হিম জগতের প্রানী (প্রথম পর্ব)।

আন্টার্কটিকা মহাদেশে প্রানের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে,অবশ্য এই মহাদেশের 98 শতাংশ 2-3 কিঃমিঃ পুরু বরফরের আবরনের নীচে ঢাকা।আন্টার্কটিকাতে যে কয়েকটি নিম্ন শ্রেনীর উদ্ভিদ দেখা যায়,তার বেশিরভাগই কুমেরু বৃত্তের বাইরে আন্টার্কটিক উপদ্বীপে ও এর সংলগ্ন এলাকাগুলিতে,কারন এখানকার গড় তাপমাএআ বেশী।
যেহেতু অনেক প্রানী এই উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল সেহেতু উদ্ভিদ কম বিধায় এখানে প্রানীর সংখ্যাও কম।এর বাইরে বাকি জায়গায় মস,অ্যালগি এবং লাইকেন জাতীয় উদ্ভিদ ছাড়া আর প্রানের চিহ্ন নেই বললেই চলে।


আন্টার্কটিকা উপদ্বীপের পশ্চিম তীরে এবং এর কাছাকাছি দ্বীপগুলিতে তিন ধরনের লতা আর একধরনের ঘাস পাওয়া যায়।লতাগুলির নাম ডেসচ্যাম্পপিয়া "Deschampia",ডেসচ্যাম্পপিয়া এ্যালিগ্যানটুলা" Deschampia elegantula" ও কলোবানথাস ক্রাসিফোলিয়াস "Colobanthus crassifolius" এবং ঘাসটির নাম পোয়া আনউয়া  "Poa annua"।


এর মধ্য মস,লাইকেন, এবং অ্যালগি এইসব শেওলা জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে প্রচন্ড ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা আছে।এরা প্রচন্ড ঠান্ডায় সুপ্ত অবস্হায় থাকে এবং অনুকুল পরিবেশে আবার জীবনে ফিরে আসে।মস পাওয়া যায় পার্বত্য এলাকায় প্রধান হিমবাহজাত হ্রদের আশেপাশে।
আন্টার্কটিকাতে প্রায় 1200 ধরনের লাইকেন আছে হলুদ,লাল,সাদা,কালো বিভিন্ন ধরনের।এর মধ্যে লাল লাইকেন সবচেয়ে কম দেখা যায়,পেঙ্গুইনের বাসায় হলুদ লাইকেন বেশী দেখা যায়।
মস এবং লাইকেনের চেয়ে বেশি দেখা যায় অ্যালগি(Algae),পাথর,বরফ,সমুদ্র সব জায়গায় এদের দেখা যায়।এখাকার হিমবাহজাত পানির হ্রদগুলিতে নানান ধরনের ব্যাকটিরিয়া এবং কয়েক ধরনের ফাংগাস পাওয়া যায়,এই হলো উদ্ভিদের অবস্হা।
আন্টার্কটিকা মহাদেশের প্রানীর ক্ষেত্রেও অবস্হা আরো করুন।পেঙ্গুইন,সীল,এবং পাখিরা যেহেতু সামুদ্রিক খাবারের উপর নির্ভরশীল তাই এগুলি জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটায় সমুদ্রে বা বরফের উপর কাজেই এদের সামুদ্রিক প্রানীই বলা ভালো।
এছাড়া কয়েক ধরনের নিম্ন শ্রেনীর কীটপতংগ ছাড়া আর বিশেষ কিছু নেই,আবার এই কীটপতংগুলোর মধ্যে অর্ধেকই আবার উকুন জাতীয় পরজীবী যারা পেঙ্গুইন ও সীলের গায়ে থাকে।
এইসব বাদে আর আছে পাখাবিহীন একধনের মাছি আর স্প্রিংটেল জাতীয় ক্ষুদ্র কীট,এদের বেশির ভাগের খাদ্য হচ্ছে লাইকেন।এইসব পোকাদেরও বেশির ভাগই দেখা যায় আন্টার্কটিকা উপদ্বীপে কুমেরু বৃত্তের বাইরে।
এই মহাদেশের সম্পূর্ন বিপরীত অবস্হা আন্টার্কটিক সমুদ্রের,এখানে প্রানের প্রাচূর্য এত বেশি যে পৃথিবীর আর কোথাও এর সাথে তুলনা হয় না।এই আন্টাটিকার সমুদ্রে যত প্রোটিন,কার্বোহাইড্রেট,চর্বি,শর্করা ইত্যাদির এত মজুদ আছে যা অন্য কোন সমুদ্রে নেই।আর আশ্চর্যের বিষয় হলো এর কারন এই সমুদ্রের প্রচন্ড ঠান্ডা।
এই অতিরিক্ত ঠান্ডার ফলে এই সমুদ্রের পানিতে অনেক বেশি অস্কিজেন ও কার্বন-ডাই-অস্কাইড ধারন করে রাখতে পারে।এছাড়া এখানকার পানিতে নাইট্রেট ও ফসফেটের পরিমানও প্রচুর,ছয়মাস সূর্যের আলো পাবার ফলে পানির উদ্ভিদের ফোটোসিনথেসিসের কাজে অনেক সাহায্য করে।
পানির এই উর্বরতার ফলে সমুদ্রে উদ্ভিদ-প্ল্যাংকটনের (Phytoplankton) প্রচুর প্রাচুর্য দেখা যায়,এই উদ্ভিদ-প্ল্যাংকটন আবার প্রানী-প্ল্যাংকটনের(Zooplankton) খাদ্য,ফলে আন্টার্কাটিকার সুমুদ্রে লক্ষ কোটি প্রানী-প্ল্যাংকটন জম্নায়।

এর মধ্যে পড়ে নানান জাতের ছোট ছোট প্রাণী,আন্টার্কটিকার বিখ্যাত চিংড়ি মাছ ক্রিল শ্রেনীর অন্তর্গত।এই ক্রিল খেয়ে বেঁচে থাকে পেঙ্গুইন,সীল,এবং তিমি।বিঞ্জানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন যে প্রচন্ড ঠান্ডা প্রানীদের আয়ু বাড়ায়,তাই আন্টার্কটিকাতে প্রজাতির সংখ্যা কম হলেও একই প্রজাতির সংখ্যা প্রচুর।
ক্রিল (Euphausia superba):দক্ষিন সমুদ্রে খাদ্য তালিকার একবারে নীচে আছে ফাইটোপ্ল্যাংকটন,এর মধ্যে আছে ডায়াটম (Diatom) জাতীয় এককোষী উদ্ভিদ,অ্যালগি ইত্যাদি।

এর পরে আছে জুপ্ল্যাংকটন এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে ক্রিল দুই থেকে তিন ইঞ্চি লম্বা কমলা রংরের এই চিংড়ি মাছটি দক্ষিন সমুদ্রের অধিকাংশ প্রানীর প্রধান খাদ্য,এক কেজি ক্রিলে খাদ্যপ্রান আছে প্রায় 1200 ক্যালরি।


এই ক্রিলের শরীরে এক ধরনের পিগমেন্ট আছে যা দিয়ে আলসারের ওষুধ তৈরী হতে পারে।এই পরিবারের অন্যান্য চিংড়ি পৃথিবীর অন্যান্য সমুদ্রেও পাওয়া যায়,কিন্ত ক্রিল শুধুমাত্র পাওয়া যায় দক্ষিন সমুদ্রে।
একটা তিমি দিনে প্রায় 4 টন ক্রিল খায়,এবং তিমি,সীল,পেঙ্গুইন এরা সবাই মিলে বছরে যত ক্রিল খায়,তার পরিমান হলো পৃথিবীতে যত মাছ ধরা হয় তার তিনগুন।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই ক্রিল ধরা শুরু করেছে তবে চুক্তি অনুযায়ী এই ক্রিল ধরতে পারবে শুধু 60 ডিগ্রী দক্ষিন অক্ষাংশের বাইরে,কারন এর বাইরের দক্ষিন অঞ্চল সংরক্ষিত।
আন্টার্কটিকার মাছঃ আন্টার্কটিকাতে যত মাছ পাওয়া যায় তার 90 শতাংশ হচ্ছে নোটোথেনিড (Notothenid) পরিবারের,তবে এদের দক্ষিন সমুদ্রের বাইরে এদের দেখা যায় না,আবার একই পরিবারের ছোট মাছও আছে।

এদের কয়েকটি প্রজাতির রক্তে লোহিত কনিকা নেই, কারন এই সমুদ্রের পানিতে এত বেশী পরিমান অস্কিজেন দ্রবীভূত আছে,আর এত প্রচন্ড ঠান্ডা পানির জন্য মাছের শরীরে বিপাক (metabolism) এত ধীরে হয় যার ফলে এই সব মাছ সরাসরি শ্বাসযন্ত্র থেকে অক্সিজেন নিয়ে রক্তের প্লাজমাতে দ্রবীভুত করতে পারে।
আবার কিছু মাছের এমন ক্ষমতা আছে যে প্রচন্ড ঠান্ডায়ও এদের রক্ত জমাট বাধে না।এই ক্ষমতা আছে ডিজোটিসাস মাওসানি "Dissotichus mawsani" ও ট্রেমাটোমাস "Trematomus" প্রজাতির মধ্যে এছাড়াও এদের রক্তে এক ধরনের অ্যান্টিফ্রিজ আছে।
এই অ্যান্টিফ্রিজের কাজ করে একটি গ্লাইকোপেপটাইড (Glycopeptide) যা হচ্ছে দুইটি অ্যামিনো অ্যাসিড এর নাম (alanin ও threonine) ও দুটি শর্করা (galactose ও N-acetygalactosamine) দিয়ে এগুলি তৈরী।দক্ষিন সমুদ্রের মাছেদের আর একটি ক্ষমতা আছে তা হলো দ্রুত বাড়ার।
রস বা ওয়েডেল সমুদ্রের আইস শেলফের মধ্যে ঠান্ডায় জমে যাওয়া বড় বড় মাছ পাওয়া গেছে,এবং এগুলির কার্বন-14 ডেটিং করে এগুলির বয়স জানা গেছে তা প্রায় 1000 বছরেরও বেশী।ধারনা করা হয় এই মাছগুলি সমুদ্রের তলায় পৌছেছিল এবং বরফের মধ্যে আটকা পড়ে।

এবং পরবর্বীতে এই আইস শেলফ গুলি ক্ষয়ে যাবার ফলে এই মাছগুলি বরফের উপর উঠে আসে।এখন পর্যন্ত এই আইস শেলফের নীচের জীবন নিয়ে তেমন কোন গবেষনা শুরু হয়নি,এই গবেষনা শুরু হলে আরো নতুন তথ্য জানা যাবে।
চলবে........................

ছবি গুগল।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

চলুক........................
পড়ে ব্যাপক মজা পাওয়া যাচ্ছে।

ধন্যবাদ মজা পাওয়ার জন্য।

-

They can not on this level understand a grain of salt much less than the
universe।

নেবুলা মোর্শেদ।

ছবি এবং তথ্য খুবই সুন্দর। ভালো লাগলো।

ভাল লাগার জন্য ধন্যবাদ।

-

They can not on this level understand a grain of salt much less than the
universe।

নেবুলা মোর্শেদ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)