আন্টার্কটিকার-বরফ ও আবহাওয়া মন্ডল (প্রথম পর্ব)।

পৃথিবীর সব মহাদেশের মধ্যে আন্টার্কটিকার গড় উচ্চতা সব থেকে বেশি।আর এই
উচ্চতার কারন হলো এখানকার পুরু বরফের আবরন।এই বরফের আবরন ভেদ করে উচু উচু
পর্বত দাড়িয়ে আছে,তবে তা কেবল মাএ শতকরা 2 ভাগ এলাকায়।

আন্টার্কটিকার ভূ-পৃ্স্ঠ খুব বেশি উঁচু নয়,বরং বরফের চাপে ভূ-পৃস্ঠ
প্রায় 700 মিটার নীচে নেমে গেছে,আবার কোথাও কোথাও আন্টার্কটিকা মহাদেশের
অভ্যন্তরের শিলাতল সমুদ্রপৃ্স্ঠ থেকেও নিচে রয়েছে।
সাড়া পৃথিবীতে যত বরফ আছে তার 90 শতাংশই আছে আন্টার্কটিকায়,এই বরফের গভীরতা
বেশিরভাগ জায়গায় 2 কিঃমিঃ রের বেশি,আবার অনেক জায়গায় এই গভীরতা 4 কিঃমিঃ
এর চেয়েও বেশি।আন্টার্কটিকার মোট বরফের পরিমান 30 মিলিয়ন ঘন কিঃমিঃ,আর
পৃথিবীর মোট স্বাদু পানির শতকরা 75 ভাগ পানি আছে এই বরফের মধ্যে।

পৃথিবীর পৃস্ট বেশ কঠিন এবং হিস্তিহাপক জিনিস দিয়ে তৈরি,তাহলে বরফের চাপে কিভাবে ভূপৃস্ট নীচে নেমে যায়?

পৃথিবীর শিলাপৃস্টের ওপর যদি কয়েক ঘন্টার জন্য চাপ দেয়া যায় তবে সেটা
একটা কঠিন হিস্তিস্হাপক পদার্থের মত ব্যাবহার করে।কিন্ত অল্প চাপ যদি হাজার
হাজার বছর ধরে স্হায়ী হয়, তাহলে সেই দীর্ঘস্হায়ী চাপে পৃথিবীর অভ্যন্তরের
নরম সান্দ্র পদার্থের মত ব্যাবহার করবে।এই জন্যেই আন্টার্কটিকার ভূ-পৃস্ঠ
নীচের দিকে ডেবে গেছে।

আন্টর্কটিকার বরফের গভীরতা কিভাবে মাপা হয়?আমরা জানি ভূ-পৃস্ঠের গভীরে কূপ
খনন করে গ্যাস,তেল সহ নানান খনিজ পদার্থ উওলন করে,কিন্ত আন্টার্কটিকার
বরফের আস্তরন ড্রিল ব্যাবহার করে খনন করা সম্ভব নয়,কারন এখানকার প্রচন্ড
ঠান্ডার জন্য ড্রিলের ভিতরকার তরল পদার্থ জমে যাবে।

ভূপদার্থবিদরা এই জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যাবহার করে বরফের ঘনত্ব নির্নয়
করে।আমরা জানি কোথাও ভূমিকম্প হলে সেখানে তিন ধরনের তরন্গের সৃস্টি হয়,
পি-তরন্গ এস-তরন্গ এবং এল-তরন্গ ।এর মধ্যে এল-তরন্গ শুধু পৃথিবীর পৃস্ঠদেশ
দিয়ে প্রবাহিত হয়,বাকি দুটি পৃথিবীর অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কঠিন
পদর্থের মধ্যে দিয়ে পি-তরন্গ ও এস-তরন্গ যাবার সময় এর গতিবেগের পার্থক্য
হয়।

শেষের এই তরন্গ দুটিকে বিশেষ পদ্ধতি ব্যাবহার করে বরফের উপরে ছোড়া হয়,এবং
এগুলি বরফের স্তর ভেদ করে ভূপৃস্ঠের নীচের কঠিন পাথরের উপর প্রতিফলিত হয়ে
ফিরে আসে তখন ফিরে আসা এই তরংগকে সিসমোগ্রাফ যন্ত্রে রেকর্ড করা হয়।

এবং এই তরংগের আসা যাওয়ার সময় হিসাব করে বরফের পূরত্ব হিসাব করা হয়।অবশ্য
এর জন্য বরফের মধ্যে 150 মিটার গভীর গর্ত করে এর ভিতর বিস্ফোরন ঘটিয়ে এই
কম্পনের সৃস্টি করা হয়।

এছাড়াও তরিৎ চূম্বকীয় তরন্গ পাঠিয়েও অনেক সহজে বরফের গভীরতা মাপা হয়।এই
ভাবে দেখা গেছে যে, আন্টার্কাটিকার মধ্যভাগের বরফের আবরনের গভীরতা সবথেকে
বেশী এবং মধ্যভাগ থেকে বাইরের দিকে এই গভীরতা ধীরে ধীরে
কমেছে।আন্টার্কটিকার এই বরফের মোট এলাকা প্রায় 14 মিলিয়ন বর্গ কিঃমিঃ।

বিশাল এই বরফক্ষেএটি মাধ্যার্কষনের টানে মহাদেশের মধ্যভাগ থেকে চারিদিকে
হিমবাহ রুপে প্রবাহিত হছে,এবং উপকুল ছাড়িয়ে মহীসোপানের (Continental Shelf)
ওপর দিয়ে সমুদ্রের ওপরে বিস্তৃত হছে।

আন্টার্কটিকার বরফ কিন্ত পানি জমা বরফের মত নয়।এই বরফ তৈরি হয় অসংখ্য ছোট
ছোট বরফের কৃস্টাল দিয়ে।তাই এই বরফের প্রবাহ তরল পদার্থের মত নয়,ধাতু বা
শিলার মত কৃস্টালিন পদার্থের প্রবাহ-যাকে বলা হয় প্ল্যাস্টিক ফ্লো।

 

এই জমা বরফ যখন প্রবাহিত হয় তখন সৃস্টি হয় হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার। এগুলি নদীর
মত সঙ্কীর্ন উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হয়।গ্রীনল্যান্ড বা আন্টার্কটিকায় যে
তুষার ক্ষেএ আছে তাকে বলা হয় মহাদেশীয় হিমবায় (Continental glacier),আর
পৃথিবীতে এই দুই এলকা ছাড়া আর কোথাও এই মহাদেশীয় হিমবাহ নেই।

 

 

 

বিঞ্জানীরা দেখেছেন যে,সমগ্র আন্টার্কটিকাতে তুষারপাতের পরিমান খুবই
সামান্য।কারন আন্টার্কটিকার অধিকাংশ এলাকা এত ঠান্ডা যে সেখানকার বাতাস
জলীয়বাস্প ধারন করে রাখতে পারে না,তাই এখানকার বাতাস মরুভূমির মত
শুস্ক।সমগ্র আন্টার্কটিকাতে কেবলমাএ তীরবর্তী অঞ্চলে বছরে মোটামুটিভাবে 15
থেকে 20 সেঃমিঃ পুরু বরফ জমে।

নতুন তুষারপাত এবং হিমশৈলের আকারে ব্যায়িত বরফের পরিমানের মধ্যে একটা
সম্বনয় আছে,এর ফলে আন্টার্কটিকার বরফের পরিমান বর্তমানে তেমন কম বেশি হয়নি।

আন্টার্কটিকার এই তুষারক্ষেএটি কোথাও কোথাও একেবারে গতিহীন আবার কোথাও এর
গতি বেশ দ্রুত,এবং এই গতি কোথাও কোথাও বছরে কয়েকশো মিটার আবার কোথাও বছরে
মাএ পনেরো মিটার।

বিয়ার্ডমোর নামের একটি হিমবার গতি সবচেয়ে বেশি,দিনে প্রায় 2 মিটার,এখানে
উল্লেখ্য যে বরফের নীচের শিলাপৃস্টের ঢালের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে
হিমবাহের গতি।আবার বরফের গভীরতার সাথে এই গতির হেরফের হয়।

আন্টার্কটিকার বরফ স্তরীভূত,এই হিমবাহের মাঝে পাললিক শিলার মত অনুভূমিক
স্তর দেখা যায়।শীতে যে বরফ জমে, গরমের সময় সেই বরফের ওপরের স্তরটি আবার গলে
যায়।
আন্টার্কটিকার ভিতরের বেশিরভাগ জায়গার বরফ কোন সময়েই গলে না,এবং বার্ষিক
তুষারপাতের পরিমানও কম,তাই সেখানকার বরফের স্তর বোঝা সম্ভব নয়।

তবে ধারনা করা হয় এই বরফের ঘনত্ব মোটামুটিভাবে 0.4 থেকে 0.5 গ্রাম প্রতি ঘন
সেন্টিমিটারে,এই গভীরতা যত বাড়তে থাকবে বরফের ঘনত্বও তত বাড়বে,কারন এত
গভীরে বরফের মধ্যে আটকে পড়া বাতাস বেড়িয়ে যায়।এবং 50 থেকে 100 মিটার
গভীরতায় এই বরফের ঘনত্ব বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় 0.83 গ্রাম প্রতি ঘন
সেন্টিমিটার।

বরফের ঘনত্ব ,এর গঠন,রাসায়নিক চরিত্র,আইসোটোপ বিশ্লেষন,ব্যাকটেরিয়া এবং
উদ্ভিদ ও প্রানীর অস্তিত আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য বরফের মধ্যে
ড্রিলিং করে অনেক গভীর থেকে বরফের টুকরা সংগ্রহ করা হয়,এই টুকরা গুলিকে
আইস-কোর বলে।

 

এই আইস-কোর পরীক্ষাতে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায় এর আইসোটোপ বিশ্লেষন করে,এই
পদ্ধতি ব্যাবহার করে বরফের ভিতরে আটকে থাকা কার্বন-ডাই-অস্কাইড এর
কার্বন-14 আইসোটোপ থেকে এই বরফের স্তরের বয়স নির্ধারন করা সম্ভব।এছাড়া এই
আইসোটোপ পরীক্ষা করেই বিঞ্জানীরা ধারনা করেন যে আন্টার্কটিকার এই
তুষারক্ষেত্রের কোন কোন অংশের বয়স প্রায় 7 কোটি বছর।

আন্টার্কটিকার বরফের মধ্যে আছে মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিন্ডের বিশাল ভান্ডার
যুগ যুগ ধরে এগুলো বরফের মধ্যে জমা হয়ে রয়েছে,এবং প্রচন্ড ঠান্ডার কারনে
এই উল্কাপিন্ডগুলো অবিকৃ্ত অবস্হায় থাকে।তাই বিঞ্জানীদের কাছে এইগুলোর
মূল্য অপরিসীম।

আন্টার্কটিকার বরফ নিয়ে গবেষনার একটা ব্যাবহারিক দিক আছে,তাহলো এই বিশাল
বরফ পৃথিবীর আবহাওয়ার উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে তাই পৃথিবীর আবহাওয়া
নিয়ে গবেষনা করতে হলে আন্টার্কটিকার এই হিমবাহের সমস্ত তথ্য জানা বিশেষ
প্রয়োজন।

আন্টার্কটিকার জলবায়ুঃ সমস্ত পৃথিবীর সামগ্রিক জলবায়ু নির্ধারনে দুই মেরু
সুমেরু এবং কুমেরুর একটি প্রভাব আছে। পৃথিবী সূর্য থেকে যে তাপশক্তি
পায়,তার বেশিরভাগ চলে যায় পৃথিবীর নিম্ন ও মধ্য অক্ষাংশ এলাকায়।সমুদ্র ও
বায়ুস্রোতের সাথে এই তাপের অনেকটা অংশ এই দুই মেরু হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়।
এই ভাবে শীতল দুই মেরু এলাকা ভূপৃস্ঠের সামগ্রিক তাপের সমতা বজায় রাখতে সাহায্যে করে।

 

 

আন্টার্কটিকা মহাদেশের চারপাশের সমুদ্রতলকে তিনটি বেসিনে ভাগ করা
হয়েছে,এর প্রত্যেকটির গভীরতা 3000 থেকে 5000 মিটার।এই তিনটি বেসিনের
সীমানায় রয়েছে একটি করে শৈলশিরা,আবার এই সবকটি বেসিনকে উওর সীমা দিয়ে ঘিরে
রয়েছে বিশাল মগ্ন শৈলশিরার (Circumantarctic ridge system)বেস্টনী।

চলবে...............

ছবি গুগল।

 

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (5টি রেটিং)

অসাধারণ তথ্যবহুল পোস্ট। ভালো লাগলো। নিয়মিত থাকবেন।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

অবশ্যই থাকার চেস্টা করবো।

ধন্যবাদ।
-

They can not on this level understand a grain of salt much less than the
universe।

নেবুলা মোর্শেদ।

অসাধারণ ভাল লেগেছে।

ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।

''সাদামেঘ''

ভাল লাগার জন্য ধন্যবাদ।

ভালো থাকুন সতত।
-

They can not on this level understand a grain of salt much less than the
universe।

নেবুলা মোর্শেদ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.8 (5টি রেটিং)