রমজানে শাহবাগে গান-বাজনা ভোগান্তিতে রোগী ও পথচারীরা

সত্তরোর্ধ্ব আকলিমা বেগম। চিকিৎসার জন্য ছেলে রমিজ উদ্দিনের
সাথে এসেছেন শাহবাগে। গতকাল (সোমবার) বিকেলে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাবেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাটতে পারেন। তবে
তা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। দশ কদম হাটার পরই বসে যেতে হয়। যেনো পা ভেঙে
আসে। কিন্তু দিনভর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের নামে রাস্তা দখল নিয়ে তা বন্ধ
করে রাখায় হেটেই যেতো হালো এই বৃদ্ধ মহিলাকে। আব্দুল মজিদ নামে আরেক রোগীর
ডান পায়ের পুরোটাই ব্যান্ডেজ করা। হোটে যাওয়ার কোন উপায় তার নেই। বেলা
তিনটার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য বের করা
হয়। কিন্তু কোন রিক্সা না পেয়ে এবং রাস্তা বন্ধ থাকায় দু’জন আত্মীয়ের হাতে
ভর করে চেংদোলা করেই তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের চারুকলা
অনুষদের সামনে পর্যন্ত। কেবল আকলিমা বেগম কিংবা আব্দুল মজিদ নয়, গতকাল
এভাবে অসহায় অবস্থায় পড়তে দেখা যায় আরও অনেক রোগীকে। আন্দোলনের নামে
শাহবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্টকে দখলে রেখে যান চলাচল বন্ধ করে
রাখায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে ওই সড়কে চলাচলকারী সকলকেই।
গতকাল
ট্রাইব্যুনাল-১ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতে
ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদ- ঘোষণা করে। তবে
রায় ঘোষণার আগের দিন থেকেই শাহবাগে অবস্থান নেয় তথাকথিত শাহবাগের গণজাগরণ
মঞ্চ। রোববার সন্ধ্যা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত অবস্থানের পর গতকাল সকাল ৮টা
থেকে তারা আবারও শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়। দুপুর পর্যন্ত হালকা যানচলাচল
করতে দেওয়া হলেও দুপুরের পর বন্ধ করে দেওয়া হয় সব কিছ্ইু। এমনকি রোগীদের
বহনকারী এ্যাম্বুল্যান্সও যেতে দেয়নি আন্দোলনকারীরা। দিনভর শাহবাগে অবস্থান
নিয়ে পবিত্র রমজান মাসে গান-বাজনায় মত্ত্ব থাকে। রমজান মাসে গণজাগরণ
মঞ্চের নেতা কর্মীরা সড়ক অবরোধ করায় মৎস্য ভবন-শাহবাগ, কাঁটাবন -শাহবাগ ও
শাহবাগ থেকে ফার্মগেট সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। শত শত যানবাহন আটকা
পড়ে আছে পল্টন- প্রেসক্লাব, কাকরাইল-মৎস্য ভবন ও এ্যালিফেন্ট রোড থেকে
ধানমন্ডি সড়কে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন অফিস ফেরত সাধারণ মানুষ।
তবে রমজান
মাসে শাহবাগীদের সড়ক অবরোধের কারণে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হন শাহবাগের
বারডেম ও বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের আসা রোগীরা। দুপুরের পর
থেকে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও শাহবাগ দিয়ে যেতে দেয়নি শাহবাগীরা। পায়ে
হেটে যেতে হয় বৃদ্ধ থেকে শুরু করে হাটতে অক্ষম রোগীরা। আর এতে মরার ওপর
খাড়ার ঘা নেমে আসে রোগীদের উপর। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থেকে রোগী নিয়ে আসা
মোবারক হোসেন বলেন, এখানে তো লোকজন বেশি নাই। পুলিশ ইচ্ছা করলে তো উনাদের
জাদুঘরের সামনে স্লোগান দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। রমজান মাসে জনগণের এমন
দুর্ভোগ সরকারের জন্য সুখকর হবে না। পথচারী আবুল হোসেন বলেন, শাহবাগে যারা
রাস্তা অবরোধ করেছেন তারা তো ৫০ জনও না। এই গুটি কয়েকজনের জন্য গোটা
রাজধানীবাসীকে কেন ভুগতে হবে। বিকেলে সোয়া তিনটার দিকে জাগরণ মঞ্চের
নেতাকর্মীরা আজিজ সুপার মার্কেটের পূর্ব কোনে অস্থায়ী ব্যারিকেড দিয়ে
যানবাহন ঘুরিয়ে দেয়। এ সময় বারডেম হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সকেও
কর্মীরা বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের পিছনের দিকের হাবিবুল্লাহ রোড ব্যবহার করতে
বলেন। এতে রোগীদের পাশাপাশি চরম অফিস ফেরত যাত্রীরাও চরম বিড়ম্বনায় পড়েন।
শাহবাগের রাস্তা বন্ধ থাকায় ওই রাস্তা দিয়ে পায়ে হেটে সাধারণ মানুষকে তাদের
গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাজমা শারমীন
বলেন, এর আগে সাড়ে তিন মাস শাহবাগ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
আবার এখন এটি দখল করে বসে থাকলে ওই সড়কে চলাচলকারী মানুষরা কোথায় যাবে।
অফিস
ফেরত সাইফুল ইসলাম বলেন, হরতালের কারণে সকালে ভয়ে ভয়ে যেতে হয়েছে। এখন
আবার সড়ক বন্ধ করে বসে থাকায় পায়ে হেটে বাসায় ফিরছি। তিনি বলেন, আমরা যারা
সাধারণ মানুষ আমাদের ভাগ্যে কি এসবই জুটবে?
শাহবাগে অবস্থিত দেশের
একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। তার পাশেই রয়েছে বারডেম হাসপাতাল এবং এর
কিছু দুরে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিনই
এই তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন হাজার হাজার মানুষ। জরুরী চিকিৎসার
জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিকল্প দেশের কোথাও নেই বলে সকলেরই জানা। তাই
দেশের বৃহৎ এই তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা শাহবাগ মোড়কেই
ব্যবহার করে থাকেন। এসব হাসপাতালে এমন অনেক রোগী আসেন যারা হাটা চলা করতেও
সক্ষম নন। তাই শাহবাগ মোড়কে অবরুদ্ধ করে রাখায় নিদারুণ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়
এসব হাসপাতালের রোগী ও চিকিৎসকদের। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান ফটক হিসেবে শাহবাগকে ব্যবহার করা
হয়। গতকাল একই সময়ে শাহবাগ ও শিক্ষা ভবন সড়কটি বন্ধ থাকায় তাদের ভোগান্তিতে
পড়তে হয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, আন্দোলনকারীরা যেন অত্যন্ত রোগী ও তাদের
স্বজনদের হাসপাতালে যাতায়াতের বিষয়টি মানবিক কারণে অন্যত্র সরিয়ে নেন।
তাদের উচিত হবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের কথা বিবেচনা করা।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)