নাটিকা: শেষ সম্বল (প্রথম দৃশ্য)

(অনেক আগে লেখা হয়েছিল এ নাটীকাটি। প্রায় ২০০৭ এর প্রথম দিকে। বিসর্গের ব্লগারদের জন্য এখানে পোষ্ট করলাম।)

প্রথম দৃশ্য-

(প্রফেসর বাংলাদেশের মানচিত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবেন আর তার বারান্দা জুড়ে পায়চারী করতে থাকবেন। একটু পর পর পথের দিকে তাকাবেন; যেন কারো আগমনের অপেক্ষায়)
প্রফেসরঃ (স্বগত) আর কত ধৈর্য্যরে পরীক্ষা নেবে জসিম; তাড়াতাড়ি এসো। প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এ কোন অশনি সংকেত শুনছি আমার অশান্ত মনে।
রহমতঃ ও সার, সার ও; এরি আন্নের কি অইছে, আন্নে এমুন কইত্তে আছেন কি-ইল্লাই। আন্নের কনো শরিল টরিল খারাব অইছেনিকি?
প্রফেসরঃ আরে রহমত যে, আস আস; না শরীর খারাপ করেনি তবে, মনটা প্রচণ্ড খারাপ। আমাদের এই স্বাধীন জন্মভূমি নিয়ে অনেক বড় চক্রান্ত শুরু করেছে, বুঝলে রহমত; তা নিয়ে মনটা গতরাত থেকে ভীষণ খারাপ।
রহমতঃ কোনান্দি কেন্নে কি অয়, এতগাইন তো আঁই বুজিনা সার। তবে হালার হুতেগো ষড়যন্ত্র করি যদি আঁঙ্গ দেশ লই যায় তো আন্নে কি মনে কইচ্ছেন আন্ডা চা-ই থাইক্কুম; আন্ডা ডান্ডাদি হেগুনরে এমুন বাঁশডলা দিওম যে যিন্দেগীতে আর আঙ্গ দেশের দিকে হিরিও চাইতো নো।
প্রফেসরঃ দো’আ করি, দেশের জন্য তোমাদের এই আন্তরিক ভালবাসাকে আল্লাহ্ আরো বৃদ্ধি করে দিন। কারণ, এই যমীন টিকে থাকলেই তো এখানে আমাদের দ্বীন-ধর্ম, ইয্যত-সম্মান টিকে থাকবে। তাই আমাদের স---(শেষ করতে পারবে না)
(জসিমের প্রবেশ)
জসিমঃ (হাঁপাতে হাঁপাতে) স্যার! স্যার!
প্রফেসরঃ এতক্ষণে এলে জসিম।
জসিমঃ স্যার, মনে হচ্ছে আপনার সন্দেহই সত্যি হতে যাচ্ছে; শুনলাম ওরা ভয়াবহ ষড়যন্ত্র করছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই দেখুন, গোয়েন্দা প্রধান ফয়সাল ভাই তাদের রিপোর্টের একটা কপি আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।
রহমতঃ ও বাউরে,,,, হেতে এইগাইন কয় কি; আঁতত্তো ডরে আঁডু কাঁইপতে শুরু কইচ্ছে।
প্রফেসরঃ বস এবং পড়ে শোনাও।
জসিমঃ ‘নিউইয়র্কে সংঘটিত হওয়া ইয়াহূদী-খৃষ্টান লবির মিটিং-এ বাংলাদেশ সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, তার সারাংশ নিম্নরূপ-
“তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটা বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে বিগত বছরগুলোতে। তাই দিনে দিনে দেশটি আমাদের অমুখাপেক্ষী হয়ে পড়ছে। আর এই অমুখাপেক্ষিতা আমাদের বৃহত্তর মিশনের জন্য দারুন ক্ষতিকর। এছাড়া দেশটিতে ইসলামী মৌলবাদী শক্তির উত্থান আমাদের মিশন সফলের পথে প্রচণ্ড ক্ষতিকর; অথচ আমাদের নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারছে না। এটা অবশ্য ওদের সততা ও দূর্নীতিমুক্ত হবার কারণে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আফগানিস্তান, ইরাক এসব দেশের মত সিদ্ধান্ত নেয়াও আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং পথ একটাই; আর তা হলো ধর্মনিরপেক্ষতার পথ ধরেই আমাদেরকে সেখানে এগুতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের মানুষকে ইসলাম থেকে বিমুখ করার জন্য এই একটাই পথ এখন বাকী আছে।
আমরা আমাদের এনজিওদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে যে কার্যক্রম এতদিন চালিয়ে এসেছি, তার ফলাফল দেখতে পেয়েছি বিগত দিনের প্রধান বিরোধী দলকে ক্রয় করে তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ও সৃষ্ট অচলাবস্থার এবং তার সফলতার মাধ্যমে। কিন্তু যেহেতু গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ার বাইরে সে দলটির যাওয়া এখন আর কোনমতেই সম্ভব নয়; সেহেতু প্রয়োজন ভিন্ন কিছুর। সে অনুযায়ী দীর্ঘ নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রয়োজন ছিল পুরো দেশবাসীর নিকট এমন একজন ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা, যার মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে আমাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। আপনারা জানেন যে, সে ক্ষেত্রে আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। তদুপরি বিগত দিনের সৃষ্ট অচলাবস্থার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ণ যে দিকে মোড় নিতে বাধ্য হয়েছে, তা পুরোপুরি না হলেও বলা যায় আশি ভাগ আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন।
সুতরাং এখন সময় এসে গেছে চুড়ান্ত আঘাত হানার। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছাড়াই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রায়ন সম্ভব, তবুও যেহেতু গণতন্ত্রের চর্চা চলে আসছিল, তাই এখন হঠাৎ করেই তা বন্ধ করে দিলে মৌলবাদী ও জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী তা সহজেই মেনে নেবে না। আর এ জন্য আমাদেরকে প্রস্তুত করতে হবে একটি সাজানো নির্বাচন; যার মাধ্যমে সংবিধান সম্মতভাবেই নিশ্চিত করতে হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ সরকার। যে হবে আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ক, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ ও পর্যায়ক্রমে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার প্রকিয়া নিশ্চিত করতে হবে।”
প্রফেসরঃ ব্যস্, ব্যাস্! আর পড়ো না জসিম; আর না! আমি আর সইতে পারছি না। কি আশ্চর্য! কি সুগভীর ষড়যন্ত্র তাদের; বাস্তবতার সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে রিপোর্টের প্রতিটি শব্দ। আমাদেরকে দয়া করুন হে মহান সর্বশক্তিমান; আমাদেরকে ক্ষমা করুন।
জসিমঃ (গভীর চিন্তিত মুখে) আমাদেরকে দয়া করুন প্রভু, ক্ষমা করুন।
রহমতঃ আল্লাহ্ গো,,, আঁঙ্গরে মাপ করি দেন।
(কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে)
প্রফেসরঃ আচ্ছা, আমরা বলবো “হাসবি আল্লাহ্” অর্থাৎ, আল্লাহ্ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এবার বল এলাকার খবর কি?
জসিমঃ জি স্যার, শোনা যাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা এবার দ্বিমুখী কৌশলে ময়দানে নামবে। বিগত প্রধান বিরোধী দলের (অর্থাৎ, ধর্মনিপরেক্ষতাবাদী দলের) নেতৃত্বে থাকবে একটি দিক এবং নতুন যে রাজনৈতিক ধারা শুরু হয়েছে তার তত্ত্বাবধানে আরেক দিক। আর সেজন্য পুরোনো সব দাগী সন্ত্রাসীদেরকে পলাতক অবস্থা থেকে এলাকায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
প্রফেসরঃ হুম, তাই মনে হচ্ছে, তা কোন পরিবর্তন দেখেছ এর মধ্যে?
জসিমঃ হাঁ স্যার, গতকালই শুনলাম গালকাটা কালামকে নাকি এলাকায় অনেকেই দেখেছে।
রহমতঃ ও মা গো, হেইলে তো আঁই মইচ্ছি। হোলা ইগায় আঁরে আগেও অনেক জ্বালাইছে।
প্রফেসরঃ চিন্তার কিছু নেই রহমত, মনে রেখো, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী দেশের মানুষের সেবা ও নিরাপত্তায় গ্রহণযোগ্যতা পায়নি একথা সত্য; কিন্তু RAB এক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল বাহিনী। তাই এদেশের মানুষ বিগত দিনগুলোতেও RAB উপর তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পেরেছে। তবে মনে রাখতে হবে সব কিছুর উপরই রয়েছেন আমাদের সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ তা‘আলা; তাঁর নিরাপত্তাই বড় নিরাপত্তা।
জসিম ও রহমতঃ জি স্যার, আল্লাহ্ই আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়।
প্রফেসরঃ আচ্ছা শুনো, কথার দিন শেষ; এখন আমাদেরকে কোমর বেঁধে কাজে নেমে পড়তে হবে। শুনেছ তো প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ আর এদেশের পঁচাশি ভাগ মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও ধর্মবিশ্বাসকে নিয়ে কি নিমর্ম ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সুতরাং আর দেরী নয়, আল্লাহর বান্দাদের মাঝে দাওয়াত ও প্রচারের মাধ্যমে ইসলাম ও স্বদেশের কল্যাণের পক্ষে জনমত সৃষ্টির মাধ্যমে এ ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা এবং প্রয়োজন হলে অর্থ দিয়ে, জীবন দিয়ে হলেও প্রতিরোধের কার্যক্রম হাতে নিয়ে আমাদেরকে এক্ষুণি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
জসিম ও রহমতঃ জি স্যার, ইনশাআল্লাহ্ আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে যাব। এখন আমরা আসি স্যার।
প্রফেসরঃ ফি আমানিল্লাহ্। (সকলের প্রস্থান)

(ক্রমশ...)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)