তলা'আল বাদরু 'আলাইনা: জান্নাতের বাগান এবং পথ দর্শনে

৫//১৫ জুন ২০০৬                   ফজরের পর আজ আর বাসায় ফিরিনি, জান্নাতের বাগানসমূহের একটি, যেটি অবস্থিত মসজিদুন্‌-নববীর অভ্যন্তরে, সেখানে যাওয়ার এবং বসার সুযোগ পেলাম। মসজিদ খোলা থাকে অথচ জান্নাতের সেই বাগানটিতে ভিড় থাকে না এমনটি কখনো দেখা যায় না। সূর্যোদয়ের পর সালাত আদায় করলাম এবং তিলাওয়াত করলাম পবিত্র কুরআন থেকে। প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের অনেক পাশেই বসে ছিলাম, যেন আন্তরিক পরশ অনুভব করছিলাম। এখানকার দায়িত্বে নিয়োজিত আলেমগণকে দেখলাম যিয়ারতকারী অনেককেই সংশোধন করে দিচ্ছেন অর্থাৎ, দো‘আ কিংবা কিছু চাওয়া অথবা চাওয়ার জন্য মুসলমানেরা হাত তুলবে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছেই; কোন পীর, ওস্তাদ এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছেও না (এ বিষয়েও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রাখি পরবর্তীতে ইনশাআল্লাহ্‌)।

বেরুলাম তখন সকাল দশ কি সাড়ে দশ হবে। আজ ঐতিহাসিক কিছু স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে, সে অনুযায়ী মসজিদ থেকে বের হয়েই ভাবলাম একা যাব না কি কোন দলের সাথে ভিড়ে যাব, উল্লেখ্য যে, এই প্রথম সফরে আমার কোন সহযোগী (গাইড) ছিল না, সীরাত পড়ে পরিচিতির যেটুকু সঞ্চয় করেছিলাম, তাই সম্বল আর মদীনায় এসে যাদের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম, তাদের কাছ থেকে মৌখিক কিছু পরামর্শ। অবশেষে একটা মাইক্রোতেই উঠে বসলাম, যেখানে আরো প্রায় ছয়/সাত জন যাত্রী ছিলেন। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম উহুদ পাহাড়, আজ কাছাকাছি যাচ্ছি। মনটাতে খুবই উত্তালতা অনুভব করলাম, ঠিক যখন গাড়ী থেকে নামতে গিয়ে উহুদের মাটির প্রথম স্পর্শ পাই, যেন অনেকটা শিউরে উঠলাম।

এ তো সেই প্রান্তর, যেখানে আমার প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হয়েছিলেন, যেখানে হামযা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বুক চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে খেতে চেষ্টা করেছিল এবং গিলতে না পেরে ফেলে দেয় হিন্দা, এ তো সেই পাহাড় যার মধ্য থেকে আনাস ইবনে নযর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু জান্নাতের সুঘ্রাণ পেয়ে শাহাদাতের মাধ্যমে তা অর্জন করে নেন। গাড়ী যেখানটায় থামলো, স্থানটা ঐতিহাসিক মানচিত্রানুযায়ী ঐ জায়গাটা হওয়ারই সম্ভাবনা রাখে বেশী, যেখানে হানযালা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু শাহাদাত বরণ করেন, যাকে ফিরিশ্‌তারা গোসল করিয়েছিলেন। কত মর্মান্তিক ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই উহুদ পাহাড়। দেখলাম সাইয়্যেদুশ্‌ শুহাদা (শহীদদের নেতা) আমীর হামযাসহ উহুদের যুদ্ধে নিহত প্রায় সত্তরজন আসহাবের কবর। এখানেও একই ব্যবস্থা, দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ ও বিভ্রান্তদের জন্য এখানেও উপদেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে করে কেউ কবরবাসীদের কাছে নয়; একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌রই কাছে হাত পাতে কোন কিছুর আশায়। এত সব ব্যবস্থার মাঝেও দেখা যায় দু’একটা বেদুঈন বালককে, যারা-কি পড়ে কিভাবে কবর যিয়ারত করতে হবে এই নূন্যতম জ্ঞানটুকু রাখে না-এমন যিয়ারতকারীদেরকে মক্তবের হুজুরের মত করে কিছু দোআ পড়িয়ে দু’পাঁচ রিয়াল আদায় করে থাকে।

হারিয়ে গিয়েছিলাম ইতিহাসের অন্তরালে, যদিও জনারণ্যের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ত্যক্ত-বিরক্ত মাইক্রো-ড্রাইভার গায়ে হাত রেখে বললোঃ ‘ইয়াল্লা সাদীক, নাহ্‌না মা-স্যী’ ওহে বন্ধু, আমরা যাচ্ছি (তুমিও চলো)। মন না চাইলেও চলে আসতে হলো। পরবর্তী স্থান ছিল মসজিদে ক্বিবলাতাঈন, মুসলমানদের পূর্ববর্তী কেবলা ছিল মসজিদুল আকসার দিকে, তারপর আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাকে পরিবর্তন করে মসজিদুল হারামের(মক্কার) দিকে করে দেন। দু’টো মিনার স্থাপন করা হয়েছে এ মসজিদে, মিনার দু’টিই যেন বলে দিচ্ছে মসজিদের পরিচয়। ভেতরে সুন্দরভাবে মুসল্লীদের জন্য সংক্ষিপ্তভাবে লেখা আছে আল্লাহ্‌র আয়াতসহ কিছু পরিচয়-ইতিহাস। দু’রাকাআত সালাত আদায় করে আবার চড়লাম পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। পথে পথে দেখে নিচ্ছিলাম মদীনার বিভিন্ন রাস্তা-বাড়িঘর গুলো। আবেগী মনের অলিন্দে তখন ইতিহাসের পাতাগুলো হালকা বাতাসে খেলা করছিল যেন।

যাত্রীদের মধ্য থেকে একজনের কণ্ঠস্বরে ফিরে তাকালাম, একজন সুদানী ভদ্রলোক চালকের কাছে জানতে চাইলেন ‘সানিয়াতুল ওদা‘আ’ এখানে কোথায়? আমরা তখন মসজিদ কুবার কাছাকাছি। চালক হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। মনের চোখে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, আনসার যুবক খেজুর গাছে উঠে রাসূলের মদীনায় আগমন দেখতে চেষ্টা করছে, হঠাৎ কাফেলা চলে এলো দৃষ্টি-সীমায়, বেজে উঠলো দফ্‌, শিশুদের আভ্যর্থনা সঙ্গীত- ‘তলা‘আল বাদরু ‘আলাইনা···’, মনের অজান্তেই দু’চোখ ভিজে উঠলো। আলোচিত প্রতিটি স্থানকেই জীবনে প্রথম দেখার অনুভূতিটাই আলাদা। ভাবনার জগত সাঁতরে সাঁতরেই যেন চলছিলাম প্রতি পদে পদে। সালাত আদায় করে নিলাম আবেগে-আনন্দে। খানিক ঘুরে-ফিরে দেখলাম মসজিদের চারপাশ, কারুকাজ। মাইক্রোবাসটি যখন আমাদের নিয়ে আবার ফিরে এলো মসজিদুন্‌ নববীর কাছে, তখন যোহরের সময় ছুঁই ছুঁই করছিল, অযু বানিয়ে প্রতি সালাতে হাজার সালাতের আকাংখা নিয়ে ঢুকে পড়লাম মসজিদের অভ্যন্তরে, মহান প্রতিপালকের আহ্বানে সাড়া দিতে, তাঁকে সিজ্‌দা করতে।

দুপুরের কিছু সময় বিশ্রামে কাটালাম, চেষ্টা করলাম কিছু ঘুমিয়ে নিতে কারণ, বিকেলের প্রোগ্রাম ছিল মদীনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি দেখার। কিন্তু ভাবনারা ঘুমকে দু’চোখের আশপাশেও আসতে দিল না। মদীনা! আমার মনের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে, ছড়িয়েছে আনন্দ অঢেল, এ ক’দিনেই পৃথিবীতে আমার দেখা এবং অনুভব করা সবচেয়ে শান্তিময় স্থান বলে মনে হতে লাগলো। এখন ভাবতেই কষ্টে হৃদয়টা মুচড়ে উঠছে যে, এই শান্তির শহর ছেড়ে চলে যাবো আর মাত্র একটি দিনের পরেই। কিন্তু কি করেই বা থাকবো এখানে, ওদিকে তো কত কি ফেলে এসেছি, তার উপর এখানে হঠাৎ করেই তো স্থায়ী কোন কাজের ব্যবস্থা করা এতই সহজ নয়। আমার মিষ্টভাষী মেজবানকে বলবো বলবো করেও সরাসরি বলতে পারছি না, ইঙ্গিতে অনেক বুঝিয়েছি যে, মদীনা আমার হৃদয় কেড়েছে। এভাবে সাত-পাঁচ-তিন-এক ভাবতে ভাবতে ভাবনারা কখন যে শূন্যে এসে ঠেকেছে টেরই পাইনি, ক্লান্ত মন তখন স্বপ্নের দেশে, স্মৃতির অজান্তে নিরব, নিথর ঘুমে তলিয়ে গেছে রৌদ্র-ভ্রমণ-ক্লান্ত দেহটিও। (চলবে)

পর্বগুলো:

 

তলা‘আল
বাদরু ‘আলাইনা: পূর্ণিমার আলোকে আলোকিত হৃদয়

তলা‘আল
বাদরু ‘আলাইনা: প্রথম সফর

তলা'আল
বাদরু 'আলাইনা: দু'টি প্রহর এবং একটি ভোর

তলা'আল বাদরু 'আলাইনা: প্রথম জুম‘আ ও স্বদেশীর ভিড়ে

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (4টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (4টি রেটিং)