আমরা অনেক সয় বিভিন্ন বিপদে-মুসীবতে পতিত হই। আসলে যে এই
সকল বিপদ-মুসীবত আল্লাহ পক্ষ থেকে বান্দার জন্য পরীক্ষা। এই জন্য আমাদের সকলেরই
উচিত বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা। বিপদ ও মুসীবতের সময় বান্দার এমন কিছু কর্তব্য
আছে যা করার দ্বারা বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে।
এ করণীয় কর্তব্যগুলো মুসীবতগ্রস্ত প্রতিটি মুসলিম
নর-নারীর পালন করা একান্ত কর্তব্য। এতে মুসীবত ও প্রতিকূলতা অনুকূলে এসে
নিত্যদিনের মত স্বাভাবিক জীবন উপহার দিবে। তাতে মুমিনগণ শোককে শক্তিতে পরিণত করে
এগিয়ে যাবেন সামনের দিকে। আর সেই সাথে তারা লাভ করবেন প্রভূত কল্যাণ ও সাফল্য।
একঃ যে কোন পরিস্থিতি মেনে নেয়ার মানসিকতা লালন করা
প্রত্যেকের কর্তব্য, পূর্ব থেকেই মুসীবত বরদাশত করার মত
মনমানসিকতা তৈরী করা। কারণ, ধৈর্য কষ্টসাধ্য জিনিস, যার জন্য পূর্বপরিকল্পনা
অপরিহার্য।
মনে রাখতে হবে যে, দুনিয়া ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। এতে কারও
জন্যই স্থায়িত্ব নেই। আছে শুধু ক্ষয়িষ্ণু এক মেয়াদ ও সীমিত সামর্থ। এজন্য এর মায়া
মমতায় অধিক জড়ানো অনুচিত। এ সম্পর্কে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
এরশাদ করেনঃ
পার্থিব জীবন ঐ পথিকের ন্যায়, যে গ্রীষ্মে রৌদ্রজ্জল
তাপদগ্ধ দিনে যাত্রা আরম্ভ করল, অতঃপর দিনের ক্লান্তিময় কিছু সময় একটি গাছের নিচে
বিশ্রাম নিল, এর ক্ষণিক পরেই তা ত্যাগ করে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করল। ( মুসনাদে আহমদ-২৭৪৪ )
দুইঃ আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং দু’আ পড়া
ঈমানের দাবী হচ্ছে মহান আল্লাহর প্রদত্ত তকদীরের উপর
সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ তা’আলা যার জন্য যখন যে অবস্থা ফয়সালা করেন, তার তখন সেটা
সর্বান্তকরণে মেনে নেয়াই ঈমানের পরিচায়ক। এভাবে যে ব্যক্তি বিশ্বাস করবে যে,
তাকদীর অপরিহার্য ও অপরিবর্তনীয়, পক্ষান্তরে দুনিয়া সংকটময় ও পরিবর্তনশীল, তার
আত্মা যে কোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকবে এবং তাকদীরের যে কোন অবস্থায় সে
অবিচল থাকবে। এতে তার কাছে দুনিয়ার উত্থান-পতন ও সুখ-দুঃখ স্বাভাবিক ও সাধারণ মনে
হবে।
আমরা দেখতে পাই, তাকদীরে বিশ্বাসী মুমিনগণ পার্থিব
মুসীবতে সবচেয়ে কম প্রতিক্রিয়াশীল, কম অস্থির ও কম হতাশাগ্রস্ত হন। বলা যায়,
তাকদীরের প্রতি ঈমান শান্তি ও এতমিনানের প্রতীক। তাকদীরের উপর বিশ্বাসই আল্লাহর
কুদরতে মুমিনদের হৃদয়-আত্মাকে নৈরাশ্য ও হতাশা থেকে মুক্ত রাখে।
রাসূল ( সলাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এরশাদ করেনঃ
জেনে রেখো, সমস্ত মানুষ জড়ো হয়ে যদি তোমার উপকার করতে
চায়, তারা কোন উপকার করতে পারবে না, তবে ততটুকু ব্যতীত-যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য
লিখে রেখেছেন। আবার তারা সকলে মিলে যদি তোমার ক্ষতি করতে চায়, তারা তমার কোন ক্ষতি
কতে পারবে না, ত ততটুকু ব্যতীত-যা আল্লাহ তোমার কপালে লিখে রেখেছেন। কল উঠিয়ে নেয়া
হয়েছে এবং কিতাব শুকিয়ে গেছে। ( সুনানে তিরমিজী-২৪৪০ )
মুমিনদের বিশ্বাস হল, মানুষের হায়াত, রিযিক ও ভাগ্য তার
মায়ের উদরে থাকা অবস্থাতেই নির্দিষ্ট হয়ে যায়। এ সম্পর্কে হযরত আনাস (
রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) বর্ণিত, রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
এরশাদ করেনঃ
আল্লাহ তা’আলা মায়ের গর্ভাশয়ে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে
দেন, পর্যায়ক্রমে সে বলতে থাকে, হে প্রভু! জমাট রক্ত, হে প্রভু! গোশতপিণ্ড। অতঃপর
যখন আল্লাহ তা’আলা তাকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, ফেরেশতা তখন বলে, হে প্রভু!
পুংলিঙ্গ না স্ত্রী লিঙ্গ? নেককার না বদকার? রিযিক কতটুকু? হায়াত কতটু্কু? তারপর
উত্তর অনুযায়ী পূর্ণ বিবরণ মায়ের পেটেই লিপিবদ্ধ করে দেয়া হয়। ( বুখারী-৬১০৬, মুসলিম-৪৭৮৫ )
ইবনে দাইলামী ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) উবাই ইবনে কাব (
রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু )-এর নিকটে আসেন এবং বলেন, আমার অন্তরে তাকদীর সম্পর্কে
প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আমাকে কিছু বর্ণনা করে শোনান। হতে পারে আল্লাহ তা’আলা আমার
অন্তরে এতমিনান দান করবেন। তখন উবাই ইবনে কাব ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) বললেন,
আল্লাহ তা’আলা সকল আসমানবাসী ও জমিনবাসীদের শাস্তি দিলে, তা জুলুম হিসেবে গণ্য হবে
না। আর তিনি তাদের সকলের উপর রহম করলে, তার রহম-ই তাদের আমলের তুলনায় বেশী হবে।
তাকদীরের প্রতি ঈমান ব্যতীত উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করলেও কবুল হবে না। স্মরণ
রাখবেন, যা আপনার হস্তগত হওয়ার, তা কোনভাবেই হস্তচ্যুত হওয়ার সাধ্য রাখে না।
এতদভিন্ন অন্য আক্বীদা নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে জাহান্নাম অবধারিত।
ইবনে দাইলামী ( রহমতুল্লাহি ) বলেন, অতঃপর আমি
আবুদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু )-এর কাছে গেলাম। তিনিও তদ্রুপ
শোনালেন। তারপর হুযাইফাতুল ইয়ামান ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু )-এর কাছে গেলাম।
তিনিও রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর পক্ষ থেকে অনুরূপ হাদীস
বর্ণনা করে শুনালেন। ( শরহে নববী-৮৫৬পৃ )
বিপদে-মুসীবতের সময় মহান আল্লাহর প্রতি রিজা ও ঈমানের
বহিঃপ্রকাশে এ সময় এ দু’আ পড়তে হবে-
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউ’ন” ( অর্থঃ
নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর। আর আমাদের সবাইকে তাঁর নিকটেই ফিরে যেতে হবে। )
এ দু’আ জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতিতে মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ
আস্থা ও বিশ্বাসকে ব্যক্ত করে। এটা ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রকাশ করে। তাই যারা এভাবে
মহান আল্লাহর প্রতি রিযা প্রকাশ করবে, ধৈর্যশীল হিসেবে তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট
বিশেষ ফজীলত ও নৈকট্য লাভ করবে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেনঃ
আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এবং
জান-মাল ও ফল-ফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দিন। যখন
তাদেরকে বিপদে আক্রান্ত করে, তখন তারা বলে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি
রাজিউ’ন। তাদের উপরই অবতীর্ণ হয় তাদের রবের পক্ষ থেকে রহমত ও দয়া এবং তারাই
হেদায়াত প্রাপ্ত। ( সূরা বাকারঃ ১৫৫ )
তিনঃ রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর
আদর্শ ও পূর্বসূরীগণের জীবন পর্যালোচনা করা
পরকালে বিশ্বাসী আল্লাহভীরু গোটা মুসলিম জাতির আদর্শ
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম
আদর্শ-তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরাকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ
করে। ( সূরা আহযাবঃ ২১ )
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর পূর্ণ
জীবনটাই ধৈর্য ও ত্যাগের দীপ্ত উপমা। লক্ষ্য করুন, স্বল্প সময়ের মধ্যে চাচা আবু
তালিব- যিনি রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) থেকে কাফিরদের অত্যাচার
প্রতিহত করতেন, একমাত্র বিশ্বস্ত সহধর্মিণী খাদিজা ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা ),
কয়েকজন ঔরসজাত মেয়ে এবং ছেলে ইবরাহীম ইন্তেকাল করেন। এতে চক্ষুযুগল অশ্রুশিক্ত হয়,
হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়, স্নায়ুতন্ত্র ও অস্থিমজ্জা নিশ্চল ও নির্বাক হয়। এরপরও মহান
প্রতিপালকের প্রতি ভক্তিমাখা উক্তি পেশ করে তিনি বলেন-
চোখ অশ্রুশিক্ত, অন্তর ব্যথিত, তবুও তা-ই মুখে উচ্চারন
করব, যে কথায় আমার প্রভু সন্তুষ্ট। হে ইবরাহীম! তোমার বিরহে আমরা ব্যথিত। ( বুখারীঃ ১৩০৩ )
আরও অনেক আত্মোৎসর্গকারী সাহাবায়ে কেরাম মারা যান, যাদেরকে
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) অনেক ভালবাসতেন, যারা তাঁর জন্য উৎসর্গ
ছিলেন। এতসব দুঃখ-বেদনা তাঁর প্রাণশক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারেনি, তাঁর ধৈর্যের
পাহাড়কে টলাতে পারেনি।
তদ্রুপ আদর্শবান পূর্বসূরীগণের জীবনচরিতে আমাদের জন্য
ধৈর্যের উপদেশের খোরাক রয়েছে। হযরত উরওয়া ইবনে জুবাইর ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু
)-এর ঘটনা, আল্লাহ তা’আলা তাঁকে একসময় একই সাথে দু’টি মুসীবত দিলেন। পা কাটা ও
সন্তানের মৃত্যু। তা সত্ত্বেও তিনি শুধু এতটুকু বলেছেন, হে আল্লাহ! আমার সাতটি
ছেলে ছিল, একটি নিয়েছেন, ছয়টি অবশিষ্ট রেখেছেন। হাত-পায়ের চারটি অঙ্গ ছিল, একটি
নিয়েছেন, তিনটি নিরাপদে রেখেছেন। মুসীবত দিয়েছেন, নিয়ামতও প্রদান করেছেন। দিয়েছেন
আপন, নিয়াছেনও আপনি। ( কিতাবুস সুনান, ২য়
খণ্ড-২৩৫ পৃ )
হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজীজ ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) –এর এক
ছেলের ইন্তেকাল হয়। তিনি তার দাফন সেরে কবরের পাশে সোজা দাঁড়িয়ে গেলেন। লোকজন
চারপাশ দিয়ে তাকে ঘিরে আছেন। তিনি বললেন, হে বৎস! তোমার প্রতি আল্লাহ রহমত বর্ষণ
করুন। অবশ্যই তুমি তোমার পিতার অনুগত ছিলে। আল্লাহর কসম! যখন থেকে আল্লাহ তোমাকে
দান করেছেন, আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্টই ছিলাম। তবে আল্লাহর কসম করে বলছি, তোমাকে
এখানে, অর্থাৎ আল্লাহর নির্ধারিত স্থান কবরে দাফন করে আগের চেয়ে বেশী আনন্দিত।
কারণ, আমি আল্লাহর কাছে তোমার বিনিময়ে অধিক প্রতিদানের আশাবাদী। ( কিতাবুস সুনান,২য় খণ্ড-২৩৫ পৃ )
চারঃ মহান আল্লাহর অপার রহমত ও অসীম করুণার কথা স্মরণ
করা
সত্যিকার মুমিন সর্বদা আপন প্রভুর করুণা ও রহমত কামনা
করে। আর আল্লাহ তা’আলা তাদের সাথে সেরূপ ব্যবহারই করেন। এ সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
আমি আমার ব্যাপারে আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সাথে
ব্যবহার করি। ( বুখারীঃ ৬৭৫৬, মুসলিমঃ
৪৮২২ )
মুসীবত দৃশ্যত অসহ্য কষ্টদায়ক হলেও তা পশ্চাতে কল্যাণ
বয়ে আনে। আল্লাহ তা’আলা ধৈর্যশীলগণকে মুসীবতের বিনিময়ে উত্তম নেয়ামত প্রদান করে
থাকেন। তাই বালা-মুসীবত তার জন্য মঙ্গল ও কল্যাণের কারণ হয়ে যায়। এ সম্পর্কে
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
এমন হতে পারে যে, কোন বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা
তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার এটাও হতে পারে যে, কোন বিষয় তোমরা পছন্দ করছ, অথচ তা
তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহ ভাল জানেন; তোমরা জান না। ( সূরা বাকারাঃ ২১৬)
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এরশাদ করেনঃ
মুমিনের বিষয়টি চমৎকার, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য ( ভাল বা
মন্দ ) যা-ই ফয়সালা করেন, তাই তার জন্য কল্যাণকর হয়। ( মুসনাদে হাদীসে আনাস ইবনে
মালেকঃ ২০২৮৩ )
সুতরাং বান্দার কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার সুপ্রশস্ত
দয়া ও রহমতের কথা স্মরণ করে বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা। সেই সাথে আল্লাহ তা’আলার
প্রদত্ত নেয়ামত ও অনুদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এ চিন্তা করা যে, অর্পিত
মুসীবত বিদ্যমান নেয়ামতের তুলনায় সামান্য মাত্র। আবার আল্লাহ তা’আলা চাইলে মুসীবত
আরও বিভৎস ও কঠোর হতে পারত। তদুপরি আল্লাহ তা’আলা আরও যে সমস্ত বালা-মুসীবত থেকে
নিরাপদ রেখেছেন এবং যে সকল দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা করেছেন, তা তাঁর অনেক বড় ও অনেক
বেশী কৃপা।
পাঁচঃ অধিকতর বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি দৃষ্টি দেয়া
অন্যান্য বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের কথা স্মরণ করা এবং
অধিকতর বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি নজর দেয়া অর্পিত বিপদে ধৈর্য ধারণের জন্য
সহায়ক হয়। এতে সান্ত্বনা লাভ হয়, দুঃখ লাঘব হয় এবং মুসীবত সহনীয় হয়। সেই সাথে দূর
হয় অস্থিরতা ও নৈরাশ্য। ধৈর্যশীলদের এভাবে ধৈর্যের পথ অবলম্বন করতে হয়। তাহলে
আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে ধৈর্যধারণের তৌফিক দান করেন।
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এরশাদ করেনঃ
যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করার চেষ্টায় রত হয়, আল্লাহ তা’আলা
তাকে ধৈর্যধারণের তৌফিক দান করেন। ( বুখারীঃ ১৩৭৫ )
বিকলাঙ্গ বা দুরারোগ্য আক্রান্ত ব্যক্তি তার চেয়ে কঠিন
রোগগ্রস্তকে দেখবে। একজনের বিরহে ব্যথিত ব্যক্তি দুই বা ততোধিক জনের বিরহে ব্যথিত
ব্যক্তিকে দেখবে। এক সন্তানহারা ব্যক্তি অধিক সন্তানহারা ব্যক্তিকে দেখবে। সব
সন্তানহারা ব্যক্তি পরিবারহারা ব্যক্তিকে দেখবে। নিরুদ্দেশ সন্তানের শোকে কাতর
মা-বাবা ছেলের মৃত্যু শোকে শোকাহত মা-বাবার কথা স্মরণ করবে।
হযরত ইয়াকুব ( আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) হযরত ইউসুফ ( আলাইহি
ওয়া সাল্লাম )-কে হারিয়ে সবর এখতিয়ার করে বলেনঃ
উত্তম ধৈর্যই আমার অবলম্বন, আর তোমরা যা বর্ণনা করছ সে
বিষয়ে আল্লাহই সাহায্যস্থল। ( সূরা ইউসুফঃ ১৮ )
এরপর দ্বিতীয় সন্তান হারিয়েও তিনি অস্থির না হয়ে
ধৈর্যধারণ করে বলেনঃ
সুতরাং, উত্তম ধৈর্যই আমার অবলম্বন। আশা করি, আল্লাহ
তা’আলা সকলকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়। ( সূরা ইউসুফঃ ৮৩ )
ছয়ঃ বিপদ-মুসীবত হওয়ার আলামত ও কল্যাণবাহী মনে করা
মুসীবত হওয়ার আলামত এবং তা কল্যাণবাহী এ বিশ্বাস মনে পোষণ
করতে হবে। আর এটাই বাস্তবতা।
একদা সাহাবী হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস ( রাদিয়াল্লাহু
তা’আলা আনহু ) রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে
আল্লাহর রাসূল! দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশী বিপদগ্রস্ত কারা হয়? উত্তরে রাসূল (
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বললেনঃ
মানুষের ধ্যে সবচেয়ে বেশী মুসীবতগ্রস্ত হয়েছেন নবীগণ,
অতঃপর যারা তাদের সাথে কাজ-কর্ম ও বিশ্বাসে সামঞ্জস্যতা রেখেছেন, অতঃপর তাদের
অনুরূপ নেককারগণ। এভাবে মানুষকে তার দ্বীনদারী অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। যদি তার
দ্বীনদারী পাকাপোক্ত হয়, তাহলে বালা-মুসীবতের পরীক্ষা হয়। আর যদি সে দ্বীনদারীতে
দূর্বল হয়, তাহলে সে দ্বীনদারীর পরিমাণ অনুযায়ী মুসীবতগ্রস্ত হয়ে পরীক্ষায় পতিত
হয়। এভাবে মুসীবত মুমিন বান্দার সাথে লেগেই থাকে-যতক্ষণ না তাকে এমন করে দেয় যে,
সে পাপমুক্ত হয়ে দুনিয়ায় বিচরণ করতে থাকে। ( জা’মি তিরমিজীঃ ২৩২২ )
এ পর্যায়ে বালা-মুসীবতকে মঙ্গল ও কল্যাণ লাভের মাধ্যম
ঘোষাণা করে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বলেনঃ
আল্লাহ তা’আলা যার কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তাকে
বালা-মুসীবতে নিপতিত করেন। ( বুখারীঃ ৫২১৩, মুসলিম; ৭৭৮ )
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আরও এরশাদ
করেনঃ
আল্লাহ তা’আলা যখন কোন সম্প্রদায়কে পছন্দ করেন, তখন
তাদেরকে বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেন। ( জামী তিরমিজীঃ ২৩২০, সুনানে ইবনে মাজাহঃ ৪০২১
)
সাতঃ মুসীবতের সময় উত্তম প্রতিদানের কথা স্মরণ করা
মুমিনের কর্তব্য হচ্ছে-বিপদের মুহূর্তে তার উত্তম বিনিময়
ও প্রতিদানের কথা স্মরণ করা। এতে মুসীবত সহনীয় হয় এবং ধৈর্যধারণ সহজ হয়। আবার বড়
মুসীবতে বড় প্রতিদান পাওয়া যায় এবং ছোট মুসীবতে ছোট প্রতিদান লাভ হয়-সে কথাও স্মরণ
রাখবে। অর্থাৎ কষ্টের পরিমাণ অনুযায়ী সওয়াব অর্জিত হয়।
রাসূল ( সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) এরশাদ করেনঃ
নিশ্চয়ই বড় কষ্ট-মুসীবতের সাথে বড় প্রতিদান রয়েছে। (
জামী তিরমিজীঃ ২৩২০ )
একদা হযরত আবু সিদ্দীক ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু )
ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর নিকট এসে
জিজ্ঞাসা করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! কুর’আনের এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর কিভাবে
অন্তরে স্বস্তি আসেঃ
না তোমাদের আশায় এবং না কিতাবীদের আশায় ( কাজ হবে )। যে
মন্দ কাজ করবে তাকে তার প্রতিফল দেয়া হবে। আর সে তার জন্য আল্লাহ ছাড়া আর কোন
অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। ( সুরা নিসাঃ ১২৩ )
তখন রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বললেনঃ
হে আবু বকর! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন, তুমি কি অসুস্থ
হও না? তুমি কি বিষন্ন হও না? মুসীবত কি তোমাকে পিষ্ট করে না? তিনি উত্তর দিলেন,
হ্যাঁ। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বললেন, এগুলোই তোমার অপরাধের
কাফফারা-প্রায়শ্চিত্ত। ( মুসনাদে হাদীসে আবু বকরঃ ৬৪ )
আল্লাহ তা’আলা বিপদে-মুসীবতে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য
উত্তম প্রতিদান রেখেছেন। বালা-মুসীবতগুলো গুনাহের কাফফারা ও উচ্চ মর্যাদা লাভের
সোপান হয়। এমনকি জান্নাতের চেয়ে বড় প্রতিদান আর কি হতে পারে, এ জান্নাতেরই ওয়াদা
করা হয়েছে ধৈর্যশীলদের জন্য। যেমন, এ সম্পর্কে কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হচ্ছে-
মৃগিরোগী মহিলার জন্য জান্নাতের ওয়াদা করা
হয়েছে-ধৈর্যধারণের শর্তে। হযরত আতা বিন আবি রাবাহ ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) বর্ণনা
করেন, একদা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) আমাকে বললেন,
আমি কি আপনাকে জান্নাতী মহিলা দেখাবো? আমি বললাম, অবশ্যই। তিনি বললেন, এই কালো
মহিলাটি জান্নাতী। ঘটনাটি হল- একবার এই মহিলা রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম ) নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মৃগী রোগী। রোগের দরূণ ভূপাতিত
হয়ে যাই, বিবস্ত্র হয়ে পড়ি। আমার ( রোগ ভাল হওয়ার ) জন্য দু’আ করুন। রাসূল (
সাল্লাল্লাহু আলাইই ওয়া সাল্লাম ) বললেন- যদি ইচ্ছা কর, ধৈর্যধারণ করতে পার,
বিনিময়ে তুমি জান্নাত পাবে। আর যদি চাও, তোমার সুস্থতার জন্য দু’আ করে দেই। আর যদি
চাও, তোমার সুস্থতার জন্য দু’আ করে দেই। মহিলাটি তখন উত্তর দিলেন, আমি ধৈর্যধারণ
করব। তবে দু’আ করুন, আমি যেন বিবস্ত্র না হই। অতঃপর রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম ) তার জন্য সেই দু’আ করলেন। (
বুখারীঃ ৫৯৪৪ )
অনুরূপভাবে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে দৃষ্টিহীন
ব্যক্তির জন্য। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বলেন ( হাদিসে কুদসীতে
)-
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, আমি যখন আমার বান্দাকে তার দু’টি
প্রিয় বস্তু ( দু’চক্ষু )-এর মুসীবত দ্বারা পরীক্ষায় ফেলি, আর সে ধৈর্যধারণ করে,
আমি তার এ দু’চোখের বিনিময়ে তাকে জান্নাত দান করবো। ( বুখারীঃ ৫২২১ )
তেমনিভাবে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে প্রিয়জনের মৃত্যুতে
ধৈর্যধারনকারীদের জন্য। এ সম্পর্কে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
বলেন ( হাদীসে কুদসীতে )-
আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন- আমি যখন আমার মুমিন বান্দার
অকৃত্রিম ভালবাসার পাত্রকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেই আর সে তাতে ধৈর্যধারণ করে
সওয়াবের আশা রাখে, আমার কাছে তার বিনিময় জান্নাত ছাড়া কিছু নয়। ( বুখারীঃ ৫৯৪৪ )
অনুরূপভাবে সন্তানহারা পিতামাতার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ
প্রদান করা হয়েছে। এ সম্পর্কে মাহমুদ বিন লাবিদ ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) হযরত জাবির
( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) থেকে বর্ননা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূল (
সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে বলতে শুনেছিঃ
যে ব্যক্তির তিনজন সন্তান মারা যাবে আর সে ধৈর্যধারণ করে
সওয়াবের প্রত্যাশী হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তিনি বলেন, আমরা জিজ্ঞাসা করলাম,
হে আল্লাহর রাসুল! যার দু’জন সন্তান মারা যাবে? তিনি বললেন, দু’জন মারা গেলেও এ
ফজীলত পাওয়া যাবে।
মাহমুদ ( রহমতুল্লাহু আলাইহি ) বলেন, আমি জাবির (
রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু )-কে বললাম, আমার মনে হয় আপনারা যদি একজনের কথা বলতেন,
তাহলে তিনি একজনের ব্যাপারেও এ সুসংবাদ পেশ করতেন। তিনি সায় দিয়ে বলেনঃ আমিও তাই
মনে করি। ( মুসনাদে হাদীসে জাবির ইবনে
আবদুল্লাহঃ ১৪২৮৫ )
এমনকি ওই অসম্পূর্ণ বাচ্চা, যা সৃষ্টির পূর্ণতা পাওয়ার
আগেই মায়ের পেট থেকে ঝরে যায়, সেও তার মায়ের জান্নাতে যাওয়ার ওসীলা হবে-যদি তার এ
অবস্থায় ধৈর্যধারণ করে ফজীলতের প্রত্যাশা করেন।
এ সম্পর্কে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
এরশাদ করেনঃ
ঐ সত্তার কসম! যার কুদরতী হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয়ই
অসম্পূর্ণ বাচ্চাও তার মাকে আঁচল ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে-যদি সে এতে
ধৈর্যধারণ করে পুণ্য লাভের আশা করে। ( সুনানে ইবনে মাজাহঃ ১৫৯৪ )
এ ছাড়াও যেকোন ধরণের বালা-মুসীবত ও বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ
করাকে হাদীস শরীফে বিশেষ ফজীলতের বিষয় বলা হয়েছে। যেমন-হাদীস শরীফে বালা-মুসীবতকে
গুনাহের কাফফারা বলা হয়েছে।
এ সম্পর্কে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
এরশাদ করেনঃ
যে কোন মুসলমান কাঁটা বা তার চেয়ে সামান্য বস্তুর দ্বারা
কষ্ট পায়, আল্লাহ তা’আলা এর বিনিময়ে তার গুনাহ সমূহ ঝরিয়ে দেন। যেমন বৃক্ষ বিশেষ
মৌসুমে ( হেমন্তকালে ) স্বীয় পত্র-পল্লব ঝরিয়ে থাকে। ( বুখারীঃ ৫২১৫ )
অপর হাদীসে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
বলেনঃ
মুসলমানের কষ্ট-ক্লেশ, চিন্তা-হতাশা ও দুঃখ-বেদনা যাই
পৌঁছে, এমনকি শরীরে যে কাঁটা বিঁধে, আল্লাহ তা’আলা এর উসীলায় তার গুনাহ সমূহ মাফ
করে দেন। ( বুখারীঃ ৫২১০ )
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) আরও এরশাদ
করেনঃ
মুমিন পুরুষ ও নারীর সাথে বালা- মুসীবত লেগেই থাকে তার
নিজের ব্যাপারে, তার সন্তানের ব্যাপারে-যতক্ষণ না সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করে
এমতাবস্থায় যে, বালা-মুসীবতে ধৈর্যাধারণ করার বদৌলতে তার গুনাহ মাফ হতে হতে তার
আমলনামায় কোন গুনাহই অবশিষ্ট থাকে না। ( জামি’ তিরমিজীঃ ২৩২৩ )
বালা-মুসীবত মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধিরও কারণ হয়। এমনকি
বিপদ-মুসীবতে ধৈর্যের ততটুকু সফলতা অর্জিত হয়ে যায়- যা আমল বা নেককাজের দ্বারা হয়
না।
এ সম্পর্কে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
এরশাদ করেনঃ
আল্লাহ তা’আলা যখন কোন বান্দার জন্য বিশেষ মর্যাদার
স্থান নির্ধারণ করেন, কিন্তু বান্দা আমল দ্বারা ঐ স্থান লাভ করতে পারে না, তখন
আল্লাহ তা’আলা তার শরীরের উপর, তার সম্পদের উপর কিংবা তার সন্তানের উপর মুসীবত দান
করেন, অতঃপর তাতে তাকে সবর করান। আর এর বদৌলতে তাকে সেই মর্তবায় পৌঁছিয়ে দেন-যা তার
জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ( মুসনাদে
আহমদঃ ২২৩৩৮ )
অপর এক হাদীসে রয়েছে, রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়া
সাল্লাম ) সাহাবীগণকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কাকে নিঃসন্তান মনে কর? তারা বললেন,
যার কোন সন্তান হয় না। তিনি বললেন, প্রকৃত নিঃসন্তান সে নয় বরং প্রকৃত নিঃসন্তান ঐ
ব্যক্তি-যার মৃত্যুর পূর্বে তার কোন সন্তানের মৃত্যু হয় না। ( সহীহ মুসলিমঃ ৪৭২২ )
অথচ পার্থিব জগতে সন্তানাদি আমাদের বার্ধ্যক্যের সম্বল।
তাই যার সন্তান নেই, দুনিয়াতে সে আমাদের দৃষ্টিতে নিঃসন্তান। কিন্তু পরকালের সম্বল
হল মা-বাবার জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণকারী সন্তান। তার মাধ্যমেই পিতা-মাতা পরকালে উপকৃত
হবেন। সুতরাং, যার জীবদ্দশায় তার কোন সন্তান মারা যাননি, তিনি পরকালের নিঃসন্তান
বৈকি। কেননা পরকালে তিনি মৃতসন্তান দ্বারা বর্ণিত উপকার লাভ থেকে মাহরুম হবেন।
এতে সন্তানহারা পিতা-মাতার অনন্য ফজীলতের বিষয় উপলব্ধি
করা যায়। বস্তুত তাদের জন্য সন্তান বিয়োগের মুসীবত এ হিসেবে কল্যাণকর পরিগনিত হয়
যে, এর বিনিময়ে তারা জান্নাত লাভ করবেন। (
সুবহানাল্লাহ )
আটঃ বালা-মুসীবতকে পুনঃ পুনঃ স্মরণ করা থেকে বিরত থাকা
যার উপর দিয়ে কোন মুসীবত বয়ে যায়, তার কর্তব্য হল-
পরবর্তীতে এর স্মৃতিচারণ বা পুনঃ পুনঃ স্মরণ না করা। যদি তা হঠাৎ বা নিজের
অলক্ষ্যে মনে চলে আসে, সাধ্যমত তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত। তা পুনঃ পুনঃ বৃদ্ধি বা লালন
করা যাবে না। কারণ, এর মধ্যে বিন্দুপরিমাণও লাভ নেই। বরং বারবার চর্চা করা ধৈর্যের
পরিপন্থী। এ জন্য হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) বলেন, তোমরা মুসীবতের
স্মৃতিচারণ করে অযথা চোখের পানি উছলে তুলো না।
অনেক স্বজনহারা শোকাতুর লোক মৃতব্যক্তির স্মৃতিচারণে
সদা-সর্বদা ব্যস্ত থাকেন। অনেকে আবার মৃতব্যক্তির স্মৃতি নিয়ে অতিউৎসসাহী হয়ে নানা
অনুষ্ঠান বা কর্মসূচী পালন করেন। এটা শোক-দুঃখ মোচনের পথে ব্যাপক অন্তরায় হয়ে
দাঁড়ায়। তা ধৈর্যশীল মুমিনদের জন্য কখনো উচিত নয়।
নয়ঃ বিপদাক্রান্ত অবস্থায় একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা বর্জন
করা
শোকাতুর ব্যক্তির একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা বর্জন করে চলা
উচিত। কেননা, দুঃখ-বিষাদ নির্জন ও নিঃসঙ্গ অবসর ব্যক্তির পিছু নেয় বেশী। এভাবে
নিঃসঙ্গদের ওপর শয়তান অধিক কূট-কৌশল ও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়-যা ধৈর্যের
পরিপন্থী।
সুতরাং, এমতাবস্থায় সবার সাথে কল্যাণকর ও অর্থবহ কাজে
নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। অটল থাক হবে পূর্বনির্ধারিত স্বীয় সিদ্ধান্তে ও যাবতীয়
প্রয়োজনীয় কাজকর্মে।
সেই সাথে নিয়মিত কুর’আন তেলাওয়াত, দু’আ দরূদ পাঠ, নামাজ
আদায় ইত্যাদিতে মশগুল থাকতে হবে। আর সময়-সুযোগমত আল্লাহ তা’আলার বেশী বেশী
যিকির-আযকারে মনোনিবেশ করতে হবে। হাদীস শরীফের বর্ণনানুযায়ী, আল্লাহর যিকিরের মাঝে
আত্মিক প্রশান্তি রয়েছে। এভাবেই বিপদ-মুসীবতের অবস্থাকে সাফল্যের সাথে উত্তরণ করা
সম্ভব।
দশঃ অভিযোগ-অনুরোগ ও অস্থিরতা পরিহার করা
যেকোন বিপদাপদের সময় অস্থিরতা-অসহিষ্ণুতা ও
অভিযোগ-অনুযোগ থেকে দূরে থাকতে হবে। এটাই মনোবল অর্জন ও প্রশান্তি লাভের
উপায়-উপলক্ষ। যে এর থেকে বিরত থাকবে না, তার কষ্ট ও অশান্তি শুধু বাড়তেই থাকবে-যা
ধৈর্যের পথ রুদ্ধ করে দিবে। তখন সে নিজেই নিজের শান্তি বিনষ্টকারী গণ্য হবে।
এ জন্য বিপদ-মুসীবতের সময় মনকে প্রশমিত রাখার নির্দেশ
দিয়ে মহান আল্লাহ এরশাদ করেনঃ
জমীনে এবং তোমাদের মধ্যে যেকোন মুসীবত আপতিত হয়- তা আমি
সংঘটিত হবার পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ করে রাখি। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই
সহজ। যাতে তোমরা আফসোস না কর তার উপর যা তোমাদের থেকে হারিয়ে গেছে এবং তোমরা
উৎফুল্ল না হও তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তার কারণে। আল্লাহ কোন উদ্ধ্যত ও
অহংকারীকে পছন্দ করেন না। ( সূরা হাদীদঃ ২২-২৩
)
মনে রাখা প্রয়োজন, অস্থিরতা হারান বস্তু ফিরিয়ে আনতে
পারে না। বরং তা হিতকামনাকারীকে দুঃখিত ও অশুভ কামনাকারীকে আনন্দিত করে। তাই
সাবধান, মুসীবত ও দুঃখের সাথে হতাশা ও নৈরাশ্য যেন কখনও স্থান করে না নেয়। কারন,
তা ধৈর্যের পরিবেশকে বিনষ্ট করে-যা বিপদ মুসীবতের ফজীলতকে নস্যাৎ করে দেয়।
জনৈক বিদ্বান বলেছেন, জ্ঞানী ব্যক্তি মুসীবতের সময় সে
কাজ করে, যা আহাম্মকরা সময় হারিয়ে করে।
হযরত আলী ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) বলেন, যদি তুমি
ধৈর্য অবলম্বন কর, তাহলেও তোমার উপর তাকদীর বর্তাবে, তবে তা এমতাবস্থায় যে, তুমি
নেকী লাভ করবে। আর যদি ধৈর্য হারাও, তাহলেও তোমার উপর তাকদীর বর্তাবে, তবে তা
এমতাবস্থায় যে, তুমি গুনাহগার হবে।
হযরত আলী ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) আরও বলেন, স্মরণ
রেখো, মাথা যেমন শরীরের অংশ, তদ্রুপ ধৈর্য ঈমানের অংশ। সুতরাং যার ধৈর্য নেই তার
ঈমানও নেই।
তাই শেষ পর্যন্ত যখন ধৈর্য ধরতেই হয় আর তা ছাড়া উপায়ও
নেই, তাহলে শুরুতেই ধৈর্য ধারণ করা উচিত। তাহলেই তা মূল্যবান হবে। অন্যথায় সময় চলে
যাবার পর ধৈর্য ধরলে তার কোন মূল্য থাকবে না।
বেশীদূর অগ্রসর হতে না পারলেও সম্ভব ও সাধ্যের নাগালের
বিষয়গুলো গ্রহণ করেই ধৈর্যধারণকারীদের মর্যাদা লাভ করা যায়। যেমন, হতাশা প্রকাশ না
করা, শোকে কাপড় না ছিড়া, গাল না চাপড়ানো, নাশোকরী বা অনুযোগ-অভিযোগ না করা,
অস্থিরতা প্রকাশ না করা, খাওয়া-দাওয়া ও পরিধানের অভ্যাস স্বাভাবিক রাখা, আল্লাহ
তা’আলার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা এবং এ বিশ্বাস করা যে, যা ফেরত নেয়া হয়েছে, তা
আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের নিকট আমানত ছিল। তাঁর আমানতই তিনি নিয়ে নিয়েছেন। সুতরাং
এতে হা-হুতাশ করা নিতান্তই বোকামী। সর্বশেষে বলি, ধৈর্য ও সবর ধৈর্যধারনকারীকে প্রহস্নতি এনে দেয়, মুসীবতের বিনিময়ে পূণ্য ও ফজিলত লাভ হয়। অতএব, যথা নিয়মে ধৈর্যধারণ করাই প্রকৃত সাফল্যের বিষয়। অন্যথায় অযথা পেরেশান হয়ে শেষ পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করতে বাধ্য হতেই হবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও পরিণামে সে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সার্বিক বিবেচনায় ধৈর্যধারণ করা মুমিনের জন্য একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে আমল করার তোফিক দান করুন। আমীন। লিখেছেনঃ মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ।
|
|||
Rate This |
||
|
জাযাকাল্লাহ্ খায়ের।
আমার প্রিয় একটি ওয়েবসাইট: www.islam.net.bd
সালাম
চমৎকার শিক্ষণীয় পোস্ট।