নারী স্বাধীনতা পর্ব-৬

একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, নারীওতো মানুষ, তাদেরও তো বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে, তাদের অন্তরেও বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা জাগতে পারে যাতে তারা নিজেদের প্রিয়জন এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে। তাছাড়া কোন কোন সময় নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাবার জন্যও বাইরে যাওয়ার দরকার হয়, আবার কখনও বৈধ চিত্ত বিনোদনেরও প্রয়োজন হয়। অতএব নারীর এসব কাজের জন্য ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি থাকা উচিত।

খুব ভাল করে বুঝে নিন, নারীদের ঘরের মধ্যে থাকার নির্দেশের অর্থ এই নয় যে, ঘরে তালা ঝুলিয়ে তাদেরকে ঘরের মধ্যে বন্দী করে দেওয়া হবে। বরং এর অর্থ এই যে, প্রয়োজনের সময় সে ঘরের বাইরে যেতে পারবে। আল্লাহ্‌ তায়ালা নারীদের উপর কোন সময়ই রুজি উপার্জনের দায়িত্ব দেননি। বিয়ের পূর্বে তার পূর্ণ দায়িত্ব পিতার উপর আর বিয়ের পর তার পূর্ণ দায়িত্ব স্বামীর উপর। তবে যে নারীর পিতা এবং স্বামী কেউ নেই এবং তার জীবিকা নির্বাহের অন্য কোন ব্যবস্থাও নেই তখন স্বাভাবিকভাবেই তাকে জীবিকা নির্বাহের জন্য বাইরে যেতে হবে, এই অবস্থায় বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে। এবং বৈধ চিত্ত বিনোদনের জন্যও ঘর থেকে বের হবার অনুমতি আছে। হুযুর ( সাল্লাল্লাহু লাইহি ওয়া সাল্লাম ) কোন কোন সময় হযরত আয়েশা ( রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা )-কে নিজের সঙ্গে বাইরে নিয়ে যেতেন।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, একবারএক সাহাবী হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর দরবারে হাজির হলেন এবং বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আমি আপনাকে দাওয়াত করতে চাই। হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা ( রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা )-এরও কি আমার সঙ্গে দাওয়াত? যেহেতু সরলতার জামান ছিল এবং ঐ সময় ঐ সাহাবীর হযরত আয়শা ( রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা )-কে দাওয়াত করার ইচ্ছা ছিল না এজন্য তিনি স্পষ্ট বলে দিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আমি শুধু আপনাকে দাওয়াত করতে চাই। হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-ও স্পষ্ট উত্তর দিলেন, যদি আয়েশার দাওয়াত না থাকে তাহলে আমিও যাব না। কিছু সময় পরে ঐ সাহাবী পুনরায় হাজির হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আমি আপনাকে দাওয়াত করতে চাই, হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আবার ঐ প্রশ্ন করলেন আয়েশারও কি আমার সঙ্গে দাওয়াত আছে? সাহাবী উত্তর দিলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) শুধু আপনার দাওয়াত! হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) পুনরায় অস্বীকৃতি জানালেন তাহলে আমিও যাব না। কিছু সময় পর তৃতীয় বার এসে আবার দাওয়াত দিলেন এবং বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার অন্তর চায়, আপনি আমার দাওয়াত কবুল করুন। হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) পুনরায় ঐ প্রশ্ন করলেন, আয়েশারও কি আমার সঙ্গে দাওয়াত আছে? এবার তিনি বললেন হ্যাঁ ইয়া রাসূলাল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) হযরত আয়েশারও আপনার সঙ্গে দাওয়াত আছে। হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বললেন, এবার আমি দাওয়াত কবুল করলাম।

হাদীস শরীফে হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর পীড়াপীড়ির কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা নেই। তবে কোন কোন উলামা লিখেছেন, সাধারণত হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর এই অভ্যাস ছিল না যে, যখন কেউ হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে দাওয়াত করতেন তখন তিনি হযরত আয়েশা ( রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা )-এরও যাওয়ার শর্ত জুড়ে দিতেন। বরং হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর অভ্যাস এই ছিল যে, যখন কোন ব্যক্তি হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে দাওয়াত করত তখন হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) তা কবুল করতেন। কিন্তু এই ঘটনায় এরকম মনে হচ্ছে যে, সাহাবী হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে দাওয়াত করেছিলেন সম্ভবত তাঁর অন্তরে হযরত আয়েশা ( রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা )-এর প্রতি অসন্তোষ ভাব ছিল এবং হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) ঐ অসন্তোষকে দূরীভুত করতে চেয়েছিলেন, এজন্য হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বারবার হযরত আয়েশাকে সঙ্গে নেয়ার শর্ত লাগিয়েছিলেন। অথবা হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) হযরত আয়েশাকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতে চেয়ে ছিলেন।

কারণ এই দাওয়াত মদীনা মনোয়ারায় ছিল না বরং মদীনার বাইরে কিছু দূরে এক মহল্লায় এই দাওয়াত ছিল। হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) হযরত আয়েশা ( রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা )-কে সঙ্গে নিয়ে চলতে ছিলেন, পথিমধ্যে এক খোলা মাঠ পড়ল, সেখানে কেউ ছিল না। হুযুর ( সালললাহু আলাইহি ওয়া সলাম ) হয আয়েশা ( রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা)-এর সঙ্গে দৌঁড় শুরু করলেন। স্পষ্টত দৌঁড়ানো একটা বৈধ চিত্ত-বিনোদন। হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এই বৈধ চিত্তবিনোদনের আয়োজন করলেন, এজন্য যে একজন নারীরও তা প্রয়োজন আছে। এ ধরনের বৈধ চিত্তবিনোদনের অনুমতি আছে। এই শর্তে যে, তা বৈধ সীমার মধ্যে হবে, পর্দাহীনভাবে হবে না এবং বেগানা পুরুষের সাথে হবে না।

শরীয়ত প্রয়োজনে নারীকে ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য এই শর্ত জুড়ে দিয়েছে যে, পর্দার সাথে বের হতে হবে। এবং প্রকাশ্যভাবে শরীর প্রদর্শন করে বের হতে পারবে নাযেমন কুরআনে কারীমে আল্লাহ্‌ তায়ালা এরশাদ করেছেনঃ “যদি কখনও বের হওয়ার প্রয়োজন হয় তবে সাজ-সজ্জা করে শরীর প্রদর্শন করে বের হবে না যেমন করে জাহিলিয়াতের যুগে নারীরা বের হত”। এরকম সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বের হবে না যাতে মানুষের লক্ষ্য সেদিকে নিবদ্ধ হয়। বরং পরিপূর্ণ পর্দা সহকারে বের হবে এবং শরীর ঢিলেঢালা পোশাকে ঢাকা থাকবে। বর্তমান জামানায় তো বোরকার প্রচলন হয়েছে, হুযুর ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর জামানায় চাদর ব্যবহৃত হত এবং ঐ চাদরে মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর ঢাকা থাকত। মোটকথা এই, প্রয়োজনের সময় নারীদেরকে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু নারীর বের হওয়ার দ্বারা ফেৎনার যে আশংকা রয়েছে তা পর্দার মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যাবে এজন্য পর্দার বিধান দেয়া হয়েছে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)