নবী প্রমের অনুপম দৃষ্টান্ত

এ পৃথিবী থেকে এমন অনেক মহামনীষী চলে গেছেন, যাঁরা ছিলেন রাসূলের একনিষ্ঠ আশেক। তাঁরা পৃথিবীর বুকে রাসূল প্রেমের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিশিষ্ট ফরাসী কবি আবদুর রহমান ইবনে আহমদ মোল্লা জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি )।

কবি আবদুর রহমান ইবনে জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) একদিন মনের মাধুরী মিশিয়ে এক কালজয়ী কবিতা রচনা করেন। তাঁর সেই কবিতার বিষয়বস্তু ছিল খুবই উঁচু মানের। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর শানে তিনি এই কবিতা রচনা করেন। তাঁর কবিতায় ছিল রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর প্রতি অগাধ ভালবাসার নিদর্শন। কাব্য-ছন্দে তিনি রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর দৈহিক সৌন্দর্য, বড়ত্ব, মহত্ত্ব, উদারতা, বদান্যতা, নম্রতা, ভদ্রতা প্রভৃতি সুমন চারিত্রিক গুণগুলোকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভাবে তুলে ধরেছেন। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর পাহাড়ের মত অবিচল সাহস, আকাশের মত বিশাল উদার হৃদয়, সমুদ্রের মত গতিশীল চেতনা, পাথরের মত মজবুত ব্যক্তিসত্তা ইত্যাদি গুণ ও আদর্শের কোনটাই এতে বাদ দেননি তিনি। তাঁর কবিতার প্রতিটি ছত্রেই ছিল প্রিয়নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর প্রতি গভীরতম ভালবাসার এক অনুপম দৃষ্টান্ত। যা নিখুঁত রাসূল প্রেমের এক অপূর্ব উদাহরণ। 

রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর শানে সেই প্রেমমাখা কবিতা রচনা করার পর রাসূল প্রেমে আত্মহারা এই মহান বুযুর্গ বারবার এটি আবেগজড়িত কন্ঠে আবৃত্তি করে রাসূলের প্রতি গভীর ভালবাসার আত্মপ্রকাশ ঘটাতেন। তখন তাঁর চোখ থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হত। 

৮৭৭ হিজরী সালের ঘটনা। একদিন তিনি মক্কা শরীফে উপস্থিত হয়ে হজ্বের যাবতীয় কাজ শেষে ভাবলেন, রাসূল ( সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর রওজা মুবারকের সামনে দাঁড়িয়ে সেই স্বরচিত কবিতাখানা পাঠ করবেন। হৃদয়ের সমস্ত ভালবাসা উজাড় তা রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে শুনাবেন। প্রেমের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন এই কবিতার ভক্তিপূর্ণ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। 

এ কথা মনস্থ করে আল্লামা জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) মদীনার পথে পা বাড়ালেন। এদিকে মক্কার তৎকালীন শাসক স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন- স্বয়ং রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) তাকে বলছেন, “ আবদুর রহমান জামীকে মদীনায় আসতে দিও না। যে কোন উপায়ে তাকে মদীনায় আসতে বারণ কর ”। 

পরদিন সকালে শাসক জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি )-কে খঁজে বের করে আনার জন্য লোক পাঠালেন। লোকদেরকে তিনি বলে দিলেন, তোমরা তাকে মদীনায় যেতে নিষেধ করবে। 

অনেক খোঁজাখুজির পর লোকজন জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি )-এর সাক্ষাৎ পেলেন। তারা তাকে মক্কার শাসনকর্তার নিষেধাজ্ঞার কথা জানালেন। একথা শুনে জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, তাহলে কি আমার আশা পূরণ হবে না! এতদিনের লালিত স্বপ্ন কি আজ ধুলোয় মিশে যাবে! আমি এমন কি অপরাধ করেছি? তিনি সেই লোকদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি এই নিষেধাজ্ঞার কারণ জানেন? তারা বললেন- না, শুধু নিষেধাজ্ঞা শুনিয়ে দেয়ার জন্য আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে। তখন রাসূল প্রেমিক এই বুযুর্গ অনেক চিন্তা-ভাবনা করলেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কোন কারণ বের করতে সক্ষম হলেন না। 

তিনি সীমাহীন অস্থিরতায় ভুগছেন। কোন কিছুই ভাল লাগছে না তাঁর। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর দেশে এসে তাঁর রওজা মুবারক যিয়ারত না করেই ফিরে যাবেন বা রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর প্রতি সালাম পেশ না করেই আপন নীড়ে প্রত্যাবর্তন করবেন? তা হয় কি করে? এভাবে চিন্তা করতে করতে তাঁর পেরেশানী আরও বাড়তে লাগলো। 

লোকজনের কথায় কিছুদূর ফিরে যাবার পর তাঁর মনোভাব পাল্টে গেল। কারণ, যার হৃদয়ের সমস্ত অংশই রাসূলের প্রেম-ভালবাসায় ভরপুর; যিনি রাসূলের ভালবাসায় নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত, তিনি কেমন করে রাসূলের রওজার কাছে এসেও যিয়ারত না করে থাকতে পারেন? শত নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হলেও তাকে মদীনায় যেতেই হবে। প্রয়োজনে জেল-জুলুম যাই আসুক, তা অম্লান বদনে সহ্য করবেন। অন্যথায় তাঁর মন কিছুতেই শান্ত হবে না। 

এরপর তিনি কাফেলা থেকে আলাদা হয়ে পাহাড়-পর্বতের পথ ধরে এগিয়ে চললেন। এদিকে মক্কার শাসনকর্তাও আবার স্বপ্নে দেখলেন, নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) তাকে বলছেন, “ জামী কিন্তু তোমার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে চলছে ”। 

এবার মক্কার শাসক লোক পাঠিয়ে জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি )-কে গ্রেফতার করে নিয়ে আসেন এবং কয়েদখানায় আবদ্ধ করে রাখেন। শুরু হয় তাঁর বন্দী জীবন। 

তৃতীয়বার আমীরে মক্কা স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন, রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) তাকে বলছেন, “ হে মক্কার শাসক! তুমি একই করলে? তুমি আমার জামীকে বন্দী করেছ? সে তো এমন কোন অপরাধ করেনি যে, তুমি তাকে জেলখানায় বন্দী করে কষ্ট দিতে পার! আমি তো তোমাকে বন্দী করতে বলিনি। আমি বলেছিলাম তাকে মদীনায় আসতে বারণ করতে। তুমি তাকে বন্দী করে কষ্ট দিলে কেন? মনোযোগ সহকারে কান পেতে শুন, জামী আমার আশেক, তাঁর হৃদয় আমার ভালবাসায় পরিপূর্ণ। আমাকে ছাড়া সে কিছুই বুঝে না। আমি ব্যতীত তাঁর জীবন যেন অর্থহীন। শয়নে-স্বপনে সে কেবল আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সে আমার প্রেমে আত্মহারা হয়ে একটি কবিতা রচনা করেছে। প্রতিদিন সে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে এ কবিতাখানা পাঠ করে।

সে মনস্থ করেছিলো, আমার রওজার কাছে এসে কবিতাটি পাঠ করবে এবং সরাসরি তা আমাকে শুনাবে। সে যদি এ সুযোগ পেয়ে যায় এবং আমার কবরের পাশে এসে করুণ কণ্ঠে তা পাঠ করতে শুরু করে, তাহলে তাঁর সাথে মুসাহাফা করার জন্য আমাকে অবশ্যই হাত বের করে দিতে হবে। তার ফলে পৃথিবীর বুকে ফেৎনা ও বিশৃংখলা দেখা দিতে পারে। এ ফেৎনার পথ বন্ধ করতেই বলেছিলাম-তাকে মদীনায় আসতে বাঁধা দাও। অথচ আমার নির্দেশ পেয়ে তুমি তাঁকে বন্দী করে ফেললে?

স্বপ্ন দেখার সাথে সাথে মক্কার শাসকের ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি দ্রুত কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে জেলখানায় পৌঁছে জামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি )-কে বাইরে নয়ে এলেন এবং ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আর তাঁকে স্বপ্নের পূর্ণ বিবরণ শুনিয়ে ইজ্জত ও সম্মানের সাথে বিদায় নিলেন।

ফার্সী ভাষায় রচিত এই কবিতার কয়েকটি পংক্তির বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ-

হে নবী! যাঁর মুখের থুতুও তৃপ্তিদায়ক, আপনি জাগ্রত হোন, যেমন জাগ্রত হয় নার্গিস ফুল তার বিভোর নিদ্রা থেকে।/ ইয়ামানী চাদর খুলে চেহারা মুবারক বের করে দিন। কারণ, আপনার মুখচ্ছবি হচ্ছে জীবনসকালের নবজীবনের সূচনা।/... এই ছিল আল্লামা জামী ( রহুল্লাহি আলাইহি )-এর নবী প্রেমের অনুপম দৃষ্টান্ত। 

আমরা কি হতে চাই নবীর প্রিয় আশেক? আমরা যদি নবীড় একনিষ্ঠ আশেক হতে চাই, তাহলে নবীজীর সুন্নতের পূর্ণ অনুসরণ করতে হবে এবং সর্বাবস্থায় নবীজীর প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ কতে হবে। কারণ, রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম ) বলেন, যে আমার সুন্নতকে ভালবাসলো, সে আমাকেই ভালবাসলো। অপর হাদীসে তিনি বলেন, যে আমার প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ করবে, সে পরকালে আমার বেশী নৈকট্য লাভ করবে। 

আল্লাহ্‌ তায়ালা আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ সুন্নাতের সত্যিকারের অনুসরণ যে যত বেশী করতে পেরেছে, সেই মূলতঃ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বেশী ভালবাসতে পেরেছে।
তবে আজকাল তো সুবিধাজনক সুন্নাতের অনুসারীর সংখ্যাই বেশী দেখা যায়।

-

"এই হলো মানুষের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়াত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।" [আলে-ইমরান: ১৩৮]

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)