ডিপ্রেশন? কি , কেন?

which does not kill us makes us stronger.”

দার্শনিক ফ্রেডরিক নীৎশের এই বিখ্যাত উদ্ধৃতিটি আমি মাঝে মাঝেই নানা জায়গায় পড়ি আর ভাবি, কথাটা কি আসলেই সত্যি? সত্যিই কি আঘাত আমাদের এতোটা শক্ত করে তোলে? অনেক ভেবে উত্তর পেয়েছি- হয়তো তোলে। তবে কিছু আঘাত আছে, যা আমাদের শক্ত করে তোলে না- বরং এতোটাই বিধ্বস্ত করে দেয় যে, মরে যাওয়াটাকে অনেক কাঙ্ক্ষিত মনে হয়। ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা এমনই এক আঘাত।

আশ্চর্যজনকভাবে ইংরেজি এবং বাংলা দুই ভাষাতেই ডিপ্রেশন কিংবা বিষণ্ণতা শব্দটি প্রায়ই তার প্রকৃত অর্থ বোঝাতে পারে না। পরীক্ষায় খারাপ করলে, বাবা-মা’র মৃত্যুতে কিংবা অন্য কোনো কষ্টে তীব্র আঘাত পেয়ে আমরা বলি যে, আমরা বিষণ্ণ, ডিপ্রেসড। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের শুধুই মন খারাপ। এই তীব্র মন খারাপ কিংবা ইংরেজিতে যাকে বলা যায়, Sadness , আর বিষণ্ণতা কোনোভাবেই এক না। মন খারাপ আমাদের জীবনের অংশ- স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সাথে তা দূর হয়ে যায়। কিন্তু ডিপ্রেশন যায় না। আমি অনেকদিন আগে টেড ডট কমে ডিপ্রেসড এক কিশোরের বক্তৃতা শুনেছিলাম- যেখানে সে বলেছিলো, “ডিপ্রেশন এমন এক রুমমেট, যাকে আপনি লাথি দিয়ে বাসা থেকে বের করে দিতে পারবেন না”। ডিপ্রেশন আর ব্যক্তিত্ব (personality) এতো গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে যে, দুটোকে আলাদা করাটা প্রায় অসম্ভব এক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিষণ্ণতা শব্দটার মাধ্যমে কোনোভাবেই আমি এই মানসিক অবস্থাটাকে অনুভব করতে পারি না। তাই পুরো লেখাজুড়েই আমি বিষণ্নতার বদলে তার ইংরেজি প্রতিশব্দ ডিপ্রেশন ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা আসলে কী?

এই প্রশ্নের কোনো ছোটো কিংবা এক কথার উত্তর নেই। বিশদ আলোচনা এই লেখাতে করা সম্ভব না। তবে ইন্টারনেটে অসংখ্য তথ্য ছড়িয়ে আছে- আগ্রহী পাঠক সেগুলি পড়ে দেখতে পারেন। আমি চেষ্টা করবো, মানুষের কিছু ভুল ধারণার ব্যাপারে- যেগুলি ভাঙতে পারলে আপনি হয়তো ডিপ্রেশনের স্বরূপ কিছুটা ধরতে পারবেন।

ডিপ্রেশনের স্বরূপ সম্পর্কে চমৎকার একটি বক্তব্য আছে- , “The opposite of depression is not happiness, it’s vitality” অর্থাৎ, ডিপ্রেশন কিংবা বিষণ্ণতার বিপরীত কখনোই আনন্দ নয়, বরং সক্ষমতা। কথাটা বাংলায় হয়তো একটু জটিল শোনাচ্ছে, আরেকটু ভেঙে বলি- আপনি ডিপ্রেসড নন, তার মানে এই না যে, আপনি সারাদিনই খুব ফূর্তিতে আছে, আনন্দে আছেন। বরং আপনি ডিপ্রেসড নন, তার মানে হচ্ছে আপনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠছেন, প্রাত্যহিক কাজ শেষে বাসা থেকে বের হয়ে অফিসে যাচ্ছেন। সেখানে সহকর্মীদের সাথে কথা বলছেন, বসের সাথে মিটিং করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। দিনশেষে বাসায় এসে আপনার স্বামী কিংবা স্ত্রীর সাথে কথা বলছেন, বাচ্চাদের সাথে খেলছেন। ডিপ্রেশন আপনার এই দৈনন্দিন সক্ষমতাকে শেষ করে দেয়। অধিকাংশ ডিপ্রেসড মানুষই তাদের বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। তাদের শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলেও, তাদের পক্ষে রোজ বিছানা থেকে উঠতে পারাটাই প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। খুব তীব্র ডিপ্রেশন না হলে তারা উঠেন। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তারা শরীরটাকে নিয়ে অফিসে যান, মিটিং করেন। বাসায় এসে তার দায়িত্ব পালন করেন। তারপর একদিন আর সম্ভব হয় না। আমরা জানতে পারি যে অমুক ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা অত্যন্ত অসামাজিক কিংবা তার মাথায় ‘সমস্যা’ দেখা দিচ্ছে।

ডিপ্রেশনের একটা কী-ফিচার (key feature) হচ্ছে, শূন্যতা। ডিপ্রেশনে ভুগছেন এমন অনেকেই জানিয়েছেন যে, তারা বুকের মধ্যে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করেন। নিরন্তর শূন্যতা। এই শূন্যতার অনুভূতিই সবচে ভয়ংকর। এই শূন্যতাই মানুষকে প্ররোচিত করে আত্মহত্যা করতে। দীর্ঘসময় ধরে এই শূন্যতাকে বুকের মাঝে আটকে রাখার পর, একজন ডিপ্রেসড মানুষ একদিন কনভিন্সড হন যে, তার এই জীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন, এবং আত্মহত্যার মাধ্যমে তার এই যন্ত্রণা একবারে বন্ধ করে ফেলা সম্ভব। ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যা প্রবণতা বা সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি তাই খুব ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই ব্লগটি মূলত দু’টি বিষয়কেই মাথায় রেখে লেখা।

নানা অষুধ কোম্পানি মস্তিষ্কের নানা ধরনের রাসায়নিক অসমতা (chemical imbalance) কে ডিপ্রেশনের প্রধান কারণ হিসেবে দাবি করলেও, ডিপ্রেশনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, ডিপ্রেশন কিংবা যেকোনো ধরনের মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রেই আমাদের জ্ঞান বহুলাংশে সীমিত, এখন পর্যন্ত। ধারণা করা হয়, ব্রেইনের কেমিক্যাল ইমব্যালেন্স, বংশগতি, ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনাপ্রবাহ ইত্যাদির সমন্বয়েই মানুষ ডিপ্রেশন আক্রান্ত হন। ডিপ্রেশন একটা রোগ হলেও, এর প্রকৃতি অন্যান্য রোগ থেকে কিছুটা ভিন্ন। আপনি জ্বরে ভুগতে থাকলে জানবেন যে, শরীরের এই তাপমাত্রা স্বাভাবিক না। আপনি ক্যান্সার আক্রান্ত হলে জানবেন যে এই টিউমার এক ধরনের অস্বাভাবিকতা। অথচ ডিপ্রেশন আক্রান্ত হলে আপনার কখনোই মনে হবে না যে আপনার চিন্তাটা ভুল। কারণ, বস্তুত ঠিক ভুল বলে কিছু নেই। একজন ডিপ্রেসড মানুষ জীবনের যে অর্থহীণতা আবিষ্কার করে জীবন যাপনে অনীহা বোধ করেন, তা কিন্তু ঠিক বা ভুলে মাপার যোগ্য না। যারা ডিপ্রেসড নন, তারা স্রেফ জীবনকে নির্দিষ্ট কিছু ফিল্টারের নিচে ফেলে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যান। যে ফিল্টার আমাদেরকে আশ্বস্ত করে যে বেঁচে থাকাই পরমার্থ এবং জীবনের যেকোনো সমস্যার ক্ষেত্রেই জীবনকে ছুঁড়ে ফেলা বাদে অন্যান্য যেসব সমাধান আছে, সেগুলির থেকেই আমাদের একটি বেছে নিতে হবে। ডিপ্রেসড মানুষেরা শুধু সে ফিল্টারটা হারিয়ে ফেলেন। জীবন তাদের কাছে এতো অর্থহীন মনে হয়ে যে, তারা প্রায়ই অবাক হয়ে ভাবেন- তবুও কেনো বেঁচে আছি?

ডিপ্রেশন শুরুতে মানুষকে একধরনের দ্বৈত জীবনযাপনের দিকে ঠেলে দেয়। বাকি পৃথিবীর সামনে একজন সুস্থ, সামাজিক মানুষের অভিনয়, আর একান্ত নিজের কাছে এমন এক জীবন, যেখানে সবকিছুই অর্থহীন। এই দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েনে একসময় দুই জীবনের মধ্যের সেই সেতুটি ধ্বংস হয়ে যায়, আর একজন বিষণ্ণ মানুষ আটকা পড়ে যান তার নিজের আপাত অর্থহীন জীবনে।

ডিপ্রেশন সম্পর্কে আমরা কী ভাবি?

এই লেখার ভাবনাটা শুরু হয়েছিলো মূলত এই বিন্দুকে কেন্দ্র করেই। বেশ কয়েক বছর আগে ফেসবুকে একটি আলোচনা চোখে পড়ে যেখানে ভার্চুয়াল স্পেসের মোটামুটি পরিচিত এক নামকে আমি খুব রূঢ় মন্তব্য করতে দেখি, যারা আত্মহত্যা করেন তাদের সম্পর্কে। এমন মন্তব্য নতুন কিছু না, কিন্তু সেই আলোচনা পড়ে আমি আবিষ্কার করি যে, আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত বিজ্ঞানমনস্ক একজন মানুষও ডিপ্রেশন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে তার মতামত চাপিয়ে দিতে পারেন। সেই মুহূর্তে প্রথম মনে হয়, ডিপ্রেশন সম্পর্কে এই সামাজিক তাচ্ছিল্য (Stigma) দূর করা প্রয়োজন।

ডিপ্রেশন এবং আত্মহত্যা সংক্রান্ত যেকোনো আলোচনায় সবচে বেশি স্টেরিওটাইপড মন্তব্য হচ্ছে, “অমুক মানুষের জীবনে কতো কষ্ট, তবু সে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সে তুলনায় এই লোকের জীবন কত আরামের, তবু কেন সে এমন সিদ্ধান্ত নিলো?” কিংবা “আত্মহত্যা এক ধরনের কাপুরুষতা”। অনেকে আড়েঠারে জানান যে, “ডিপ্রেশন এক ধরনের শৌখিনতা। কই কোনো রিকশাওয়ালার তো ডিপ্রেশন হয় না” কিংবা “যে আত্মহত্যা করতে চায়, তার মরাই উচিত। এদের ব্যাপারে কোনো সিম্প্যাথি নাই”- এমন আরো বহু কথা। একটু ভালো করলে ভাবলেই বোঝা যাবে যে, প্রতিটা কথাই আসলে অজ্ঞতাপ্রসূত, এক ধরনের জাজমেন্টাল বক্তব্য। আমরা সবকিছুই বিচার করার চেষ্টা করি আমাদের অভিজ্ঞতার আলোতে। যা কিছু আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে, তার ব্যাপারে রূঢ় জাজমেন্ট দিতে আমাদের দেরি হয় না। অন্যের জুতোয় পা না গলিয়েই আমরা তার ব্যাপারে চটজলদি সিদ্ধান্তে চলে আসি।

প্রতিটা মানুষের সংগ্রামই তার নিজস্ব, এবং তার ইউনিক। শুধু খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার স্ট্রাগলই একমাত্র স্ট্রাগল না। একজন মানুষ প্রাচুর্যে বেঁচে আছে, তার অর্থ কখনোই এই না যে সে সুখে আছে, ভালো আছে। হয়তো তার পরিবার কিংবা কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক তাকে অসুখী করে তুলেছে। কিংবা সবকিছু ঠিক থাকার পরও শুধুমাত্র মস্তিষ্কের রাসায়নিক সামঞ্জস্যের অভাবে সে অসুখী। কারণ যাই হোক, একজন মানুষ ডিপ্রেসড হতে পারে, এবং তার কষ্টটুকু পুরোপুরি সত্যি। আপনার-আমার যতোই মেকি মনে হোক, তাতে তার কষ্টের তীব্রতাটুকু কমে না। আরেকটা স্টেরিওটাইপড চিন্তা- গরিব মানুষ কখনো ডিপ্রেশনে ভুগে না। শুধু কষ্ট করে একটু ইন্টারনেটে খুঁজলেই এই দাবির অসারতা পাওয়া যাবে। যাদের বড় কোনো শারীরিক সমস্যাতেই ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য থাকে না, তারা ডিপ্রেশনকে চিকিৎসা দরকার এমন সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ডাক্তারের কাছে যাবে, এমনটা আশা করা কিছুটা অবাস্তব। তাই ডাক্তারের চেম্বারে দরিদ্র ডিপ্রেশনের রোগী কম দেখা যাওয়াকে কোনোভাবেই “ডিপ্রেশন শুধু বড়লোকের শৌখিনতা” হিসেবে অনুবাদ করার সুযোগ নেই।

যারা গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছেন, এবং তার লক্ষণগুলিকে আমরা সাধারণভাবে চিনতে সক্ষম, তাদের ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই সহানুভূতিশীল হলেও, ডিপ্রেশনের ব্যাপারে আমরা বেশ নির্দয়। আমরা অধিকাংশ মানুষই একে একটা মানসিক রোগ হিসেবে বুঝতে শিখি না। দেশে থাকাকালীন সময়ে এক বন্ধুর সঙ্গে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে গিয়েছিলাম দুইবার। যিনি গিয়েছিলেন তিনি নিজেও ডিপ্রেশনে ভুগছেন। সেই চেম্বারে ঢুকে আমার অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। সে এক ভিন্ন পৃথিবী। আপাতদৃষ্টিতে যাদের দেখলে স্বাভাবিক, সফল জীবনের অধিকারী মনে হবে, এমন বহু মানুষের ভিড় সেই চেম্বারে। আমি উপলব্ধি করেছিলাম ডিপ্রেশন এমন এক গোপন, গভীর অসুখ, যা আমরা অনেকেই সবার অলক্ষ্যে বয়ে চলি। এমনকি হয়তো পরিবারের মানুষেরা পর্যন্ত জানে না যে তাদেরই একজন কী কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের সমাজ ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আপনার পাশে সহানুভূতির হাত বাড়াবে, অথচ ডিপ্রেশনের কথা শুনলে, যা কিনা ক্যান্সার কিংবা হৃদরোগের মতোই প্রাণঘাতী, এবং প্রতিবছর বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ, আপনাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা শুরু করবে। একজন ডিপ্রেসড মানুষের যুদ্ধটা তাই শুধু রোগের সঙ্গেই নয়, তার চারপাশের সঙ্গেও। মূলত সেই ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফিরে আসবার পরই আমি ডিপ্রেশন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠি, এবং আবিষ্কার করি, আমাদের চারপাশে বহু মানুষ, যাদের আমরা “মেন্টাল”, “আধা পাগল”, “অসামাজিক”, “অলস”, “বেকুব” ইত্যাদি বলে ক্লাসিফাই করে এসেছি, তারা হয়তো শুধুই ডিপ্রেশনের স্বীকার। গোটা বিশ্বেই ডিপ্রেশন সম্পর্কে মানুষের লুকোছাপার প্রবণতা আছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল, এবং রক্ষনশীল দেশে সেই প্রবণতা, ট্যাবু আরো বহুগুণে শক্তিশালী। এ কারণে আমাদের সমাজে একজন ডিপ্রেসড মানুষের স্ট্রাগলটাও তুলনামূলকভাবে তীব্র।

তবে আমাদের কেমন ব্যবহার করা উচিত?

এর উত্তর এক কথায় হচ্ছে, সমানুভূতিশীল বা ইংরেজিতে যাকে বলে এমপ্যাথেটিক (empathetic)। সমানুভূতি শব্দটা অনেকটাই অচেনা। আমরা চারপাশে খুব একটা ব্যবহার হতে দেখি না, এর কারণ হয়তো আমাদের আচরণের মধ্যে এই গুণের অভাব। সমানুভূতি হচ্ছে অনেকটা অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে তার দুঃখ অনুভব করার মতো। সমানুভূতি আর সহানুভূতির মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। সহানুভূতির মধ্যে কিছুটা করুণার আভাস থাকে, পক্ষান্তরে সমানুভুতি জাজমেন্টশূন্য এক অবস্থান, যেখানে আপনি প্রকৃত অর্থেই অন্যের মানসিক অবস্থার একটা অনুমান পাবেন। সমানুভূতি বা এম্প্যাথি সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে পারেন এখান থেকে। সহজভাবে বললে, একজন ডিপ্রেসড মানুষকে দুম করে জাজ করে ফেলবেন না। তাকে বোঝাতে যাবেন না কেন তার জীবন আরো অনেকের চেয়ে ভালো, কিংবা তার এই ধরনের চিন্তার কোনো মানে নেই। আপনি যদি ভালো মনেও কথাগুলি বলে থাকেন, তবুও আপনি আসলে তার উপকার করছেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিপ্রেসড একজন মানুষ মূলত একজন মানুষকে চায় যার কাছে সে তার কথাগুলি বলে কিছুটা নির্ভার হতে পারে, এবং অবশ্যই যে মানুষটি জাজমেন্টাল না। আপনি একজন ক্যান্সার রোগীকে কি কখনো বলবেন যে, অন্য কারো জীবন কতো ভালো, কিংবা অন্য কেউ কষ্টে থেকেও কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে? যদি না বলেন, তবে কেন একজন ডিপ্রেশনের রোগীকে আপনি এই কথাগুলি বলবেন, যেখানে ডিপ্রেশন ক্যান্সারের মতোই প্রাণঘাতী একটি অসুখ? কাজেই ডিপ্রেসড মানুষের প্রতি কোনো কথা কিংবা আচরণেই যেন জাজমেন্ট প্রকাশ না পায়, সেই ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা জরুরি।

কয়েকমাস আগে যখন অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস আত্মহত্যা করেন, তখন সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখেছি মানুষের জাজেমেন্টাল কমেন্টের ঝড়। কেউ কেউ বিস্মিত হলো যে এমন বিখ্যাত একজন অভিনেতা কেন আত্মহত্যা করবেন। কেউ কেউ বিশেষজ্ঞ মতামত দিলো, “স্টারদের জীবন এমনই হয়।” কেউ কেউ আরো এক কাঠি সরেস- দাবি করলেন,” যতো বড় অভিনেতাই হোক, আত্মহত্যা যে করে সে কাপুরুষ। তাকে নিয়ে আফসোসের কিছু নেই।” কেউ একবারও ভাবলো না, কতোখানি অসহায় হলে একজন মানুষ এতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে? যে আজ আত্মহত্যা করলো, তার কাছে জীবন কতোটা অর্থহীন ছিলো? সবটুকু আবরণ সরালে নিজেকে ছাড়া তো আমাদের আর কিছু নেই। সেই নিজেকেই মুছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একটা মানুষের কতোটা শূন্য, কতোটা অসহায় লাগে? না, আমরা কেউই এসব ভাবি না। রবিন উইলিয়ামসের ক্ষেত্রে ভাবি না, নাম না জানা কোনো মধ্যবয়েসী মানুষের ক্ষেত্রেও ভাবি না। আমরা যারা মানসিকভাবে সুস্থ আছি (সুস্থতা শব্দটা এই ক্ষেত্রে একটা আয়রনি), তারা আসলে একটা নির্দয় জাজমেন্ট মেশিন। আমাদের চিন্তার স্কোপের বাইরে যা কিছু, তাকেই আমরা বাতিল করে দেই। যে মানুষটা আজ ঝরে গেলো, সে যদি আমাদের মধ্যে কাউকে পেতো, যে বিনা জাজমেন্টে তার কথাগুলি শুনতো, তাকে নিরর্থক জ্ঞান না দিয়ে, অনুরোধ করতো জীবনকে আরেকটা সুযোগ দেওয়ার জন্য, হয়তো একটা জীবনকে আমরা বাঁচাতে পারতাম।

সত্যিকারের বন্ধু হিসেবে যদি পাশে দাঁড়াতে চান, তবে এম্প্যাথি নিয়ে একজন ডিপ্রেসড কিংবা সুইসাইডাল মানুষের কথাগুলি শুনুন। এমনকি বলবার দরকার নেই যে, আপনি তার কষ্ট অনুভব করতে পারেন (যেটা সম্ভবত আসলেই পারেন না)। আপনি শুধু শুনুন- বলবার দরকার নেই কে ভুল, কে ঠিক, কিংবা জীবন কতো চমৎকার। ডিপ্রেসড মানুষের রিকভারি অনেক সহজ হয়ে যায় যখন তার পরিবার, বন্ধু, আপনজনেরা তার ডিপ্রেশন দিয়ে তাকে জাজ করে না।

আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশে ছোটো স্কেলে হলেও আত্মহত্যা-প্রবণতা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। হাত বাড়িয়ে দাও উদ্যোগটি এরই মধ্যে বিখ্যাত হয়েছে। তবে এ কেবলই শুরু। আমি এমন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি, যেখানে ডিপ্রেশন কিংবা অন্যান্য মানসিক ব্যাধিকে আর অন্যান্য শারীরিক রোগের মতোই গুরুত্ব সহকারে, কোনো জাজমেন্ট ছাড়াই ট্রিট করা হবে। যে পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ তার ডিপ্রেশনের জন্য সংকোচে ভুগবে না, কাউকে আর ‘সুস্থ মানুষের’ অভিনয় করতে হবে না। শুধু মাত্র জাজমেন্টশূন্য, এম্প্যাথিপূর্ণ হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই এ স্বপ্ন কোনোদিন সত্যি হতে পারে।

লেখাটা শেষ করবো আমার অত্যন্ত প্রিয় একটা টেড টকের লিঙ্ক দিয়ে। এই লেখাটা পড়ার ধৈর্য্য যদি কারো না থাকে, তবু অন্তত টক-টা শুনুন। বক্তা নিজে ডিপ্রেশনের শিকার ছিলেন- দীর্ঘ যুদ্ধের পর তিনি ফিরে এসেছেন সাধারণ জীবনে। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে শুনুন ডিপ্রেশনের কথা। 

যারা ডিপ্রেশন সম্পর্কে জানতেন না, কিংবা আত্মহত্যাপ্রবণ একজন মানুষকে তাচ্ছিল্য করতেন, আশা করি ডিপ্রেশনের সূক্ষ্মতা, এবং ভয়াবহতা কিছুটা অনুভব করতে পেরেছেন। আপনার আমার চারপাশে অগণিত জনস্রোতে যে ডিপ্রেসড মানুষগুলি আছেন, তারা যেন অন্তত এইটুকু নির্ভরতা পান যে, তাদের পাশে আমরা আছি। বরাবরই থাকবো। এ অসম্ভব যুদ্ধটাকে অন্তত জেতার যোগ্য করার সম্ভব এভাবেই।

মেহরাব শাহরিয়ার মারুফ

বিএসএমআরএইউ 

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None