কঠিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। (শেষ পর্ব)

এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকরা 
প্রথম পর্বের লিঙ্ক

http://bishorgo.com/user/592/post/1358

দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক 
http://bishorgo.com/user/592/post/1368


অবশেষে নিথর দেহ নিয়ে রাতের অন্ধকারে রুমে প্রবেশ করে, খুব সতর্ক অবস্থায় দরজাটা খুলে নিজ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। শব্দ করা বা বাতি জ্বালাবার কোন উপক্রম নেই। কারন এতে করে পাশে শুয়ে থাকা ভাইটির যে কষ্ট হবে। হয়ত নানামুখি চিন্তার কারণে ঘুম আসেনা। তবুও তার শরীর যে আর ভার বইতে পারছেনা তাই হয়তো কোন এক সময় নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়ে গভীর ঘুমে। ঘুম আর কতক্ষণ? হঠাৎ করে আবার ঘড়ির অথবা মোবাইলের এলার্মে ঘুম ভেঙ্গে যায়, ছুটোছুটি শুরু হয় সেই পূর্বের নেয়। 

এই যে সকাল থেকে গভীর রাত অবদি মানুষগুলো খেটে চলেছে তার বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক তারা পাবে, সেই পারিশ্রমিকটা যদি সময়মত হাতে পেয়ে যেত, তাহলে কিছুটা হলেও তাদের দুঃখের লাগব হত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, এমন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরেও তারা তাদের পারিশ্রমিক পাচ্ছেনা সঠিক সময়ে। কোন কোন সময়ে এই পারিশ্রমিক পাচ্ছেনা কখনই। 

৪০-৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ করে পারিশ্রমিক না পাওয়াটা একটু বেশীই বেদনাদায়ক 

সপ্তাহে মাত্র একদিন ছুটি পায় সেটা হচ্ছে শুক্রবার। সপ্তাহের এই দিনটাকেই স্বদেশীদের মিলন মেলা হিসেবে সবাই জানে। কিন্তু জানার ভিতরেও লুকিয়ে আছে আরও একটি অজানা সত্য। তাহল এই দিনটাতেও অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে পারেননা বাহিরে, বেড়িয়ে আসতে পারেননা একই গ্রামের ভাইয়ের বাসা থেকে। দেখা করতে পারেনা প্রবাসে তার আপনজনদের সাথে। কিন্তু কেন? 

এই প্রশ্নটির উত্তর পেলাম আমারই পাশের রুমে থাকা এক প্রবাসী ভাইয়ের কাছে। বেশ কিছুদিন থেকে উনি আমাদের ভিলায় পাশের রুমে এসেছে। কিন্তু মাস কয়েক হয়ে গেলেও উনাকে সপ্তাহের এই দিনটাতেও দেখি বেস্ত। একদিন রাতে একা পেয়ে সেই ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম। আচ্ছা আমরা সবাই শুক্রবারে কতকিছু করি কিন্তু আপনি থাকেননা কেন? 

একবার কাজ থেকে এসে আবার পার টাইম কাজেও করতে হয় এমন পরিশ্রম। 

জবাবে খুব সহজ ভাষায় উনি আমাকে জানাল, ভাই আমি প্রতি শুক্রবারে একটি ফ্ল্যাট পরিষ্কার করতে যাই তাই আপনাদের সাথে থাকতে পারিনা। আমি একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি প্রতি শুক্রবারে ঐ বাসা পরিষ্কার করে কত পান? উনি বললেন ২৫ রিয়াল। খুব আবেগ জড়িত কণ্ঠে উনি বলল ভাই ২৫ রিয়াল হয়তো আপনার কাছে কিছুনা কিন্তু আমার কাছে যে অনেক। আমিতো মাসে ১০০ রিয়াল পাই যা দিয়ে বাংলাদেশে ২০০০ টাকা হয়। আর এই টাকা দিয়ে আমার মায়ের একমাসের ঔষধ খরচ হয়ে যায়। 

আমি একটু হতবাক হয়ে উনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার রুমে চলে এলাম। আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার চোখের পানি এক্ষণই বেরিয়ে আসবে। তাই নিজেকে একটু সংযত করে হাতে পানির গ্লাস নিয়ে একটু পানি পান করলাম। কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসে ভাবলাম, এটাই কি জীবন? এর নামই কি প্রবাস? এর নামই কি বাস্তবতা? 

যাই হোক এভাবে পুরো মাসজুড়ে রোদেপুড়ে ঘামে ভিজে এমন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর একজন শ্রমিক যখন ছুটে যায় তার পারিশ্রমিকের জন্য তখন তার সামনে এসে উপস্থিত হয় আরেকটি যুদ্ধ। এবার যুদ্ধ করতে হয় তার পারিশ্রমিকের জন্য। মাসব্যাপী এমন অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে ছুটে যায় তার ঠিকাদারের কাছে। অর্থাৎ যে তাকে দিয়ে কাজ করিয়েছে। 

উল্লেখ্য যে, এখানেও বাংলাদেশের মত একদল ব্যবসায়ী আছে যারা মানুষের শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আর এদেরকে এখানে বলা হয় মেন পাওয়ার সাপ্লাইয়ার (man power supplier)। 
কিন্তু বড় নির্মম হলেও সত্য সে তার ন্যায্য পাওনাটা পায়না সঠিক সময়ে। যখন একজন শ্রমিক তার পাওনার জন্য যায় তার ঠিকাদারের কাছে। তখন বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তার পারিশ্রমিক দিতে বিলম্বিত করে। একদিন বলে ভাই আমি কোম্পানি থেকে বিল পাইনি। অন্যদিন বলে ভাই আজকে আমি চেকটা ক্যাশ করতে পারিনি, এভাবে আরও প্রায় একমাসের মত ঘুরতে হয় তার ন্যায্য হিসেব বুঝে পাবার জন্য। কিন্তু কে শুনে এই ইতিহাস, কে বুঝে তার মনের এমন কষ্ট। 

অবশেষে যখন সে তার পারিশ্রমিক হাতে পায়, বিগত দিনের কষ্টগুলো ভুলে গিয়ে আনন্দে নেচে উঠে। আর টাকাটা হাতে নিয়েই খুব নিকটজনদের ফোন শুরু করে দেয় আমি আমার বেতন হাতে পেয়েছি আপনারা কোন চিন্তা করবেননা, কিছুদিনের ভিতরেই আপনাদের হাতে টাকা পৌঁছে যাবে। কিন্তু যে নিকটজনদের নিয়ে এই মানুষটি এতকিছু ভাবে তারা কি সেই প্রবাসী মানুষটির জন্য অথবা ভবিষ্যতের জন্য এতটুকুও ভাবে? 

এখানেই কি শেষ? না প্রবাসী শ্রমিকদের পরিশ্রমের যে পুরো গল্পটা আছে, এটা হচ্ছে আরও অনেক দীর্ঘ আমি আপনাদের সামনে তার সামান্য একটি অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রবাসীরা। আমাদের অজানা অনেক কষ্ট আর কষ্টের জীবন নিয়ে। যা হয়তো সারাজীবনের জন্যই আমাদের কাছে অজানাই রয়ে যাচ্ছে। 

তবুও একজন প্রবাসী তার নিকটজনের কথা ভেবে, দেশের কথা ভেবে এভাবেই কাটিয়ে দিচ্ছে জীবনের দীর্ঘ একটা সময়। 
তবে যে যাই বলুক একজন প্রবাসী মানেই একজন দেশপ্রেমিক। 

আসুন সবাই মিলে একটু মূল্য দেই এমন কঠিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের 

ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড : কঠিন হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। (শেষ পর্ব) তবে যে যাই বলুক একজন প্রবাসী মানেই একজন দেশপ্রেমিক।
বিষয়শ্রেণী: সাহিত্য
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

"খুব আবেগ জড়িত কণ্ঠে উনি বলল ভাই ২৫ রিয়াল হয়তো আপনার কাছে কিছুনা
কিন্তু আমার কাছে যে অনেক। আমিতো মাসে ১০০ রিয়াল পাই যা দিয়ে বাংলাদেশে
২০০০ টাকা হয়। আর এই টাকা দিয়ে আমার মায়ের একমাসের ঔষধ খরচ হয়ে যায়।
"

-সত্যিই খুব বাস্তব আর খুব হৃদয় বিদারক!

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

সত্যিই বিষয়টি অনেক হৃদয়বিদারক। অনেকেই ভেবে থাকেন প্রবাসীরা অনেক সুখে আছে। শুধু প্রবাসীরাই জানে তারা আসলে কেমন আছে।

-

 


 

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)