বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) পর্ব-৪

সাহাবের দৃষ্টিতে হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )

 

দোজাহানের সর্দার নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর সঙ্গে হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) –এর সম্পর্ক কি গভীর, পবিত্র ছিল এবং দরবারে রিসালাতে তিনি কত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন সে সম্পর্কে পূর্বের লেখাগুলো থেকে আমরা কিছুটা হলেও ধারণা লাভ করতে পেরেছি। এবার দেখব সাহাবায়ে কেরামের দ্রষ্টিতে তাঁর মর্যাদা ও কদর কেমন ছিল।

হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু আনহু )-এর উপস্থিতিতে একবার হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) সম্পর্কে বিরূপ আলোচনা শুরু হলে সবাইকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বলেন,

যে কুরায়েশী যুবক চরম ক্রোধের মুহূর্তেও হাসতে পারে, যার হাত থেকে স্বেচ্ছায় না দিলে কিছু ছিনিয়ে আনা সম্ভব নয় এবং যার শিরস্ত্রাণ পেতে হলে পায়ে লুটিয়ে পড়া ছাড়া উপায় নেই, ( অর্থাৎ সহনশীলতা, সাহসিকতা ও আত্মসম্মানবোধে যে যুবক অতুলনীয় ) তোমরা তারই সমালোচনা করছ!

                                                                                                                                    ( আল  ইসতআব  -, -৩৭৭ )

আরেকবার হযত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) উপস্থিত লোকদের সম্বোধন করে বলেছিলেন-

লোকসকল! আমার পরে তোমরা দলাদলি ও কোন্দল এড়িয়ে চলবে। যদি তা না করো, তবে মনে রেখো, সিরিয়ায় কিন্তু মুয়াবিয়া রয়েছে। সে তোমাদের অবশ্যই সায়েস্তা করবে।   ( আল ইসাবাহ,খঃ ৩, পৃঃ৪১৪ )

প্রসঙ্গক্রমে এখানে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। কেননা একদিকে তা যেমন বড়দের সামনে হরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) –এর স্বতস্ফূর্ত আনুগত্য ও কৃতার্থ মনোভাবের পরিচায়ক, অন্যদিকে তেমনি তা অধিনস্থ ও নিকটজনের প্রতি হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর সদা সতর্ক দৃষ্টির জ্বলন্ত নজির।

আল্লাম ইবনে হজর ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) বর্ণনা করেন, হজরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) একবার আকর্ষণীয় সবুজ পোশাকে হজরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু)-এর খেদমতে হাজির হলেনউপস্থিত সকলে সপ্রশংস দৃষ্টিতে সেদিকে তাকাচ্ছিলেন। হজরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) কাছে এসে দাঁড়াতেই হজরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) চাবুক হাতে তাঁকে চাবকাতে শুরু করলেন। আর, হজরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) আর্তস্বরে বলতে লাগলেন, আল্লাহ! আল্লাহ! আমায় মারছেন কেন আমীরুল মুমিনীন?

কিছুক্ষণ পর হযরত উমর  ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) স্বস্থানে ফিরে এসে বসে পড়লেন। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, আমীরুল মুমিনীন আপনার প্রশাসকদের মাঝে এই কুরায়েশী যুবকের চেয়ে ভালো তো কেউ নেই; তবু যে আপনি তাঁকে মারলেন?

জবাবে হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) বললেন, এটা ঠিক যে, এ যুবকের চরিত্রে ভাল ছাড়া মন্দ কখনও আমি দেখিনি এবং এর সম্বন্ধে সবসময় ভাল সংবাদই আমি পেয়ে এসেছিতবে কিনা সবুজ পোশাকটা এর গা থেকে আমি নামাতে চাচ্ছিলাম।     ( আল ইসাবাহ খ-৩, পৃ-৪১৪ )

হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর দৃষ্টিতে যোগ্যতা ও মর্যাদার কোন শীর্ষ সোপানে হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর অবস্থান ছিল তা পরিষ্কাররুপে আমরা জানতে পারি, হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর ভাই যায়েদ বিন আবু সুফিয়ানের মৃত্যুর পরে তাঁকে সিরিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত করার ঘটনা থেকে। লোকনির্বাচন ও প্রশাসক নিযুক্তির ব্যাপারে হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর ঈমানী প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কথা গোটা দুনিয়া জানে। কোন ব্যক্তি সম্পর্কে আগাগোড়া নিশ্চিত ও আশ্বস্ত না হয়ে তাকে তিনি কোন অঞ্চলের প্রশাসক নিযুক্ত করতেন না। এমনকি নিযুক্তির পরও তার সম্পর্কে সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর নিতে থাকতেন এবং কারও মধ্যে সামান্য বিচ্যুতি বাঁ অসর্কতা লক্ষ করা মাত্র তাকে বরখাস্ত করে দিতেন। রোমকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আল্লাহর তরবারি খালিদ বিন ওয়ালিদকে পর্যন্ত সেনাপতির পদ থেকে অব্যাহতি দিতে তিনি বিন্দু মাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। সেই হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআল আনহু ) যখন হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-কে সিরিয়ার প্রশাসক নিযুক্ত করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে পদে বহাল রেখেছেন তখন এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, তাঁর উপর হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু)-এর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল।

পরবর্তী খলিফা হযরত উসমান ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহর এক বিরাট অংশ হযরত আলী ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) –এর হাতে বাইয়াত হল। ফ তিনি শরীয়ত সম্মত চতুর্থ খলীফা নিযুক্ত হলেন। ঘটপ্রবাহের এই নাযুক মুহূর্তে এসে উসমান হত্যাকারীদের কিসাস ও বিচার দাবিকে কেন্দ্র করে হয়যরত আলী ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু)-এর সাথে হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলাহু )-এর বিরাট মতবিরোধ সৃষ্টি হল, পরবর্তী পর্যায়ে যা সশস্ত্র সংঘর্ষের রূপ নিয়ে গোটা উম্মাহকে যুদ্ধান দুই শিবিরে বিভক্ত করে ফেলেছিল। তবে এ কথা বলাই বাহুল্য যে, উভয় পক্ষেরই উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ সাধন। উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষের ইখলাস ও আন্তরিকতা, তাকওয়া ও ধার্মিকতা, চরিত্রিক মহত্ত্ব ও উন্নত নৈতিকতা এবং দ্বীন _ ঈমানের প্রতি বিশ্বস্তার স্বীকৃতি দিতেন অকুণ্ঠ চিত্তে।

আল্লামা হাফেজ ইবনে কাসীর বর্ণনা করেছেন, সিফফীন যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে আপ অনুগামীদের লক্ষ্য করে হযরত আলী ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) বলেছিলেন,

হে লোক-সকল! মুয়াবিয়ার শাসনকে তোমরা অপছন্দ করো নাকেননা তাঁকে যেদিন হারাবে সেদিন দেখবে, ধড় থেকে মুন্দুগুলো হানযাল ফলের মত কেটে কেটে পড়ে যাচ্ছে।   ( আল বিদায়া, খঃ৮, পৃ-১৩১ )

রইসুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) একবার ফিকাহ সংক্রান্ত বিষয়ে হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর সমালোচনাকারীদের সাবধান করে বলেছিলেন, তিনি একজন ফকীহ ( সুতরাং, তার সমালোচনার অধিকার তোমার নেই )     ( আল বিদায়া, খঃ৮, পৃ-৩১ )

অন্য রেওয়াত অনুযায়ী তিনি সমালোচনাকারীকে আরও বলেছিলেন, তিনি তো রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর সান্নিধ্য লাভ করেছেন। ( অর্থাৎ, তিনি একজন সাহাবী অর্থাৎ কোন অধিকারে তুমি তাঁর সমালোচ করছো? ) ( আল ইসাবাহ,খঃ৩,পৃ-৪১২, বুখারী, খ-১, পৃ-৫৩১ )   

হযরত ইবনে আব্বাস ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর উপরোক্ত মন্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর কোন সাহাবীর কোন আচরণের সনমালোচনা করার অধিকার সে যুগেও কারোও ছিল না, সুতরাং এ যুগেও কারও নেই।

আরেক সমালোচনাকারীকে তিনি এই উত্তর দিয়েছিলেন, বৎস! তিনি ঠিকই করেছেন। মুয়াবিয়ার চেয়ে জ্ঞানী আমাদের মাঝে কেউ নেই। ( বায়হাকী, খ-৩, পৃ-২৬ )

দেখুন! হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, তাকওয়া ও ধার্মিকতা সম্বন্ধে হযত ইবনে আব্বাস ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) কত উঁচু ধারণা পোষণ করতেন। এমনকি রাজনীতি ও শাসন ক্ষমতার ক্ষেত্রেও তাঁর সম্বন্ধে তাঁর মন্তব্য হল, শাসন ক্ষমতার জন্য মুয়বিয়ার চেয়ে উপযুক্ত কেউ আমার নজরে পড়েনি। ( আল বিদায়া খঃ৮, পৃ-১৩৫ )

হযরত উমায়ের বিন সাআদ ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-ও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন। তিরমিজী শরর বর্ণনা মতে, তিনি হিমসের প্রশাসক থাকা অবস্থায় কোন কারণে হযরত উমর ( রাদল্লাহু তাআলা আনহ ) তাঁকে সরিয়ে হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-কে সেখানে পাঠালেন। এতে কিছু লোকের মধ্যে গুঞ্জন শরু হল। হযরত উমায়ের বিন সাআদ ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) তখন সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, দেখো! মুয়াবিয়া সম্বন্ধে উত্তম আলোচনাই শুধু করবেকেননা, নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে আমি এরূপ দুয়া করতে শুনেছি, হে আল্লাহ! মুয়াবিয়ার মাধ্যমে লোকদেরকে হেদায়াত দান করো। ( আল বিদায়া, খঃ২, পৃ-২৪৭ )

জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশ সাহাবীর অন্যতম সাহাবী হযরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) আলী-মুয়াবিয়া বিরোধে পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিলেন। তিনি বলতেন- হযরত উসমান ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর পরে মুয়াবিয়ার চেয়ে উত্তম শাসক আমার নিজ পড়েনি।

হযরত কাবীসা বিন জাবীর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, এ দু’চোখে আমি মুয়াবিয়ার চেয়ে উদার, সহনশীল ও নেতৃতের যোগ্য কাউকে দেখিনি।

ইনশাআল্লাহ, পরবর্তী পর্বে তাবেঈনদের কাছে তাঁর মর্যাদা তুলে ধরা হবে।

 

  

 

 

                                                                                                 

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.2 (5টি রেটিং)

জাযাকাল্লাহ্ খায়ের এ ধারাবাহিকের জন্য।

-

"এই হলো মানুষের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়াত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।" [আলে-ইমরান: ১৩৮]

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.2 (5টি রেটিং)