এক নওমুসলিমের হৃদয়স্পর্শী ঘটনা

ভারতের ফুলাত থেকে প্রকাশিত ইসলামী দাওয়াতী পত্রিকা ‘আরমুগানে’ প্রকাশিত দু’জন নওমুসলিম ভারতীয় নাগরিক নূর মুহাম্মদ ( পূর্বনাম রামফল ) ও তার ভাই- এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে সাক্ষাতকার নিম্নে প্রদান করা হল। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন মাওলানা কালীম সিদ্দীকী ( দাঃ বাঃ ) সাহেবের পুত্র মাওলানা আহমদ আওয়াহ।

আহমদ আওয়াহঃ আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ ওয়া-আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আহমদ আওয়াহঃ জনাব নূর মুহাম্মদ সাহেব! আমাদের এখান থেকে ‘আরমুগান’ নামে একটি ম্যাগাজিন বের হয়। আমি এ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য আপনার সাক্ষাতকার গ্রহণ করতে চাচ্ছি। যাতে লোকজন এর থেকে উপকৃত হয়।

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ আহমদ ভাই! আমার মত এক নগন্য লোকের কী সাক্ষাতকার হবে, যদ্দারা লোকজন উপকৃত হবেন?

আহমদ আওয়াহঃ আল্লাহ তা’আলা আপাকে যেভাবে হেদায়েত দান করেছেন, তা তাঁর একটি বিরাট রহমত। মহান আল্লাহর সেই রহমতের কথাই আমরা শুনতে চাই।

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ হ্যাঁ, ভাইজান! এতে সন্দেহের কি আছে যে, আমার আল্লাহ তাঁর অসীম রহমতে আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। ( এরপর কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন ) আমি কখনও এর উপযুক্ত ছিলাম না। আল্লাহ তা’আলার এ নিয়ামতের শোকর আদায় করে শেষ করা যাবে না। যদি আমার শরীরের প্রতিটি পশম এক একটি জীবন হয় আর আল্লাহ তা’আলার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনে আমি সেগুলো কুরবান করে দেই, তবুও শোকর আদায় করা হবে না। আর আমার জান ও পশমগুলোও তো তাঁর নিয়ামত।

আহমদ আওয়াহঃ প্রথমেই আপনার বিস্তারিত পরিচয় জানতে চাই।

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমার নাম ছিল রামফল। ভারতের মীরাট জেলার দাদরী নামক গ্রামে গোজর পরিবারে আমার জন্ম। পিতাজী ছিলেন একজন ক্ষুদ্র কৃষক। ২৫ বছর হল তিনি মারা গেছেন।

১৩/১৪ বছর আগে আল্লাহ তা’আলা আমাকে হেদায়েত দান করেছেন। আমি ফুলাতে এসে আপনার আব্বার হাতে ইসলাম গ্রহণ করি এবং তিনি আমার ইচ্ছানুসারে আমার বড় ভাইয়ের নামে আমার নাম ‘নূর মুহাম্মদ’ রাখেন।

আহমদ আওয়াহঃ আপনার বড় ভাইও মুসলমান হয়েছিলেন?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ জী হ্যাঁ, আসলে প্রথমে মুসলমান তিনিই হয়েছিলেন আর আমি তাঁর বদৌলতে হেদায়েত পেয়েছি।

আহমদ আওয়াহঃ একটু বিস্তারিতভাবে আপনাদের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী শুনাবেন কি?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ আমার সেই বড় ভাইয়ের নাম ছিল জয়পাল। তিনি খাতূলীতে মীরাটের লালাদের ফার্মে চাকুরী করতেন।

বড় ভাই ছিলেন বড়ই ধার্মিক, সজ্জন ও রহমদিল মানুষ। কোন দুঃখী মানুষের দুঃখ-কষ্ট তিনি দেখতে পারতেন না। আহত জীব-জানোয়ার দেখলে তিনি পেরেশান হয়ে যেতেন। ফুল ও গাছ-গাছালীর চারা দেখলে তিনি এরিয়ে যেতেন।

বড্ড ভাবুক কিসিমের লোক ছিলেন তিনি। তারকারজি দেখলে অস্থির হয়ে উঠতেন, উঠে বসে পড়তেন। সারাটা রাত মালিকের তারীফ করতেন।

তাঁর কারখানার পাশে দু’জন লোকের দোকান ছিল- যারা ফার্নিচার ইত্যাদি বানাতো। তাদের দোকানে আপনার আব্বা ( মাওলানা কালীম সাহেব ) মাঝে-মধ্যে আসতেন। বড় ভাই তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন। সেখানে আরও দু-চারজন লোক জমা হত, মাওলানা সাহেব তাদেরকে ইসলামের কথা শুনাতেন। আমার ভাই সেসব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ইসলামের কথা তাঁর খুব ভাল লাগত। ইসলামের কথা তিনি এত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন যে, তাঁর সম্পর্কে মাওলানা সাহেব বলেন, আমার ধারণাই ছিল না যে, এই লোকটি হিন্দু।

আগস্ট মাসে খাতুলীতে ছড়ির মেলা বসত। ১৯৯০ সালে মেলা বসতে যাচ্ছিল। মাওলানা সাহেব বলেন যে, আমি সে সময় সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখন সেই ফার্নিচার দোকানের কাসীমুদ্দীন দ্রুতগতিতে এসে আমাকে সালাম দিল এবং বলল, দাদরীতে মীরওয়ালাদের কারখানায় এক গোজর থাকে। সে আপনার সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য ছটফট করছে। আপনি পাঁচ মিনিটের জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করে গেলে ভাল হয়।

তখন মাওলানা সাহেব সেই ফার্নিচারের দোকানে এসে বসেন এবং মীরওয়ালাদের কারখানা থেকে আমার বড় ভাইকে ডাকিয়ে আনেন। বড় ভাই এসে মাওলানা সাহেবকে ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে বলেন, মাওলানা সাহেব আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। একটি খুব সুন্দর ও সুদৃশ্য স্বর্গ-রথ। এর উপর বহু হুজুর মানুষ উপবিষ্ট। আপনি সেই রথ চালাচ্ছেন। আপনারা সামনের এক বিরাট প্রাসাদের দিকে যাচ্ছেন, যা খুবই মনোরম ও সুন্দর, যা হীরা দ্বারা নির্মিত ও কাঁচের গোলাকৃতি বেলুন দ্বারা সজ্জিত ছিল। তার আটটি দরজা ছিল। লোকজন বলতে লাগল, এটি স্বর্গ। আমি এটা শিনতেই রথ ধরে ঝুলতে থাকলাম সেই স্বর্গে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আপনি আমার হাত ধরে নামিয়ে দিলেন এই বলে যে, তুমি হিন্দু! তুমি এ অবস্থায় স্বর্গে যেতে পার না। তখন আপনারা সকলেই স্বর্গে চলে গেলেন আর আমি দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম। এই বলে বড় ভাই মাওলানা সাহেবকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, মাওলানা সাহেব! আপনি আমাকে স্বর্গে যেতে দিলেন না কেন? আপনার কি ক্ষতি হত?

মাওলানা সাহেব তাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন যে, ভাই! আমি তো এই স্বপ্ন সপর্কে জানিও না। কাউকে স্বর্গে বা মুসলিম পরিভাষা অনুযায়ী জান্নাতে যাওয়া থেকে বাঁধা দেয়ার কোন অধিকার আমার নেই। আসলে জান্নাতে যাওয়া থেকে তিনি বাঁধা দিয়েছেন- যিনি জান্নাতের মালিক। তাঁর আইন হল, তিনি কেবল ঈমানদারদের এবং মুসলমানদের জন্য জান্নাত বানিয়েছেন। সত্যি কথা হল, যিনি ঈমান না আনবেন এবং মুসলমান না হবেন, এই দুনিয়াতেও তার থাকার ও বসবাসের কোন অধিকার নেই। যেহেতু তার নিকট সৃষ্টকর্তার নির্দেশিত ন্যাশনালিটি বা জাতীয়তা নেই। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে- ঈমানবিহীন মানুষ বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকের মত দুনিয়াতে থাকে।

এরপর মাওলানা সাহেব বলেন, এই দুনিয়ার মালিক এক ও একক মাবূদ মহান আল্লাহ। তিনি তাঁর দুনিয়ার মানুষের জন্য এক ইসলামের আইন তাঁর সত্য নবী মুহাম্মদ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। যেসব লোক সেই এক ও একক মালিককে মানবে না এবং তাঁর প্রদত্ত ইসলামের আইন মানবে না, তারা তো আল্লাহদ্রোহী ও গাদ্দার- যাদের দুনিয়াতেই থাকার ও বসবাসের কোন অধিকার নেই; অতএব, তারা কিভাবে বেহেশতে যাবে?

আপনি যদি বেহেশতে যেতে চান, তাহলে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান। আজ তো স্বপ্ন দেখে এতটা পস্তাচ্ছেন, কিন্তু যে মৃত্যুর ব্যাপারে আদৌ জানা নেই- তা কখন আসবে, সেই মৃত্যুর পর আল্লাহ না করুন, আপনি যদি মুসলমান না হয়ে মারা যান, তাহলে এই স্বপ্ন বাস্তব সত্যে পরিণত হবে এবং এরপর আর সেখান থেকে ফিরেও আসতে পারবেন না।

বড় ভাই বললেন, দাদরীর মত গ্রামের আজকের এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার যুগে যদি আমি মুসলমান হয়ে যাই, তাহলে আমার ঘরের লোকেরাই আমাকে মেরে ফেলবে।

মাওলানা সাহেব বললেন, মেরে ফেললে তো আপনি শহীদ হয়ে যাবেন এবং আরও তাড়াতাড়ি জান্নাতে চলে যাবেন।

বড় ভাই বললেন, আমি যদি মুসলমান হই, তাহলে আমাকে ঘর ছাড়তে হবে। এরপর আমি থাকব কোথায়?

মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি ফুলাত চলে আসবেন এবং আমাদের এখানে থাকবেন।

বড় ভাই বললেন, আমি দু-চার দিনের মধ্যেই বাড়ীর লোকদেরকে বলে আপনার ওখানে পৌঁছে যাব।

মাওলানা সাহেব বললেন, দেখা করেই অবিলম্বে যেন ফুলাত চলে আসেন।

মাওলানা সাহেব বলেন, মনে করেছিলাম যে, দু-চার দিনের মধ্যেই জয়পাল ভাই ফুলাত এসে যাবেন। কিন্তু তিনি আসলেন না।

নভেম্বরের শেষের দিকে একদিন মাওলানা সাহেব জোহরের নামাযের জন্য বের হলে দেখতে পেলেন- জয়পাল ভাই বাইরে বসে আছেন। কিছু ফলমূল ইত্যাদি নিয়ে এসেছেন। মাওলানা সাহেব আসা মাত্রই ভাই ওঠে দাঁড়ালেন এবং মাওলানা সাহেবের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। অতঃপর বললেন, আপনি ভেবে থাকবেন যে, জয়পাল ধোঁকা দিয়েছে। আসলে আমার নামে কিছু জমি-জমা ছিল। আমার মা আছেন। আমি ভাবলাম যে, মায়ের সেবা করা তার প্রাপ্য হক। আমি তো এখন চলে যাব। তাহলে তাঁর সেবার কি হবে? এই ভেবে আমি আমার ভাতিজাকে ডেকে পাঠাই এবং তাকে কসম দিয়ে তার থেকে ওয়াদা নেই যে, আমি আমার সমস্ত জমি-জমা তোমার নামে দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শর্ত হল, তুমি আমার মাকে অর্থাৎ তোমার দাদীকে অন্তর দিয়ে সেবা করবে। সে এ শর্তে রাজী হল। জমি-জমা ও ঘরের অংশ তার নামে করতে এত সময় লেগে গেল। সবকিছু সমাধা করে এখন আমি এসে গেছি। আমাকে মুসলমান বানিয়ে দিন।

মাওলানা সাহেব তাকে সাথে করে মসজিদে নিয়ে গেলেন এবং তাকে গোসলের নিয়ম-কানুন বলে মসজিদের গোসলখানায় গোসল করতে বললেন। ফুলাতে তখন একটি আরব জামা’আত এসেছিল। তাই মসজিদ ভর্তি লোক ছিল। সবাই দেখে ভাবতে থাকেন যে, মাওলানা সাহেব একজন অপরিচিত লোককে ভিতরে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?

ভাইয়ের গোসল শেষ হলে, জোহরের নামাযের কিছু পূর্বে মাওলানা সাহেব ভাইকে মসজিদের ভিতরের অংশে নিয়ে যান এবং তাকে কালেমা পড়ান। মাওলানা সাহেব বড় ভাইকে ইসলামে দীক্ষিত করে তাঁর নাম রাখেন নূর মুহাম্মদ।

ইতিমধ্যে জামা’আত দাঁড়িয়ে গেল। মাওলানা সাহেব ভাইকে নিজ বরাবর জামা’আতে দাঁড় করিয়ে দেন।

বড় ভাই মুসলমান হওয়ার পর জীবনের প্রথম নামায পড়ে হৃদয়ে অভূতপূর্ব প্রশান্তি অনুভব করেন। অতঃপর মাওলানা সাহেবের ঘরে গিয়ে খানা খান।

আসরের নামাযের সময় তিনি আবার মসজিদে আসেন। তখন আরবের লোকের সাথে তাকে মাওলানা সাহেব পরিচয় করিয়ে দেন। ভাই সাহেবে তাদের ভাল লাগে। রাত্রে তিনি তাদের সাথে থাকেন।

পরদিন ছিল রবিবার। আরবের তাবলীগী জামা’আতটি মীরাট যাবার কথা। বড় ভাই মাওলানা সাহেবকে বললেন, আমার মন চাচ্ছে এই জামা’আতের সঙ্গে যেতে। মাওলানা সাহেব গুজরাটের অধিবাসী আমীর সাহেবের সঙ্গে বড় ভাইয়ের দেখা করিয়ে তাঁর ইচ্ছার কথা জানান। আমীর সাহেব এতে খুশী হন এবং বহু পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও মাওলানা সাহেব থেকে তাঁর খরচ বাবদ কিছুই নেননি।

সেদিনই পরন্ত বেলায় জামা’আত মীরাট পৌঁছে যায়। বড় ভাই সমস্ত আমলে স্বতস্ফূর্তভাবে তাদের সাথে শামিল হন।

অতঃপর পরদিন সোমবার ভোরে ফজরের নামাযের পর মুযাকারা ও নামাযের দু’আ প্রভৃতি মুখস্থ করাবার জন্য জিম্মাদার সাহেব নূর মুহাম্মদকে তালাশ করেন। এ সময় একজন বলেন, ফজর থেকে তাকে দেখছি না। শেষরাতে তাকে মসজিদের ভিতরে তাহাজ্জুদের নামায পড়তে দেখেছি।

তখন তালাশের জন্য একসাথী মসজিদের ভিতরে গিয়ে দেখতে পান, সদরী বরাবর একটি আলাদা অংশে বড় ভাই সিজদারত। সাথী তাকে ডাকলে তিনি সাড়া দিলেন না। সাথীটি ধারণা করলেন, হয়তো তিনি সিজিদার মধ্যে ঘুমিয়ে গেছেন। তাই তাকে জাগাবার জন্য ধাক্কা দিলেন। তখন জানা গেল- তিনি চিরদিনের জন্য রহমতের ছায়াতলে ঘুমিয়ে গেছেন।

সর্বমোট ৯ ওয়াক্ত ফরয নামায ও একরাতের তাহাজ্জুদ নামায তাঁর নসীব হয়েছিল। আর সেই তাহাজ্জুদেই মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যের সিজদায় তিনি মহান আল্লাহর নিকট চলে যান চিরদিনের জন্য। যে-ই তাঁর এ ঘটনা শুনতো, এ ধরণের মৃত্যুর জন্য আকাঙ্খা জাহির করতো। সেদিনই জোহরের নামাযের সময় জানাযা শেষে মীরাটেই তাঁকে দাফন করা হয়।

আহমদ আওয়াহঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ। এই ঘটনা অনেকবার আব্বা আমাকে শুনিয়েছেন। এ ঘটনা যে আপনার ভাইয়ের, তা এখন জানলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আপনার ভাই বড়ই সৌভাগ্যবান।

এবার দয়া করে আপনার ইসলাম গ্রহণের কথা বলুন, কিভাবে আপনি ইসলাম গ্রহণ করলেন?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ আহমদ ভাই! মূলত আমাদের ইসলাম গ্রহণ তো ভাই সাহেবের ঈমানের বদৌলতেই হয়েছে। সে এক লম্বা ঘটনা।

বহুকাল পর্যন্ত আমর জানতেই পারিনি যে, ভাই ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু তিনি আমার ছেলেকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখা দিতেন। বেশীরভাগ সময় ইসলামী পোশাকে টুপি, কোর্তা ও দাঁড়িসহ তিনি দেখা দিতেন।

একবার তিনি আমার ছেলেকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, বেটা! আমি আমার সব জমি-জমা তোমার নামে করে দিয়েছি। তুমি আমার এক কাজ করে দাও। এক ডজন কলা নিয়ে ফুলাতে বড় মাওলানা সাহেবকে পৌঁছে দাও।

স্বপ্ন থেকে জেগেই আমার ছেলে রওয়ানা হয়ে গেল। সে খাতূলী থেকে এক ডজন কলা কিনে নিল এবং তা ফুলাত নিয়ে গেল। সেখানে পৌঁছলে মসজিদের খাদেম সাহেব তাকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যান। মাওলানা সাহেব তখন বাড়িতে ছিলেন না। তিনি লক্ষৌ গিয়েছিলেন। আমার ছেলে সেই কলা মাওলানা সাহেবের ভগ্নিপতিকে দিয়ে আসে এই বলে যে, মাওলানা সাহেবকে বলবেন, দাদরীর জয়পাল এই কলা পাঠিয়েছেন।

এরপর আরেকবার বড় ভাই আমার ছেলেকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন, মাওলানা সাহেবকে এক কেজি মিষ্টি ফুলাত গিয়ে দিয়ে এস। তৎক্ষণাত আমার ছেলে মিষ্টি নিয়ে ফুলাত গিয়ে মাওলানা সাহেবকে দিয়ে আসে। এভাবে ভাই নূর মুহাম্মদ মারা যাবার পর কয়েকবার মাওলানা সাহেবকে হাদিয়া পাঠিয়েছেন।

এরপর একদিন এক ঘটনা ঘটল। আমাদের গ্রামে একজন বড় ও শক্তিশালী মানুষ কিছু গরীব ও দূর্বল লোকের উপর অত্যাচার করছিল। এতে আমার মন খুবই দুঃখিত ও বেদনার্ত হয়ে গেল। অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম এল না। মনে মনে মালিকের কাছে অভিযোগ পেশ করতে থাকলাম যে, মালিক যখন সবকিছু দেখছেন, তখন এই অত্যাচার কেন হয়?

সেদিন অনেক রাতে ঘুম এল। তখন স্বপ্নে দেখলাম, অনেক লোকের ভিড় একদিকে চলে যাচ্ছে। আমি জানতে চাইলাম, এত লোক কোথায় যাচ্ছে? হঠাৎ দেখলাম, সেখানে আমার বড় ভাই রয়েছেন। তিনি আমার কথার উত্তর দিয়ে বললেন, এসব লোক ফুলাত যাচ্ছে মুসলমান হতে এবং মুসলমান হয়ে স্বর্গে যেতে। রামফল! জলদী কর! নইলে তুমি পিছনে পড়ে যাবে। জলদী যাও, জলদী! ফুলাত গিয়ে মাওলানা সাহেবে বলবে, আমাকে মুসলমান বানিয়ে দিন, যাতে আমি স্বর্গে যেতে পারি। আমি তো আমার মালিকের দয়ার স্বর্গে এসে গেছি।

আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি স্বপ্ন খুব কম দেখি। তাই স্বপ্নের প্রতি আমার তেমন ভ্রুক্ষেপ থাকে না। কিন্তু এই স্বপ্ন আমাকে অস্থির করে তুলল। এক পর্যায়ে আমি মনে মনে সেদ্ধান্ত নিলাম, হ্যাঁ, আমি ভাই সাহেবের মত স্বর্গে যাব, আমি মুসলমান হব।

সকাল হল। আমি দেরী না করে রওয়ানা হয়ে গেলাম এবং কিছু সময়ের মধ্যেই ফুলাত পৌঁছলাম। মাওলানা সাহেবের খুঁজে আমি সেখানকার বড় মসজিদে গেলামমসজিদের মোল্লাজী আমাকে মাওলানা সাহেবের বাসায় নিয়ে গেলেন।

কিন্তু মাওলানা সাহেবকে পেলাম না। তিনি কোথাও সফরে গিয়েছিলেন। জানতে পারলাম, তিনদিনের মধ্যে তিনি আসবেন। তাই আমি সেখানেই অপেক্ষা করতে থাকলাম।

তিনদিন শেষ হয়ে সন্ধ্যা হল। কিন্তু মাওলানা সাহেব আসতে পারেননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলাম, মাওলানা সাহেব রাত দেড়টায় এসে পৌঁছেছেন। দিনটি ছিল সোমবার আর এ দিনটি ছিল মাওলানা সাহেবের ফুলাতে থাকার দিন।

সকাল থেকেই লোকজনের আসা শুরু হল। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাত করে লোকজন বিদায় নিতে লাগল। আমার পালা এল দেরীতে। ৯টার সময় মাওলানা সাহেবের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হল।

আমি মাওলানা সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি দাদাবীর জয়পালকে চিনেন? তিনি বললেন, খুব ভাল করেই চিনি। তিনি আমার কাছে এসেছিলেন। এরপর মাওলানা সাহেব ভাইজানের ইসলাম গ্রহণের পুরো কাহিনী আমাকে শুনালেন।

অতঃপর আমি আমার স্বপ্নের কথা প্রকাশ করলাম। মাওলানা সাহেব তা শুনে আমাকে মুবারকবাদ দিলেন এবং বললেন, আমার ছোট ভাই রামফল আসছে। তাকে মুসলমান না হয়ে যেতে দিবেন না।

সে মুহূর্তে মাওলানা সাহেব আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন, আপনিই কি নূর মুহাম্মদের ছোট ভাই রামফল?

আমার না বা সত্ত্বেও মাওলানা সাহেব আমার নাম বললেন! তা শুনে আমার স্বপ্ন সত্য হওয়ার ব্যাপারে প্রত্যয় জন্মালো। তখন আমি মাওলানা সাহেবকে আমার নিজের মুসলমান হওয়ার ইচ্ছার কথা বললাম।

তা শুনে তিনি খুব খুশী হলেন এবং আমাকে কালেমা পড়ালেন। অতঃপর বললেন, আপনি যদি ইসলামী নাম রাখতে চান, তাহলে পূর্বের নাম পাল্টাতে পারেন। আমি বললাম, হ্যাঁ, আপনি আমার নাম রেখে দিন। আরও ভাল হয়, যে নাম নিয়ে আমার বড় ভাই স্বর্গে গেছেন, আপনি যদি আমারও সেই নাম রাখেন। আমার নাম কি নূর মুহাম্মদ রাখা যায়? মাওলানা সাহেব বললেন, এতে অসুবিধা নেই। এই বলে তিনি আমার নাম নূর মুহাম্মদ রাখলেন। অতঃপর সেখানে আরও একদিন থেকে আমি দাদরীতে নিজের বাড়িতে চলে এলাম।

আহমদ আওয়াহঃ মাশআল্লাহ, বহুত হৃদয়গ্রাহী ঘটনা। আল্লাহ তা’আলা কুদরতীভাবে আপনাদের হেদায়েতের ব্যবস্থা করেছেন! কী খোশনসীব আপনাদের!

আপনি তো ইসলাম গ্রহণ করে বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। তাহে এবার একটু বলবেন কি- বাড়ি গিয়ে আপনার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি কি প্রকাশ করেছিলেন? সেখানে কি পরিস্থিতি হয়েছিল?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ বাড়িতে গিয়ে আবেগ ও উদ্দীপনার সাথে পরদিনই আমি আমার স্ত্রীকে আমার ইসলাম গ্রহণের পুরো কাহিনী বলে দিলাম। কিন্তু সে শুনে খুব অসন্তুষ্ট হল এবং আমার গোটা পরিবারে ব্যাপারটা ফাঁস করে দিল।

আমার চাচা ছিলেন গ্রামের প্রধান। আমাকে নিয়ে গ্রামে পঞ্চায়েত বসলো। কেউ কেউ বলল, তার মুখে কালি মেখে গাধার পিঠে বসিয়ে সারা গ্রাম ঘুরাও। কেউ মত দিল, তাকে গুলি করে মেরে ফেল। সে ধর্মচ্যুত হয়ে গেছে।

আমাদের গ্রামে একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল ছিলেন। তিনিও ছিলেন এ পঞ্চায়েতে। তিনি বললেন, এই যুগ হল যুক্তি-প্রমাণের যুগ। আপনারা তাকে বুঝান এবং প্রমাণ করুন যে, হিন্দুধর্ম ইসলামের তুলনায় ভাল। জোর-জবরদস্তি করে আপনারা তার দিল পাল্টাতে পারবেন না। তাই ভাল হয় যদি আপনারা তাকে চিন্তা-ভাবনার জন্য সময় দেন এবং বুঝিয়ে শুধরাবার চেষ্টা করেন। যেহেতু তিনি শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত লোক ছিলেন, তাই তার কথার উপরই পঞ্চায়েতে ফয়সালা দেয়া হয়।

সেই অনুযায়ী বাড়িতে এনে আমার মা আমাকে খুব বুঝাতে লাগলেন। তদুপরি তার ধারণা ছিল, ফুলাতওয়ালাগণ আমার উপর যাদু করেছে। তাই সেই যাদুর ক্রিয়া থেকে আমাকে মুক্ত করবার জন্য তিনি আমাকে ফালাওদাহ নিয়ে গেলেন।

সেখানে পৌঁছে চেয়ারম্যানের পায়ে পড়ে কান্নাকাটি করতে লাগলেন- এবং তিনি এসব ঝাড়-ফুঁকের উস্থাদ ছিলেন এবং তাকে বললেন যে, আমার ছেলের উপর যাদু করা হয়েছে। ফলে সে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেছে। আপনি আমার উপর দয়া করুন। তার উপর কৃত যাদুকে নষ্ট করে দিন। যেন সে আমাদের ধর্মে ফিরে আসে।

চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে পরীক্ষা করে দেখলেন যে, আমি ঠিক আছি। তখন মাকে বুঝিয়ে সান্ত্বনা দিলেন এই বলে যে, তার উপর কোন যাদু নেই। তার উপর মালিকের স্রোত বয়ে চলেছে। আপনি একে সমস্যা মনে করলে আপনি নিজেই ফুলাতওয়ালাগণের নিকট যান। তারা খুব মেহমান-নাওয়ায। তারা দুঃখী-অসহায় মানুষকে সাহায্য করেন।

 এ কথা শুনে মা হতাশাগ্রস্ত হয়ে আমাকে নিয়ে ফিরে এলেন। তখন মাকে বিভিন্নভাবে বুঝালাম যে, মা! আপনিও মুসলমান হয়ে যানকিন্তু মা উত্তর না দিয়ে বিষণ্ন হয়েই রইলেন।

আমার ইসলাম গ্রহণের কারণে সবচেয়ে বেশী আমাদের চাচা প্রধানজী কষ্ট পান। তিনি বলতে থাকেন, রামফল আমাদের সমাজে মুখ দেখাবার মত অবস্থা রাখেনি। তিনি এ নিয়ে অনেক বাকবিতণ্ডা করেন। কিন্তু আমি বশ্যতা স্বীকারের পরিবর্তে তাকেও ইসলামের কথা শুনাই এবং ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেই।

পরিশেষে তিনি আমাকে বশ করতে না পেরে একদিন পূর্ণিমার অনুষ্ঠানের নাম করে আমাকে দাওয়াত দিলেন। আল্লাহর কি মহিমা, সেইদিন রাতে আমি স্বপ্নে মাওলানা সাহেবকে দেখলাম, তিনি আমাকে বলছেন, পূর্ণিমার দাওয়াতে ক্ষীরের যে পেয়ালা তোমার সামনে দিবে- তার ভিতর বিষ মেশানো, তা কখনো খাবে না।

সেই দাওয়াতে যাওয়ার আমার কোন ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু চাচার জোরাজুরির কারণে যেতে বাধ্য হলাম।

কী আশ্চর্য ব্যাপার, স্বপ্নে যা দেখেছিলাম, বাস্তবেও তেমনটিও পেলাম। আমার চাচা আমার সামনে ক্ষীরের পেয়ালা রাখলেন। আমি রুটি খেতে শুরু করলাম এবং সুযোগ বুঝে সেই পেয়ালা চাচার সামনে ঠেলে দিলাম। তিনি তা জানতে পারেন নি।

চাচা সেখান থেকে দু-তিন চামচ ক্ষীর খেতেই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। তাকে মীরাঠে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু বিষক্রিয়ায় সেখানেই তিনি মারা গেলেন।

তার অন্তেষ্টিক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আমি ফুলাতে এসে মাওলানা সাহেবকে সমস্ত ঘটনা শুনালাম এবং তাঁর কাছ থেকে জানতে চাইলাম, আপনি কিভাবে জানতে পারলেন যে, ক্ষীরে বিষ মেশানো হয়েছে?

মাওলানা সাহেব বললেন, আমি তো এর কিছুই জানি না। আর গায়েব (অদৃশ্য)-এর খবর আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। বরং আল্লাহ তা’আলাই তাঁর বান্দাকে বাঁচিয়ে থাকেন এবং যার সঙ্গে তার মহব্বত হয় তার আকৃতিতে স্বীয় ফেরেশতা পাঠিয়ে পথ দেখান। তাইতো তাঁকে মেহেরবান রব বলা হয়।

বাড়িতে গিয়ে মাকে এসব ঘটনা বিস্তারিত খুলে বললাম। আমার হিন্দুধর্ম ত্যাগ সত্ত্বেও চাচার এই শত্রুতা মায়ের খুব খারাপ লাগে এবং এই ঘটনায় তিনি ইসলামের খুব কাছাকাছি এসে যান।

চাচার দুই ছেলে এরপর থেকে আমার জানের দুশমন হয়ে গেল। অপরদিকে আমি নিত্যকার ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে সংকতাপন্ন অবস্থায় পড়লাম। তাই সবদিক চিন্তা করে গ্রাম ছেড়ে ফুলাতে এসে থাকতে শুরু করলাম।

কিন্তু আমার বাড়ির লোকেরা এখানেও আমার পিছু নিল। তবে এখানে তারা তেমন কিছু করতে পারল না।

আহমদ আওয়াহঃ এ সময় ফুলাতে আপনি কতদিন ছিলেন এবং আপনার সময় কিভাবে কেটেছে?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ তিন বছরের বেশী আমি ফুলাতে ছিলাম। সেখানে আমি নামায-রোযা প্রভৃতি শিখেছি এবং দু’আ-কালাম ও মাস’আলা-মাসায়েল মুখস্থ করেছি। আর সময় পেলেই যিকির করতাম এবং সমাগত মেহমানগণের খেদমত করতাম।

আহমদ আওয়াহঃ শুনেছি, আপি ফুলাতে থাকাকালে নামাযের ভিতর আল্লাহর ভয়ে খুব কান্নাকাটি করতেন!

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ ভাই! আমি কি কাঁদব? ( কাঁদতে কাঁদতে বললেন ) এক ফোঁটা নাপাক পানিতে সৃষ্ট এই মানুষের যদি এত বড় মালিকের সামনে যাওয়ার সুযোগ ঘটে, আপন প্রিয় মাবূদের সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য ঘটে, তাহলে তো কান্না আসবেই। কোন দারোগা থানায় ডেকে পাঠান কাউকে, তাহলে তার কী অবস্থা হয়! সুতরাং, মালিকের সামনে গেলে কী অবস্থা হওয়া দরকার!

তাই যখনই আমি নিয়ত বাঁধি, আমার অন্তরে খেয়াল জাগে, এই বান্দা নূর মুহাম্মদ কোথায় আর কোথায় মাওলার দরবার! মসজিদে যাই তো মনে হয়, আপন মালিকের করতলে মাথা পাতছি, যিনি আমার পরম আরাধনা। মাওলানা সাহেব আমাকে নামায শেখানোর সাথে নামাযের সূরাহ ও দু’আসমূহের অর্থও মুখস্থ করিয়েছিলেন। নামাযে সেগুলো পড়ার সময় তার অর্থের দিকে খেয়াল করে কেঁপে উঠি।

আমার জানতে ইচ্ছা হয়েছিল, নামাযে আত্তাহিয়্যাতু ও দরুদ পড়া হয় কেন? তখন মাওলানা সাহেবকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, মিরাজে আমাদের নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর বদৌলতে আমাদের আল্লাহ তা’আলা আমাদের এই দুর্লভ সুযোগ দান করেছেন। এজন্য নামাযের মধ্যে মিরাজের সেই কথোপকথন দ্বারা রসনাকে ধন্য করা হয় এবং নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর উপর দরুদ পাঠ করত তাঁর অনুগ্রহ স্মরণ করা হয়। এখানে আত্তাহিয়্যাতু ও দরুদ শরীফ পড়ার সময় সে কথা স্মরণ করে আমার অন্তর ভরে যায়।

আহমদ আওয়াহঃ শুনেছি, আপনি রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে স্বপ্নে দেখেছেন আর রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) কর্তৃক আদেশপ্রাপ্ত হয়ে নাকি আপনি আপনার মাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন? এ সম্পর্কে কি কিছু বলবেন?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ আলহামদুলিল্লাহ, আমি নামাযে আত্তাহিয়্যাতু ও দরুদ শরীফ খুব মন দিয়ে পড়ি এবং তখন থেকেই স্বপ্নে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর যিয়ারত খুব নসীব হয়। আসলে আমার প্রতি মহান আল্লাহরই অসীম অনুগ্রহ।

সর্বপ্রথম যখন আমার রাসুল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর যিয়ারত নসীব হয়, তখন দেখি আপর আব্বার মত বয়স বা কিছুটা বেশী, পরিষ্কার বর্ণ, আমাকে বলছেন, যাও, তোমার মাকে কালেমা পড়িয়ে দাও। সে তৈরী, তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

সকালে আমি এ স্বপ্নের কথা মাওলানা সাহেবকে বললাম। তিনি আমাকে বাড়িতে গিয়ে তা পালনের পরামর্শ দিলেন।

সেমতে আমি বাড়িতে গেলাম। আমার মা তখন খুব অসুস্থ ছিলেন।  আমি ডাক্তার এনে মাকে দেখালাম। অতঃপর তার খেদমতের জন্য বাড়িতে থেকে গেলাম। আমার ছেলেও তার খুব সেবা করত।

তার ঘন ঘন পেট নামার অসুখ হয়ে গিয়েছিল। বারবার পরিহিত কাপড়-চোপড় খারাপ হয়ে যেত। আমি নিজ হাতে তার এসব ধুয়ে দিতাম এবং তাকে গোসল করাতাম। তার নষ্ট করা কাপড় নিঃসংকোচে ধুয়ে দিতাম।

ইসলাম গ্রহণের আগে মায়ের সঙ্গে আমার তেমন বনিবনা হত না। তাই তার কোন সেবা করতাম না। কিন্তু এখন আমার এ সেবা পেয়ে তিনি খুব প্রভাবিত হন। তাঁর ধারণা জাগে, মুসলমান হয়ে আমি এমন হয়েছি। এ সুযোগে আমি তাকে মুসলমান হওয়ার জন্য বললাম। তিনি ইসলাম গ্রহণ করতে রাজী হলেন। তখন আমি তাকে কালেমা পড়ালাম এবং তাঁর নাম রাখলাম ফাতেমা।

মহান আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি ইসলাম গ্রহণের পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান। আমার ছেলেকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম। সে তা কবুল করে মুসলমান হয়ে গেল।

ওদিকে গ্রামের লোকেরা আমার গ্রামে আসাটাকে ভালভাবে মেনে নেয়নি। তারা আমার সাথে শত্রুতা করতে থাকে। কয়েকবার আমার উপর হামলাও করে। কিন্তু আল্লাহর শোকর, আল্লাহ তা’আলা আমাকে রক্ষা করেছেন।

আমি ফুলাতে গিয়ে এ ব্যাপারে মাওলানা সাহেবের সাথে পরামর্শ করলাম। মাওলানা সাহেব আমাকে গ্রাম ছাড়তে বললেন। তখন আমি আমার মাকে নিয়ে মীরাটে এক ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করলাম।

তখন রোজগার প্রসঙ্গে মাওলানা সাহেব আমাকে বললেন, ইসলাম রুজী-রোজগারের ভিতর ব্যবসাকে বেশী পছন্দ করে। আমাদের নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-ও ব্যবসা করেছেন। তাই আমি তরি-তরকারির ব্যবসা শুরু করলাম।

অতঃপর মাওলানা সাহেব আমাকে লোহার ব্যবসায় লাভ সম্পর্কিত হাদীস শোনান। সেই প্রেক্ষিতে আমি গ্রীলের দরজা-জানালার দোকান দিলাম। তখন কারবার বেশ জমে উঠল।

ওদিকে আমার গ্রামের লোকেরা আমার ঠিকানা জেনে গেল। তারা মীরাটে আমার পিছনে লাগলো।

সে সময় আমার চাচার বড় ছেলে এক বদমায়েশকে দশ হাজার টাকা দিল আমাকে গুলী করে মেরে ফেলার জন্য। মহান আল্লাহর কী করুণা, স্বপ্নে আমি রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন, কাল তোমাকে মারার জন্য এক বদমায়েশ আসবে। তার নাম মুহাম্মদ আলী। সে হবে কালো প্যান্টধারী ও নীলজামা পরিহিত। তাকে বলবে, মুহাম্মদ আলী হয়ে এক রামফলকে নূর মুহাম্মদ হওয়ার কারণে মারতে এসেছ?

আমি রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় যাচ্ছিলাম। তখন সেই লোকটি এল। আমি তাকে বললাম, মুহাম্মদ আলী হয়ে একজন রামফলকে নূর মুহাম্মদ হওয়ার কারণে মারতে এসেছ? আমার কথা শুনে সে বিস্ময়ের সাগরে ঘোরপাক খেতে লাগল। আশ্চর্য হয়ে সে জিজ্ঞেস করল, আমার নাম তোমাকে কে বলল? আমি বললাম, তিনি বলেছেন, যিনি সকল সত্যের সত্য, যিনি দুনিয়াকে সত্য শিখিয়েছেন। এরপর আমি তাকে রাতে দেখা স্বপ্নের কথা বললাম এবং আমার ইসলাম গ্রহণের কথা বিস্তারিত খুলে বললাম। তা শুনে সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।

অতঃপর তার রিভলভার আমার হাতে তুলে দিয়ে সে বলতে লাগল, এমন প্রিয় নবীর নামকে বদনামকারী মুহাম্মদ আলীর চেয়ে তুমি রামফল কত ভাল! এমন পাপিষ্ঠের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। এই নাও, আমার পেটে গুলী মার। আমি তাকে বললাম, গুলী মারলে তো কাজ হবে না। সত্যিকারের তওবা সকল গুনাহের প্রতিকারকারী। আল্লাহর কাছে তওবা কর এবং তাবলীগ জামা’আতে গিয়ে চিল্লা লাগাও। তখন সে এর ওয়াদা করল।

সকালে সে আবার আমার কাছে আসল এবং কিভাবে তাবলীগে চিল্লায় যাবে এর পরামর্শ চাইল। আমি তাকে নিয়ে হাউজওয়ালী মসজিদে গেলাম। সেখানে তখন তাবলীগে যাওয়ার জন্য জামা’আত তৈরী হচ্ছিল। তখনই সে আমার কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে জামা’আতে চলে গেল।

আহমদ আওয়াহঃ আমরা জেনেছি, আপনি খুব আন্তরিকতার সাথে দ্বীনী দাওয়াতের কাজ করে যাচ্ছেন। তা কিভাবে করছেন, কিছু বলবেন কী?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ একসময় মীরাটের সেই তাবলীগী মারকাযে গেলাম- যেখানে আমার বড় ভাই সিজদারত অবস্থায় পরপারে চলে গিয়েছিলেন। তাবলীগের এক সাথী সেই জায়গা আমাকে দেখিয়ে দিলেন- যেখানে আমার ভাই তাহাজ্জুদ নামায আদায়রত ছিলেন আর এ অবস্থায়ই সিজদার মধ্যে ইন্তেকাল করেন।

রাতে আমি সেই মসজিদে থাকলাম এবং সেই জায়গায়ই তাহাজ্জুদ নামায পড়লাম। এরপর আমি অনেকক্ষণ সেই মসজিদে এই আশায় পড়ে থাকলাম যে, সম্ভবত এটাই জান্নাতের দরজা। হয়তো আমিও আমার ভাইয়ের মত মর্তবা পেতে পারি।

ইতিমধ্যে আমার চোখ লেগে গেল। তখন স্বপ্নে রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর যিয়ারত নসীব হল। তিনি আমাকে বললেন, ঈমানদারদের জন্যই জান্নাত। কিন্তু এখন তোমাকে অনেক কাজ করতে হবে। এরপরই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, আমি অধমের কী কাজ করার আছে? মনে মনে স্থির করলাম, দেখি, আমি কী কাজ করতে পারি। প্রিয় নবীর একান্ত কিছু কাজ।

সেই সময়ই আমি মাওলানা সাহেবের সাথে মাশওয়ারা করে ইসলামের দাওয়াতের কাজে গভীরভাবে মনোনিবেশ করলাম।

আহমদ আওয়াহঃ আপনার গ্রামের পক্ষ থেকে কি আর কোন সমস্যা হয়েছে?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ হ্যাঁ, তারাতো লেগেই ছিল। মুহাম্মদ আলীর বিষয়টি বানচাল হওয়ার পর তারা আরও ক্ষেপে গেল। তখন বিভিন্নভাবে তারা আমার বিরুদ্ধে লেগে গেল। এমনকি একসময় মীরাটে আমার থাকা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল।

তখন মাওলানা সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করলাম। তিনি আমাকে মীরাট ছাড়ার পরামর্শ দিলেন।

তাঁর পরামর্শ মোতাবেক প্রথমে পাঞ্জাব ও পরে হরিয়ানায় গেলাম। কিন্তু কোথাও কাজ তেমন জমল না। ওদিকে ঋণ বৃদ্ধি পেতে থাকল। তখন আমাকে মুনিপুরে যাবার পরামর্শ দিলেন। সে ব্যাপারে মাশওয়ারা করলে মাওলানা সাহেব আমাকে ইস্তিখারা করতে বললেন।

ইস্তিখারা করার পর আল্লাহ তা’আলা অন্য এক উত্তম ব্যবস্থা করে দিলেন। হঠাৎ করেই মাওলানা সাহেবের পরিচিত একজন লোক কানপুর থেকে এলেন এবং আমাকে তার সাথে কানপুর নিয়ে গেলেন। আলহামদুলিল্লাহ, চার বছরে এখানে আমার লোহা-লক্করের কাজ খুব ভালভাবে জমে গেল। যত ঋণ ছিল, সব শোধ করলাম।

এরপর প্রথমে আমি আমার ছেলেকে বিবাহ করালাম। অতঃপর গত বছর জনৈক বিধবা মহিলাকে মুসলমান বানিয়ে বিবাহ করেছি। তার দু’টি সন্তানও আমার তত্ত্বাবধানে আছে-তাদেরকেও মুসলমান করেছি।

আর ব্যাপকভাবে ইসলামের দাওয়াতের কাজ তো রয়েছেই, সর্বাবস্থায় তা আনজাম দিয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ তা’আলা কবুল করুন।

আহমদ আওয়াহঃ আলহামদুলিল্লাহ, খুবই মুবারক জীবন আপনার! মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কোন পয়গাম দিবেন কি?

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ আমি এই সফর করেছি মাওলানা সাহেবের কাছে দু’আর আবেদনের জন্য এবং সমস্ত মুসলমানদের কাছেও আমার দু’আর দরখাস্ত যে, আমি যেন আমার কাজে পূর্ণ সফল হতে পারি। আমি একটি দাওয়াতী টিম বানিয়েছি, যেই টিমের আমরা বাঙালী ছিন্নমূল ও যাযাবরদেরকে এবং মধ্যপ্রদেশে ভীল সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াতের কাজ শুরু করেছি। এ পর্যায়ে আমি এক চিল্লা লাগিয়েছি যমুনা নগরে, সেখানে বাঙালীদের কাঁচা-পাকা কিছু বস্তি আছে। আরও এক চিল্লা লাগিয়েছি খাণ্ডোয়া এলাকায়। সেখানে ভীল সম্প্রদায়ের বেশ কিছু লোক আছে। সেখানে আমি অনুভব করেছি যে, তাদের ভিতর কাজ করলে দলে দলে লোক মুসলমান হতে পারে। এ ছাড়াও কানপুরে গত বছর আমি দশটি সফর করেছি। মহান আল্লাহর কাছে আমার প্রত্যাশা, ইনশাআল্লাহ লাখ লাখ লোক মুসলমান হবে।

সমস্ত মুসলমানের কাছে আমার আবেদন, না জানি এ ধরণের আরও কত বস্তি ও জনবসতি আছে। যদি সঠিকভাবে ও পরিকল্পিতভাবে দাওয়াত দেয়া যায় এবং আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করা হয়, তাহলে কত শত-সহস্র লোক জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারে। নিজ নিজ সঙ্গতি ও সামর্থ অনুসারে অমুসলিমদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর বিষয়ে সকল মুসলমানের ফিকির করা দরকার।

আহমদ আওয়াহঃ বহুত বহুত শুকরিয়া নূর মুহাম্মদ ভাই। আপনার নিকট থেকে অনেক মূল্যবান কথা শুনলাম। আশা করি এর দ্বারা, আমরা যথেষ্ট উপকৃত হব। আপনি আমাদের জন্য দু’আ করবেন।

নওমুসলিম নূর মুহাম্মদঃ প্রিয় ভাইজান আমার! এমন অকৃতজ্ঞ কে হবে যে, আপনার জন্য এবং আপনাদের পরিবারের জন্য দু’আ করবে না? ( এরপর কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন )  আমার প্রতিটি পশম আপনাদের পরিবারের কাছে ঋণী। আপনাদের মাধ্যমেই আমি চিরস্থায়ী জাহান্নামের পথ থেকে বেঁচে ইসলামের পথে এসছি। আমার শরীরের চামড়া দিয়ে আপনাদের জন্য জুতো বানিয়ে দেয়া হলেও আপনাদের পরিবারের এ ঋণ কখনও শোধ করা সম্ভব হবে না। আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত আপনাদের পরিবারেক গোটা বিশ্বের হেদায়েতের জরী’আ বানিয়ে রাখুন এবং আপনাদেরকে এর পরিপূর্ণ উত্তম জাযা দান করুন। ( আমীন )

( তথ্য সংগ্রহঃ মাসিক আরমুগান, জুলাই-আগস্ট-২০০৫, মাসিক আদর্শ নারী, ফেব্রুয়ারী-২০১২ )

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার দ্বীনের উপর পরিচালিত করুন আ'ম ভাবে সবাইকে হেদায়াত নসীব করুন ও জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা প্রসস্থ করুন। আমিন।

সুন্দর লেখা শেয়ার করার জন্য আপনাকে যাযাকাল্লাহু খাইরান।

-

▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬
                         স্বপ্নের বাঁধন                      
▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)