নওমুসলিমা শাহনাজ বেগমের ঈমানদীপ্ত উপাখ্যান

সৎমায়ের অত্যাচার, নির্যাতন সইতে না পেরে শাহনাজ বেগম বাড়ী ছেড়ে চলে যায়। তাকে আশ্রয় দেয় দিল্লী শহরের একটি মুসলিম পরিবার। মুসলিম পরিবারের সদস্যদের আচার-ব্যবহার এবং ইসলামের সৌন্দর্যময় বিভিন্ন বিষয় দেখে তিনি ইসলামের প্রতি উদ্ভুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। আসুন আমরা তার মুখ থেকেই তার ইসলাম গ্রহণের বিস্তারিত বিবরণ শুনি।

জম্মু শহরের শিক্ষিত এক পরিবারে আমার জন্ম। আমার পিতা কুলদিপ নারায়ণ স্থানীয় কলেজের শিক্ষক। আমার মা অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত একজন মহিলা। কিন্তু ছোট বয়স থেকেই তিনি মারাত্মক ব্যাধিতে ভুগছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! বিয়ের পর তার সেই রোগ আরও বৃদ্ধি পায়। আমার বয়স যখন পাঁচ বছর, একদিন মা আমাকে নদীর ব্রীজের উপর নিয়ে গেলেন। নদীতে ফেলার জন্য আমাকে ঝাপটে ধরলেন, আমার চিৎকারে এক ব্যক্তি দৌড়ে এলতার সাথে একটি বাচ্চা ছেলেও ছিল। লোকটি মায়ের মনোভাব বুঝতে পারলেন। লোকটি কৌশলে মাকে বললেন, আমার সাথে যে বাচ্চাটি দেখছেন, ও আমার সন্তান। আমি ওকে নদীতে ফেলে দিব, ওর কপাল অত্যন্ত মন্দ। জীবিত থাকলে তাকে অনেক দুঃখ-কষ্ট সইতে হবে। এরপর তিনি আমার দিকে ঈশারা করে বললেন, বাচ্চাটি কি আপনার? ওর ভবিষ্যত ভাগ্যতো অনেক ভাল! সুখ-শান্তিতেই ওর জীবন কাটবে। বাচ্চার ব্যাপারে আপনি কোন চিন্তা করবেন না। বাচ্চাকে আপনি পানিতে ফেলবেন না জানিনা লোকটির কথায় কি এমন জাদু ছিল, যদ্দরুন মা আমাকে পানিতে ফেলা থেকে বিরত থেকেছেন।

এই ঘটনার বছর খানেক পর আমার চিরদুঃখী মা পরকালে পাড়ি জমান। মায়ের মৃত্যুর ছয় মাস পর, আমার পিতা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎ মা আসার পর আমি ও আমার ছোট ভাই সন্দীপ নারায়ণ একেবারে অসহায় হয়ে পরলাম। সৎ মা আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করতেন। অত্যাচার নির্যাতনে আমাকে অতিষ্ট করে রাখতেন। কঠিন এই অবস্থার মধ্যেই আমি মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি এবং কৃতিত্বের সাথেই পাশ করেছি। নির্যাতনের মাত্রা এত বেশী ছিল যে, ঘর আমার কাছে জাহান্নাম মনে হত। অতিষ্ঠ হয়ে কয়েকবার ব্যর্থ আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলাম। সৎ মা প্রায় সময় আমার ব্যাপারে পিতার কাছে মিথ্যা নালিশ দিতেনপিতা অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে আমাকে বকাঝকা করতেন। আমার করার কিছুই ছিল না। নীরবে শুধু অশ্রু ঝরাতাম। মাঝে মাঝে মন্দির গিয়ে মাটির দেব-দেবীর পূজো করতাম। প্রার্থনার সুরে মাটির এই স্তুপগুলোকে বলতাম, কবে হবে আমার আঁধার রাতের সকাল। কবে যাবে আমার বেদনার পাহাড়! নির্জীব এসব দেব-দেবী প্রার্থনার জবাব দিবে তো দূরের কথা, তাদের শরীরে বসা মশা-মাছি তাড়াতেও বড় অক্ষম। মহান আল্লাহ্‌ পাক তাঁর কালামে পাকে এরশাদ করেছেন-

তোমরা তাদের আহবান করলে তার তোমাদের আহবান শুনবে না এবং শুনলেও তারা তোমাদের আহবানে সাড়া দিবে না। তোমরা তাদের যে শরীক করেছ, তা ওরা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সত্য প্রত্যাখানকারীদের সম্পর্কে সর্বজ্ঞ আল্লাহর ন্যায় কেউ তোমাকে অবহিত করতে পারে না। ( সূরা ফাতিরঃ ১৪ )

আমি কোর’আনের এই আয়াতটি যখন তিলাওয়াত করি, পূর্বের কৃতকর্মের জন্য বড় আফসোস হয়হায়! কোর’আনের এই আয়াত যদি আরও আগে জানতাম! সৎ মায়ের সাথে আমি একদিন কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেখানে একটি মুর্দাকে দাফন করা হচ্ছিল। এই দৃশ্য দেখে আমি মাকে বললাম, মৃত্যুর পর আমাকেও যেন এভাবে দাফন করা হয়, চিতায় যেন আমাকে জ্বালানো না হয়। আমার এ কথায় সৎ মা আমাকে অনেক তাচ্ছিল্য করলেন। সৎ মায়ের গালি-গালাজ শুনাটা আমার প্রতিদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছিল। নিত্যদিন ভিন্ন ভিন্ন রুপে পিতার কাছে অভিযোগ পেশ করতেন। এই ধারাবাহিকতায় একদিন সৎ মা আমার উপর পাঁচশত রুপি চুরির অপবাদ দিলেন। আমাকে অনেক হেনস্তা করলেন। সেদিন হৃদয়ে আমার অনেক রক্ত ঝরে ছিল। নয়ন বেয়ে অঝোরে অশ্রু বর্ষেছিল। বিমর্ষ মনে আমি ভাবছিলাম, আজ তারা আমাকে চুরির অপবাদ দিয়েছে। পরবর্তীতে এর চেয়ে বড় অপবাদ দিতেও তারা কুন্ঠিত হবে না। তাই বাধ্য হয়েই আমি ঘর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমার কাছে একশত রুপি ছিল। কিছু কাপড়-চোপড় বেগে পুরে অজানার উদ্দেশ্যে বের হলাম। আমাদের বাড়ীটা ছিল সংকীর্ণ গলিতে। কয়েক কদম হাঁটার পরে দেখি পিতা মেইন রাস্তা থেকে গলিতে ঢুকছেন। পিতাকে দেখে আমার হৃদকম্পন বেড়ে গেল। ভয় হচ্ছিল, না জানি কি হয়। গলির কিনারা দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে পিতা আমার পাশ দিয়েই হেঁটে গেলেন, কিন্তু আমার দিকে তার দৃষ্টি পরেনি। আসলে রব্বুল আ’লামীন আমাকে হেদায়েতের অমীয় সুধা পান করাবেন, তাই পিতার চোখে পর্দা ঢেলে দিয়েছিলেন।

কিছুটা দূরেই রেল স্টেশন। স্টেশনে পৌঁছে ভাবতে লাগলাম কোথায় যাব? কে হবে আমার আশ্রয়দাতা! অবশেষে দিল্লীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে টিকেট কাটলাম। কিন্তু কোন বগিতে উঠতে হবে, তা আমার জানা ছিল না। সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট একটি বগি রয়েছে, আমি সেই বগিতে গিয়ে উঠলাম। মেয়ে মানুষ হওয়ার কারণে, সেই বেচারাগণ আমাকে একটি সিট দিলেন। ট্রেন চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর একজন টিটি এলেন। আর্মিদের বগিতে আমাকে দেখে তিনি টিকিট চাইলেন। আমার বরাবর একজন সৈন্য বসা ছিল, সে সৈন্য টিটিকে বললেন, ওতো আমার বোন! এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য ছিল।

 সেনাবাহিনীর সেই লোকটি সারা রাস্তায় বোনের মত আমার দিকে খেয়াল রেখে ছিলেন। আরামের সাথে আমি দিল্লী পৌঁছলাম। স্টেশনের বাইরে এসে সিটি বাসে চড়লাম। আমার সামনে দুজন যুবক বসা ছিল। তারা পরস্পর বিভিন্ন  আলোচনা করছিল। তাদের আলোচনা দ্বারা বুঝতে পারলাম, তারা ভদ্র ঘরের সন্তান।

আমি তাদের লক্ষ্য করে বললাম, ভাইয়া! আমাকে দিল্লীর কোন হোস্টেলের ঠিকানা বলতে পারবেন? তারা আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি সংক্ষিপ্তভাবে আমার ব্যাপারটি তাদেরকে খুলে বললাম। আমার সমস্যায় তারা চিন্তিত হলেন। তারা বলল, হোস্টেল তো অনেক দূরে। আপনি এক কাজ করুন, আমাদের এক বোন আছে, সে পড়ালেখা করে। তার ঘরে কোন পুরুষ নাই। কিছু সময় তার ঘরে কাটান। সময় করে সে নিজেই আপনাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিবে। তাদের অমায়িক ব্যবহারে আমি আশ্বস্ত হলাম। তারা আমাকে তাদের বোনের কাছে নিয়ে গেলেন। তাদের বোন আমার সমস্যার কথা বুঝতে পেরে আমাকে কাছে টেনে নিলেন। নাস্তা করালেন। এবং বললেন, আমার এক নিকট আত্মীয় আছে, যার নাম জনাব আরিফ সাহেব। আপনি বরং প্রথমে তাঁর সাথে আপনার বিষয়টি আলোচনা করুন। তারপর না হয় আমি নিজেই আপনাকে হোস্টেলে দিয়ে আসব।

সেদিনই তিনি আমাকে আরিফ সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন। আমি বিস্তারিতভাবে আরিফ সাহেবকে আমার ঘটনা বললাম। আমার কাহিনী শুনার পর আরিফ সাহেব অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ভাবে মূর্তিপূজার অসারতা ও ইসলামের মহত্বের ব্যাপারে আমাকে বুঝালেন। তার কথা শুনার পর আমার হৃদয়ে অস্থিরতা অনুভব করলাম। মূর্তিপূজার অপকারিতা বুঝতে পারলাম। ধারাবাহিকভাবে কয়েকদিন মুসলমানের মাধুর্য্যপূর্ণ ব্যবহার, মুসলিম যুবতী বোনের আন্তরিকতা এবং ইসলামী আক্বিদা বিশ্বাস সম্পর্কে কিঞ্চিত অবগতি লাভ ইত্যাদি বিষয়গুলি আমাকে ইসলাম ধর্মের প্রতি আগ্রহী করে তুলল। এমনকি আমি নিজেই একদিন আরিফ সাহেবের কাছে আমার ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ ব্যক্ত করলাম।

তিনি আমাকে বুঝালেন, ঈমান প্রত্যেকটা মানুষের জন্য অপরিহার্য একটা বিষয়। কিন্তু তুমি তো আমাদের এখানে এসেছ বিপদে পড়ে। কোন জবরদস্তি বা সামান্য এহসানের বদলা দেওয়ার জন্য ইসলাম গ্রহণ করাটা তোমার উচিত হবে না। তবে যদি বুঝে শুনে নিজের সবচেয়ে অপরিহার্য বিষয় মনে করে, ইসলাম গ্রহণ করতে চাও, এটাতো খুশির খবর! আমাদের এক বোন জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন থেকে নিষ্মৃতি পাবে; এর চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কি হতে পারে। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সন্তুষ্টির সাথে আরিফ সাহেবকে ইসলাম গ্রহণের কথা বললাম। তিনি আমাকে পবিত্র কালেমা পরিয়ে দিলেন। আমি ইসলাম শিক্ষা অর্জনের ব্যাপারে আরিফ সাহেবের কাছে পরামর্শ চাইলাম। তিনি আমাকে মেওয়া নামক শহরে একটি ইসলামী প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। প্রথমে সেখানে আমার কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। পরবর্তীতে অবশ্য সব ঠিক হয়ে যায়। ইসলামী শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান আমার কাছে অত্যন্ত উপকারী মনে হতে লাগল। আলহামদুলিল্লাহ! কয়েক মাসের মধ্যে কুর’আনে কারীমের তেলাওয়াত শিখার তোফিক হয়েছে। এছাড়াও দুআ-কালাম ও বিভিন্ন ধরণের মাস’আলা-মাসায়েলও শিখা হয়েছে। আমি যখন মেওয়া থেকে দিল্লীতে ফিরে এলাম, আরিফ সাহেব একটি ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করলেন। ছেলেটি দ্বীনদার ছিল না, অথচ আমার জন্য তখন দ্বীনদারীটাই মুখ্য বিষয় ছিল। আমি ভয়ে ভয়ে আরিফ সাহেবকে বললাম, আমার জন্য একজন দ্বীনদার ছেলে তালাশ করলে উত্তম হত। চাই সেই ছেলে দরিদ্র হোক না কেন। দ্বীনদার ছেলের আমার আগ্রহ দেখে সেখানে আর বিয়ে দিলেন না। তিনি নিজের মেয়ের জন্য দৈনিক পত্রিকাতে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। সেই বিজ্ঞাপনটি মাওলানা জায়েদ আশরাফ নদভী সাহেবের দৃষ্টি গোচর হল। তিনি ইতিপূর্বে একটি বিয়ে করেছিলেন। স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় তাদের সেই সম্পর্ক বেশীদিন টিকেনি। হয়তো এটা আমার খোশ কিসমতের কারণে হয়ে থাকবে। জায়েদ আশরাফ সাহেবের পিতামাতা ইন্তেকাল করেছেন। তিনি পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে, নিজের ভাইদের সাথে কোন পরামর্শ না করেই, আরিফ সাহেবের কাছে বিয়ের খোঁজ-খবর নিতে আসলেন। আরিফ সাহেব আমার মহব্বতের কারণে অথবা জায়েদ সাহেবের পূর্ব বিবাহের কারণে, নিজের মেয়ের কথা না বলে আমার ব্যাপারে জায়েদ সাহেবকে প্রস্তাব দিলেন।

 ইতিপূর্বে আমার ইসলাম গ্রহণের বিস্তারির বিবরণ একটি খাতায় আমি নোট করে রেখেছিলাম। আরিফ সাহেব মাওলানা জায়েদ সাহেবকে আমার লেখাটি দেখালেন। জায়েদ সাহেব লেখাটি পড়ে অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন এবং আমাকে দেখার আগ্রহ ব্যক্ত করলেন। জায়েদ আমাকে দেখেই পছন্দ করলেন এবং একদিন জোহরের নামায শেষে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। জায়েদ সাহেব আমাকে তার বাড়িতে নিতে চাচ্ছিলেন না। কেননা এই ব্যাপারে তিনি নিজ পরিবারের পক্ষ থেকেই বিরোধিতার আশঙ্কা করছিলেন। এ কারণে আমাকে তিনি লক্ষৌ নিয়ে গেলেনএখানে কিছুদিন থাকার পর বোম্বের অধিবাসী তার এক বন্ধু মুফতী আব্দুল হামিদ সাহেবের বাসায় নিয়ে গেলেন। তার এখানে এক বছর রাখলেন।

মুফতী সাহেবের মা-বাবা আমার সাথে খুবই হৃদ্যতা পূর্ণ করতেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা আমার উপর একের পর এক অনুগ্রহ করছিলেন। ইতিমধ্যে জায়েদ সাহেব মদীনা ইউনিভার্সিটি চান্স পেয়ে গেলেন। যেকোন ভাবে তিনি আমার জন্যও মদীনা শরীফের ভিসা জোগাড় করলেন। বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মদীনা শরীফে অবস্থান করছিমদীনার আলো বাতাস আমার কাছে  অত্যন্ত প্রশান্তিদায়ক মনে হয়। আল্লাহ্‌ পাক আমাদেরকে তিনটি সন্তান দান করেছেন তারাও মদীনার আলো-বাতাসের বেড়ে উঠছে। আমার স্বামী একটু লাজুক ধরণের। আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাকে মাওলানা সাহেবের সুরতে কোমল, উদার ও সহনশীল একজন স্বামী দান করেছেন। এছাড়াও মদীনায় বসবাসের ব্যবস্থা করে আল্লাহ্‌ তা’আলা আমার জীবনের সব পেরেশানী দূর করে দিয়েছেন।

এখানে জায়েদ সাহেবের একজন আলেম বন্ধু রয়েছেন। তার নাম মুফতী আশেকে ইলাহী। আমি তার বাসায় গিয়েছি। মুফতী সাহেবের স্ত্রী উম্মে জান সাহেবার সাথে সাক্ষাত হয়। পরিচয় পেয়ে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি আমাকে অনেক সমাদর করলেন। মুফতী সাহেবের কাছে  আমার জীবন বৃত্তান্ত বললেন। অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ব থেকেই মুফতী সাহেবের আগ্রহ ছিল। যে কারণে তিনি দিল্লীর মাওলানা কলীম সিদ্দীকী সাহেবের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

মুফতী সাহেব অন্য একদিন আমার স্বামীকে ডেকে, আমাকে সহ তার বাসায় দাওয়াত করলেন। আমরা তাদের বাসায় গেলাম। সেদিন থেকে তারা উভয়ে আমাকে মেয়ে বানিয়ে নিলেন। এবং এখন পর্যন্ত তারা আমাকে নিজ মেয়ের মত দেখে থাকেন। উম্মে জান সাহেবা বার্ধক্যের দূর্বলতা সত্ত্বেও, নিজ হাতে আমার বাচ্চাদের কাপড় পরিয়ে দেন। আলহামদুলিল্লাহ! মুফতী সাহেবের ছেলেমেয়েরাও আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে থাকেন। তারা আমাকে নিজ বোনের মতই দেখেন, বরং অন্য ভাই-বোনদের চেয়ে আমার খোঁজ-খবর একটু বেশী রাখেন। মাওলানা কলীম সিদ্দীকী সাহেবের সাথে আমার স্বামীর ভাল সম্পর্ক ছিল। কলীম সিদ্দীকী সাহেব একবার উমরাহ করার জন্য তার মেয়ে সহ মক্কায় এলেন। আমরা তাদের সাথে দেখা করেত গেলাম। মদীনার অধিবাসী হওয়ার সুবাদে কিছু মেহমানদারীও করলাম। আমি অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, খেদমতের মধ্যে আল্লাহ্‌ পাক বড় প্রভাব রেখেছেন। মানুষ যদি খেদমতের অভ্যাস করতে পারে, তাহলে পাথরের মত কঠিন হৃদয়েও জায়গা করে নিতে পারে। আলহামদুলিল্লাহ! কারও খেদমত করতে পারলে আমার খুব ভাল লাগে। মাজুর বা বৃদ্ধা মহিলাদের কাপড় ধুয়া, মাথায় তেল দেয়া এবং  হাত-পা টিপে দিতে পারলে, নিজেকে আমার সৌভাগ্যবান মনে হয়। নিজের সামান্য আরামকে কুরবান করে যদি বড়দের খেদমত করা যায়, তাহলে তাদের আন্তরিক দু’আর বরকতে দুনিয়া ও আখিরাতে চিরস্থায়ী কল্যাণ সাধিত হবে, ইনশাআল্লাহ।

আমি তো নিজ বাচ্চাদের লালন পালন করাটাকেও আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ মনে করি। স্বামীর উপর খরচের বোঝা কমানোর জন্য আমি বাসায় টিউশনি করি।আলহামদুলিল্লাহ! আমার নিয়্যাতের কারণে প্রত্যেক কাজের মধ্যে আমি আনন্দ অনুভব করি। আমাদের ধর্মে নিয়্যাতের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে অত্যন্ত জোর দেয়া হয়েছে। নিয়্যাত থিক থাকলে প্রত্যেক কাজের মধ্যেই স্বাদ অনুভব হয়য়। জীবনে একবাক্র যিনি মদিনা শরীফ দেখেছেন, জান্নাত ছাড়া অন্যকোনো যায়গা তার পছন্দ হতে পারে না। আমার শেষ ইচ্ছা হল জান্নাতুল বাকির পবিত্র মাতির বুকে যেন আমার ঠাই হয়। দু’আর মধ্যে আমি প্রতিনিয়ত বলি, হে , আল্লাহ্‌! আমাকে জান্নাতুল বাকিতে ঠাই দিও।

আমি বারি ছেড়ে এসেছি বহু বছর হয়ে গেছে। আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে খোজ করেনি। তারা ভেবেছে আমি বোধহয় আত্মহত্যা করেছি। মদিনা ভার্সিটিতে জম্মুর এক ছাত্র পড়তো। কিভাবে যেন সে আমার ঠিকানা পেয়ে গেল। আমার পিতাকে সে আমার ঠিকানা বলে দিল । আমি বেচে আছি জানতে পেরে পিতা ও ভাই আমাকে দেখার জন্য ব্যকুল হয়ে গেলেন। অনেক ভেবে চিনতে কিছু দিনের জন্য দিল্লিতে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার দিল্লিতে আসার সংবাদ জানতে পেরে, পিতা ও ভাই তাৎক্ষণিকভাবে আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। আমাকে কাছে পেয়ে তারা অঝোরে কাঁদলেন। আমার বিস্তারিত ঘটনা তাদেরকে খুলে বললাম। তারা খুব লজ্জিত হল।

দিল্লিতে কিছুদিন থাকার পর মদিনায় ফিরে এলাম। এখানে আসার পর পিতা ও ভাই দুই তিন দিন পর পরই আমাকে ফোন করত। আমার স্বামী ও আমি তাদের ফোন ধরতাম। তাদেরকে ইসলাম গ্রহনের দাওয়াত দিতাম। ইসলামের বিভিন্ন ভাল দিক তাদের সামনে তুলে ধরতাম। আলাহর রহমতে এক সময় তারা মূর্তি পূজা ছেড়ে দিলেন। আমার স্বামী দিল্লিতে মাওলানা কলিম সিদ্দীকি সাহেবকে বিষয়টি জানালেন। কলিম সিদ্দীকি সাহেব আমার পিতা ও ভাইয়ের ঠিকানা জোগাড় করে তাদের পিছনে দাওয়াতি লোক লাগালেন। তিনি আমাদেরকে আশ্বাস দিলেন যে, ইনশাল্লাহ অচিরেই তারা ইসলাম গ্রহণ করবেন।

একদিন ফোনে সৎ মায়ের সাথেও কথা হয়। তিনি আমার কাছে অনেক কাকুতি মিনতি করে মাফ চাইলেন। কিন্তু আমার ভাগ্যের উন্নতি ও পেরেশানী থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে সট মায়ের অবদানই তো সবচেয়ে বেশী ছিল। তার অত্যাচার নির্যাতনের বদৌলতেই তো আমি হেদায়েতের আমীয় সুধা পান করে ধন্য হয়েছি। আমার প্রতি বড় এহসান ও অনুগ্রহকারী হিসেবে, সৎ মায়ের হেদায়েতের জন্য কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে দু’আ করি। বিগত হজ্বে আরাফার ময়দানে তার জন্য সবচেয়ে বেশী হেদায়েতের দু’আ করেছি। সৌদী আরবের বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান পদ্ধতি অনেক সুন্দর। বিশেষ করে উত্তম চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে সেখানে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। আমাদের আশা, ইনশাল্লাহ আমাদের প্রতিটি বাচ্চা দ্বীনের খেদমতে  আনজাম দিবে। আলহামদুলিল্লাহ! আমিও আল্লাহর অনুগ্রহে মুফতী আশেকে এলাহী সাহেবের কুর’আনের তাফসীর “ আনওয়ারুল বায়ানের” হিন্দি অনুবাদ সম্পন্ন করেছি। এই অনুবাদ আমি তার জীবদ্দশাতেই শুরু করেছিলামআমার আশা, আমার দ্বারা কুর’আনে হাকীমের খেদমত আনজাম দিবেন। মুসলমান ভাইবোনদের কাছে আমার আবেদন থাকবে, তারা যেন সঠিকভাবে নিজেদের জিম্মাদারী পালন করেন এবং অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কে স্থাপন করেন। সেই সাথে নিজেদের আমল আখলাকও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধাঁচে হওয়া চাই। আমাদের আমল দ্বারাই যেন রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর আদর্শ ফুটে ওঠে। লোকদের সামনে যদি নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর আমল বাস্তবায়ন করা যায়, তখন লোকেরা নায়ক-নায়িকাদেরকে আদর্শ না বানিয়ে নবীজী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-কে আদর্শরূপে গ্রহণ করবে। এছাড়াও রেডিও, টিভি ও মিডিয়ার মাধ্যমেও লকদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে হবে। এ কাজের জন্য মুসলমান ভাই-বোনদেরকে পর্যাপ্ত শ্রম দিতে হবে এবং সম্পদ ব্যয় করতে হবে। আমার আরেকটি আবদার হচ্ছে, আপনারা সবাই আমার এবং আমার পরিবারের জন্য দু’আ করবেন। আমরা যেন মহান আল্লাহর কাছে দ্বীনের খাদেম, বিশেষ করে দ্বীনের দায়ী হিসেবে কবুল হতে পারি। আমাদের কতিপয় হিতাকাঙ্খী বলে থাকেন, তোমরা এতদিন যাবত মদীনাতে বসবাস করছ, অথচ বাড়ী বানাওনি। আমি তাদেরকে বলে দেই, আমরা তো কেবল জান্নাতুল বাকীর পাক মাটিতে সমাধিত হবার আশায় এখানে পড়ে রয়েছি। দুনিয়া কামাতে হলে তো প্যারিসে যেতাম, নিউইয়র্কে যেতাম। এটাতো শুধু তাদের কথার জবাব দেওয়ার জন্য বলতাম। নতুবা আমার খেয়াল হচ্ছে, দুনিয়ার জিন্দেগীর সুখ-শান্তি তো মূলত মদীনায় বসবাসসের মধ্যেই রয়েছে। হে আল্লাহ্‌! প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে মক্কা-মদীনা জিয়ারতের স্বপ্ন দিও, তারপর স্বপ্নের তাগাদা এবং সবশেষে স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে মুমিনের অন্তর পরিতৃপ্ত কর। আমীন।

( তথ্যসূত্রঃ মাসিক বাদারে ডাইজেস্ট, পাকিস্তান, মাসিক মঈনুল ইসলাম, সেপ্টেম্বর-২০১৩ )

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (4টি রেটিং)

হে আল্লাহ্‌! প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে মক্কা-মদীনা জিয়ারতের স্বপ্ন দিও, তারপর স্বপ্নের তাগাদা এবং সর্বশেষে স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে মুমিনের অন্তর পরিতৃপ্ত কর। আমীন। হে আল্লাহ আমাকে ও আমার আওলাদদেরকে মদিনাতে কবুল করো আর জান্নাতুল বাকিকে চিরবাসস্থান করে দিও। আমিন।   

-

▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬
                         স্বপ্নের বাঁধন                      
▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬

সালাম

আলহামদুলিল্লাহ।  আল্লাহর  যাকে   ইচ্ছা   তাকেই  তিনি  হেদায়েত   করেন ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (4টি রেটিং)