তবে কেন এত দুশ্চিন্তা? [মানব জীবনে দুর্ভোগের আসল কারণ উন্মোচন]

ইতবান (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বলবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আল্লাহ তার উপর জাহান্নামের আগুনকে হারাম করে দেবেন।" (বুখারী, মুসলিম) এ হাদীসের সমর্থন পাওয়া যায় কোরআনের এ আয়াতে—
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ- نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ- نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ-
"নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের আল্লাহ আমাদের প্রভু, অতঃপর এর উপর কায়েম (অনড় ও অবিচল) থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন। ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্যে আছে তোমরা দাবী কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন।" (সূরা হামীম সেজদা: ৩০-৩২)

এ আয়াত থেকে বোঝা গেল, যারা আল্লাহকে প্রভু বলবে ও তার উপর কায়েম থাকবে, তাদের কাছে দুনিয়াতে যেমন ফেরেশতারা আগমন করে অভয়বাণী শোনাবে, তেমনি আখেরাতেও তাদেরকে ফেরেশতারা নিশ্চিন্ত করার পাশাপাশি জানিয়ে দেবে, তোমরা যা চাও তাই পাবে। কিন্তু কথা হলো, আমরা তো সকলেই আল্লাহকে 'ইলাহ' ও 'রব' হিসেবে স্বীকৃতি দেই। তারপরও আমাদের জীবন দুশ্চিন্তামুক্ত ও নির্ভয় হচ্ছে না কেন? এর জবাব হলো, আমরা মুখে বললেও আয়াতের বর্ণনা মোতাবেক এ মৌখিক স্বীকৃতির উপর বাস্তবে কায়েম থাকতে পারছি না। আমরা মুখে আল্লাহকে 'প্রভু' হিসেবে ঘোষণা করছি, কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্য অনেক কিছুকে প্রভু বানিয়ে বসে আছি। আর আমাদের সেই মনগড়া মাবুদগুলোই একেকটা আপদ হয়ে আমাদের জীবনে নাযিল হচ্ছে আর অযাচিত ঝামেলা ও অশান্তি সৃষ্টি করছে। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া বিভিন্ন উপাস্যের উপাসনা করতে গিয়ে এবং সেই দেবতাগুলোকে তুষ্ট করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই খামাখা নিজেদের পরিবারে, সমাজে ও সংসারে অশান্তি ও হাঙ্গামা সৃষ্টি করছি।

আল্লাহর পরিবর্তে আমাদের উপর মাবুদ হয়ে চেপে বসা এই দেবতাগুলোর পরিচিতি এবার তুলে ধরা যাক:-

(ক) প্রবৃত্তি: প্রবৃত্তির চাহিদা যখন আল্লাহর অনুমোদিত পন্থার বাইরে অন্য কোন পন্থায় চরিতার্থ করা হয়, অথবা আল্লাহর অনুমোদিত পন্থার মধ্যে চরিতার্থ করা হলেও তার পিছনে এতটাই সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকা হয়ে যে, আল্লাহর স্মরণ, আল্লাহর এবাদত ও আল্লাহর হুকুম পালন অপেক্ষা তা অধিক মনোযোগ ও গুরুত্ব পেয়ে বসে, তখন তা প্রবৃত্তির উপাসনায় পরিণত হয়। প্রবৃত্তি দেবতা আবার বিভিন্ন রূপে নাযিল হয়ে থাকেন; যথা-
১। কাম: কাম প্রবৃত্তি কখন আমাদের জন্য ক্ষতিকর হয়? দুই ভাবে হতে পারে। প্রথমত, যখন আল্লাহর অনুমোদিত পন্থার বাইরে এ প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা বা আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিসকে কামনা করা হয়। দ্বিতীয়ত, বৈধ পন্থায় হলেও এ প্রবৃত্তি যখন এমন অতিরিক্ত হয় যে, কাম প্রবৃত্তি মেটাতে গিয়ে আল্লাহর এবাদত থেকে বিরত থাকা বা জীবনসঙ্গীকে আল্লাহর এবাদত করতে বাধা দেয়া হয়, অথবা কামভাবের খাতিরে নিজের জীবনসঙ্গীর অন্যায় কাজেও সমর্থন বা প্রশ্রয় দেয়া হয়, কিংবা জীবনসঙ্গীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে তাকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।

২। ভোজনস্পৃহা: একজন ভোজনবিলাসী মানুষ তার রসনাদেবের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে যখন কোন হারাম দ্রব্য (হারাম উপায়ে উপার্জিত খাদ্য হোক, বা বস্তুগতভাবে নোংরা নিষিদ্ধ খাবার হোক) ভক্ষণ করে, অথবা হালাল খাদ্যই আহার করতে গিয়ে নিজের বা অপরের শারীরিক ক্ষতি সাধন করে (অর্থাৎ, অতিরিক্ত খেলে বা যেসব দ্রব্য খেলে নিজের শারীরিক ক্ষতি হবে তা জেনেও জিহবাকে সংযত না করা অথবা খাদ্য তৈরি বা যোগান দিতে অন্য মানুষের ক্ষতি হবে জেনেও মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের উপরে নিজের রসনাকে অগ্রাধিকার দেয়া), অথবা রসনার চাহিদা সামলাতে না পেরে অন্যের ভাগের খাবারটাও খেয়ে ফেলে, তখন সে রসনার পূজা করছে বলে গণ্য হবে।

৩। অর্থ: অর্থের প্রবৃত্তি যখন এতটা পর্যায়ে যায় যে, অর্থ কামানোর নেশায় আল্লাহর অনুমোদিত পন্থার বাইরে অর্থাৎ চুরি-ডাকাতি-খুন, প্রতারণা, সুদ-ঘুষ ইত্যাদি পন্থায় টাকা কামানো হয়; অথবা আল্লাহর অনুমোদিত বৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করলেও অর্থ বৃদ্ধির নেশায় এতটা ব্যস্ত থাকা হয় যে, আল্লাহর হক, নিজের হক ও পরিবার-পরিজনের হক সবকিছু থেকে উদাসীন থাকা হয়, তখন তা অর্থের পূজা হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া কারো দ্বারা অনিচ্ছাকৃতভাবে অর্থ-সম্পদের সামান্য ক্ষতি হলেও তা নিয়ে বড় রকমের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাটা অর্থপূজারী মানসিকতারই পরিচায়ক।

৩। সম্মান ও সুনাম: সম্মান ও সুনামের প্রতি মানুষ যখন এতটা আসক্ত হয়ে পড়ে যে, তার তুলনায় আল্লাহর দ্বীন, নিজেদের জীবন এমনকি বাচ্চাদের জীবনও তুচ্ছ হয়ে দাড়ায়, তখন সে যশপ্রীতিকে নিজের দেবী বানিয়ে নিয়েছে বলে বুঝতে হবে। এই সুনাম কামনার বহি:প্রকাশ ঘটে আমাদের বিভিন্ন মানসিকতা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। যেমন- নিজেকে উচ্চ পদে সম্মানজনক অবস্থানে যেতেই হবে, নিজের সামর্থ্যের বাইরে নিজের ও বাচ্চাদের ক্ষতি করে হলেও মানুষজনকে আদর-আপ্যায়ন করে সামাজিকতা দেখিয়ে নিজেকে সুগৃহিনীরূপে প্রমাণ করতেই হবে, আমার বাচ্চাকে ক্লাসের মধ্যে ফার্স্ট হতেই হবে— এগুলো হলো সম্মান ও সুনামের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ তথা ওগুলোকে প্রভু বানিয়ে নেবার নিদর্শন।

৪। ইগো ও প্রেস্টিজ: আলগা প্রেস্টিজ ও ঠুনকো আত্মসম্মানবোধ যখন প্রবল থাকে, তখন মানুষ যেকোন ব্যাপারে নিজেকে 'পরাজিত' ও 'অপমানিত' দেখতে মোটেই পছন্দ করে না। নিজের কোন সিদ্ধান্ত বা বদ্ধমূল ধারণা যখন ভুল বা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তখন সে সেটাকে নিজের জন্যই অপমানজনক মনে করে। নিজেকে ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ভাবতে বা দেখাতে হবে— এই প্রবণতার কারণে

৫। অহংকার: অহংকারী ব্যক্তি নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত ভাবতে পছন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং নিজের গুণকীর্তন শুনতে ভালোবাসে।

(খ) ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষ: কোন ব্যক্তি, দল, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি অন্ধ অনুরাগ ও শর্তহীন আনুগত্য আল্লাহর পরিবর্তে তাকে বা তাদেরকে প্রভু মানার শামিল।

(গ) হুজুগ বা বাতিক বিশেষ:

উপরে যে মাবুদগুলোর উপাসনার বর্ণনা দিলাম, সেগুলোর যেকোন একটাই মানুষের জীবন থেকে শান্তি কেড়ে নেবার জন্য যথেষ্ট। এ দেবতাগুলোর পূজারী ব্যক্তি নিজেও শান্তিতে থাকে না, অন্যকেও শান্তিতে থাকতে দেয় না। এসবের পূজায় এতটাই মোহান্ধ হয়ে থাকে যে, এদের অবস্থা হয় 'সুখে থাকতে ভুতে কিলায়'।
আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None