চোখের পানিতে ভিজছে প্যারিস

রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির (বন্ধ) দিন। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন শোকার্ত মানুষেরা। সন্ত্রাসী হামলায় রক্তস্নাত স্থানগুলোতে কঠোর পুলিশি ব্যারিকেড ঠেলে রবিবারও মোমবাতি জ্বালিয়ে ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তারা। স্বজনরা তো বটেই, সেখানে অশ্রু ফেলছেন সাধারণ ব্যথিত মানুষও। মানুষের নোনা কান্নায় ভিজে যাচ্ছে হামলাস্থল।

সরেজমিন রবিবার প্যারিস সিটির বাটাক্লঁ কনসার্ট হলসহ সন্ত্রাসী হামলাস্থল বার দু’টি ঘুরে এ সব দৃশ্য দেখা যায়। শোকার্ত মানুষের পাশাপাশি বিশ্ব মিডিয়ার কর্মীদের সরব উপস্থিতিও সেখানে উল্লেখ করার মতো। তারা ব্যস্ত রয়েছেন সর্বশেষ খবর পাঠক বা দর্শকদের জানাতে। বিশেষ করে বাটাক্লাঁ কনসার্ট হল এলাকায় সাংবাদিকদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।

শুক্রবার ফ্রান্সের প্যারিস সিটির ৬টি স্থানে বর্বর সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ গেছে ১২৯ জন শান্তিপ্রিয় মানুষের। আহত হয়েছে ৩৫২ জন। যাদের ৯৯ জনের অবস্থায় গুরুতর।

ইতিহাস-ঐতিহ্য আর শান্তির নগরী ফ্রান্সের প্যারিস সিটি। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি ফ্রান্সের ব্যঙ্গ পত্রিকা সাপ্তাহিক শার্লি এবদো কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছিলেন। বছরের শেষের দিকে শুক্রবার সন্ধ্যা রাতে ফের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যাকে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা বলে মনে করা হচ্ছে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় প্যারিসের স্তেদ দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়ামে ফ্রান্স-জার্মানির প্রীতি ফুটবল ম্যাচ চলছিল। স্বয়ং দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ স্টেডিয়ামে গিয়ে প্রায় সত্তর হাজার দর্শককে সঙ্গে নিয়ে প্রীতি এ ফুটবল ম্যাচটি উপভোগ করছিলেন। আনন্দ-উল্লাস ও উত্তেজনাপূর্ণ এ ম্যাচটিতে ২-০ গোলে জয় পায় ফ্রান্স। কিন্তু ততক্ষণে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়ে ফুটবল ম্যাচ জেতার আনন্দ ম্লান হয়ে যায় প্যারিসের ৬টি স্থানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায়।

মাত্র কয়েক মিনিটের বর্বরতায় বহু মানুষের হতাহতের খবরে প্যারিস সিটি আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়। হতবিহ্বল হয়ে পড়েন মানুষ। প্যারিসের বাটাক্লঁ কনসার্ট হল, রেস্তোরাঁ, স্তেদ দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়াম সংলগ্ন স্থানসহ মোট ৬টি স্থানে ভয়াবহ এ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নাড ক্যাজেনেভ এক জরুরি বার্তায় জানিয়েছেন, ‘তিন দিন পর্যন্ত সমস্ত মিউজিয়াম, জিম, সুইমিংপুল, লাইব্রেরি, স্কুল বন্ধ থাকবে। নিহতদের স্মরণে সোমবার দুপুর ১২টা নাগাদ এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে।’

ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শহীদুল ইসলাম দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘স্থানীয় বাঙালীদের খোঁজ নেওয়া হয়েছে। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো বাঙালীর নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশীরা সবাই ভাল আছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘শোকে মুহ্যমান ফরাসীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঠানো এক শোকবার্তা ভোর ৭টায় পৌঁছেছে। তিনি তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। নিজে ঘুরে ঘুরে সব খোঁজ নিচ্ছেন। তার সরকারের মতো তিনিও ব্যথিত।’

প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটিতে জরুরী অবস্থা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। দেশটির সব সীমান্ত এক সময় বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে অধিকতর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশের সাধারণ নাগরিকদের ঘরে অবস্থান করার জন্য বলেছে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বাড়তি নিরাপত্তার জন্য নগরজুড়ে দেড় হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনাটি ঘটে প্যারিসের বাটাক্লাঁ কনসার্ট হলে। যেখানে শতাধিক লোক নিহত হয়। ওই হলে আমেরিকার একটি ব্যান্ড দলের কনসার্ট চলছিল। লোকজনকে জিম্মি করে পাখির মতো গুলি করে সন্ত্রাসীরা।

ঘটনার পরপরই পুলিশ কনসার্ট হলের চারপাশ ঘিরে ফেলে। পরবর্তী সময়ে পুলিশ জিম্মিদের উদ্ধারে ভারী অস্ত্রসহকারে সন্ত্রাসীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে ৩ অস্ত্রধারী মারা যায়। শুক্রবার মধ্যরাতে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় পুলিশ।

অন্যদিকে স্তেদ দ্য ফ্রান্স স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকা, দু’টি বার বা রেস্টুরেন্টসহ আরও মোট ৫টি স্থানে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। এ সব ঘটনায় আট হামলাকারীও নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে সাতজনই আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পুলিশ।

এদিকে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় জড়িত একজনকে চিহ্নিতের দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। প্যারিসের প্রধান প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, ওই হামলাকারীর নাম ওমর ইসমাইল মোস্তফাই।

পুলিশ জানিয়েছে,বাটাক্লাঁ কনসার্ট হলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত ফ্রান্সের নাগরিক মোস্তফাই’র (২৯) বাবা ও ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে ফ্রান্সের মন্ত্রই নামক স্থানে একটি কালো গাড়ির সিটের নিচ থেকে ৩টি রাশিয়ান কালাশনিকভ রাইফেল উদ্ধার করেছে ফ্রান্সের পুলিশ। গাড়িটির মালিকের নাম-পরিচয় ও ছবিও পাওয়া গিয়েছে। তার নাম আবদেসালাম সালাহ্। জন্ম ১৯৮৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়াল বালস বলেছেন, আমরা এখন যুদ্ধের মধ্যে আছি। আমরা এই জেহাদী শক্তিকে পাল্টা আঘাত করে সম্পূর্ণভাবে তাদের ধ্বংস করব। জিহাদী শক্তিকে পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে আনব।

এদিকে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পরের দিন শনিবার বিকেলে ফ্রান্স সীমান্তের স্ট্রাস বৌর এলাকায় দ্রুতগামী একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে খাদে পড়ে ১০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫ জন। ফ্রান্সের স্থানীয় সময় শনিবার বিকেলে ৩টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ার বরাত দিয়ে দ্য রিপোর্টের প্যারিস প্রতিনিধি আরিফ রানা জানান, টিজিভি নামে ফ্রান্সের ওই ট্রেনটির ঘণ্টায় গতিবেগ ছিল সাড়ে তিন শ’ কিলোমিটার। দ্রুতগামী ট্রেনটি আরও অত্যাধুনিক করে এলজিভি নাম দিয়ে ওই রাস্তায় চলাচলের জন্য শনিবার পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরুর দিনই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ট্রেনটিতে ফ্রান্সের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এসএনসিএফ’র কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারসহ মোট ৪৯ জন যাত্রী ছিলেন। ঠিক কী কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে তা জানা যায়নি।

ফ্রান্সে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় যখন পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত, ঠিক তখনই দেশটিতে আরও একটি প্রাণঘাতীর ঘটনা ঘটল। তবে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার কাছে ট্রেন দুর্ঘটনাটি অনেকটা ঢেকে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সেটি সেভাবে আসেনি।

অস্ত্র উদ্ধার : এদিকে প্যারিসে একটি পরিত্যক্ত মোটরগাড়ি থেকে বেশ কয়েকটি কালাশনিকভ রাইফেল পাওয়া গেছে। ফ্রান্সের বিচার বিভাগ সূত্রে বলছে, গাড়িটি কয়েকজন হামলাকারী ব্যবহার করতে পারে। রবিবার পূর্ব প্যারিসের শহরতলী মন্ট্রেউলে অস্ত্রসহ গাড়িটি পাওয়া যায়। গাড়িটি করে কিছু হামলাকারী পালিয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হামলায় অংশ নিয়েছে তিনটি দল : ফরাসি প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলিন্স বলেছেন, ফ্রান্সের প্যারিসে তিনটি দল মিলে সিরিজ হামলা চালিয়েছে। মলিন্স বলেন, ‘তারা (হামলাকারী) কোথা থেকে এসেছে আমরা তা অনুসন্ধান করে দেখছি। কীভাবে তাদের অর্থায়ন করা হয়েছে তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় সাত হামলাকারী নিহত হয়েছে। তারা সবাই ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ও বিস্ফোরক বেল্ট পরা ছিল।

একজন চিহ্নিত : হামলার ঘটনায় জড়িত একজনকে চিহ্নিতের দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। প্যারিসের প্রধান প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলিন্স জানিয়েছেন, ওই হামলাকারীর নাম ওমর ইসমাইল মোস্তফাই। ফরাসি নাগরিক মোস্তফাই’র বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। তবে তিনি কখনো জেল খাটেননি।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাটাক্লাঁনের কনসার্ট হল থেকে মোস্তফাই’র হাতের আঙ্গুল খুঁজে পাওয়া যায়। এটার ছাপ পুলিশের কাছে থাকা আঙ্গুলের ছাপের সঙ্গে মিলে গেছে। মোস্তফাই কুরকুরুন্নেস শহর থেকে এসেছেন। শহরটি প্যারিসের ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।

এএফপির প্রতিবেদনে বিচার বিভাগীয় সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, মোস্তফাই ২০১৪ সালে সিরিয়া ভ্রমণ করেছিলেন কিনা, সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ফরাসি পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোস্তফাই’র বাবা ও ভাইকে গ্রেফতার করেছে।

মোস্তফাই’র বড় ভাই ফ্রান্সের একটি পুলিশ স্টেশনে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেন। হামলার দিন তিনি প্যারিসে থেকে এ ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। মোস্তফাই’র সঙ্গে তার ৭ বছর ধরে যোগাযোগ নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে প্যারিসে সিরিজ হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বেলজিয়ামে একজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মলিন্স।

গুজব-আতঙ্কে দিশেহারা মানুষ

ভয়াবহ এই বোমা হামলার পর আতঙ্কিত হয়ে রয়েছে প্যারিসে বসবাসরত মানুষেরা। আর আতঙ্কের এই মুহূর্তে গুজবের ডালপালা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে। রবিবার বোমা হামলায় নিহতেদের প্রতি শোক জানাতে কেন্ট রিপাবলিকে জমায়ত হয়েছিল শত শত মানুষ। এ সময় কোথা কিছু একটা বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত মানুষ প্রাণ ভয়ে ছুটোছুটি শুরু করে। পরে জানা যায়, সেখানে একটি বৈদ্যুতিক বাতি বিস্ফোরিত হওয়ায় এই শব্দ হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে প্যারিসের স্থানীয় সময় অনুযায়ী রবিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে।

এদিকে, ইংল্যান্ড ও প্যারিসের বর্ডার সংলগ্ন ক্যালে এলাকায় সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকান রিফিউজিদের (উদ্বাস্তু) অস্থায়ী ক্যাম্পে আগুন লাগার ঘটনাতেও জন্ম নিয়েছে গুজবের। মিডিয়াতেও সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে যে সন্ত্রাসীরা এই আগুন লাগিয়েছে। তবে ক্যালের ডেপুটি মেয়র জানিয়েছেন, এটি একটি দূর্ঘটনা। এর সঙ্গে নাশকতার কোনো সম্পর্ক নেই।

উল্লেখ্য, ক্যালের এ্ই ক্যাম্পে প্রায় ৪,৫০০ রিফিউজির বসবাস রয়েছে। অস্থায়ী ক্যাম্পটির আয়তন প্রায় ২৫ হাজার বর্গ মিটার।
সংগ্রগ- দ্য রিপোর্ট২৪ এর বিশেষ সংবাদ পেজ থেকে।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None