এজিদপ্রেমের পোস্টমর্টেম

মহররম আসলে কেউ কাঁদে হোসাইনের (রা.) জন্য, কেউ কাঁদে এজিদের জন্য। হোসাইনের জন্য কান্নাটা যৌক্তিক কারণেই সঙ্গত ও বোধগম্য, যেহেতু তিনি মজলুম অবস্থায় শাহাদাতবরণ করেছেন। অপরদিকে এজিদের জন্য তার ভক্তরা কাঁদে নিজ গুরুকে দুনিয়াবাসীর কাছে ধিকৃত ও অভিশপ্ত হতে দেখে। আজ থেকে আনুমানিক দুই যুগ আগে একটি সংবাদপত্রের মুক্তমতের পাতায় ব্লাসফেমী আইন নিয়ে বিতর্কে ব্লাসফেমীর বিপক্ষে একজনের "ব্লাসফেমী আইন শিল্প-সাহিত্যকে ধ্বংস করবে" শীর্ষক লেখায় এই মর্মে যুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছিল যে, "মধূসুদন যেমন রামের বিপক্ষে রাবণের পক্ষে মহাকাব্য লিখেছেন, তেমনিভাবে কেউ যদি কারবালার ঘটনায় হোসাইনের বিপক্ষে ও এজিদের পক্ষে কোন কাব্য বা সাহিত্য রচনা করে, তাহলে সেটা মুসলমানরা মেনে নেবে কিনা।" কিন্তু স্বয়ং মুসলিম নামধারী কোন সম্প্রদায় খোদ ইসলামের নামেই যে এ কাজটি করতে পারে, এজিদ বন্দনা গাইতে পারে, তা কি তখন কেউ কল্পনা করেছিলাম? কোন মুসলমান যে এজিদের সমর্থক হতে পারে, তা কি আমরা কেউ কোনকালে স্বপ্নেও ভেবেছি? কিন্তু আজ ইন্টারনেটের কল্যাণে অবাধ তথ্য প্রবাহের ফলে আমরা জানতে পারছি যে, আল্লাহর দুনিয়ায় এ ধরনের বিকৃত চিন্তাধারার গোষ্ঠীও একটা আছে। এমনকি এক যুগ আগে ইসলামের নামে আজগুবি তত্ত্ব আওড়িয়ে নৃশংস বোমাবাজি পরিচালনাকারী গোষ্ঠীটির আগা-মাথা নিয়ে কোন কুলকিনারা পেতে হিমশিম খেলেও আজ এ গোষ্ঠীটির উৎস উদঘাটিত হয়েছে এবং স্পষ্ট হয়েছে যে, এরা এজিদ সমর্থক গোষ্ঠীরই সদস্য।
এবার আসি এজিদের প্রতি এ আজব ভালোবাসা ও অনুরাগের কারণ ও তাৎপর্য এবং এর পিছনে এজিদপ্রেমীদের psychology উদ্‌ঘাটনে। আমরা এ প্রসঙ্গে হযরত হাসান বসরী (রহ.)-এর একটি বাণী স্মরণ করতে পারি, "যার মনে ফিসক তথা পাপাসক্তির বীজাণু বিদ্যমান রয়েছে, কেবল তার পক্ষেই কোন ফাসেক তথা পাপাসক্তের প্রতি ভালোবাসা থাকা সম্ভব।" এজিদের প্রতি ভক্তি-ভালবাসা ও দুর্বলতার আসল অন্তর্নিহিত সূত্র এর মাঝেই নিহিত। কারণ, এজিদ চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হলো নিষ্ঠুরতা ও ভোগ-বিলাসিতা। বর্তমানকালে এজিদ অনুসারীদের নীতি-আদর্শ, কর্মপন্থা ও  ব্যক্তিগত জীবন দেখলেও এর বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়।
পার্থিব লোভ-লালসাবশত: ক্ষমতার জন্য (ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতা দখল করা) হোক, বা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদেরকে কাফের ভেবে হত্যা করার জন্য হোক, এর জন্য মানব স্বভাবে যে জিনিসটা আনতে হয় তাহল— দয়া-মায়া সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা, অন্তরে নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতার বীজ বপন করা। আর এ স্বভাবটি অর্জন করা ও সহযোগী-সমর্থকদের মাঝে আনয়ন করাটা যাদের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরী, তারা হলো মুসলিম বিশ্বের দুটি সম্প্রদায়। একটি সম্প্রদায় হলো বিশেষ একটি রাজপরিবার, আরেকটি সম্প্রদায় হলো ধর্মের নামে চরমপন্থী একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। রাজতন্ত্রকে বৈধ করার পাশাপাশি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মুসলিমদের উপর নিষ্ঠুরতা চালানো, ইসলামের শত্রুদের সাথে ঐক্য গড়া, বৈধ-অবৈধ নানান পন্থায় ভোগ-বিলাসিতা ও ইন্দ্রিয়সম্ভোগ ইত্যাদি কার্যকলাপের জন্য এজিদই উত্তম আদর্শ। আরেকটি সম্প্রদায়, যারা ধর্মের গোঁড়া, একপেশে, বিকৃত ও মনগড়া ব্যাখ্যার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে নৃশংস পন্থায় মানুষ হত্যা ছাড়া মুসলিম বিশ্বকে আর কিছুই উপহার দিতে পারছে না, তাদের এই বিদঘুটে হিংস্রতা চালানোর জন্যও অন্তর থেকে দয়া-মায়াকে নির্বাসিত করবার প্রয়োজন হয়। তাই এদের জন্যও দরকার এজিদি চেতনা। একদিকে রাজপরিবারের ইহুদীদের দালালী ও অনৈসলামিক জীবনযাপন, অপরদিকে ইসলামের নামে চরমপন্থীদের কার্যকলাপ দুটি দৃশ্যত বিপরীত হলেও নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার স্বভাবটি আত্মস্থ করবার জন্য তাদের এক অভিন্ন চেতনার দরকার হয়, আর সেটিই অর্জিত হয়েছে একটি স্বতন্ত্র মাযহাবের (সালাফী) আওতায় এজিদভক্তির মধ্য দিয়ে। কারণ, যার দৃষ্টিতে ইমাম হোসাইনের রক্তই মূল্যহীন, তার কাছে সাধারণ মানুষের রক্ত আবর্জনার চাইতেও তুচ্ছ বিবেচিত হবে। ফলে ক্ষমতার লোভে হোক বা ধর্মের নামে হোক, নরহত্যা তার কাছে পানিপান্তা তথা মামুলী ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। এজন্যই এজিদকে এদের এত দরকার। আর বলাবাহুল্য, ধর্মের নামে চরমপন্থী কার্যকলাপ পরিচালনাকারী বিশেষ ভাবধারাসম্পন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীটির দ্বারা ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার দুরাশা কোন বেকুবেও করে না, বরং মুসলিম বিশ্বে বিশেষ রাজবংশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এজেন্ডাই পূরণ হতে পারে মাত্র। সুতরাং এ দুটি গোষ্ঠী দৃশ্যত দুই মেরুতে অবস্থিত হলেও তাদের লক্ষ্য এক। তাই তাদের মাযহাবও এক। ভাবতে অবাক লাগে, যেই এজিদ মসজিদে নববীকে অপবিত্র করেছিল এবং কাবাঘরকে ভস্মীভূত করেছিল, 'খাদেমুল হারামাইন' খেতাবধারীরা কিভাবে সেই এজিদকে নিজের গুরু মনে করে? যারা মদীনাবাসীদেরকে ভালোবাসা সংক্রান্ত নবীর (সা.) হাদীস প্রচারের দ্বারা মক্কা-মদীনার বর্তমান দখলদারদের প্রতি আনুগত্য করাকে মুসলমানদের জন্য জরুরী প্রমাণ করতে চায়, মদীনাবাসীদের সমালোচনা করলে ঈমান চলে যাবে মর্মে জাল হাদীস প্রচার করে মদীনার বর্তমান শাসকদেরকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে চায়, তারা কিভাবে মক্কা-মদীনায় গণহত্যা ও গণধর্ষণ পরিচালনাকারী এজিদকে সমর্থন করে?
এজিদের অনুকূলে সহানুভূতি অর্জনের এবং এজিদকে নির্দোষ প্রমাণের এ অপপ্রয়াসটি চলছে ধর্মীয় আলোচনার আবরণে, নিছক শেরেক-বেদাত দূর করার নামে। মহররম মাসে কোন্ ধরনের আমল করা উচিত, কোনটা অনুচিত, এ সংক্রান্ত মাসলা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনার ছলে এজিদকে মন্দ বলা বা ঘৃণা করাটাকেও বেদাতের তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়ে মুসলমানদেরকে এজিদ সমর্থক বানানোর সূক্ষ্ম প্রয়াস চালানো হয়। এমনকি যুক্তিতর্কের মারপ্যাঁচে ফেলে মহররম নিয়ে প্রচলিত বেদাতী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতার ছলে ইমাম হোসেনের (রাঃ) যেটুকু শ্রদ্ধা প্রাপ্য, আল্লাহর নবী (সাঃ) তাঁকে যে সম্মান [অর্থাৎ, জান্নাতের যুবকদের নেতা] দিয়ে গেছেন, সেটুকু থেকেও তাঁকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। এখানে সম্মান কেড়ে নেয়া বলতে মুসলমানদের অন্তর থেকে শ্রদ্ধাবোধ উঠিয়ে দেবার কথাই বোঝাচ্ছি, যেহেতু আল্লাহর দরবার থেকে কারো সম্মান কেউ কেড়ে নিতে পারে না। শুধু তাই নয়, নৃশংসতার শিকার একজন মজলুম মানুষ হিসেবে হোসাইন (রাঃ) যতটুকু ন্যূনতম মানবিক সহানুভূতি পেতে পারেন, তাও যাতে তিনি না পান, ছলে-বলে-কৌশলে সেই চেষ্টাও কম হয় না। এই জালেমরা ইমামের প্রতি সামান্য মানবিক সহানুভূতি ও সৌজন্যবোধটুকুও দেখাতে দিতে কোনভাবে রাজি নয় বলেই মনে হয়। এদের ইতিহাস বর্ণনা ও প্রচারণার ধরন দেখে মনে হয়, কারবালার ঘটনাকে এরা নিছক ক্রসফায়ার টাইপেরই একটা কিছু হিসেবে দাঁড় করাতে চায়; এটা যে একটা একতরফা হত্যাযজ্ঞ- এ বিষয়টা যতটা পাশ কাটিয়ে পারা যায় সেই ধান্ধাতেই মত্ত থাকে এই মতলববাজের দল।
মুসলমানদের মনে এজিদের প্রতি অনুরাগ, আনুগত্য ও সহানুভূতি জাগ্রত করাটা এদের আসল এজেন্ডা হলেও এদের লেখার শিরোনামে ও ভূমিকায় এ মতলবটা স্পষ্ট না হওয়ায় এবং ধর্মীয় মাসআলা-মাসায়েল ও ফযীলত বয়ানের বিষয়টি অধিক দৃশ্যমান হওয়ায় সাধারণ পাঠকের চোখে এটা ধরা পড়ে না। মানুষ এটাকে নিছক ধর্মীয় আলোচনা ভেবে এবং সুন্নত-বেদাত সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য লাভ করতে পেরেছে ভেবে 'লাইক' আর 'জাযাকাল্লাহ' দিয়ে ভরিয়ে ফেলে। অথচ ভালো চালের সাথে যে পাথরগুলো সুকৌশলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে, গরুর দুধের সাথে যে গোমূত্রও গেলানো হচ্ছে, এটা কেউ টেরই পায় না।
কারবালার ঘটনা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা গ্রহণকারী সাহাবাবিদ্বেষী ও বেদাতী সম্প্রদায়গুলো ছাড়া যেকোন সাধারণ মুসলমান বুকে হাত দিয়ে নির্দ্বিধায় দাবি করতে পারে, হোসাইনের (রাঃ) প্রতি ভালোবাসা আল্লাহর জন্যই। কারণ, তিনি স্বয়ং আল্লাহর নবীর (সাঃ) প্রিয়তম দৌহিত্র এবং নবী কর্তৃক মর্যাদা ও সুসংবাদপ্রাপ্ত। কিন্তু এজিদপ্রেমীরা কি দাবি করতে পারবে যে, এজিদের প্রতি তাদের ভালোবাসা আল্লাহর জন্য? তা করবে তারা কিসের ভিত্তিতে? এজিদের পিতা আল্লাহর নবীর (সাঃ) একজন সাহাবী, এই তো? কিন্তু তিনি কোন্ মাপের সাহাবী? আল্লাহর নবীর (সাঃ) একজন পরাজিত শত্রুর পুত্র, এই তো?
হযরত আলী (রা.) একবার আবু জেহেলের মেয়েকে বিবাহ করবার চিন্তা-ভাবনা করলে রসূলুল্লাহ (সা.) জুমার খুতবায় বলেছিলেন, "যে ফাতেমাকে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়। আল্লাহর নবীর মেয়ে আর আল্লাহর দুশমনের মেয়ে কখনো এক ঘরে থাকতে পারে না।" এ খুতবা শোনার পর আলী (রা.) তাঁর সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। পাঠক ভেবে দেখুন, আল্লাহর নবীর মেয়ে আর আল্লাহর দুশমনের মেয়ে যেখানে এক ঘরে থাকতে পারে না, সেখানে আল্লাহর নবীর নাতি আর আল্লাহর নবীর দুশমনের নাতি কিভাবে এক হৃদয়ে স্থান পেতে পারে? আল্লাহর নবীর নাতি আর আল্লাহর নবীর নাতির দুশমন কিভাবে এক অন্তরে ঠাঁই পেতে পারে? ইয়াজিদের প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ যে ইমাম হোসাইনের (রা.) প্রতি শত্রুতা প্রকাশেরই নামান্তর, তা বুঝতে কি আর বাকি থাকে?
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)