উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-এর বিস্ময়কর ঘটনা

আল্লাহ তা’আলা যুগে যুগে বহু নবী-রাসূল পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাঁদের মনে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে যদি কোন কিছু জানতে ইচ্ছে হত, আল্লাহ তা’আলা সাথে সাথে কোন উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন। ঠিক তেমনি হযরত উযাইর ( আলাইহি সালাম )-কে তাঁর মনের জবাব আল্লাহ তা’আলা চাক্ষুশ প্রমাণে বুঝিয়ে দেন।
ঘটনাটি হল, বখতে নসর নামক জনৈক রাজা যখন বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করে বনী ইসরাঈলের অনেক লোককে বন্দী করেছিল, তখন বন্দীদের মধ্যে হযরত উযাইর ( আলাহিস সালাম )-ও ছিলেন। তিনি নবী বলে রাজা তাঁকে ছেড়ে দিল।
হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-এর সাথে কিন্তু টাকা, খেজুর, পানি ও একটি গাধা ছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) এমন একটি গ্রাম দেখতে পেলেন, যার ইমারত ও অট্টালিকাগুলো ধসে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল এবং সেখানে জন-মানবের কোন চিহ্নও ছিল না। এ অবস্থা দেখে উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এখানকার অধিবাসীরা তো মারা গেছে। তারা এমনভাবে বিলীন হয়ে গিয়েছে যে, যেন তারা কেউ এখানে ছিল না। আল্লাহ তা’আলা এদের আবার কিভাবে পুনর্জীবিত করবেন।
এই ভাবনা ভেবে উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) গাধাটিকে একটি গাছের সাথে বেঁধে একটু বিশ্রামের জন্য মাটিতে পিঠ রাখলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে মৃত ও ধবংসপ্রাপ্ত জনপদের মানুষদেরকে কিয়ামতের দিন কিভাবে জীবিত করবেন-দুনিয়াতে তার নজির দেখাতে ইচ্ছে করলেন। সে জন্য তাঁকে সেই অবস্থায়ই মৃত্যু দান করলেন।
এরপর আল্লাহ তা’আলা হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে এভাবে একশত বছর পর্যন্ত মৃত অবস্থায় রাখলেন। কিন্তু তাঁর শরীর নষ্ট হয়ে বা পঁচে গলে যায়নি। সাথে সাথে তাঁর গাধটিরও মৃত্যু দান করলেন। তবে গাধাটির দেহ পঁচে গলে মাটির সাথে মিশে গেল। শুধু হাঁড়গুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে। অপরদিকে তাঁর সাথে যে খাদ্য ছিল, আল্লাহর কুদরতে তার বিন্দু মাত্রও নষ্ট হল না।
মহান আল্লাহ হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে দীর্ঘ একশত বছর পর পুনঃ জীবিত করলেন। অতঃপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি এ অবস্থায় কত কাল ছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, একদিন বা দিনের কিছু অংশ হবে। হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে আল্লাহ তা’আলা যখন মৃত্যু দিয়েছিলেন, তখন ছিল সকাল আর একশত বছর পর তাঁকে যখন জীবিত করলেন, তখন ছিল বিকেল। উযাইর ( আলাইহিস সালাম )এ সময়কে সেদিনের সময়ই মনে করেছিলেন। তাই একদিন বা দিনের কিছু অংশ বলেছিলেন।
তখন আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জানালেন, একদিন বা তার কিছু অংশ নয়, আপনি বরং একশত বছর এ অবস্থায় ছিলেন। আপনি দেখুন আপনার গাধার দিকে, তা মরে পঁচে কিভাবে কিভাবে মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। আর আপনার খাদ্য ও পানির দিকে লক্ষ্য করুন, তা সম্পূর্ণ পূর্ণ অবস্থায়ই রয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা’আলা বললেন, এখন আপনি দেখবেন, গাধার অঙ্গগুলো কিভাবে জোড়া লাগে। তখন তাঁর সামনে আল্লাহ তা’আলা গাধাটিকে তার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জোড়া করে তাকে পূর্বের ন্যায় জীবিত করলেন।
হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) মহান আল্লাহর এ বিস্ময়কর কুদরত অবলোকন করে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব করলেন এবং আল্লাহ তা’আলার অশেষ শুকরিয়া আদায় করলেন।
ওই একশত বছর পর সে দেশের মধ্যে অনেক পরিবর্তন ও আবর্তন-বিবর্তন ঘটেছিল। বাইতুল মুকাদ্দাস বনী ইসরাঈলের দখলে পুনরায় চলে এসেছিল এবং তা ঈমানদারদের দ্বারা আবাদ হচ্ছিল। তা দেখে হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) খুব আনন্দিত হলেন।
অতঃপর হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলেন। পথিমধ্যে পেটে ক্ষুধা অনুভব করলেন। তাই তাঁর কাছে যে টাকা ছিল, তা নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস এলাকায় গিয়ে কিছু কিনতে চাইলেন। কিন্তু দোকানদাররা তাঁকে জানালো যে, এ মুদ্রা একশত বছর পূর্বে ছিল। এখন এ মুদ্রা অচল। এছাড়াও কেউ তাঁকে চিনতে পারল না এবং সবাই তাঁকে আশ্চর্য হয়ে দেখছিল। কেননা তখন তিনি পূর্বের ন্যায় যুবক ছিলেন। তা৬র সমবয়সী কেউ বেঁচে ছিল না।
তিনি তাদের কাছে উযাইর বলে নিজেকে পরিচয় দিলেন। তখন সকলেই বলতে লাগল, হযরত উযাইরকে তো বখতে নসর বন্দী করে নিয়ে গেছে। তিনি আর ফিরে আসেন নি। আমরা ভেবেছি, সম্ভবত তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তারা আরো বলল যে, উযাইরের ছেলেরা ছোট ছিল। কিন্তু তারা এখন বৃদ্ধ। উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) বললেন, আমাকে তাদের কাছে নিয়ে চলুন।
লোকেরা উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে তাঁর ছেলেদের কাছে নিয়ে গেল। উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-এর ছেলেরা তাঁর কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লো। কেউ তাঁর কথা বিশ্বাস করতে চাইলো না। শেষে উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) কোন উপায় না পেয়ে বললেন, তোমাদের এখানে কি দুইশ বছর বয়সের কোন বৃদ্ধ লোক আছে? তারা বললো, একজন বৃদ্ধা আছে, সে অন্ধ এবং হাঁটতে পারে না। তিনি বললেন, আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাও।
উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-কে সেই বৃদ্ধার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। তখন সেই বৃদ্ধা বলল, আপনি যদি উযাইর হয়ে থাকেন, তবে তাওরাত কিতাব মুখস্থ বলুন। উযাইর তা মুখস্থ পারতেন। আপনি উযাইর হলে এখনই তা প্রমাণ হবে। তখন উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) তাওরাত মুখস্থ শুনালেন।
বৃদ্ধা বললেন, আমি প্রথম প্রমাণ পেয়েছি, এবার দ্বিতীয় প্রমাণ হল, উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) যদি কোন অন্ধের চোখে হাত বুলিয়ে দিতেন, তাহলে আল্লাহর রহমতে সে ভাল হয়ে যেত। আপনি তা দেখান। উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) তখন সেই বৃদ্ধার চোখে হাত রাখলেন। আল্লাহর দয়ায় তৎক্ষনাত তার চোখ ভাল হয়ে গেল।
সবাই তখন বলল, নিঃসন্দেহে আপনি উযাইর। কিন্তু এতদিন আপনি কোথায় ছিলেন? তখন উযাইর ( আলাইহিস সালাম ) তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনা খুলে বললেন। সেই কুদরতী কাহিনী সবাই খুব অবাক হল।
রাজা বখতে নসর তাওরাত কিতাব পুড়ে ফেলেছিল। তাই হযরত উযাইর ( আলাইহিস সালাম )-এর মাধ্যমে তা নতুন করে লেখা হল। তিনি মানুষদেরকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিতে লাগলেন। সবাই উযাইর (আলাইহিস সালাম )-এর দাওয়াতে আল্লাহর দ্বীন পালন করতে লাগল।

( তথ্যসূত্রঃ মাসিক আদর্শ নারী, সেপ্টেম্বর-২০১৪ )

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)