পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর নব উদ্দীপনা

প্রকৃতিগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী
এলাকাগুলো উর্বর ও অনেক প্রকার ফসল উৎপাদনের উপযোগী। একটা সময় ছিল পাহাড়ে জুম চাষ
ছাড়া অন্য কোন আবাদ হতো না। পাহাড়ীরাও তাদের এই ঐতিহ্যবাহী ফসল উৎপাদনের প্রক্রিয়া
থেকে আধুনিক চাষাবাদের প্রতি মনোযোগীও ছিল না। তবে জুম চাষ সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর
হওয়ায় অধিক খরা বা বৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হতো। এতে খাদ্যাভাবও দেখা দিত। এখন
বিকল্প ফলন হিসাবে ফলের চাষ পাল্টে দিয়েছে পাহাড়ের অর্থনীতির চিত্র। পার্বত্য
চট্টগ্রামের পাহাড়ে উৎপাদিত আনারস, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে ইত্যাদি দেশের প্রচুর
চাহিদাও পূরণ করে আসছে। বলা চলে পাহাড়ে মিশ্র ফলের এই চাষ কৃষি সেক্টরে বিপ্লব
এনেছে। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কমলা ও মাল্টার মতো ফলের উৎপাদন। এখানকার
সুস্বাদু কমলা আর মাল্টা বাজারজাত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। উদ্ভাবিত এই ফল এখন
সারাদেশে পরিচিত নাম সবুজ কমলা ও হলুদাভ মাল্টা। পাহাড়ে আসা পর্যটকদের হাত ধরে টক-মিষ্টি স্বাদের গোলাকার এই ফল এখন পাহাড়ের সীমানা
পেরিয়ে পাওয়া যাচ্ছে সারাদেশে। এতে বাণিজ্যিকভাবেও আসছে সফলতা। আয় যাচ্ছে কৃষকের
হাতে। এখন জুম চাষের পরিবর্তে পাহাড়ীরা কমলাসহ মিশ্র ফল চাষের প্রতি ব্যাপকভাবে
আগ্রহী হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে তিন
পার্বত্য জেলার ৬শ’ কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয় সরকার। সে
লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড পাহাড়ে মিশ্র ফল চাষের উদ্যোগ নেয়।
প্রাথমিক অবস্থায় ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষীদের মধ্যে কমলা, মাল্টা ও মিশ্র ফসল চাষ শুরু হয়। ১৯৯৯ থেকে ২০১৬ সাল
মাত্র ১৮ বছরের ব্যবধানে পাহাড়ে মিশ্র, বিশেষত কমলা ও মাল্টা
চাষ করে বহু পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। ২০০৬-০৭ মৌসুমে তিন জেলায় প্রায় ১০ লাখ টন ফল উৎপাদন
হয়েছে। সর্বশেষ মৌসুমে এ সংখ্যা বেড়ে  পৌঁছেছে
১৭ লাখ টনে, যা গত এক দশকে পার্বত্য জেলায় ফল উৎপাদনের নতুন রেকর্ড। গত এক
বছরের ব্যবধানে পার্বত্য তিন জেলায় ফল উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ টনের বেশি। পার্বত্য
চট্টগ্রামে ২০১৪-১৫
মৌসুমে ৯৭ হাজার ৬৮৪ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ১৬ লাখ ৪১ হাজার ৫৩০ টন ফল। ২০১৫-১৬ মৌসুমে ৯৭ হাজার ৭০৬ হেক্টর
জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৬ টন। অর্থাৎ এক বছরের
ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে ১ লাখ ৪৬৬ টন। ফল চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে
প্রশংসাযোগ্য। এতে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নব উদ্দীপনা তৈরি হচ্ছে, ফলনে উৎসাহ যোগাচ্ছে। তাদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথ
দেখাচ্ছে। 

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None