামাল দিতে হয় সেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে। আর এমন শ্রম দিয়ে তৈরি করা খাবারটিই যখন খেতে বসলে বালির ঝড় এসে নষ্ট করে দেয় তখন স্বাভাবিক ভাবেই মনের ভিতর কাল বৈশাখীর ঝড় উঠাটাইতো স্বাভাবিক। এত কছুর পরেও পিছনের দুঃখকে ভুলে গিয়ে সামনে এগিয়ে চলতে হয়। 

সারাদিনের এমন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, রাতের খাবার গ্রহণ করে এদের অনেকেই আবার ছুটে যায় পার টাইম (per time) কাজ করতে। কেউ যায় বড় কোন দোকানে, আবার কেউ যায় কোন শপিং মলে। এভাবে কেউ রাত ৯ টা থেকে ১২ টা কেউবা আবার ১০ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত কাজ করতে থাকে। সত্যিই এমন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মধ্য দিয়েই একজন প্রবাসী শ্রমিককে দেশে টাকা পাঠাতে হয়। কিন্তু কজনইবা বুঝে তাদের সেই কষ্টের কথা, কজনইবা বিশ্বাস করে তাদের এই হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের কথা। তবে বিশ্বাস করুক আর না করুক সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই প্রবাসের একজন শ্রমিককে পার করতে হয় প্রতিটি মুহূর্ত। 

এদের এমন কঠিন পরিশ্রম কি ভুলে যাবার মত? 

চলবে.........

ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড : আমরা প্রবাসী শ্রমিক।
বিষয়শ্রেণী: সাহিত্য
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (4টি রেটিং)

সালাম

 

ভাই , অনেক  ধন্যবাদ ।  প্রবাসীরা  যে  এত  কষ্ট করে  দেশে    অর্থ পাঠান , তা  অনেকেরই  অজানা ।

সম্ভব হলে  কোন  বাংলা  দৈনিকে লেখাটি পাঠান ।  তাহলে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না , তারাও পড়তে পারবেন ।

-

ওয়ালাইকুম আসসালাম,

আপনার পরামর্শের জন্য অনেক ধন্যবাদ, চেষ্টা করব কোন দৈনিকে পাঠাতে।
-

 


 

সালাম

ভাইয়া! আসলেই প্রত্যেক কাজের আলাদা আলাদা পরিশ্রম বা কষ্ট থাকে, সত্যই প্রবাসীদের কষ্ট দেশী ভাইদের চেয়ে অনেক অনেক গুণে বেশী। কারন যারা দেশে থাকেন, তারা  পরিশ্রমের পর বাসায় এসে আবার নতুন করে পরিশ্রম করতে হয়না। মা, বোন, বা যাদের স্ত্রী আছে তারাই রান্নার কাজটা সেরে ফেলেন। আপনার এই লেখায় প্রবাসীদের বাস্তবতা উঠে এসেছে। যারা জানে না তারাও জানতে পারলো যে, প্রবাসী ভাইদের কষ্ট কত বেশী।

তাই আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ

-

▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬
                         স্বপ্নের বাঁধন                      
▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬

ওয়ালাইকুম আসসালাম,

আমি শুধু একটুখানি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আসলে আমার লেখাতে প্রবাসীদের কষ্টের মাত্র একটি খণ্ড এসেছে। এ কষ্টের কাহিনী আরও অনেক দীর্ঘ।
আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
-

 


 

ধারাবাহিকের জন্য ধন্যবাদ মামুনুর রশীদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ।

-

 


 

ধন্যবাদ সত্য ঘটনাটি তুলে হরার জন্য।

-

imam

আমি চেষ্টা করেছি, কতটুকু পেরেছি সেটা আপনারা ভাল বলতে পারবেন। আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

-

 


 

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (4টি রেটিং)