বাংলা ভাষা এবং ইসলাম - সংঘাত নাকি সমন্বয়

ভাষা নিয়ে ভাষাবিদরা ভাষার অনেক সংজ্ঞা দিয়েছেন॥ অ্যাডওয়ার্ড স্যাপির Language নামক বইতে ভাষার সংজ্ঞা দিয়েছেন, "ভাষা হচ্ছে স্বেচ্ছায় উৎপাদিত প্রতীকের সাহায্যে ভাব, আবেগ ও কামনা সংজ্ঞাপনের সম্পূর্ণ মানবিক ও অপ্রবৃত্তিগত পদ্ধতি॥"
তবে বাংলা ভাষার উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষা থেকে কি না এ নিয়ে মত ভিন্নতা রয়েছে। ড মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে," সংস্কৃত থেকে সরাসরি বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়নি। তার মতে ভাষা প্রবাহের মধ্যে বাঙলার পূর্বে অপভ্রংশ এবং প্রাকৃত যুগের প্রমাণ মিলে। [সুত্র : বাঙালা ভাষার ইতিবৃত্ত, ১৯৯৯, পৃ- ২৬ -২৭।]"
ড এনামুল হকের মতে, "মাগধী প্রাকৃত থেকেই বাঙলা ভাষার উৎপত্তি। [সুত্র : মুহাম্মদ এনামুল হক, বাঙলা ভাষার ক্রমবিকাশ, ১৯৯৪, পৃ-১১৩ -১১৪।]"
তবে বাংলা ভাষার ইতিহাস হাজার বছরের ॥ "প্রাচীন যুগে, অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের দিকে, হিন্দু ও বৌদ্ধদের প্রাধান্য ছিল। বৌদ্ধরা এখানকার অধিবাসী ছিল, অন্যদিকে কর্ণাটক থেকে আগমন ঘটেছিলো হিন্দুদের। বৌদ্ধদের আমলে ভাষা ছিল পালি, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ। [ সুত্র : মুহাম্মদ আব্দুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, - ২০০৫, পৃ- ৩ - ৪]"
কিন্তু বিপত্তি ঘটে রাজা শশাংক ক্ষমতায় আরোহনের পর॥ "রাজা শশাংক ছিলেন চরম মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ । রাজা নিজে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং অন্য ধর্মের অনুসারীদের নিষ্ঠুর ভাবে দমন করেন। রাজা শশাংক নির্দেশ দেন - (আ-সেতোর আতুষারাদ্রের বৌদ্ধানাং বৃদ্ধবালকান। যো ন হন্থি স হন্ত ব্যো ভৃত্যান্‌ ইত্যশিষন্‌ নৃপ)॥ অর্থাৎ সেতুবন্ধ হইতে হিমালয় পর্যন্ত যেখানে যত বৌদ্ধ আছে তাহাদের বৃদ্ধ ও বালকদের যে হত্যা না করিবে সে প্রাণদন্ডে দন্ডিত হইবে - রাজভৃত্যদিগের প্রতি রাজার এই আদেশ। [ সুত্র : শ্রী চারু বন্দোপধ্যায়, রামাই পন্ডিতের শূণ্য পূরাণ, পৃ - ১২৩ -১২৪]"
যার কারণে, "বাংলার বৌদ্ধরা স্বদেশ ছাড়িয়া নেপাল, তিব্বতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই বাঙ্গালার বৌদ্ধ সাধক কবিদের দ্বারা সদ্যোজাত বাঙ্গালা ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলোও তাহাদের সঙ্গে বাঙ্গালার বাহিরে চলিয়া যায়। তাই আদি যুগের বাঙ্গালা গ্রন্থ নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য। [সুত্র : প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস, অধ্যাপক দেবেন্দ্রকুমার ঘোষ, পৃ ৯-১১]"
এসব কারণে বাংলা ভাষা চর্চা বিপদের মুখে পরে যায়। আরো সমস্যা শুরু হয়
সেন রাজত্বের আমলে। তখন ব্রাহ্মণরা একধাপ এগিয়ে বলা শুরু করল, সংস্কৃত হচ্ছে দেবভাষা আর বাংলা হচ্ছে মনুষ্য সৃষ্ট ভাষা। বাংলা ভাষা মর্যাদায় অনেক নিচু। "ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী সেন রাজারা বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করেছিল। আর হিন্দু পুরোহিতরা এ কথা বলে বেড়াতো যে, যে ব্যক্তি বাংলা ভাষায় কথা বলবে সে নরকে যাবে। [ সুত্র : খন্দকার কামরুল হুদা, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও শেখ মুজিব, ১৯৯৫ পৃ. ৩২] "
ডক্টর দীনেশ চন্দ্র সেন অত্যন্ত সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, ‘ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গ ভাষাকে পন্ডিত মন্ডলী ‘দূর দূর’ করিয়া তাড়াইয়া দিতেন। (সওগাত, চৈত্র, ১৩৩৫)
কিন্তু সেন রাজাদের বাংলা বিরোধী অভিযানের মধ্যেও কিছু লোক বাংলা ভাষার চর্চা অব্যাহত রেখেছিল। ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায়, "ইসলামের প্রভাবে প্রভাবান্বিত কিছু লোক বাংলার কোথাও কোথাও সেই প্রাকৃতধর্মী সংস্কৃতির ধারা অক্ষুন্ন রেখেছিলেন॥ [ সুত্র : নীহাররঞ্জন রায় - বাঙালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৭৬]"
অপরদিকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা দেশে মুসলিম রাজত্ব কায়েমের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নবজন্ম ঘটে। মুসলমান শাসক হুসেন শাহ, গৌড়ের সামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ এবং অপরাপর মুসলমান সম্রাটেরা বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে আমাদের সাহিত্যে এক নতুন যুগ সৃষ্টি করেছিলেন। আর সে কারণেই শ্রী দিনেশ চন্দ্র সেন মন্তব্য করেন, "মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ – সাহিত্যের এইরূপ জন্মদাতা বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গভাষা বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা। [ সুত্র : দীনেশ চন্দ্র সেন - প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, (১৯৪০) কলকাতা।]"
"বাংলা হলো মুসলমানদের প্রানের ভাষা - আর এ কারণেই আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ১৯০৩ সালে "আল ইসলাম" পত্রিকায় সর্বপ্রথম বাংলাকে মুসলমানদের মাতৃভাষা রূপে তুলে ধরেন। শুধু তাই নয়, এ ভাষা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলের সার্বজনীন ভাষা হিসাবে গ্রহণের দাবি জানান। [ সুত্র : ড. ইফতেখারউদ্দিন চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেফাক, সোমবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩]"
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ১৩২৫ বঙ্গাব্দে - 'আল-ইসলামে' প্রকাশ্যে নির্ভীকচিত্তে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দেন যে, 'বাঙলা বাঙালী মুসলিমের কেবল মাতৃভাষাই নয়, জাতীয় ভাষাও।'
কিন্তু দুঃখের বিষয় এই বাংলা সাহিত্য রচনা করে নোবেল পুরস্কার পেলেও
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৮ সালে হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে গান্ধীর কাছে লিখিত ভাবে দাবি উত্থাপন করেন। "Mahatma Gandhi in a letter to Rabindranath Tagore posed the question as to which language should be ''lingua franca" when India attained self-rule. Rabindranath replied, "The only possible national language for inter-provincial intercourse is Hindi in India. [সূত্র : রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী— প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৯৬৮,পৃষ্ঠা ৭৮]"
রবীন্দ্রনাথের হিন্দি সম্পর্কিত প্রস্তাবের ঘোর বিরোধীতা করেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। "১৯১৮ সালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, শুধু ভারত কেন সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলার স্থান হবে সর্বোচ্চ। [ সুত্র : বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস-সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় / ভাষা আন্দোলনের ডায়রী, মোস্তফা কামাল]"
ব্রিটিশদের গোলামী করা রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছেন, "ভারতবর্ষে ভাষার ঐক্য সাধনের পক্ষে সর্বাপেক্ষা বাধা দিবে বাংলা ভাষা। অতএব বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ভারতবর্ষের পক্ষে মঙ্গলকর নহে [সুত্র : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, (১৯১১-১২), পৃঃ- ৬০৫, খণ্ড-৯, রবীন্দ্র রচনাবলী - সুলভ সংস্করণ]"
ডক্টর শহীদুল্লাহ্‌র পর বাংলা ভাষার স্বপক্ষে দাবি উত্থাপন করেন, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি ১৯২১ সালে বৃটিশ সরকারের কাছে এ মর্মে দাবি জানান যে, 'ভারতের রাষ্ট্রভাষা যা-ই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলাকে।'
"১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর করাচিতে এক সম্মেলনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ দিকে পূর্ব বাংলার সংখ্যা গরিষ্ঠ লোক ছিল বাঙ্গালী। তারা চায় রাষ্ট্রভাষা হোক বাংলা। তখন সর্বপ্রথম ৪৭ সালে একটি ইসলামী আদর্শবাদী সংগঠন ‘‘তমদ্দুন মজলিস’’ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতারা আন্দোলন শুরু করেন। হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ. মানুষের নিকট তা গ্রহনীয় করে তোলার জন্য জমিয়তের পাকিস্তানের সংবিধানের এক ধারায় লিখলেন ;উর্দুর সাথে বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। [ সুত্র: মাসিক মদীনা-ডিসেম্বর-২০০৮/ বদরুদ্দীন ওমর ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি পৃ: ২৪১]"
যাইহোক, উপরোক্ত লেখা এবং ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় এই বাংলা ভাষাকে হঠানোর স্বরযন্ত্র হাজার বছরের॥
রাজা শশাংক থেকে শুরু করে পাকিস্তান শাসন পর্যন্ত। কিন্তু ইসলাম মানুষের ভাষাকে বিভিন্ন ভাবে মর্যাদা ও গুরুত্ব দিয়েছে। সুরা বাকারায় আছে,অ‘আল্লামা আ-দামাল্ আস্মা-য়া কুল্লাহা- (সূরা বাকারা; ২ : ৩১) অর্থাৎ 'আল্লাহ তায়ালা আদমকে নাম সমূহের জ্ঞান শিক্ষা দিলেন।' [ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে আরবিতে নাম বলতে বস্তুর পরিচিতি সূচক চিহ্নকে বুঝায়। সুত্র : ড মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, যুক্তি তত্ত্বের স্বরূপ সন্ধানে, প্রাচ্য বনাম প্রতীচ্য, পৃষ্টা- ৩৩]
এই আয়াত দ্বারাই বোঝা যায় আল্লাহ তায়ালা আদমকে (আ.) নাম শিক্ষা দানের মাধ্যমে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং কোরানিক সুরা থেকেই বোঝা যায় আল্লাহ্‌র কাছ থেকেই ভাষা এসেছে ।
ইসলাম ঘোষণা করেছে, মাতৃভাষা ব্যবহার করার অধিকার মানুষের সৃষ্টিগত তথা জন্মগত অধিকার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধ। "আন্দোলন শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য প্রচার বা আলোচনা দ্বারা উত্তেজনা সৃষ্টিকরণকেই আন্দোলন বলে। [ সুত্র : সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান,আহমদ শরীফ, বাংলা একাডেমী, ১৯৯২, পৃ. ৪৫]"
পুর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা কিন্তু পাকিস্থানি শাসকগন জোর করে আমাদের উপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিচ্ছিলেন। তাই ভাষা আন্দোলনটা ছিল সঠিক॥ রাসূল সা.বলেছেন, "অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক তথা সঠিক কথা বলা অর্থাৎ ন্যায় অধিকার প্রদান করার স্পষ্ট দাবী করাই শ্রেষ্ঠ জিহাদ। [তিরমিযী, আবূ ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা, আস-সুনান, খ. ৪, পৃ. ৪৭১, হাদীস নং-২১৭৪]"
জাতীয় স্বার্থে কাজ করা ইসলামের পরিপন্থী নয় যদি না সেটি ইসলামের মৌলিক আকীদা, বিশ্বাস, আচার-আচারণের সাথে দ্বান্দ্বিক হয়। বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন কখনোই ইসলামের পরিপন্থী ছিল না। "মাতৃভাষা মানুষের একটি সৃষ্টিগত অধিকার। তাই কেউ যদি এ অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায় তার প্রতিরোধ করা অপরিহার্য। আর এ প্রতিরোধে কেউ নিহত হলে ইসলামের দৃষ্টিতে সে শহীদের মর্যাদা পাবে। তবে শর্ত হলো,তাদেরকে প্রকৃত ভাবে এমন মুসলমান হতে হবে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিহত হয়। [ সুত্র : ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহমান আন্ওয়ারী, মাতৃভাষা আন্দোলন ও ইসলাম,পৃ. ১০৪]"
ভাষা আন্দোলন ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ইসলাম মাতৃভাষাকে সমর্থন করে তাই বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন এবং ইসলাম কখনোই সংঘাতের নয়॥ এই ভাষার মাসে ভাষা শহীদদের সন্মান জানিয়ে লেখাটা শেষ করলাম।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)