বিমাতাসুলভ আচরণ

দলীয় নেতা কর্মীদের হয়রানী, হামলা-মামলা, ধরপাকড় ও নানাধরনের হূমকী
ধামকীর পর শির্ষব্যক্তি বিবৃতি দিলেন – সরকার আমাদের প্রতি বিমাতা সূলভ
আচরণ করছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করছে।

পত্র-পত্রিকায়, টকশোতে, খবরে, র্শীষনিউজে বিবৃতি প্রচার হতে লাগলো।
পত্রিকার নিউজ হেডলাইন হলো – সরকারের বিমাতাসূলভ আচরণ। বিমাতাসূলভ আচরণের
কাব্যিক ব্যবহারে ব্যবহারকারী নিজেই মুগ্ধ। একেবারে ক্লাসিক একটি বাগধারা
তৈরি করা হয়েছে। ঘরে-বাইরে, হাটে-মাঠে-ঘাটে, দেশে-বিদেশে, রাঁধুনীর
রান্নাঘর থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এমনকি বিশ্বায়নের যুগে পুরো বিশ্ব
বিশ্লেষনে বিমাতার অবাধ চলাফেরা।
বিমাতার বাস ঘরে বিশেষ করে পাকশালায় কিন্তু তার আচরণের ফিরিস্তি গায় বিশ্ব বাঙ্গালী। জয়তু বিমাতা, যত দোষের দোষী।

বিমাতাসূলভ আচরণ কথাটির অর্থ বুঝার জন্য বিশেষ জ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন
নেই। এর অর্থ অবহেলা করা, অপমান করা, গুরুত্ব না দেয়া, অসম্মান করা।
সবগুলোর অর্থ নেতিবাচক।এখানে বিমাতা একজন নেতিবাচক নারী চরিত্র।
ক্লাসিক্যাল নেতিবাচক চরিত্রে বিমাতাকে নিয়ে আসা বিশ্লেষণী ভাষাজ্ঞানের
লক্ষণ মনে করা হয়।

বিমাতাকে নিয়ে যত হাঁক-ডাক বিপিতাকে নিয়ে তার বিন্দুমা্ত্র নেই। অথচ দুজনের
কিছু কিছু প্রকৃতি একই রকম। বিমাতা একজন সর্বজনীন নারী চরিত্র, অন্যদিকে
বিপিতা(সৎপিতা) কখনও কখনও যে কত নিষ্ঠুর আর নৃশংস হতে পারে তার একটা উদাহরণ
দেই। রাহাত(ছন্দনাম) বিত্তশালী সমাজে সম্মানীত ব্যক্তি। ডিভোর্সের পর
দ্বিতীয় বিয়ে করেন। যাকে বিয়ে করেন তার একটা কিশোরী মেয়ে আছে। বিয়ের পর
তিনি তার সৎ মেয়েকে যৌন নির্যাতন শুরু করেন। বাধা দিতে গেলে ভদ্রলোক ঘোষনা
দেন – মেয়েটি তার সম্পত্তি সুতরাং মেয়েটির সাথে তিনি যেমন ইচ্ছা ব্যবহার
করতে পারেন। এরকম আরও বহু নৃশংসতার কাহিনী আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়
সবসময়। কারন পুরুষতন্ত্রে বিপিতার(সৎপিতা) বাস স্বশাসিত সমাজে আর বিমাতার
বসবাস পুরুষশাসিত সমাজে। তাই বিপিতার আচরণের নিষ্ঠুরতা গল্প উপন্যাসে নেই।

এরকম বহু উদাহরণ আছে যেখানে বিমাতা একজন মায়ের মতো সতীনের সন্তান সন্ততি
নিযে র্নিঝঞ্চাটে সংসার করছেন। ভালভাবে খুঁজলে দেখা যাবে বিমাতার যে চরিত্র
আমরা তৈরি করেছি তা ব্যতিক্রম মাত্র।
আসলে ছোট ত্রুটিকে আমরা বড় করে দেখছি, নিজের ত্রুটিগুলোর দিকে না তাকিয়ে।
নিরপেক্ষ ভাবে উত্তর দিন তো রাস্তায় দুটা বাচ্চা আছাঁড় খেয়েছে – একটি
আপনার, আরেকটি পাশের বাড়ির। কোন বাচ্চাটিকে আপনি প্রথমে উঠাবেন। নিজেরটাকেতো। তারপর পাশের বাড়ির বাচ্চাকেও উঠাবেন। আদর করবেন দুজনকেই্। এটা চিরায়ত
নিয়ম। বিমাতার এই চিরায়ত আচরণকে কেন ক্লাসিক নেতিবাচক রূপ দেয়া হয়েছে? তবে
হ্যাঁ, ব্যতিক্রম আছে, ভালমন্দের মিশ্রন আছে। এটা যদি মানা হয় তবে “বিমাতার
সুলভ আচরণ” বলে কেন সকল বিমাতাকে একই জঞ্জালে ফেলে দেয়া হলো?

বিমাতাসুলভ আচরণ কথাটি মূলত নারীর প্রতি অসম্মানজনক একটি উক্তি। এসব
উপমা নারীর প্রতি ঘৃণা জাগায়, অসম্মানজনক মনোভাব তৈরি করে। এক্ষেত্রে কোন
নারী যদি আত্মসম্মানের আওয়াজ ওঠায় তবে তাকে নারীবাদী বলে আস্তাকুঁড়ে ফেলে
দেয়া হয় ।

হাজার বছরের অভ্যাসবশত নারী অপমান ও ঘৃণার ধারক কখনও কখনও বাহক, নারী
দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রাণী।দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রাণী অপমান ও ঘৃণার প্রতিশব্দ
হতেই পারে। তাই অবহেলা অসম্মানের সহজ বাংলা প্রতিশব্দ বাদ দিয়ে বিমাতাকে
টেনে এনে ভাষায় সৌর্ন্দয বৃদ্ধি করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু এভাবে তাবৎ নারী
জাতির অপুরনীয় ক্ষতি হয়ে গেলো।

বিমাতাসুলভ আচরণ কথাটির বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে একজন মানুষের মস্তিষ্কে
ঢুকে যায় নারীর প্রতি ঘৃণার প্রতিচ্ছবি- তার উপর সে যদি হয় মা(মাতা) তবে তো
কথাই নেই, দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রাণীটির সামাজিক অবস্থানের বিস্তারিত বর্ণনার
ষোলকলা পূর্ণ হয়।এভাবে নারীর প্রতি ঘৃণা-অবজ্ঞার শিক্ষা একজন মানুষ শৈশবেই
পায় সুন্দর সাহিত্যের অন্তরালে।এই মানুষই বড় হয়ে নারীকে যখন বন্ধু,
সহকর্মী, সহচরী না ভেবে উপভোগের বস্তু ভাবে তখন তাকে দোষ দেয়া যায়না।

সাহিত্যে, নেটের জগতে, মিডিয়াতে অনেক সময়ই নারীর উপস্থিতি সম্মানজনক নয়,
বরং নেতিবাচক। একজন মানুষ নারীর প্রতি নেতিবাচক শিক্ষা নিয়ে বড় হবে তারপর
তার কাছ থেকে নারীর প্রতি ইতিবাচক ব্যবহার আশা করা হবে-এই গোলক ধাঁধা থেকে
বের হতে হবে প্রতিটি মানুষকে এখনই…….

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None