অবাক হয়ে যাবেন কেন রাসূল (স:) ‌এর বাহন গিয়ে হযরত আবু আইউব আনসারী রা. -এর বাড়ীর সামনে থামে

অবাক হয়ে যাবেন কেন রাসূল (স:) ‌এর বাহন গিয়ে হযরত আবু আইউব আনসারী রা. -এর বাড়ীর সামনে থামে

সৌভাগ্যের রহস্য

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের এক হাজার বছর পূর্বের
কথা। হযরত ঈসা আ. -এর আবির্ভাবও তখন হয়নি। ইয়ামানের রাজ সিংহাসনে তাবইয়া
আউয়াল হামিরী নামক জনৈক ব্যক্তি সমাসীন। যাকে লোকেরা শাহে তুব্বা নামে
চিনতো। মহা ক্ষমতাধর এই সম্রাটের প্রভাব তখন দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত। দেশের পর
দেশ বাজ্যের পর রাজ্য তাঁর করতলগত।
এই মহাশক্তিধর সম্রাট তুব্বা একবার
প্রাচ্য দেশসমূহ পদানত করার উদ্দেশ্য দিগি¦জয়ে বের হন। পথে মদীনা পড়লে
তিনি এখানকার সুন্দর আবহাওয়া দেখে মুগ্ধ হন। কিছুদিন থাকার পর নিজের
একপুত্রকে এখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে রওয়ানা হন সিরিয়া ও ইরাক অভিমুখে।
মদীনার শাসনকর্তা সম্রাট তুব্বার পুত্র মদীনার ভিতরে শিকারে গেলে
ঘটনাক্রমে সেখানকার লোকজন বিশ্বাস-ঘাতকতা করে তাকে হত্যা করে ফেলে। পুত্র
হত্যার এই সংবাদ যখন সম্রাট তুব্বার কাছে পৌঁছলো, তখন তিনি পুত্র হত্যার
প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মদীনায় ফিরে আসলেন এবং শুরু করলেন প্রতিশোধ গ্রহণ
অভিযান। এসব সংঘর্ষে একপর্যায়ে তাঁর ঘোড়া নিহত হলো। এতে তিনি আরো ক্ষিপ্ত
হয়ে ওঠেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে, এই শহরকে শ্মশানে পরিণত না করে সামনে
অগ্রসর হবেন না।

সম্রাট তুব্ব্র সাথে তখন চারশত ইহুদী পন্ডিত ছিলো,
তাঁরা সম্রাটের এই মনোভাব জানতে পেরে তাঁর কাছে এসে বললো, “মহামান্য
সম্রাট! এই শহর এবং তাঁর অধিবাসী, এরা সকলেই আল্লাহর হেফাজতে সুরক্ষিত। কেউ
এক ধ্বংস ও বরবাদ করতে পারবে না। আমরা এই শহরের মাটি, কংকর ও পরিবেশ
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি যে, এটাই তাওরাতের
বর্ণিত সেই পবিত্র শহর, যাতে শেষনবী এসে আশ্রয় নিবেন। তাওরাতে একে তাইয়েবা
নামে উল্লেখ করা হয়েছে। আপনি এই শহরকে নিশ্চিহ্ণ ও ধ্বংস করার বদ খেয়াল
পরিত্যাগ করুন। আর এটাই হবে আপনার জন্য উচিত কর্তব্য।

ইহুদী
পন্ডিতদের মখে এই কথা শোনার পর, পুত্র হত্যার কারণে মদীনাবাসীদের উপর
সম্রাট তুব্বার মনে যে রাগ ও ক্রোধ জন্মছিল তা দূর হয়ে গেলো। রাগ ও ক্ষোভের
স্থলে জন্ম নিলো শেষনবীর প্রতি অগাধ ভক্তি ও ভালবাসা। তিনি শেষনবীর প্রতি
সম্মান জানিয়ে তাঁর মত পাল্টে ফেললেন। শেষ পয়গাম্বরের উসীলায় তিনি
মদীনাবাসীর এই অপরাধকে ক্ষমা করে দিলেন। এই ঘটনার পর সম্রাট তুব্বার সঙ্গের
ইহুদী আলিমগণ সম্রাটের সঙ্গ ত্যাগ করে সর্বশেষ পয়গাম্বরের পূণ্যময়
সান্নিধ্য ও সংসর্গ লাভের আশায় মদীনায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

সম্রাট তুব্বা যখন ইহুদী পন্ডিতদের এই ইচ্ছার কথা জানতে পারলেন, তখন তিনি
তাদের সকলের এই সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছার প্রতি সশ্রদ্ধ সম্মতি দিলেন। সাথে সাথে
মদীনায় বসবাস করার জন্য তাদের প্রত্যেককে একটি করে ঘর বানিয়ে দেন। আলিমদের
মধ্যে যিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও বিজ্ঞ ছিলেন, সম্রাট তুব্বা তার জন্য বানানো
দালানের সাথে শেষ পয়গাম্বরের জন্য আলাদা একটি দোতলা বাড়ীও বানিয়ে দিলেন।
এরপর তিনি ওসিয়ত করলেন, যখন আখেরী নবী মদীনায় তাশরীফ আনবেন, তখন এই
দালানটিই যেন তাঁর আবাস, অবসর ও দীন প্রচারের কেন্দ্রস্থল হয়। তিনি আরো
অনুরোধ করলেন, “আলিমগণ যেন আজীবন এখানেই থাকেন। এ স্থান ছেড়ে অন্য কোথাও
চলে না যান।”

তারপর বাদশাহ নামদার শেষ যমানার সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরাবর একটি পত্র লিকলেন। তাতে বললেন,
“অযোগ্য, অথর্ব সম্রাট তুব্বা আউয়াল হামিরীর পক্ষ থেকে সর্বশেষ ও
সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম - এর
খেদমতে, আমি আহমাদ সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি নিশ্চয়ই সেই আল্লাহর
রাসূল, যিনি আত্মাসমূহের স্রষ্টা।
যদি আমি তাঁর সময় পর্যন্ত বেঁচে
থাকি, ভাগ্যক্রমে যদি তাঁর সাথে আমার সাক্ষাত হয়েই যায়, (তাহলে তো মহা
সৌভাগ্য ও বড় আনন্দের কথা) তবে আমি অবশ্যই তাঁর উযীর ও ভাই হয়ে যাবো।”

এধরনের আরো কিছু কথা লিখার পর সম্রাট তুব্বা পত্রটিতে সিল মোহর মেরে
আলিমদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন, তাঁর হাতে দিয়ে বললেন, “আমার এই
পত্রটি আপনি শেষ যমানার সর্বশেষ্ঠ নবীর কাছে পৌঁছাবেন। আপনার জীবদ্দশায় যদি
তাঁর সাথে সাক্ষাত না হয়, তাহলে আপনি আপনার সন্তানদেরকে ওসিয়ত করে যাবেন
যে, তাঁরা যেন বংশ পরস্পরায় এই পত্রটি যতেœর সাথে সংরক্ষণ করে এবং আখেরী
নবী তশরীফ আনলে তারা যেনো তাঁর মুবারক হাতে এই চিঠি অর্পণ করে।”
-একথা বলে, এই চিঠি দিয়ে সম্রাট তুব্বা লোকজন নিয়ে ফিরে গেলেন তার দেশে।

এরপর। কতদিন গত হলো, কতমাস অতিক্রান্ত হলো। সময় তার নিজ গতিতে বয়ে চলল।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দেখতে দেখতে এক হাজার বছর
পেরিয়েগেলো এর মাঝে পৃথিবীতে কত যে পরিবর্তন এলো, কত উত্থান পতন ঘটল, কত
বিপ্লব সাধিত হল তার হিসাব কে, রেখেছে?
এ দীর্ঘ সময়ের ভেতর সম্রাট
তুব্বা মারা গেলেন, তাঁর সন্তান-সন্ততিরা মারা গেল। মদীনায় বসতি স্থপনাকারী
ইহুদী আলিমগন মারা গেলেন। তাদের পর কয়েক প্রজন্মও গত হলো, কিন্তু সম্রাট
তুব্বার ওসিয়ত অনুযায়ী তাঁর চিঠিটি মদীনায় থেকে যাওয়া আলিমদের সর্দার এর
বংশে ধারাবহিকভাবে সংরক্ষিত হতে থাকলো। এই বংশের ১৬তম পুরুষ মতান্তরে ২৬ তম
পুরুষ গত হওয়ার পর সর্বশেষ বংশধর হযরত আবু আইউব আনসারী রা. এর কাছে সম্রাট
তুব্বার ওসিয়ত অনুযায়ী পত্রটি এসে পৌঁছে এবং তিনি সেটি শেষ নবীর কাছে
পৌঁছাবার উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করতে থাকেন। মুহাজির সাহাবায়ে কিরাম এবং
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করে আসার সময় হযরত
আবু আইউব আনসারী রা. শেষ নবীর জন্য সম্রাট তুব্বার বানানো দ্বিতল ভবনে
বসবাস করছিলেন।

ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ও সীরাতবিদগণ বলেন, রাসূলের উষ্ট্রী
হযরত আবু আইউব আনসারী রা. এর বাড়ীর সামনে এসে বসে যাওয়ার কারণ ছিলো মহান
আল্লাহর অদৃশ্য ইঙ্গিত। এর দ্বারা তিনি শেষনবীর খেদমতে পেশ করা সম্রাট
তুব্বার আন্তরিক ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম হযরত আইউব আনসারী রা. -এর বাড়ীতে উঠার পর হযরত আবু আইউব আনসারী রা.
রাসূলের খেদমতে সম্রাট তুব্বার সেই পত্রটি পেশ করেছিলেন। মহানবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পত্রটি পাঠ করে সম্রাট তুব্বাকে ধন্যবাদ
জানান।

* * * *
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
উষ্ট্রী হযরত আবু আইউব আনসারী রা. এর ঘরের সামনে এসে বসে যাওয়ায় প্রিয়নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে তাঁর মদীনায় অবস্থান করার
ব্যাপারে মহান আল্লাহর অভিপ্রায় একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। সাথে সাথে রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এও বুঝে নেন যে, মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর
মদীনায় থাকার জন্য হযরত আবু আইউব আনসারী রা. এর ঘরকেই নির্বাচিত করেছেন।
তাই তিনি আর দ্বিমত না করে মদীনায় তাঁর জন্য পৃথক আবাসস্থল নির্মিত হওয়ার
আগ পর্যন্ত হযরত আবু আইউব আনসারী রা. -এর আতিথ্য গ্রহণ করলেন এবং তাঁর
বাড়ীতে তাশরীফ আনলেন।

হযরত আবু আইউব আনসারী রা. এর বাড়ীটি ছিলো
দোতালা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাড়ীতে এসে নীচ তলায়
অবস্থান গ্রহণ করেন। কিন্তু এত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
প্রতি অবমাননা হবে ভেবে হযরত আবু আইউব আনসারী রা. নিজের ব্যবহৃত দ্বিতল ভবন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করলেন। তাই
তিনি রাসূলের কাছে এসে আরয করলেন- “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার
জন্য কোরবান হোক। আমরা উপর তলায় থাকবো আর আপনি নীচ তলায় থাকবেন, এটা
আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর। দোজাহনের সর্দার থাকবেন নীচে আর আমরা থাকব
উপরে-এটা কিরূপে সমীচীন? তাই হে আল্লাহর প্রিয় হাবীব! আপনি অনুগ্রহ করে
উপরের তলায় তাশরীফ নিয়ে যান। আমরাই নীচ তলায় থাকি।”
কিন্তু প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবু আইউব আনসারী রা. -এর এই কথার জবাবে বললেন,
“আবু আইউব! আমার মতে আমার জন্য নীচ তলায় অবস্থান করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
কেননা, আমার সঙ্গে অনেক লোকজন। তাছাড়া আমার সাক্ষাত প্রার্থীদের সংখ্যাও
অনেক। তাই আমার ও আমার সাক্ষাতপ্রার্থীদের সুবিধার জন্য আমি নীচতলায়
অবস্থান করাকেই অধিক সুবিধাজনক মনে করি। সতরাং আমি এখানেই থাকি আর তুমি
তোমার পরিবারের লোকদেরকে নিয়ে ওপর তলায়ই অবস্থান করো।”

হযরত আবু
আইউব আনসারী রা. -এর আর্থিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল ছিলনা। কিন্তু তদুপরি
স্বয়ং রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আজ তাঁর গরীবালয়ে
তাশরীফ এনেছেন, এতে তাঁর খুশীর অন্ত নেই। তিনি রাসূলের খেদমতে তাঁর
সর্বশক্তি ব্যয় করলেন। রাসূলের সেবা-যত্নে, মেহমানদারীতে কোন ধরনের
সামন্যতম ত্র“টি বা অবহেলা করতেন না।
হযরত আবু আইউব আনসারী রা. বলেন,
একবার আমাদের ওপর তলার পানি রাখার মশকটা ভেঙ্গে যায়। ফলে আমি আর আমার
স্ত্রী উম্মে আইউব আমাদের পরিধেয় একমাত্র চাদরটি দিয়ে গড়িয়ে গড়া পানি শুষে
নিলাম, যাতে করে তা কোনোভাবে গড়িয়ে নিচে না পড়ে এবং সেখানে অবস্থানরত
রাসূলের কষ্টের কোন কারণ না হয়।
তিনি আরো বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য খাবার তৈরী করে পাঠাতাম। হযরত
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা হতে খাদ্য গ্রহণ করার পর যা অবশিষ্ট
থাকতো, তা আমরা বরকতের নিয়তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেখান
দিয়ে খেয়েছেন সেখানে মুখ লাগিয়ে খেয়ে নিতাম।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

সালাম

যাজাকাল্লাহ  খায়ের  চমৎকার  লেখাটার  জন্য  ।  এসব ঘটনা  আরো  বিস্তারিতভাবে  কোন  বইতে  পাওয়া   যাবে , জানা থাকলে   জানাবেন ।

মনে নেই,তবে মাসিক মদিনার কোন একটা সংখ্যায় এসেছিল এটা মনে আছে।

-

সুফিয়ান

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)