আলেমের সংজ্ঞা

আমরা সাধারণ মানুষ যাকে একটু আরবী ভাষায় পণ্ডিত হিসেবে জানি তাকেই আলেম মনে করি। আর সাথে দু'চারবার হজ্জ-ওমরার রেকর্ড থাকলে তো কথাই নেই। অথচ আরবী জানাটা কোনমতেই ধর্মীয় জ্ঞানের মানদণ্ড হতে পারে না। আবু জেহেল, আবু লাহাব এরাও ছিল আরবী ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শী। আবার ধর্মীয় জ্ঞান তথা কোরআন-হাদীসের জ্ঞানে জ্ঞানী হলেই যে আলেম হবে, এমনও কোন কথা নেই। খ্রীস্টান মিশনারীরাও কোরআন-হাদীসের জ্ঞান ভালোই আয়ত্ত্ব করে থাকে। এমনকি খুদে নাস্তিকরাও কোরআনের আয়াত আপনার-আমার অনেকের চেয়ে বেশ ভালোই জানে। তাহলে আলেম আমরা কাকে বলব? মূলত: আলেম তাকেই বলে, যিনি কোরআন-হাদীসের জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং সেই জ্ঞানকে দ্বীনের কল্যাণে, মানবতার কল্যাণে সৎ কাজে সদুদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন।
অতএব, যিনি ধর্মীয় এলেমকে নিছক নিজের জীবিকা অর্জনে ব্যবহার করছেন (কোরআন-হাদীস শিক্ষাদানের বিনিময়ে হোক, ফতোয়ার বিনিময়ে হোক, তাবিজ-কবচ দানের বিনিময়ে হোক, বা নিজের ধর্মীয় জ্ঞানের উসিলায় অর্জিত ভাবমূর্তি ও মানুষের ভক্তিকে কাজে লাগিয়ে হাদিয়া-তোহফা লাভের দ্বারা হোক), তিনিও আলেম নন। যার ধর্মীয় জ্ঞান তার অহংকার ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করেনি, তিনিও আলেম নন। যিনি ধর্মের বিধানকে খণ্ডিতভাবে গ্রহণ করে শুধু নিজের অধিকার ও সম্মান আদায়ে ব্যবহার করছেন, তিনিও আলেম নন। নিজে অন্যায়কারী বা স্বেচ্ছাচারী হয়েও নিজের প্রতি মানুষের আনুগত্য আদায়ে ধর্মের নাম ব্যবহার করছেন, কিংবা নিজের লোকজনের অন্যায়-অপকর্মের কাজে প্রোটেকশন প্রদানের জন্য ইসলামের ক্ষমা ও উদারতার বাণী শুনিয়ে মানুষকে দাবিয়ে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছেন, তিনিও আলেম নন। আর যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দ্বারা নিজের সুবিধা আদায় করা এবং ব্যক্তিগত অন্যায় আক্রোশবশত কাউকে শায়েস্তা করবার জন্য ধর্মের দোহাই দিচ্ছেন, তিনি তো সাক্ষাত মুনাফিক।
একজন মানুষ কোরআন মুদ্রণকারী ও কোরআনের অনুবাদক হয়েও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যদি ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য না করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্যায় ও অসত্যের পক্ষ অবলম্বন করেন, জালেম ও বেনিফিশিয়ারীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ আর মজলুম ও ক্ষতিগ্রস্তদেরকে বিদ্রূপ ও টিটকারি মারেন, তার নাম আল্লাহর খাতায় আলেমের পরিবর্তে জালেম হিসেবে লিপিবদ্ধ হবার সম্ভাবনাটাই বেশি বলে মনে হয়। এ ধরনের আলেমদেরকে আল্লাহ তাআলা গাধার সাথে তুলনা করেছেন, যারা শুধু কিতাব বহন করে। রসূলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, "এমন দিন আসবে, যখন কোরআনের একেকটা হরফের পিছনে মাসের পর মাস ব্যয় হবে, কিন্তু কোরআনের শিক্ষা মানুষের জীবনে থাকবে না।" যিনি পেশাগত জীবনে আরবী ভাষা বা ইসলাম ধর্মের ওস্তাদ হিসেবে সম্মান অর্জন করলেও পারিবারিক জীবনে ধর্মীয় শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করে শুধু প্রচলিত ইংরেজি শিক্ষাকে প্রমোট করে থাকেন, সন্তানদের নামায ও মসজিদে গমন দেখে ভ্রূকুঞ্চিত করেন, এমনকি নামাযে বাধা প্রদান করেন, তিনি সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে আলেম হিসেবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তাকে আলেম কেন ভাবতে হবে তা আমার বুঝে আসে না।
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3.7 (3টি রেটিং)