তাকওয়া কী?

তাকওয়া কী? তাকওয়া অর্থ হচ্ছে বাঁচা, আত্মরক্ষা করা, নিষ্কৃতি লাভ করা। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় ও তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাবতীয় অপরাধ, অন্যায় ও আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ, কথা ও চিন্তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নাম তাকওয়া। একবার হযরত উবাই ইবনে কাব (রা)-কে ওমর (রা) তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, হে ওমর (রা)! পাহাড়ের দুই ধারে কাঁটাবন, মাঝখানে সরু পথ। এমতাবস্থায় কিভাবে চলতে হবে? তিনি বলেন, গায়ে যেন কাঁটা না লাগে, সাবধানে পথ অতিক্রম করতে হবে। হযরত উবাই ইবনে কাব (রা) বললেন, এটাই তাকাওয়া। সুতরাং আজকের এই পাপ পঙ্কিলতাপৃর্ণ পৃথিবী, যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে পাপাচার, অনাচার, শিরক, কুফর, বিদায়াত যেখানে অক্টোপাসের মত ছড়িয়ে আছে, দুর্নীতি, ঘুষ আর সুদের কাঁটা থেকে একজন মুমিনকে আত্মরক্ষা করে সাবধানে জীবনের পথ অতিক্রম করতে হবে। তাকওয়াই হচ্ছে যাবতীয় কল্যাণের মূল উৎস। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সাদা-কালো ধনী-দরিদ্র আরব-অনারব প্রাচ্য-পাশ্চাত্য এর ভিত্তিতে মর্যাদার মূল্যায়ন হবে না। বরং মূল্যায়নের ভিত্তি কী হবে তা তিনি নিজেই বলেছেন.. “নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে যারা তাকওয়ার অধিকারী তারাই আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত।” (সূরা হুজুরাত : ১৩) "সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের দোষ-ত্রুটি ও অংহকার দূরে করে দিয়েছেন ৷ হে লোকেরা! সমস্ত মানুষ দু'ভাগে বিভাক্ত ৷ এক, নেক্কার ও পরহেজগার-যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মর্যাদার অধিকারী ৷ দুই, পাপী ও দূরাচার যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট ৷ অন্যথায়, সমস্ত মানুষই আদমের সন্তান ৷ আর আদম মাটির সৃষ্টি৷ " ( বায়হাকী -ফী শুআবিল ঈমান, তিরমিযী) ৷ বিদায় হজ্জের সময় আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি সময়ে নবী ( সা) বক্তৃতা করেছিলেন ৷ তিনি বলেছিলেনঃ "হে লোকজন! সাবধান! তোমাদের আল্লাহ একজন ৷ কোন অনারবের ওপর কোন আরবের ও কোন আরবের ওপর কোন অনারবের কোন কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের ও কোন শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কোন শ্রেষ্ঠতাব নেই আল্লাহভীতি ছাড়া ৷ তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু সেই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান ৷ বলো, আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিয়েছি? সবাই বললোঃ হে আল্লাহর রসূল, হ্যাঁ ৷ তিনি বললেন, তাহলে যারা এখানে উপস্থিত আছে তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে এ বাণী পৌছিয়ে দেয় ৷ " ( বায়হাকী) একটি হাদীসে নবী ( সা) বলেছেনঃ "তোমরা সবাই আদমের সন্তান ৷ আর আদমকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল ৷ লোকজন তাদের বাপদাদার নাম নিয়ে গর্ব করা থেকে বিরত হোক ৷ তা না হলে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা নগণ্য কীট থেকেও নীচ বলে গণ্য হবে ৷ " ( বাযাযার) ৷ আর একটি হাদীসে তিনি বলেছেনঃ "আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তোমাদের বংশ ও আভিজাত্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেননা৷ তোমাদের মধ্যে যে বেশী আল্লাহভীরু সে-ই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী ৷ " ( ইবনে জারীর) ৷ আরো একটি হাদীসের ভাষা হচ্ছেঃ "আল্লাহ তা'আলা তোমাদের চেহারা -আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ-কর্ম দেখেন ৷ " ( মুসলিম, ও ইবনে মাজাহ) ৷ তাকওয়াই হচ্ছে জান্নাত লাভের অপরিহার্য শর্ত। কুরআনে যেখানে জান্নাতের আলোচনা করা হয়েছে, সেখানে তাকওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা মরিয়ামে আল্লাহ বলেন, “সে জান্নাতের উত্তরাধিকারী আমি অবশ্য তাদেরকে বানাব, আমার বান্দাদের মধ্যে যারা তাকওয়ার অধিকারী।” (সূরা মরিয়াম ৬৩) তাকওয়াকারী ব্যক্তি এক দিকে নফসের যাবতীয় দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিদ্রোহী ও অবাধ্য নফসকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। সমস্ত জুলুম-অনাচার, অত্যাচার ও পাশবিকতার বিরুদ্ধে হয়ে ওঠে সংগ্রামী। আল্লাহ আমদেরকে তাকওয়া অর্জন করার তাওফিক দিন।আমীন।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (6টি রেটিং)

আত্মশুদ্ধি মূলক পোষ্ট। ভালো লাগলো। জাযাকাল্লাহ্ খায়ের।

-

আমার প্রিয় একটি ওয়েবসাইট: www.islam.net.bd

*****

আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন ভাই?

সংক্ষেপে বলতে গেলে তাকওয়া অর্থ হল আল্লাহর ইচ্ছার জন্য নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেয়া, নিজের ইচ্ছার উপরে আল্লাহর ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেয়া।
তাকওয়া শব্দের সবচেয়ে উপযুক্ত (appropriate) বাংলা প্রতিশব্দ হল "মান্য করা"। কারণ, এ শব্দের দ্বারা আদেশ পালন করা, সমীহ করা, ভক্তি করা সবই বুঝায়।  সম্মান ও আনুগত্যকেন্দ্রিক যে ভয়, তাই তাকওয়া।

তাকওয়া সহজে বোঝানো যায় একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে:- একজন ডায়াবেটিস রোগীর মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু তিনি তা স্পর্শ করছেন না। এখানে ক্ষতির ভয়ে অর্থাত রোগ বৃদ্ধির ভয়ে তিনি নিজের চাহিদা ও কামনাকে দমন করছেন। ঠিক তেমনি আল্লাহর ভয়ে মানুষ যখন কোন নিষিদ্ধ তথা পাপ কাজের দিকে ইচ্ছা বা আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত থাকে, তাই তাকওয়া।
এক্ষেত্রে আল্লাহর ভয় আবার দুই রকম হতে পারে:- আল্লাহর আযাবের ভয়; আর আল্লাহর মর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি সমীহ এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হবার ভয়। আল্লাহর আযাবের ভয় বলতে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত সম্ভাব্য পার্থিব শাস্তির ভয়ও হতে পারে, আবার পারলৌকিক শাস্তির ভয়ও হতে পারে। কারণ, আল্লাহ মানুষের পাপের কারণে পরকালে যেমন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন, তেমনি দুনিয়াতেও নানাভাবে শাস্তি দিয়ে থাকতে পারেন। আর আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্ভ্রমবোধ এবং আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও কৃতজ্ঞতার কারণে যখন আল্লাহর হুকুম অমান্য করার প্রবণতা রোধ করা হয়, তখন সেটা হয় উঁচু স্তরের তাকওয়া। এ স্তরের মুত্তাকী ব্যক্তি নিছক নিজে আযাব-গযব বা বিপদে পড়ার ভয়ে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মানসিকতা থেকেই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলে।
আযাবের ভয়ে যে তাকওয়া, সেটা হল minimum requirement, যেটি না হলেই নয়। আর আল্লাহ তাআলার সম্মান ও মর্যাদার দিকে দৃষ্টি দিয়ে এবং আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের কথা চিন্তা করে ন্যায়নীতি ও বিবেকের তাড়নায় যে তাকওয়া করা হয়, সেটা হল আরো উন্নত স্তরের তাকওয়া।
তাকওয়ার দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হল যেসব কাজে আল্লাহর অসন্তুষ্টি হয় সেগুলো পরিত্যাগ করা। যেমন- চুরি-ডাকাতি, যেনা-ব্যভিচার, জুলুম-দুর্ব্যবহার ইত্যাদি।
আর তাকওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় হল, যেসব কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল হয় না বা যেসব কাজ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কোন সম্ভাবনা নেই, সেসব কাজ বর্জন করা। যেমন- দ্বীনী বা দুনিয়াবি কোন প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ জরুরী জ্ঞানার্জন ছাড়া নিছক সার্টিফিকেট ও নাম-যশ-সুনাম অর্জনের জন্য যে লেখাপড়া ও চেষ্টা-সাধনা করা হয়।
প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া হচ্ছে সকলের জন্য অপরিহার্য ও ফরয, এ নিয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে তাকওয়া রক্ষা করে চলতে পারলেই উত্তম।
প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তি শুধু আল্লাহ কর্তৃক হারাম ঘোষিত ও সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহর অসন্তুষ্টি উদ্রেককারী বিষয় থেকেই নিজেকে বিরত রাখেন, কিন্তু জীবনের বাদবাকি কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কোন কাজে আসছে কিনা, জীবনের মূল্যবান সময়গুলো আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যয়িত হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে বেখবর থাকেন। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তি সুস্পষ্ট হারামগুলো বর্জন করা এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেও মনোযোগী হন। তিনি নিজের জীবনের সকল কাজকর্মই যথাসম্ভব আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে করতে সচেষ্ট হন এবং প্রতিটি কাজ করার আগেই ভাবেন এর দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কাজটা হাসিল হবে কিনা। এটা করতে গিয়ে যে কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে সহায়ক হবে না বলেই মনে হয় সেগুলো বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে যেসব কাজ সহায়ক হবে সেগুলোতেই নিজেকে ব্যস্ত ও নিয়োজিত রাখেন।
এই দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়া আবার প্রথম পর্যায়ের তাকওয়াটি বজায় রাখার সহায়ক। প্রথম পর্যায়ের তাকওয়াটি নিরাপদ ও অটুট রাখতে হলে দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়াটিও অর্জন করে নেয়া ভাল। কারণ, দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়া সুরক্ষিত না থাকলে প্রথম পর্যায়ের তাকওয়াটিও অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে। হারাম বর্জনকে নিশ্চিত করতে হলে যেসব হালাল বস্তুও হারামের দরজা ও রাস্তা খুলে দিতে পারে সেসব হালালকেও পরহেয করে চলার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন- চুরি করা, যেনা করা বা মানুষকে কষ্ট দেয়া হারাম। পক্ষান্তরে পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে চাওয়াটা বা সন্তানকে ফার্স্ট বানাতে চাওয়াটা কোন হারাম কামনা নয়। কিন্তু এই দ্বিতীয় বিষয়টি অনেক সময় মানুষকে প্রথম বিষয়টিতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। যেমন ধরুন, পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার জন্য আপনাকে নকল করার বা কোন শিক্ষকের সাথে অবৈধ আর্থিক লেনদেন করার প্রয়োজন হল, যা মূলত একটি চুরি। কিংবা পরীক্ষায় নম্বর ভাল পাওয়ার জন্য বিপরীত লিঙ্গের কোন শিক্ষকের অনৈতিক বাসনা পূরণ করতে রাজি হতে হল, কিংবা বিপরীত লিঙ্গের কোন শিক্ষার্থী বন্ধুর কাছ থেকে নোট-সাজেশন বা ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সংগ্রহ করতে গিয়ে অবৈধ কাজে লিপ্ত হতে হল, অথবা বিপরীত লিঙ্গের কোন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হল। এছাড়া লেখাপড়ায় অতিরিক্ত ভাল করতে গিয়ে নিজের উপর অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ দেয়া, নিজের শরীরেরর ক্ষতি করা হয়- আর জরুরী কারণ বা প্রয়োজন ছাড়া নিজের ক্ষতি করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। আর যদি নিজের সন্তানকে পরীক্ষায় ফার্স্ট বানাতে গিয়ে তার উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া হয়, তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টে ফেলা হয়, এমনকি মেজাজ খারাপ করে মৌখিক দুর্ব্যবহার ও শারীরিক শাস্তি প্রদান করা হয়, তাহলে তো এটা স্পষ্টতই জুলুম। আর বলাবাহুল্য, মানুষের উপর বিশেষত শিশুদের উপর জুলুম ও দুর্ব্যবহার করা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচাইতে বড় হারাম ও গর্হিত কাজ।
অতএব, প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া অবলম্বনকারী ব্যক্তি এই দ্বিতীয় পর্যায়ের তাকওয়ার ব্যাপারে সচেতন ও সজাগ না থাকলে মনের অজান্তে প্রথম পর্যায়ের তাকওয়া থেকেও বিচ্যুত হয়ে পড়তে পারে যেকোন সময়ে এবং চুরি, যেনা, জুলুম ইত্যাদি তাকওয়ার পরিপন্থী যেকোন কর্মে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই তো বলা হয়, "সাবধানের মাইর নাই।" তাকওয়ার বিপরীত আচরণ তথা অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারিতাকে দূরেই থামিয়ে দেয়া উচিত, কাছেই ঘেঁষতে দেয়া উচিত না। ফেতনা থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই তো বুদ্ধিমানের কাজ। তাই তো পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন পাপ কাজের বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা এভাবে বলেছেন যে- "এগুলোর কাছেও যেও না।"

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (6টি রেটিং)