মহাকাশে পৃথিবীর চোখ।(শেষ পর্ব)

হাবলের চোখ: অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে পৃথিবীতে এত বিশাল বিশাল দুরবীন
থাকতে এত টাকা খরচ করে মহাকাশে দুরবীন পাঠানোর কতটা প্রয়োজন ছিল? প্রয়োজন
ছিল কারন পৃথিবীর উপরে বিশাল একটি বায়ুমন্ডল থাকার ফলে দুর মহাকাশ থেকে আসা
বিভিন্ন ধরনের আলো,পৃথিবী পৃস্ঠে আসার সময় বায়ুমন্ডল সেই আলোর অনেকটাই
শোষন করে নেয়।এরপরে যেটুকু আলো পৃথিবী পৃস্ঠে এসে পৌছায় তা খুব ক্ষীন এবং
গবেষনার জন্য যথেস্ট নয়।কিন্ত পৃথিবীর বাইরে কোন বায়ুমন্ডল নেই,স্বাভাবিক
দৃস্টি সীমানা অনেক দুর পর্যন্ত বিস্তৃত।

আর হাবলের দৃস্টি সীমা অনেক অনেক দুর পর্যন্ত প্রসারিত এর দৃস্টি ফাকি দেয়া
সম্ভব নয়।তাছাড়া হাবলের তোলা ছবি পৃথিবী থেকে তোলা ছবির চেয়ে 10 গুন বেশী
স্পস্ট।হাবলের পাঠানো ছবি এবং তথ্য থেকে বিন্গনীরা অনেক অজানা তথ্য জানতে
পেরেছেন,যা এর আগে তাদের জানা ছিল না।কাজেই এই রকম একটি দুরবীনের খুব
প্রয়োজন ছিল।

হাবলের পাঠানো তথ্য ও ছবি: হাবলকে মেরামতের পর 1993 সালের 18 ই ডিসেম্বর
হাবল M-87 গ্যালাস্কীর প্রথম ছবি পাঠায় যা দেখে বিন্গানীরা অবাক হয়ে
গেলেন,সেই ছবি ছিল ঝকঝকে। আর M-87 গ্যালাস্কীর ছবি পৃথিবীর দুরবীনের
সাহায্যে তোলা সেই ছবি ছিল ঘোলা আর অস্পস্ট।

কালপুরুষ (Orion) মন্ডলের M-42 ওরিয়ন নীহারিকা অভ্যন্তরে নক্ষএ সৃস্টি হয়
কিভাবে তা বিন্গানীরা দেখতে পেয়েছেন। পৃথিবী থেকে 7 হাজার আলোকবর্ষ দুরে
ঈগল নীহারিকায় প্রায় 1 লক্ষ কোটি কিঃমিঃ উচ্চতার বিশাল এক ধূলি মেঘের
আস্তরন রয়েছে।এই মেঘের মধ্যে সূর্যের দ্বিগুন 100 টি নতুন তারার সন্ধান
পেয়েছে হাবল।হাবল M-87 গ্যালাস্কীর কেন্দ্রর চারিদিকে প্রচন্ড গতিতে
ঘূর্নায়মান জলন্ত গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে,এর সম্ভাব্য কারন হতে পারে বিশাল
আকারের কৃন্ষ গহ্ববর।

ড্রাকো (Draco) মন্ডলের ক্যাটস্‌ আই (Cats eye) নীহরিকায় উজ্জল কমলা রংয়ের
বিশাল একটি বলয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে,এর সম্ভাব্য কারন হতে পারে তারকার
মৃত্যুর সময়ের বিস্ফোরের ফল।হাবল দেখতে পেয়েছে 50 কোটি আলোকবর্ষ দুরে
স্কালপটার (Sculptor) মন্ডলের কার্ট হুইল (Cartwheel) গ্যালাস্কীর কেন্দ্রে
এর সহচর অপর একটি গ্যালাস্কী প্রচন্ড বেগে ভিতরে প্রবেশ করার ফলে যে
শকওয়েভের সৃস্টি হয়েছে তার গতি ছিল ঘন্টায় প্রায় সোয়া তিন লক্ষ মাইল।হাবল
দেখতে পেয়েছে দক্ষিন আকাশে ইটা ক্যারিনা তারাটিতে 1841 সালে এক বিশাল
বিস্ফোরন ঘটে, এবং তখন এটি আকাশের দ্বিতীয় উজ্জলতম বস্তুতে পরিনত হয়।হাবলের
অনুসন্ধানে প্রমান পাওয়া গেছে যে আমাদের সৌরজগতের চেয়েও বড় বিশাল দুটি
অগ্নিগোলোকের বিস্ফোরনই এই তারাটির উজ্জলতা বৃদ্ধিরকারন।

HH1 এবং HH2 নামক দুটি তারার প্রায় 1 লক্ষ আলোকবর্ষ বিস্তৃত অন্চলে দুটি বড়
কিন্ত হালকা মেঘপুন্জে ঘন্টায় কয়েক হাজার কিঃমিঃ বেগে ঝড় প্রবাহিত
হচ্ছে।প্রায় দুই দশক পূর্বে বিন্গানীরা এই সিন্ধান্তে উপনিত হন যে এই দুটি
তারার একটির মাধ্যাকর্ষন বৃদ্ধি পাওয়ায়,এর চারপাশের মেঘের স্তরকে নিজের
কেন্দ্রের দিকে আকৃস্ট করায় ধূলায় অতি ঘনত্বের সৃস্টি হয়।এবং অতিরিক্ত
পদার্থ বিপরীত দিকে ছড়িয়ে পড়ে, এই মেঘপুন্জের সৃস্টি করে।পৃথিবীর দুরবীনের
সাহায্যে তোলা ঝাপসা ছবির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া অনুমান করা গেলেও,হাবল সেই
দুই দশকের রহস্যপূর্ন প্রশ্নের নিশ্চিত সমাধান দিয়েছে।

1995 সালের ডিসেম্বরে হাবল সপ্তর্ষী মন্ডলের লেজের কাছাকাছি সরু একফালি
জায়গায় দৃস্টি দিয়ে সেখানকার কিছু ছবি তুলে আনে,কিন্ত এর আগে এই স্হানটিকে
তুলনামুলক "শূন্য" অন্চল হিসাবে (যেখানে মহাশূন্যে বস্তুর উপস্হিতি
অনিশ্চিত) জানতো বিন্গানীরা। কিন্ত হাবলের তোলা ছবিতে দেখা যায় সেখানে 1500
গ্যালাস্কী বিদ্যমান।

এবং এটি এখন পর্যন্ত তোলা সবচেয়ে গভীর মহাশূন্যের ছবি।1994 সালে শুমেকার
লেভি 9 নামের একটি ধূমকেতুর 21 টি টুকরা 16 থেকে 26 শে জুলাই পর্যন্ত
বৃহস্পতি গ্রহের পৃস্টে আছড়ে পড়ে,এর এক একটি টুকরা 1কিঃমিঃ থেকে শুরু করে
4কিঃমিঃ পর্যন্ত বড় ছিল।এই টুকরা গুলির আঘাতে যে বিস্ফোরনের সৃস্টি হয়েছিল
তা হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত পারমানবিক বোমার চেয়েও কয়েকগুন বেশী শক্তিশালী।
হাবল এই বিস্ফোরনের ছবি তোলে এবং এ সর্ম্পকে বিস্তারিত পর্যবেক্ষন
করে।পরবর্তিতে এই বিস্ফোরন জনিত প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষন করে বৃহস্পতির উপাদান
সমন্ধে বহু তথ্য জানা গেছে।

হাবলের মাধ্যমেই প্রথম জানা যায়,শনির কিছু উপগ্রহের নিজেদের মধ্যে সংর্ঘস
ঘটে।এছাড়াও হাবলের মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে যে শনির বলয় সমূহ স্হায়ী
নয়,সময়ের বির্বতনের সাথে সাথে গ্রহের মাধ্যাকর্ষনে এরা ধ্বংস প্রাপ্ত
হয়।আরও প্রমান পাওয়া গেছে 1993 সালে কোন মহাজাগতিক বস্তুর প্রভাবে শনির
উপগ্রহ প্রমিথিউস তার কক্ষপথ থেকে প্রায় 31,000 মাইল দুরে সরে গেছে।মন্গল
গ্রহের ধূলিঝড়, বৃহস্পতির উপগ্রহ আই ও (IO) র পৃস্ঠে ভূমিকম্প। ইত্যাদি
বিভিন্ন ঘটনা হাবলের মাধ্যমে জানা গেছে।

হাবলকে কক্ষপথে পাঠানো হয়েছিল 10 বছরের মেয়াদে,আজ হাবল 21 বছরে পর্দাপন
করছে।এবং আরো 10 বছর এটি সক্রিয় থাকবে।যদিও এর মধ্যে হাবলকে কক্ষপথে গিয়ে
নভোচারীরা এর মেরামত করেছে।এর মধ্যে ছিল হাবল তার কক্ষপথ থেকে বছরে কয়েক
ফুট করে সরে যাচ্ছিল,তা ঠিক করা হয়েছে।এছাড়াও হাবলে স্হাপিত করা হয়েছে নতুন
নিকট অব লোহিত (Near infra red camera)ক্যামেরা।তারার কেন্দ্রের উজ্জল
অংশকে আড়াল করে পরীক্ষা চালানোর জন্য বসানো হয়েছে একটি ক্রোনোমিটার
(Chronometer),এবং উন্নত মানের নতুন আরো একটি ক্যামেরা।

হাবলের মাধ্যমে আমাদের চোখ পৌছে গেছে,মহাবিশ্ব সৃস্টির প্রথম মুহুর্তের 100 কোটি বছরের মধ্যে।
এবং হাবল প্রমান করেছে মহাবিশ্বে কমপক্ষে পাঁচগুন পদার্থ আজো
অনাবিস্কৃত।হাবলকে মহাশূন্যে পাঠানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত যে পরিমান তথ্য
উপাত্ত পৃথিবীতে পাঠিয়েছে ,তা পুরাপুরি গবেষনা করে শেষ করতে বিন্গানীদের
আগামী কয়েক দশক সময় লাগবে।
আশাকরি হাবল সামনে এই ভাবে আরো অনেক অজানা তথ্য আমাদের জানাবে।

ছবি সৌজ্যন্যে: নাসা এবং হাবল হেরিটিজ টিম।
12.হবলের তোলা প্রথম ছবি।
13.M42 নীহারিকার অভ্যন্তরে তারার জম্ন।
14.ঈগল নীহারিকার ধূলিমেঘ।
15.M87 গ্যালাস্কীর কেন্দ্র।
16.ক্যাটস্‌ আই নীহারিকার বলয়।
17.কার্টহুইল গ্যালাস্কীর শক ওয়েভ।
18.ইটা ক্যারিনার বিস্ফোর।
19.HH1 ও HH2 তারা।
20.সপ্তর্ষী মন্ডলের গ্যালাস্কী।
21.সূমেকার লেভী 9 এর টুকরা।
22.ধূমকেতুর আঘাতে সৃস্ট ক্ষত।
23.মন্গল গ্রহের ধূলিঝড়।
24.আই ও IO আগ্নেয়গিরি।

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

মহাকাশে সত্যিই মহাবিস্ময়! মানুষ কখনোই পারবেনা এসব রহস্য উদ্ঘাটন করতে। ধন্যবাদ পোষ্টের জন্য।

-

সূর আসে না তবু বাজে চিরন্তন এ বাঁশী!

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)