খোলা চিঠি

প্রাণপ্রিয় ,
"তমা" তুমি কি এখনো সেই আগের মতো খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে জোছনা দেখার চলে গ্রামের সেই জরাজীর্ণ ছোট্ট কুটিরে জন্ম নেওয়া নিদারুণ হতভাগা ছেলেটি কথা ভাবছো, নাকি কোন অভিজাত মহা অট্টালিকায় সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া কোন রাজ পুত্রের হাতে হাত রেখে কল্পনার রাজ্যকে সুপ্রসন্ন করার কাজে ব্যস্ত আছো। মাঝে মাঝে মনের ভিতর প্রশ্নও জাগে, এখনোও কি তুমি আগের মতো খোলা আকাশ নিচে, পোতপাতে পাশাপাশি বসে চীনাবাদাম আর জালমুড়ি খাওয়া পছন্দ কর? নাকি জীবনের করুন অধ্যায়টাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে কায়দায় নর্দমায়। এখন কি আর আগের মতো, মুক্ত বিহঙ্গের মত আকাশে উড়ে উড়ে সমগ্র বিশ্বেটাকে দর্শন করতে ইচ্ছা করে ? নাকি সোনার সিন্ধুকে বন্ধী জীবনে আহত পাখির মতো নিভৃতে নিরবে চুপিসারে কেঁদে মরচো। এখন কি ইচ্ছা করে, চারবৃত্তের দেওয়াল ভেঙে জগত্সংসার কে ছিন্ন ভিন্ন করে আকাশের বুকে উড়ে যেতে। আচ্ছা, তমা তোমার কি ইচ্ছা করেনা, মুক্ত পাখি হয়ে উড়ে ফিরে আসতে? দেখতে কি ইচ্ছা করেনা, হৃদয় ভাঙা আহত চাতক পাখিটির কথা। ইচ্ছা কি করেনা, বাড়ির সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে , ইচ্ছা কি করেনা, সবার চোখেকে ফাঁকি দিয়ে চিমটি মারতে।ইচ্ছা কি করেনা, গ্রামের আঁকাবাঁকা মেট্রো পথে, শালবনের ঝোপের ঝাড়ে আড়ালে লুকোচুরি আর দুষ্টুমি করতে? ইচ্ছে তোমার হয় না এ আমি বিশ্বাস করি না, ইচ্ছে ঠিকই হয়, পারো না। অথচ এক সময় যা ইচ্ছে হতো তোমার তাই করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারারাত না ঘুমিয়ে গল্প করতে – করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারাদিন পথে পথে হাটতে –হাটতে। কে তোমাকে বাধা দিতো? জীবন তোমার হাতের মুঠোয় ছিলো। এই জীবন নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলেছো। আমার ভেবে অবাক লাগে, জীবন এখন তোমার হাতের মুঠোয় নেই। ওরা তোমাকে রাজ প্রসাদ নামে বন্ধী শালাইতে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে, তুমি প্রতিবাদ করতে পারোনা।
যাহোক তমা, বল তোমার রাজপুত্রের খবর কি, ক্ষণিক কয়েক মাসের প্রেম, পরে শুভ পরিণয়, যদিও ভাবতে অবাক লাগে কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিদারুণ নিষ্ঠুর। স্বার্থপর পৃথিবীতে ভালো মন্দ দেখার ও সময় থাকে না । আমি ও মেনে নিয়েছি নিষ্ঠুর নিয়মিতর দোহাই দিয়ে। কিবা করার ছিলো আমার বল- তার প্রতি তোমার চিন্তা চেতনা দেখে আমি কি ভীষণ কেঁদেছিলাম একদিন ! তুমি আর কারোসঙ্গে প্রেম করছো, এ আমার সইতো না। কি অবুঝ বালক ছিলাম ! তাই কি? যেন আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দু’জন জন্মেছি দু’জনের জন্য। যেদিন তোমাকে নিয়ে গেলো গাড়ি করে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে বিশ্বাস কর নিজেকে বড়ই অসহায় মনে হলো, হৃদয় ভেঙে কাঁচের মতো টুকরো টুকরো হয়ে গেল; কোন প্রতিবাদের ভাষা ফেলাম না বাক শক্তি হারিয়ে পেলাম, যেন এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে পাড়ি জমাছি না ফেরার দেশে। এতো বড় জনবহুল গ্রামটিকে এতো ফাঁকা আর কখনো লাগেনি। বুকের মধ্যে আমার এতো হাহাকারও আর কখনো জমেনি। আমি গ্রাম ছেড়ে সেদিন চলে গিয়েছিলাম শহরে। আমার ঘরে তোমার বাক্সভর্তি চিঠিগুলো হাতে নিয়ে জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম। নিজে নিজে ডুকরে কেঁদেছি আবার আবার। কাউকে কিছু বলতেও পারেনি, বলেই কোন লাভ হবেনা জেনে আর বলাও হলনা। আজ আমাদের বিচ্ছেদ ছিলো পাঁচ বছরের। এতোটা বছর পরও তুমি কী গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে গেলে ! প্রতিটি ক্ষণে আমি টের পেয়েছি। এখন আমার বড়ো হাঁসি এবং কান্না দুটো পায়, যখন দেখি আমার চারপাশে শ’য়ে শ’য়ে বন্ধুরা ঘুরে বেরোচ্ছে। তখন আমার কোন বন্ধু বান্ধবী ছিলো না এক মাত্র তুমি ছাড়া। দেখে না বিধাতার কি নিষ্ঠুর খেলা অসহায়কে কেন জানি আরো অসহায় করে তুলে। হয়তো, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন। তাঁর লীলা খেলা বুঝা বড়ই দায়। তখন পয়সার অভাবে তোমাকে মেলা থেকে একটা পুঁতির মালা কিনে দিতে পারিনি । আমার কষ্ট দেখে তুমি ও কেঁদেছ । তুমি না হয় আমার বন্ধু নই, আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে বলে। কিছু দিন পূর্বে তোমার এক বান্ধবীর কাছ থেকে তোমার জীবনের গল্প শুনেছি। শুনে … তুমি বোঝবেনা আমার কি যে কষ্ট হচ্ছিলো। এই ভেবে আমি কি আর ভালো থাকতে পারি। চারপাশ আমার আম্যাভষার চাঁদের মতো ঝাপসা হতে লগলো! ঠিক এইরকম অনুভব একসময় আমার জন্য ছিলো তোমার! আজ মনে প্রশ্ন জাগে কিসের জন্য তোমার অস্থিরতা।তোমার নির্ঘুম রাত কাটাবার গল্প শুনে আমার কান্না পায় না বলো? ভেবে ছিলাম রাজপুত্রকে নিয়ে দিব্যি সুখে আছো! ভেবেছিলাম ভুলে যাইবা অতীত, সুখের মাঝে হারিয়ে যাবে ক্ষত বিক্ষত স্মৃতি।আজ এতটা বছর তোমাকে ছেড়ে থেকেছি ঠিকই কিন্তু আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে তাকে বিলোবার জিনিস নয়। জোছনা রাতে তারাদের সঙ্গে কতো কথা হয় রোজ ! কষ্টের কথা, সুখের কথা।মনে কি পড়ে, একদিন আকাশভরা জোত্স্নায় গা ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের। তুমি দু চারটি কষ্টের কথা বলে নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলেছিল।সেই সব সুখ স্মৃতি আজও ভুলতে পারিনা। অনেক দিন ইচ্ছে তোমাকে একটা চিঠি লিখি, লিখি লিখি বলে লিখা আর হয়ে উঠেনা। একটা সময় ছিলো তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম। তুমিও লিখতে প্রতিদিন। এখন আর সময় হয়ে উঠে না । তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে ক’দিন বলো? দিন তো ফুরোয়। আমার কি দিন ফুরোচ্ছে না? তুমি ভালো নেই জেনে, আমি কি ভালো থাকতে পারি বল?
ইতি,
হতভাগা

ছবি: 
আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None