মাহে রমজানে মদীনা মুনাওয়ারা

মাহে রমজান চলছে। মাহে রমজানে মদীনা মুনাওয়ারা এক ভিন্নরূপ ধারণ করে। পারস্পরিক সহযোগীতা, সহমর্মীতা আর মুসলিম ভাতৃত্ববোধের এক অনুপম দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয় এই মাসে। মসজিদে নবওয়ী যেন সাজে এক নতুন সাজে। তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত মর্দে মুমিনগণের মিলন মেলায় পরিণত হয় রাসূলের এই মসজিদ।

আসরের পর ইফতারের আয়োজন নিয়ে সূচনা হয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। মদীনার ধনী পরিবারগুলো ‍মসজিদে হারাম এর ভেতরে ইফতারের আয়োজন করে। দেশ- জাতি, সাদা-কালো কোনপ্রকার ভেদাভেদের লেশমাত্র চিহ্ন থাকে না এই সময়টাতে। সকলে এই সময়ে পরিণত হয় একই আত্মার আত্মীয় হিসাবে। আয়োজকদের মধ্যে প্রতিযোগীতা চলে কে কাকে ইফতার করাবে এই আশায়। ছোট ছোট শিশুরা মসজিদে আগত মুসল্লিদের নিজেদের সুফরায় যাবার জন্য অভ্যর্থনা জানায়। এদের এই আন্তরিকতায় মন ভরে যায়। আমার স্মৃতিপটে তখন ভেসে উঠে রাসূলের আগমণের সেই দিনের কথা যখন এমন শিশুরা গেয়ে উঠেছিল, “তলাআল বাদরু আলাইনা, মিনসানি ইয়াতিল বিদা ... ।” আমার দু-চোখের কোনা ভিজে উঠে। 

হারাম মসজিদের ভেতরে ইফতারির কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। নির্দিষ্ট সংখ্যক আইটেমের অতিরিক্ত কোন কিছু ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। আইটেম গুলো হলো খেজুর, টুকরো রুটি, জবাদি (টক দই), দুক্কা (টক দই এর সাথে মিশিয়ে খাবার জন্য), চা অথবা গাওয়া (কফি), আর পানি। হারামের পক্ষ থেকে জমজমের পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি সুফরাতে একটি অথবা দুটি জমজমের পানির ড্রাম সরবরাহ করা হয়। হারাম মসজিদে আগত মুসল্লিগণ সারিবদ্ধভাবে বসে ইফতার করেন। হারাম মসজিদের বাইরের চত্বরে ইফতারির চিত্র একটু ভিন্ন। সেখানে নামী দামী কোম্পানীর পক্ষ থেকে ইফতারী পরিবেশন করা হয়। এখানে ইফতারীর আইটেমের কোন বাধ্যবাধকতা নাই। খেপসা (সৌদি খাবার), বিরিয়ানী, ব্রোস্টসহ নানা সুস্বাদু ইফতারী এখানে পরিবেশন করা হয়ে হারাম মসজিদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের জন্য প্রায় আড়াই হাজার এর মত পরিচ্ছন্ন কর্মী নিযুক্ত আছে। সৌদি আরবের বিখ্যাত কোম্পানী বিনলাদিন গ্রুপ এই সব পরিচ্ছ্ন্ন কর্মীদের দায়িত্বে আছে। এই সব পরিচ্ছন্ন কর্মীরা তিন শিফটে কাজ করেন। কিন্ত রমজান উপলক্ষে ইফতারীর সময় সর্বাধিক সংখ্যক কর্মী দায়িত্বরত থাকে। ইফতারীর পর এই সকল পরিচ্ছন্ন কর্মীরা কয়েক মিনিট ব্যবধানের মধ্যে ইফতারীর উচ্ছিষ্ট সরিয়ে হারাম মসজিদকে নামাজের উপযোগী করেন। এ কাজে তাদের আন্তরিকতা দেখার মত। ইফতারীর শেষে শুরু হয় মাগরীবের নামাজ। মসজিদুল হারামে বর্তমানে পাঁচ জন ইমাম এবং দশ জন মুয়াজ্জিন নিযুক্ত আছেন। তারা সকলে পালা বদলের মাধ্যমে নামাজ পড়িয়ে থাকেন। ইমামদের মধ্যে জনাব আলী আব্দুর রহমান আলহুজাইফি জ্যেষ্ঠ এবং সুপরিচিত। তার কুরআন তেলাওয়াত সকলের মন কাড়ে। সুললিত কণ্ঠের জন্য নয় মুলতঃ স্পষ্ট, শুদ্ধ ও ভারী উচ্চারণের জন্য তিনি বিখ্যাত। তার তেলাওয়াতকৃত কোরআন শুনে যে কোন শ্রোতার হৃদয় কাড়ে। জনাব হুজাইফি মদীনা ইসলামী ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক। এর পর আছেন শেখ আব্দুল বারী আওয়াদ ইনিও মদীনা তাইয়্যেবা ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক। তার পরে আছেন জনাব শেখ হুসাইন আল শেখ, জনাব শেখ আব্দুল মুহসিন আল কাসিম এবং জনাব শেখ সালেহ বিন মুহাম্মদ আল বুদির। এই তিন জনই মদীনা আদালতের বিচারক। আর মুয়াজ্জিনদের নেতা হলেন জনাব আব্দুর রহমান খুশুবজি। 

নামাজ শেষে হারাম মসজিদের ভেতরে আপ্যায়নের আরেকটি পর্ব শুরু হয়। ইফতারীর জন্য আনীত খেজুর এবং গাওয়া দিয়ে আপ্যায়ন করা হয় সেই সাথে চলে পরস্পরিক কথোপকথন। এটি চলে এশার নামাজের আগ পর্যন্ত। এশার নামাজের আগে আরেকবার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। আর হারাম মসজিদের বাইরের চত্ত্বরে “হারাম কপ্টার” নামে এক ধরনের গাড়ির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। এশার আজানের আগ থেকে দলে দলে মুসল্লিগণ হারাম মসজিদের দিকে আসতে থাকেন। এশার নামাজের পর শুরু হয় তারাবীর নামাজ। সেই সাথে বিতর। বিতর নামাজে ইমাম সাহেব দীর্ঘ সময় ধরে আল্লাহর কাছে তার রহমত বরকত আর নাজাতের জন্য দোয়া করেন। মুসল্লিগণের আমিন আমিন আর হৃদয় নিঃসৃত কান্নার শব্দে মসজিদুল হারামে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পালা। রমজানকে কেন্দ্র করে হারামের আশপাশের হোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো নতুন করে সাজানো হয়। বাহারী আলোক সজ্জা ছাড়াও বিভিন্ন হোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ পথ একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। সাজ-সজ্জার মধ্যে ইসলামী ভাবধারা বিদ্যমান থাকে। রমজানের এই সময়টাতে উমরাহ ও দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি থাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ ব্যস্ত সময় কাটায়। হাজীদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এই সময়টাতে বেশ তৎপর থাকে। হারাম মসজিদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য পুলিশের সাথে একদল অনিয়মিত সেচ্ছাসেবক বাহিনী নিযুক্ত করা হয়। এদেরকে আরবীতে “মুআস্কার কাশাফ” বলে। এছাড়াও এ সময়টাতে বিভিন্ন মাদ্রাসা (স্কুল), কুলিয়া (কলেজ) এ পড়ুয়া ছাত্রদের স্কাউট দল বিভিন্ন সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করে। বলা চলে সেবা ক্ষেত্রে কড়া নজরদারীর মাধ্যমে এই রমজানের সময়টাতে হারাম মসজিদ একটি সুশৃঙ্খল নিরাপত্তাব্যুহ রচনা করা হয়। রমজান মাস তাকওয়া অর্জনের মাস। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র মদীনা মুনাওয়ারা রমজানে যে রূপ ধারণ করে তা সত্যি উপভোগ্য।

 

http://newspage24.com/2013/index.php?m=details&id=2220#.Uea6sdI3Bsk 

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (4টি রেটিং)

রমাদ্বানের পূর্ণতা মদীনার মত পৃথিবীর আর কোথাও নেই হয়ত।

-

"এই হলো মানুষের জন্য স্পষ্ট বর্ণনা ও হেদায়াত এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ।" [আলে-ইমরান: ১৩৮]

সঠিক বলেছেন। @ কুরআনের বানী। আল্লাহ আমাদের পরিপূর্ণ মুত্তাকী হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (4টি রেটিং)