ইখওয়ানুল মুসলিমুন এর ৯০ বছরঃ একটি পর্যালোচনা -ড. আব্দুস সালাম আজাদী


ইখওয়ানের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে বই লিখেছেন অনেকেই। ডঃ ইউসুফ আলক্বারাদাওয়ীর লেখা “আলতারবিয়্যাহ ইসলামিয়্যাহ ওয়া মাদ্রাসাতু হাসান আলবান্না” বইটা এর মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইখওয়ানের প্রশিক্ষণের প্রথম লক্ষ্যবস্তু হলো মানুষের ক্বলবের উন্নয়ন। এটা সম্পন্ন হবে সহীহ সুন্নাহকে সঠিক ভাবে পালন করা, ফারায়েদ্ব গুলোকে পরিপূর্ণ ভাবে আদায় করা। জামাআতের সাথে সালাত আদায় করা। বেশি বেশি নফল কাজ করা। তাহাজ্জুদ পালন ও সেখানে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতে নিজকে অভ্যস্ত বানানো।

তিনি এডুকেশন সিস্টেমে আরেকটা জিনিষকে অবিরত ভাবে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন। তাহলো ইসলামের সামগ্রিকতা। ইসলামে যেমন আধ্যাত্মিকতার নাম, তেমন জ্ঞান চর্চার ও নাম; এখানে সামরিক প্রশিক্ষণের যেমন দরকার, চারিত্রিক পরিশীলনের ও তেমন প্রয়োজন রয়েছে। এখানে চিন্তা ও দার্শনিকতার উন্নয়ন যেমন দরকার, তেমন দরকার ইসলামের বিপরীতে আসা বুদ্ধিবৃত্তির স্রোতের মুখে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের মত স্থৈর্যের পরিচয় দিতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা। ইসলামী দ্বীনদারিতার উপযুক্ত হয়ে ওঠার জন্য যেমন ইসলামি বিষয় নিয়ে পড়তে হবে, অনুরূপ ভাবে দুনিয়ার নেতৃত্ব নিতে শিখতে হবে অন্যন্য জ্ঞান। অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এং সভ্যতা উন্মেষের সমস্ত দিক ও বিভাগ এখানে আসবে। ইখওয়ানের শিক্ষা প্রশিক্ষণের আরেকটা বিশেষ দিক হলো ইতিবাচক হওয়া ও কনস্ট্রাক্টিভ বা সৃষ্টিশীল হওয়া। ইখওয়ান তার সাথীদেরকে গোঁড়া হতে নিষেধ করে। তাকে হতে বলে “অয়াসাত” তথা মধ্যপন্থী হতে। আক্বীদাহ ও ইবাদাতের ক্ষেত্রে সব সময় প্রান্তিকতা পরিহার করা ইখওয়ানের সার্বক্ষনিক । নিজকে সব ভুলের উর্ধে মনে করে অন্যকে বাতিল মনে করা ইখওয়ান খুব খারাপ মনে করে।

ইখওয়ানের অবদান নিয়ে শত শত আর্টিকেল লেখা হয়েছে। মূলতঃ বিশ শতকে ইসলামি রাস্ট্রগুলো স্বাধীন করার ক্ষেত্রে, স্বাধীন ইসলামি রাস্ট্রকে ইসলামের আলোকে চালাতে, ইসলামি বুদ্ধি বৃত্তিকে আধুনিকায়ন করতে ইখওয়ান যা করেছে তা সত্যিই ইসলামের তাজদীদেরই কাজ।

চিন্তা, দর্শন ও যুগ জিজ্ঞাসার উত্তরে ইখওয়ান এক অবিসংবাদিত তাজদীদী সংস্থার নাম। একদিকে ইসলামকে আধুনিক মনস্কদের কাছে বৈজ্ঞানিক ভাবে তুলে ধরেছে, তদ্রুপ ভাবে ইসলাম বিরোধী শিবির থেকে আসা ক্রমাগত আক্রমনের যৌক্তিক জবাবে তারা গড়ে তোলে এক বুদ্ধিজীবী মহল। যখন সারা মুসলিম বিশ্ব পাশ্চাত্য সন্দর্শনের আলোকেই নিজদের গড়ে তুলেছিলো। তাদের সাহিত্য সংস্কৃতি ছিলো বিজিতদের সৃজন, প্রভাবিত। তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো পাশ্চত্যের সেবাদাস বানানোর মোহময় কারখানা। ভাষা ছিলো অন্যদের দেখিয়ে দেয়া খালের মাঝে সীমাবদ্ধ। তখন ইখওয়ান চোখ খুলে দেয় সারা মুসলিম বিশ্বে। তাদের প্রথম আহ্বান ছিলো, তুমি কবি হও সাহিত্যিক হও, বুদ্ধিজীবী কিংবা খ্যাতনামা রাজনৈতিক নেতা হও, হতে পারো সেরা ধনী, কিংবা শিল্পপতি। যা ই হওনা কেন তুমি, পয়লা তুমি হয়ে যাও একজন মুসলিম। তাদের আহ্বানে ইসলামের কোলে ফিরে আসেন অনেক নাস্তিকতার পতাকাবাহীরা। ফিরে আসেন ডারিউইনের ভক্ত ইসমাঈল মাযহার, সন্দেহবাদী ডঃ মুস্তাফা মাহমূদ, সমাজতান্ত্রিক নাস্তিক খালিদ মুহাম্মাদ খালিদ প্রমূখেরা। যে কলমের ডগা বেয়ে আগে বের হতো ইসলাম ধ্বংশের গরল, ইখওয়ানের প্রভাবে তারা হয়ে গেলো ইসলামের একেকজন সেবক।

ইখওয়ানের প্রভাব বলয় তৈরি করলো সাইয়েদ কুতুব, মুহাম্মাদ কুতুব, মুহাম্মাদ গাযালি থেকে শুরু করে এক ঝাঁক তরুণ লেখক, কবি ও বুদ্ধিজীবীদের যারা সারা দুনিয়ায় ইসলামের শ্বাশ্বত বাণী উচ্চকিত করলেন। বের হয়ে আসলো ইসলামী আইনের গবেষক, ইসলামী ফিক্বহের নতুন দিগন্ত রচনা কারী, ইজতিহাদের উপযুক্ত ফক্বীহ, অর্থনীতির বিশদ ব্যাখ্যাতা, ইসলামী সমাজব্যবস্থার রূপকার, ইসলামী সাহিত্যের কর্ণধারগণ, ইসলামি কাব্যের নতুন ঝংকার, নাশীদ শিল্পের নানান বর্ণের ও স্বাদের মুখরোচক ধারা। এদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের হাতে বের হতে লাগলো নতূন নতূন থিসিস, গবেষণা, কিংবা বই এর সম্ভার।

ইখওয়ানের আরেকটা অবদান হলো বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ। ফিলাস্তিন, কাশ্মীর, জাকার্তা, মরক্কো্‌, আলজেরিয়া, ইরাক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সেনেগাল, সোমালিয়া তথা সারা দুনিয়ার হৃদয়াবেগ অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসে। ভৌগলিক সীমারেখা ছাড়ায়ে দেখা গেল ফিলাস্তীনে, কাশ্মীরে, কাবুলে কিংবা বার্মায় মুসলমানদের দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছে মুসলিমরাই, অর্থ দিয়ে, স্বার্থ না দেখে, যুদ্ধ করে কিংবা পক্ষে লিখে।

১৯২৮ সালের পর যত গুলো ইসলামী জিহাদ হয়েছে, মুসলিমগণ সার্বিক ভাবে অংশগ্রহন করেছে, সেখানে ইখওয়ানীদের ত্যাগ-তিতীক্ষা ও অবদান ছিলো চোখে পড়ার মত।

ইসলামি অর্থনীতি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফিক্বহের পুরনো বই এর ছত্রের মাঝেই ছিলো তার অবস্থান, এবং কিছু দ্বীনী দরসগাহে ছিলো তার আলোচনার বিষয়। ইখওয়ান সর্বপ্রথম এই সিস্টেমকে সামনে আনে। ইসলামের “তাকাফুল ইজতিমাঈ” বা সামাজিক ইনসিউরেন্স পদ্ধতি ইমাম হাসানুল বান্নার হাতেই সূচিত হয়। ইসলামী ব্যাঙ্কিং নিয়ে লেখা শুরু হয়। এদের চিন্তার প্রসার ঘটে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে। সারা দুনিয়ায় আজ ইসলামী ব্যাংক চলছে মাথা উঁচু করে, এবং ইসলামি ব্যাংকিং এর উপর এখন পড়া হয় পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ এখন ইসলামি ব্যাংকিং এর উপকার লাভ করে যাচ্ছে।

সেই ক্রুসেডের সময় থেকেই এন জি ও তথা সাহায্যকারী সংস্থা গড়ে ওঠে খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের ধর্মীয় বলয়ে। সর্ব প্রথম ইখওয়ানুল মুসলিমুন সারা দুনিয়াতে এই চ্যারিটি অরগানাইজেশানের ধারণা দিয়ে এগিয়ে গেছে। ফ্রী এডুকেশান, ফ্রী চিকিৎসা সেবা, ফ্রী আইনী পরামর্শ, স্বল্প খরচে বিয়ে, কারদান হাসানা বা সুদ মূক্ত ঋণের প্রবর্তন, সমবায় ভিত্তিক কলকারখানা তৈরি ইত্যাদিতে ইখওয়ান মুসলমানদের জীবনে একটা নবতর চেতনার জন্ম দেয়। হাত পেতে নেবার কাংক্ষাকে ইখওয়ান হাত উঁচু করে কিছু দেবার মানসিকতায় মুসলিম সমাজকে নিয়ে আসে। ইখওয়ান যে যুক্তি গুলো সেই প্রথম থেকেই মানুষের কাছে তুলে ধরেছে তা হলোঃ

১। সূরা হাজ্জ এর ৭৭ আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট বলছেনঃ ............তোমরা কল্যান মূলক কাজ “খায়র” কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। এখানে ঈমানদারদের রুকু’ করতে, সিজদা দিতে এবং ইবাদাত করার পরে যখন কল্যান মূলক কাজ করতে বলা হচ্ছে তখন এটা আর সুন্নাত মুস্তাহাব থাকেনা। ইবাদাত করার মতই মানুষের খেদমত করা, রাস্তা ঘাট বানানো, মানুষের কল্যানমূল্ক যাবতীয় কাজ করাও তাই ফরদ্ব হয়ে যায়।

২। দাওয়াতী কাজ শুধু কথা দিয়ে করতে হয় এমন টা আমাদের নবী দেখাননি। তিনি মানুষের বিপদ আপদে সাথে থেকে ইসলামের সৌন্দর্য ফুঁটিয়ে তুলেছিলেন।

৩। মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠে নানান ধরণের লোক দিয়ে। এতে বক্তা যেমন থাকে, কর্মীও তেমন থাকে। সবাইকে কাজে লাগানো বা লাগাতে পারাই হলো দ্বায়িত্বশীলদের যোগ্যতার প্রধান দিক।

৪। ইখওয়ান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় দুইটি। এক, মানুষকে ইসলামের পথে রাখা। দুই, মুসলমানদেরকে আল্লাহর হুকুমের দিকে অগ্রসর করিয়ে ইসলামি রাস্ট্র প্রতিষ্ঠার দ্বার প্রান্তে নেয়া। যার প্রতিটা কাজ হয় জনকল্যানমূলক।

এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইখওয়ান তার গতি পথে মুসলিম সমাজ ও ইসলামী চেতনার যে উন্নয়ন সাধন করেছে তা বিশ শতকে সত্যিই বিস্ময়কর।

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)

পর্যালোচনায় কেবল ভালো দিকগুলো এসেছে। ইখওয়ানীদের মন্দ দিকগুলো কই?

ড. আব্দুস্ সালাম আজাদী ভাইয়ের লেখা সবসময় মুগ্ধ করে। একটা নিরপেক্ষ পর্যালোচনার নির্যাসে হৃদয়টা ভরে উঠে।
জাযাকুমুল্লাহ্ খায়ের।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (3টি রেটিং)