"বাঙ্গালী" -এখন একটি আলোচিত গালি!

কথায় বলে- ব্যক্তির চেয়ে পরিবার বড়, পরিবারের চেয়ে সমাজ আর সমাজের চেয়ে দেশ। আনন্দ-বেদনা, সম্মান-অসম্মান ইত্যাদিতে একক কোন ব্যক্তি যদি সম্পৃক্ত হয়, তবে তা একটি মনেই সীমাবদ্ধ থাকে, পরিবারের সম্পৃক্ততায় পরিবার, তেমনি সমাজের সম্পৃক্ততায় সমাজ। কিন্তু যদি এই সম্পৃক্ততা হয় গোটা একটি দেশের মানুষের সাথে, তখন এর জন্য ভুক্তভোগী হয় একটি দেশ। একটা সময় ছিল যখন মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশীদের শ্রমবাজার ছিল তুঙ্গে। বাংলাদেশীদের সুনাম ছিল সবার মুখে মুখে। কেননা, অল্প টাকার বিনিময়ে এত অধিক শ্রম এ অঞ্চলে কর্মরত পৃথিবীর আর কোন দেশের শ্রমিকরা দিত না। বাঙ্গালী(বাংলাদেশী) বলতেই আরবদের নিকট ছিল ভাল মানুষ। হাঁ একথা ঠিক যে, রাস্তা কুড়ানো, ময়লা তুলে নেয়া, টয়লেট পরিষ্কার করা সহ যাবতীয় কাজগুলো বাংলাদেশীরাই আঞ্জাম দিত। আর তাই উপরে উপরে যত ভালই বলত, মনে মনে অনেকটা 'নিচুজাত' টাইপের ভাবনা যে কেউ কেউ ভাবেনি তা নয়। কেননা, সব মানুষ তো আর 'মানুষ' শব্দটার যথার্র্থ মানে সম্পর্কে অবগত নয়। নিশ্চয়ই যারা জানত যে মানুষ মানুষই, তার মধ্যে কোন জাতভেদ নেই, শ্রমরূপের ব্যবধানে মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য হয় না, তারা অন্যদের কথিত এসব তুচ্ছ-হীন কাজের শ্রমিকদের সাথেও সাধ্যানুযায়ী সদ্ব্যবহার করত।

বছর ক' আগে সউদি আরবে এন্টিরেট নামক একটি ওয়েবসাইট প্রথম শুরু করে বাংলাদেশীদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা। এ সাইট সউদি আরবের যেখানেই বাংলাদেশীদের দ্বারা কোন অকর্ম ঘটত কিংবা বাংলাদেশীরা কোন অবৈধ কাজে ধরা পড়ত, সেসব খবর কপি পেস্ট করে ব্লগ আকারে প্রকাশ করত। আর সাধ্যানুযায়ী প্রচার করত। প্রচুর সউদি নাগরিক এ সাইট ভিজিট করে মন্তব্য প্রদান করত। বুঝতেই পারছেন যে, তাদের মন্তব্য গুলো কেমন হত। শুধু কি তাই, একজন নেট কিংবা খবরের কাগজ থেকে এসব পড়ে নিজ নিজ আড্ডায় সেসব নিয়ে চর্চা করত। এভাবেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশীরা আরবদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়ে পড়ে।

কথায় বলে- একেতো লোহার আগুন, তার উপর ঘি-এ দ্বিগুণ। সময়টা যখন এমন যাচ্ছিল, তখন বাংলাদেশীরাও ভয়ংকর ভয়ংকর কিছু অপকর্ম করে বসে যা "ঘি"-এর মত কাজ করে। অন্য সময় হলে এসব অপরাধকে গতানুগতিক ধরে নিত হয়ত। কিন্তু সেসময়ে আর তার সুযোগ ছিল না। সাধারণ জনগণকে ক্ষেপিয়ে দেয়ার এ অপকর্মে এন্টিরেট এডমিনরা সফল হয়। পরবর্তীতে শোনা যায় যে, তিনজন এ অপকর্মের হোতা ছিল এবং তাদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল ভারতীয়দের হাত। এ হাতের দৈর্ঘ্য সম্পর্কে এখন হয়ত অনেকেই ওয়াকিফহাল। তাদের প্রচারিত শ্লোগান ছিল- 'বাঙ্গালীরা এদেশে অপকর্মে এক নম্বর'। আর এ শ্লোগান সাধারণ সউদিরা গোগ্রাসে গিলেছিল। তথাপি পত্রপত্রিকা থেকে জানা যায় যে, সরকার হস্তক্ষেপ করে এ ব্যাপারে একটি গবেষণা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক অধ্যাপক মহোদয়কে। তিনি দীর্ঘ গবেষণার পর রিপোর্ট দিলেন যে, সউদী আরবে অপরাধ কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশীদের অবস্থান চতুর্থ; প্রথম নয়।

যাই হোক, আমরা যে, ধোয়া তুলসী পাতা, তা কখনোই নই। একথা সবার জানা যে, দেশে অপরাধ জগতের বিরুদ্ধ সংঘটিত প্রতিটি জাতীয় তৎপরতার সময় প্রচুর অপরাধী নানাভাবে ভিসা নিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাদের টার্গেটগুলোর মধ্যে প্রথমে ভারত হলেও দ্বিতীয় স্থানে যে সউদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ছিল একসময়  তা সবাই কমবেশী অবগত। এসব অপরাধীদের দেশেও কাজ করে খাবার জুটানোর মত যোগ্যতা ছিল না। এখানে এসেও তাই কাজের পরিবর্তে ডাকাতি, ছিনতাই, সন্ত্রাসীর ধান্দায় থাকতো। সুযোগ পেলেই তা সংঘটিত করে বসত। এভাবেই পনর কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী বিশ লাখের মত প্রবাসী বাংলাদেশী এখন আরবদের নিকট কিছু ঘৃণ্য কীটের মত পড়ে আছে।

"জানোয়ার" -মানুষের সমাজে একটি গালি। যাদের মনুষ্যত্ববোধ নেই, বিবেক নেই, যারা হিংস্র, পশুত্ব প্রবণতা যাদের বৈশিষ্ট্য, মানুষেরা রাগের মাথায় কিংবা কোন অমানুষ প্রকৃতির মানুষকে 'জানোয়ার' আখ্যা দিয়ে গালি দেয়। কি চরম দুর্ভাগ্য আমাদের! বাংলাদেশের অধিবাসী 'বাঙ্গালী', আজ আরব্য ভূমিতে একটি প্রচলিত গালি। আরো প্রায় বছর খানেক আগেই এক বন্ধু বলেছিল- এক সউদি এক মিসরীকে মারছে আর গালি দিচ্ছে এই বলে- 'ইয়া বাঙ্গালী!' 'ইয়া বাঙ্গালী!' শুনে কিছুটা দোদল্যমানতায় ভুগছিলাম। হয়ত বন্ধুটি বুঝতে ভুল করেছে। তারপর যখনি ট্যাক্সিতে উঠতাম, কথায় কথায় জানতে চাইত সউদি চালক- তুমি কোন দেশের? কখনো বলতাম, কখনো তারা নিজেরাই বলত- তুমি কি হিন্দি? 'না', বাকিস্তানী? 'না', আফগানী? 'না, আমি বাংলাদেশী', সাথে সাথে মুখটা ফিরিয়ে নিত যারা কিছুটা ভদ্রতা দেখাতে চাইত, আর যারা সেসবের ধার ধারত না, তারা বলেই বসত- 'কুল্লু বাঙ্গালী হারামী, হাইওয়ান' খারবান, (সব বাঙ্গালী চোর, জানোয়ার, খারাপ)। বিভিন্ন শহরে শোনা যায় বাংলাদেশীরা রাস্তায় চলতে গেলে সউদি বালকদের ঢিলের শিকার হয়েছে, অনেকের রক্তও ঝরেছে ইতোমধ্যে। এইতো সেদিন, ব্যাংকের কাজে দারুন ভীড়, লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকে, সউদি হলে না হয় দুঃখটা গা সওয়া ছিল, এক ইন্দোনেশিয়ান হাউজ ড্রাইভার দেরী দেখে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যেতে যেতে গালি দিয়ে গেল- 'কুল্লু বাঙ্গালী'। অথচ ব্যাংক কর্মচারীদের মধ্যে সউদি, ইন্ডিয়ান, ইজিপ্সিয়ান, সুদানি, ফিলিফিনো, বাংলাদেশী সবাই ছিল। আমি নিশ্চিত হলাম- "বাঙ্গালী" সত্যিই এখন একটি গালি!

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

কিন্তু সমাধানের উপায় কি?

 

তিন জন ভারতীয় মিলে যদি একটা ওয়েবসাইট খুলে বাংলাদেশের ইমেজের ১৩ টা বাজাতে পারে, তাহলে ২ মিলিয়ন বাঙ্গালি মিলে কেন একটা পপুলার ওয়েবসাইট খুলে ইমেজ উদ্ধার করতে পারবেনা?

সরকার এটা করে দেবে এইটা আশা করাটা বোকামী। সুতরাং, সৌদি প্রবাসীদের নিজেদের স্বার্থেই এটা করা জরুরী।

 

মুজাহিদ ভাই, অবস্থা মনে হয় আর করুন হবে।

-

স্বপ্নই দেখি! বাস্তব হয় না।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)