বুকটা কেবলি খালি খালি লাগছে আজ...

পৃথিবীর দিনগুলোর অনেকটা পেরিয়ে গেছি, জানিনা আরো কতদিন রয়েছে সম্মুখে। বিগত জীবনে অনেক আনন্দ আর অনেক ধরনের দুঃখের সাথে পরিচয় ঘটেছে। আমি আনন্দ এবং বেদনাকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করে থাকি। তবে পুরোপুরি যে পেরে উঠি তা স্বীকার করবো না, কারণ মানবীয় সবগুলো দুর্বলতাই আমিও ধারন করি আর দশজন সাধারণ মানুষের মতই। আনন্দ-বেদনার দৃষ্টিভঙ্গিটা হলো খুব স্বাভাবিক। অর্থাৎ, আনন্দ আছে বলেই বেদনায় কষ্ট হয়, আবার কষ্ট আছে বলেই আনন্দ এতটা মধুর লাগে। যদি শুধু একটা থাকতো, তাহলে এসব স্বাদ উপলব্ধি করা আমাদের পক্ষে কষ্মিনকালেও সম্ভব হতো না। মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ তা'আলা এভাবেই আলো-আঁধার, ভালো-মন্দ, নিদ্রা-জাগরণ ইত্যাদি বিষয়কে আমাদের জন্য সামঞ্জস্য বিধান করেছেন। মানুষের মধ্যে যে যত উচ্চ পর্যায়ের চিন্তাশীল জ্ঞানী, সে তত বেশী বুঝতে পারে তিনি কত মহান-উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন; কতটা শক্তিশালী।

জীবনে সুখ-দুঃখের কথা বলছিলাম। পেরিয়ে আসা পার্থিব সময়ের অধিকাংশই কেটে গেছে স্বজনহারা সুদূর প্রবাসে। তবে পবিত্র মদীনায় যখন আসি দু'হাজার এক সালে, তখন থেকে হৃদয় মাঝে যেন একটা অতিরিক্ত আনন্দ ভর করে তাকে সারাক্ষণ। যদি কখনো মদীনার বাইরে যাই, আমি অনুভব করি ঠিক হারাম সীমানা পেরুনোর সময়, যেন আমি মাতৃ উদরের সেই সুরক্ষিত স্থান থেকে বেরিয়ে পড়ছি। তখন থেকে মনটা আনচান করতে থাকে, কখন ফিরবো, কখন ফিরে আসবে মনের সেই নিশ্চিন্ত, নির্ভয়, প্রশান্ত আনন্দানুভব। তারপর যখন ফিরে আসি, অনুভব কি একটা মায়া, যেন একটা মমতার চাদরের ছায়ায় প্রবেশ করছি আমি, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থানে এসে পড়েছি আমি, কেউ আমার আর কোন ক্ষতি করতে পারবে না এ জগতে। মদীনাকে ঘিরে এই হলো আমার মনে অনুভূতি।

প্রসঙ্গে এখনো এসে পৌঁছুতে পারিনি। প্রতিবছর পৃথিবীর মানুষদের কাছে একটি বরকতময় মাস আসে, সাথে নিয়ে আসে এমন এক রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। পৃথিবীবাসী শাবান মাসকে বিদায় দিয়ে অধীর আগ্রহে পশ্চিমাকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে রমাদ্বানের বাঁকা চাঁদটি দেখার জন্য। মদীনায় আমি দেখেছি এ মাসটির আগমনের ভিন্ন রূপ, ভিন্ন আয়োজন; যা আর কোথাও দেখিনি অথবা শুনিনি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি হওয়ায় এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য সবসময়ই রমরমা। বিশেষ করে রমাদ্বান মৌসুম এবং হজ্জ মৌসুম। ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় থাকে এ দু'টি মৌসুমের, যখনি এসে যায়, তখন কি না করে তারা, নেই ঘুম, নেই খাওয়া-দাওয়ার ঠিক-ঠিকানা, নেই গোসল, নেই বিশ্রাম; মরিয়া হয়ে লেগে পড়ে উপার্জনে। রমাদ্বান মাসে তো প্রায় চব্বিশ ঘন্টা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থাকে এখানে। অর্থ লাভের ব্যবসায়ীরা প্রাণান্ত পরিশ্রম করে এসব মৌসুমে।

মদীনায় মৌসুমী আয়োজনে আমি আরেক ধরনের ব্যবসায়ীদের দেখেছি, যাদের পুঁজি হলো শুধু অবিচল "বিশ্বাস" (ঈমান) আর যাদের পণ্য হলো সম্পদ ও জীবন (জীবনের সময় থেকে শুরু করে অবসান পর্যন্ত), আর যাদের ব্যবসার নাম "জিহাদ" (স্বীয় নফস থেকে শুরু করে আল্লাহর শত্রুদের সাথে ইসলামের জন্য), এবং যাদের ব্যবসার মুনাফা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং কঠিন আযাব থেকে মুক্তি। কুরআনে সূরা আস্-সফ এ এই ব্যবসার কথা বলা আছে। এ ধরনের ব্যবসায়ীরা সারাটা বছর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকে, যেন তারা রমাদ্বান মাস পর্যন্ত হায়াত পায়, যেন তারা রমাদ্বানের কল্যাণ-বরকত অর্জন করতে পারে। এদের মাঝে রমাদ্বানের চাঁদ দেখার পর থেকেই ঈদের আনন্দ শুরু হয়ে যায়। তারপর প্রতিটি দিনই তারা প্রাণান্ত ইবাদাতের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের জন্য বিভোর থাকে। আর প্রতিটি রাতের অধিকাংশ সময় দাঁড়িয়ে থাকে দু'হাত বেঁধে, যেন কে কার চেয়ে বেশী মুনাফা অর্জন করবে সে জন্য চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বাইরে ধীরে সুস্থে বিশ রাকা'আত তারাওয়ীর সালাত, তারপর ব্যক্তিগত তাহাজ্জুদ, সাহরী, তিলাওয়াত, দৈনন্দিন কার্যক্রম, সংসার, ইফতার তারপর আবারো প্রতিদিনকার ধারাবাহিকতায় ডুবে থাকে এ ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে যখন শেষ দশক আসে, তখন যোগ হয় অধিক ধীরস্থির ভাবে আদায় করা তাহাজ্জুদ, রাত একটায় মসজিদুন্ নববীতে শুরু হয়, মোট আদায়কৃত তাহাজ্জুদ হয় দশ রাকা'আত এবং সাথে তিন রাকা'আত ওয়ীতর মিলে সর্বমোট তের রাকা'আত সালাত আদায়ে সময় ব্যয় হয় প্রায় দু'ঘন্টা। যে তাতে অংশ নিতে পেরেছে, সালাতের স্বাদ সে অনুভব করতে পেরেছে। কোন ব্যস্ততা নেই, তাড়া নেই, নিশ্চিত তিলাওয়াত, অব্যস্ত রুকূ' আর দীর্ঘ সিজদায় যেমন খুশী তেমন দো'আ করা যায়। সালাত যে চক্ষুশীতলকারী, তা অনুভব করা যায় এ তাহাজ্জুদে। শেষ দশকে এসব ব্যবসায়ীরা কোমর বেঁধে ইবাদাতে লেগে যান। রওদ্বায় কে কার আগে পৌঁছুবে, প্রথম কাতারে কিভাবে, কোন সুকৌশলে স্থান করে নিতে পারবে, এ যেন অর্থের ব্যবসাকেও হারা মানাবে। তবে ন্যায়-ইনসাফ ও পবিত্র পন্থায়।

বিমুদ্ধ আমি, প্রশান্ত আমি দেখে দেখে, এসব কল্যাণকামীদের প্রতিযোগিতার নানা রূপ দেখে, অর্জন দেখে। সর্বদা একটি দো'আই হৃদয় নিংড়ে বের হয়- 'হে দয়াময়! আমি তো অনেক গোনাহগার, অথচ এ পবিত্র হারামে তোমার বহু প্রিয় বান্দা-বান্দিরা রয়েছে, তোমার অনেক ক্ষমাপ্রাপ্তরা রয়েছে। ফসলের সাথে যেমন ভালো ভালো দানাগুলোর সাথে বহু ফলহীন খোসাও ওজনে চলে যায়, তেমনি করে আমার মত গোনাহগারকেও পার করিয়ে দাও...! তোমার দয়া ব্যতীত যে আমার আর কিছুই নেই!!'

আসবে আসবে করে এসেছিল রমাদ্বান, এক দুই করে অভ্যাস গড়ে উঠেছিল তিলাওয়াতের, তারাওয়ীর, তাহাজ্জুদের; হঠাৎ যেন জীবনেরই ছন্দ পতন ঘটলো। সবকিছু যেন থমকে গেল, ঈদের নতুন চাঁদ উঠলো, চারদিকে ধুমধাম আনন্দ বাজে। অথচ সবকিছুর মাঝেও যেন বুকটা কেবলি খালি খালি ‍লাগছে। এশার পর আর কোন অপেক্ষা নেই, নেই দীর্ঘ সালাত, নেই তাহাজ্জুদে যাওয়ার কোন প্রস্তুতি, নেই সাহরীর আয়োজন, নেই সিয়ামের সেই পবিত্র অনুভূতি। বুকটা আরো বেশী খালি খালি লাগছে এই ভেবে, কত উদার হস্ত নিয়ে রমাদ্বান এসেছিল, যেন পারিনি কিছুই তুলে নিতে, যেন বার বার থলেটা ফুটো হয়ে যাচ্ছিল, যা কিছু নিয়েছি পড়ে যাচ্ছিল পথে পথে; আহা! যদি আরেকটু পাওয়ার চেষ্টা করতে পারতাম; এ আফসোসে বুকটা ব্যথিত হয়ে উঠছে বার বার। বুকে বুক মিলাচ্ছে অনেকেই ঈদের আনন্দে, আমি অন্তর দিয়ে খুঁজে ফিরি ও বুকের গভীরে, কি পবিত্রতা লুকিয়ে আছে সেখানে, কি অর্জন সঞ্চিত সেখানে, যদি আমিও একটি ফসলের খোসার মত সেসব পূর্ণ ফসল সম পূণ্যবানদের সাথে পেরিয়ে যেতে পারতাম....। হে করুণাময়, তুমি তাই করো, তুমি তাই করো...!!

আজ ঈদ, তবুও বুকটা কেবলি খালি খালি লাগছে...

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.8 (4টি রেটিং)

আসলেই তাই!! আপনার মত মন নিয়ে সবাই ভাবে কিনা তিনিই ভাল জানেন। রমাদ্বান আমাদের মাঝে ফিরে ফিরে আসুক বারেবার। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ

''সাদামেঘ''

আল্লাহ্ আপনাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন, লেখাটি পড়ার ও মন্তব্য দেয়ার জন্য।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

সালাম

 

দেখতে  দেখতে  রামাদান   শেষ  হয়ে গেল ।  যে  রকম  ইবাদত  করবো ভেবেছিলাম , তার  কিছুই  তো  করতে  পারলাম  না  ,  আল্লাহ  মাফ করুন  ।

 

ইনশাআল্লাহ  আগামী  রামাদানে   ভালভাবে ইবাদত  করার  সৌভাগ্য লাভ করবো  ।

আপনার দো'আতে- আমীন।
জাযাকিল্লাহ্ খায়ের।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.8 (4টি রেটিং)