মুসলমানদের অধপতন যারা করেছে, যেভাবে করেছে - (পর্ব -১)

জহির উদ্দীন মুহাম্মদ বাবর ১৫২৬ সালের ২১শে এপ্রিল পানি পথের প্রথম যুদ্ধে ইবরাহিম লোদীকে পরাজিত করে দিল্লী দখল করেন। দিল্লী দখলের এক বছরের মাথায় রাজপুত নামালব ও মধ্য ভারতের ১২০ জন রাজা মহারাজা সংঘবদ্ধ ভাবে মুসলিম শক্তি উৎখাতের জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেন। হিন্দু রাজাদের ৯০ হাজার অশ্বারোহী এবং অসংখ্য পদাতিক বাহিনীর মোকাবেলায় বাবরের মাত্র ১০ হাজার সৈন্য মরণপণ লড়াই করে আগ্রার অদূরে খানুয়ার যুদ্ধে (১৫২৭) সংঘবদ্ধ হিন্দু শক্তিকে পরাজিত করে॥ পরাজিত হওয়ার পর শক্তি দিয়ে মুসলমানদের মোকাবেলার আকাঙক্ষা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের মন থেকে উধাও হয়ে যায়। অতঃপর তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করে। তাদের পরীক্ষিত কৌশল তিন প্রজন্ম প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগী হয়। এ প্রকল্প আর কিছু নয় তিন প্রজন্মের মধ্যে মুসলমানদেরকে বিপথগামী করে রাস্তায় বসানো। তিন প্রজন্ম প্রকল্প সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হল। তিন প্রজন্ম প্রকল্প - [প্রথম প্রজন্মে একজন ১০০% মুসলমান পুরুষের সাথে একজন ১০০% হিন্দু নারীর বিয়ে দিতে হবে। তাদের মিলনে যে শংকর সন্তান জন্মাবে সে হবে সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে ৫০% মুসলমান এবং ৫০% হিন্দু। দ্বিতীয় প্রজন্মে সেই ৫০% মুসলমান পুরুষের ১০০% হিন্দু নারীর বিয়ে হলে যে শংকর সন্তান জন্মাবে সে হবে ১৭% মুসলমান ও ৮৩% হিন্দু। এবং তৃতীয় প্রজন্মে সেই ১৭% মুসলমানের সাথে কোন ১০০% হিন্দু নারীর বিয়ে দিলে পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানটি সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে হবে ৯৩% হিন্দু এবং ৭% মুসলমান। অর্থাৎ তিন প্রজন্ম শেষ হতে না হতেই মুসলমানিত্ব শেষ হয়ে যাবে। মুসলমানগণ হবে শুধু নামে মুসলমান।
তবে বাবরের মৃত্যুর পর এই বিষয়ে এগিয়ে যায় তারা। বাবরের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন সম্রাট হুমায়ুন। সম্রাট হুমায়ূনের সময় হিন্দু রাজারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। অবশেষে হুমায়ুনের মৃত্যু ব্রাহ্মণ্যবাদী কুচক্রীদের জন্য বড় রকমের সুযোগ এনে দেয়। সম্রাট আকবর মাত্র ১৩ বছর বয়সে ক্ষমতায় আসেন। "তবে, প্রথম জীবনে আকবর রীতিমত পাঁচ ওয়াক্ত জামায়াতে নামাজ পড়তো। প্রতি বছর হজ্জের মৌসুমে আকবর একজনকে আমীরে হজ্জ নিযুক্ত করতো এবং বলতো যে কেউই তার সাথে গমন করবে সমুদয় খরচ আকবরই বহন করবে [1]।"
.
একজন ধর্মপ্রাণ শাসক আকবরের অধপতন ঘটলো যেভাবে।
.
আকবর অনেক গুলো হিন্দু মেয়েদের বিবাহ করে॥ রাজা মহারাজাদের অনেকেই আকবরের হাতে ভগ্নী ও কন্যা সম্প্রদান করে মুঘল পরিবারে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলে এবং এভাবেই শুরু হয় কুটকৌশল। "জয়পুরের রাজা বিহারী মল (মান সিংহের পিতামহ) তার কন্যা জয়পুরী বেগমকে বিয়ে দেন তরুণ সম্রাট আকবরের সাথে। এই আত্মীয়তার সুবাদে পিতা পুত্র এবং পৌত্র যোগ দান করেন আকবরের সেনাপতি পদে। বিকানীর ও জয়সলমীরের রাজারাও আকবরকে কন্যা দান করেন [2]।"
হিন্দু দর্শন ও জীবনাচার আকবরের মন মগজকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আকবর তার পত্নীদের জন্য আলাদা আলাদা ঠাকুরঘর/পুজার ঘরের ব্যবস্থা করে দেন । আকবরের হিন্দু প্রীতিতে খুশী হয়ে হিন্দু প্রজারা তাকে ‘দিল্লীশ্বর’ উপাধীতে ভুষিত করেন । তার কয়েকদিন পর আবার তাকে ‘জগদীশ্বর’ উপাধীতে ভুষিত করেন ।
পরবর্তীতে সম্রাট আকবর হয়ে উঠে মুসলমানদের শত্রু। আকবর হিন্দুদের সাথে অবাধ মেলামেশা করে হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরে। "এসময় পুরুষোত্তম ব্রাক্ষনের প্রভাবে আকবর জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী হয়। এবং পূনর্জনম ছাড়া শান্তি সম্ভব নয় বলে মনে করে। আকবর এ সময় গরু কে শক্তির উৎস মনে করতো। সে গরু কুরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং গরুর গোশত খাওয়ার উপরও বিধি নিষেধ আরোপ করে। কেননা হিন্দুরা গরু পুজা করতো এবং গোমুত্র পবিত্র মনে করতো [3]॥"
আবার, রাজা ভবনদাসের মেয়ের সাথে আকবর তার ছেলে সেলিমের বিয়ে সম্পূর্ণ হিন্দু রীতিতে সম্পন্ন করে। "হিন্দু সমাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আকবর, মুসলিম দের চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো, খালাতো বোন বিবাহ নিষেধ করে আইন করে। হিন্দুরা যেহেতু পর্দা করে না তাই সে নির্দেশ দেয় ভবিষ্যতে কোন মুসলমান মহিলা পর্দা করে বাইরে যেতে পারবে না। আকবর কুরআন হাদীস শিক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এসময় অধিকাংশ হক্কানী আলেম দেশ ত্যাগ করেন এবং আলেমের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মসজিদ মাদ্রাসা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। এ সময় হিন্দুরাও মুসলমানদের মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির বানাতে শুধু করে [4]।"
ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ সালাত । আকবর সালাত নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সেখানে কেউ প্রকাশ্য নামাজ পড়ার সাহস পেতো না। "হিন্দুরা এ সুযোগে মসজিদ খানকাকে আস্তাবলে রুপান্তর করে। রোজার মাসে দরবারে প্রকাশ্যে পানাহার করতে বাধ্য করে [5]।"
"১৫৮২-১৬০৫ সালের মধ্যে আকবর ইসলাম ধর্মকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে দ্বীনে এলাহী নামক ধর্ম প্রচার শুরু করে [6]।"
পরবর্তীতে আকবরের মৃত্যুর পরও থেকে যায় তার দীন-ই-ইলাহীর সমস্ত বাতিল মতবাদ। সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন পিতা আকবরের প্রতিষ্ঠিত দীন-ই-ইলাহীর একনিষ্ঠ মুরিদ। হিন্দু ব্রাম্মন ও যোগীদের সাহচর্য তাকেও ইসলাম ধর্ম হতে উদাসীন করে রেখেছিল। ফলে পিতার নাম উচ্চারনের পুর্বে তিনি ”আমার মোর্শেদ” শব্দ উচ্চারন করতেন। জাহাঙ্গীর তার পিতা আকবরের মত মনে করতেন যে, বিবেক যাহা ভাল বলে গ্রহন করবে সেই অনুযায়ী আল্লাহ পাকের ইবাদত বন্দেগী করলেই চলবে। তিনি সূর্যকে বড়ই সম্মান করতেন এবং পরম শ্রদ্ধাভরে সশব্দে সুর্যের নাম উচ্চারন করতেন। সমস্ত কার্যের উপর নক্ষত্রের প্রভাব আছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন এবং মনে করতেন নক্ষত্র সমুহ নুরে এলাহীর বিকাশস্থল। সম্রাট জাহাঙ্গীর সিংহাসনে উপবেশন করে পিতার আমলের আমির ওমরাহগনকে তাদের স্ব স্ব পদে বহাল রাখলেন। ফলে শাহী দরবারে হিন্দুদের প্রভাব বিন্দুমাত্রও কমলোনা। কারন দরবারের বড় বড় পদ গুলো সব হিন্দুদের দখলেই ছিল। ফলে জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তিত হলো না,গরু জবেহ বন্ধের হুকুম রহিত হল না। ফলে পরিস্থিতি এমন আকার ধারন করল যে ,প্রকৃত ইসলামের নিশানা সমগ্র দেশ থেকে মুছে যাবার উপক্রম হল। তার উপর যোগ হল নুতন আর এক ফেতনা। এই ফেতনার মুল নায়িকা হলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের বেগম নুরজাহান। নুরজাহান ছিলেন অত্যধিক বুদ্ধিমতি। সম্রাট জাহাঙ্গীরের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্রমে ক্রমে বাদশাহও বাদশাহীর উপর একছত্র প্রভাব করে ফেললেন। পরিস্থিত এমন পর্যায়ে পৌছল যে ,সম্রাট জাহাঙ্গীর কেবল নামমাত্র বাদশাহ রইলেন। প্রকৃত ক্ষমতা চলে গেল নুরজাহানের হাতে।
যেহেতু সম্রাট আকবরের উপর শুধু হিন্দু রমনী নয়, হিন্দু ধর্মেরও ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল আর তাই এসকল হিন্দু রমনীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানদের জীবনে পৌত্তলিক ধর্মের প্রভাব কতটুকু তা সহজেই অনুমেয়। এজন্য আমরা দেখতে পাই, হিন্দু মহিষীর গর্ভজাত সন্তান সম্রাট জাহাঙ্গীর দেওয়ালী পূজা করতেন এবং শিবরাত্রিতে ব্রাহ্মণ পন্ডিত ও যোগীদেরকে তাঁর সাথে একত্রে নৈশ ভোজে নিমন্ত্রণ করতেন। তাঁর শাসনামলের অষ্টম বৎসরে পিতা আকবরের সমাধিসৌধ সেকেন্দ্রায় হিন্দু প্রথা অনুযায়ী শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান পালন করেন।
ইতিহাসবিদ 'থমাস রোর' মতে জাহাঙ্গীর নাস্তিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন।
জোধাবাই ছিল জাহাঙ্গীরের মাতা।
সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং তাঁর হিন্দু রাজপুত স্ত্রী তাজ বিবি বিলকিস মাকানি-র সন্তান ছিলেন সম্রাট শাহ জাহান। পাঠকগণ খুব খেয়াল করে দেখেন, প্রথম পর্বে লিখেছিলাম শংকর জাতের মুসলমান তৈরি শুরু হয়েছিল কিভাবে॥ খেয়াল করে দেখেন, বাবরের সবগুলো স্ত্রী ছিল মুসলমান এবং বাবরের পরবর্তী সম্রাট হুমায়ুনেরও সব গুলো স্ত্রী ছিল মুসলমান। হুমায়ুনের মৃত্যু ব্রাহ্মণ্যবাদী কুচক্রীদের জন্য বড় রকমের সুযোগ এনে দেয়। জাহাঙ্গীর এবং শাহ জাহান দুইজনের মাতাই কিন্তু হিন্দু। শাহ জাহানেরও দুইজন হিন্দু স্ত্রী ছিল, (শ্রীমতি মানভবাতি বাইজি লাল সাহেবা ও লীলাবতি বাইজি লাল সাহেবা)
.
ধারাবাহিক ভাবে চলবে....
..
তথ্যসুত্র:
.
[1] মুন্তাখাবুত তাওয়ারিখ দ্বিতীয় খন্ড ১৮১ পৃষ্ঠা॥
.
[2] An Advanced history :Re Mayodan, P- 441.
.
[3] মুন্তাখাবুত তাওয়ারিখ, দ্বিতীয় খন্ড, ৩২৬ পৃষ্ঠা॥
.
[4] মকতুবাত শরীফ, ১ম খন্ড, ৯২ নং মকতুব।
.
[5] মুন্তাখাবুত তাওয়ারিখ, দ্বিতীয় খন্ড, ৩১৫ পৃষ্ঠা॥
.
[6] Akbar the great mughal p.348.

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)