মুসলমানদের মজলিস কেমন হওয়া উচিত

দু’জন-চারজন মানুষ যখন কোথাও একত্র হয়, তখন সেটা হয় মজলিস। তারা যদি হন মুসলিম, তাহলে ওই মজলিসটা হয় মুসলমানদের মজলিস। এটা দ্বীনী কোন বিষয়কে কেন্দ্র করেও হতে পারে, আবার দুনিয়াবী কোন প্রয়োজনে বা শুধু আলাপচারিতার জন্য হতে পারে। উদ্দেশ্য যাই হোক, যেহেতু দু’জন মুসলিম একত্র হয়েছেন, তাই এই মজলিসের একটি চরিত্র থাকবে। সব মজলিসেরই নিজস্ব চরিত্র থাকে। মুসলমানদের মজলিসে প্রকাশ ঘটবে ইসলামী আদর্শের।

কুর’আন মাজীদে আল্লাহ্‌ তা’আলা এরশাদ করেন,

আপনি লক্ষ্য করেন না- আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, আল্লাহ্‌ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না-যাতে চতুর্থ হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না-যাতে ৬ষ্ঠ হিসেবে তিনি উপস্থিত থাকেন না, অথবা তারা এর কম হোক অথবা বেশী, তিনি তো তাদের সঙ্গেই রয়েছেন-তারা যেখানেই থাকুক না কেন। এরপর কিয়ামত দিবসে তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ সকল বিষয়ে সম্যক অবগত।  ( সূরা মুজদালাহ, আয়াত-৭ )

পবিত্র কুর’আনের এই ঘোষণায় যারা বিশ্বাসী, তারা তো তাদের মজলিসে আল্লাহ্‌কে বিস্মৃত হতে পারে না। আল্লাহ্‌ বিস্মৃতি এবং আল্লাহ্‌ বিস্মৃতির কুফল ওই মজলিসে অনুপ্রবেশ করতে পারে না।

অতএব, মুসলমানদের মজলিসের প্রথম বৈশিষ্ট্য হল-এটা আল্লাহর স্মরণ থেকে শূন্য হবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে, যে মজলিস আল্লাহর স্মরণ থেকে শূন্য থাকে, হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ নেই, কথা ও কাজে তার প্রকাশ নেই, সেটা যেন মৃতদের সভা। এ সম্পর্কে নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বলেন-

লোকেরা যখন আল্লাহর যিকির বিহীন কোন মজলিস থেকে উঠে আসে, তারা যেন মৃত গাধার চারপাশ থেকে উঠে আসল। আর এটা তাদের আক্ষেপ হয়ে দেখা দিবে।

                                                             ( সুনানে আবু দাউদ )

এজন্য কিছু মুসলমান যখন একত্র হন, তারা যে বিষয়কে কেন্দ্র করেই একত্র হোন না কেন, ওই সময় আল্লাহকে স্মরণ করা কর্তব্য। আমাদের সকল কথা আল্লাহ্‌ শুনেন, আমাদের সকল কাজ আল্লাহ্‌ দেখেন আর ওই কথা ও কাজের বিষয়ে কিয়ামত দিবসে আমাদেরকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে-এ কথা স্মরণ রাখতে হবে।

এজন্য উলামা-মাশায়েখগণের রীতি হল-তারা কোন বিষয়ে একত্র হলে, প্রথমে হামদ ও ছানা, দরূদ শরীফ, কুর’আন তিলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে মজলিসের সূচনা করে থাকেন। এরপর গীবত-শেকায়েত থেকেও নিজেদেরকে বিরত রাখেন। সবশেষে মাসনূন দু’আর মাধ্যমে মজলিস সমাপ্ত করেন।

গীবত-শেকায়েত অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। এ থেকে মজলিসকে পবিত্র রাখা অত্যন্ত জরুরী। কখনো ভুলক্রমে কারো থেকে এই বিষয়ের চর্চা আরম্ভ হয়ে গেলে, অন্যদের কর্তব্য হল-কৌশলে তা বন্ধ করে দেয়া। অন্যথায় সকলেই গুনাহের অংশীদার হয়ে যাবে।

মুসলমানদের মজলিসের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল-এতে উপস্থিত বা অনুপস্থিত অন্য মুসলিমের হক বিনষ্ট করা হবে না, অন্যকে কোনভাবে কষ্ট দেয়া যাবে না।

ইসলামী আদর্শ একজন মুসলিমের কাছে সচেতনতা ও রুচিশীলতা কামনা করে। এটা অনুসরণ করা হলে, আমাদের আচরণ কখনো অন্যের কষ্টের বা বিরক্তির কারণ হতে পারে না। এমন বিষয়াদি সম্পর্কে নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) সাবধান করেছেন-যা অন্যকে কোনভাবে কষ্ট দেয়।

অনেক সময় দেখা যায়, ছোট ছোট বিষয়ের দ্বারাও অনেক বড় ঝগড়া-বিবাদের সূচনা হয়ে যায়। এজন্য এসব বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত।

এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে-

কারো জন্য বিনা অনুমতিতে দু’ব্যক্তির মধ্যে বসে পড়া বৈধ নয়। ( আবু দাউদ, তিরমিজী )

অন্য এক হাদীসে এসেছে যে,

গোয়ারের মত বৃত্তাকার মজলিসের মাঝখানে বসে পড়া ঠিক নয়।

অন্য হাদীসে এসেছে-

সর্বাধিক প্রশস্ত মজলিসই হল সর্বোত্তম মজলিস। ( আবু দাউদ )

অর্থাৎ, যে মজলিসের লোকেরা নতুন আগন্তুকদের জন্য উদারচিত্তে স্থান করে দেয়, মজলিসের বৃত্তকে বড় করে অন্যদেরও শামিল হওয়ার সুযোগ করে দেয়, সেটাই হল উত্তম মজলিস।

এভাবে মজলিসের বহু আদব-কায়দা হাদীসের কিতাবসমূহে বিধৃত হয়েছে। এই ইসলামী নির্দেশনাগুলো একজন মানুষকে সভ্য ও সচেতন করে। এজন্য আল্লাহর প্রকৃত ভদ্র, সুশীল ও রুচিশীল বান্দা হওয়ার জন্য হাদীস শরীফের আদব-কায়দা অনুশীলনের বিকল্প নেই।

মজলিসের সমাপ্তিও দু’আ ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে হওয়া চাই। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন দু’আ হাদীস শরীফে এসেছে। সহজ ও প্রসিদ্ধ দু’আটি হল-

সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইহি।

এ দু’আর মাহাত্ম্য সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা ( রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ) বলেন, নবী করীম ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) বলেছেন-

যে ব্যক্তি কোন মজলিসে বসে, যাতে অপ্রয়োজনীয় কথা-বার্তা বেশী হয়ে যায়, সে যদি মজলিসের শেষে এই দু’আ পড়ে, তাহলে সেই অনুচিত বিষয়গুলোকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। ( তিরমিজী )

 

-মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া আব্দুল্লাহ। ( মাসুক আদর্শ নারী, অক্টোবর-২০০৯ )  

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None