একজন বাংলাদেশী হতে পেরে গর্বিত...

মারজুক ভাইয়ের মামা দেশে এসেছেন সম্প্রতি। বিয়ে করবেন। ছয় বছর পর দেশে এলেন, তাই অনেক গল্প জমে গেছে । কথা যেন ফুরাতেই চায় না। দু'দিন আগেই, সন্ধ্যায় কিছু পিঠা নিয়ে হাজির হলাম (আরামবাগে একটা পিঠার দোকান আছে। গাজী পিঠা ঘর। জোশ পিঠা বানায়। পাঠকের দাওয়াত Smiling )

পিঠা খেতে খেতে মামা'র গল্প শুনছিলাম। এটা সেটা অনেক গল্পের পর মামা ও মাহমুদ ভাই বাইরে কোথায় যেন যাবেন, তাই উঠে পড়লেন। এটা সেটা প্রস্তুতি নিতে নিতে হঠাৎ মামা চাবি খুঁজতে শুরু করলেন। এবং কিছু ক্ষনের মাঝেই চাবি পাওয়া গেল। বেশ বাহারি চাবি।

"এই চাবি পাওয়া না গেলে তো আমি শেষ..." মামা বললেন।

"ক্যান? চাবি বানাবেন আরেকটা।" মারজুকের তড়িৎ জবাব।

" আরে, কোন আইডিয়াই নাই তোমার। এজন্য একথা বলতেছ। কানাডায় চাবি বানানো এত্ত সহজ না।"

"কেনো? "

"কানাডায় প্রত্যেক তালার চাবির কপি গভমেন্টের কাছে থাকে। তুমি যদি নতুন বাড়িতে ওঠো, তবে স্থানীয় থানায় তোমার চাবির কপি যাবে। কোন কারনে যদি চাবি বদল করতে হয় তবে থানায় জানালে তারা নতুন চাবি দেয়ার ব্যবস্থা করবে।"

"খাইছে, এটাতো ভয়াবহ ব্যুরোক্র্যাসি!!"

আমি একটু বামহাত দিয়ে দিলাম ডিসকাশনে, " এটা কেন করা হয়, মামা?"

"তোমার সিক্যুরিটি। সরকার তোমার  নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এছাড়া যদি কখনো তোমার বাসা চেক করার দরকার হয়, তবে তারা চাবি নিয়ে এসে তোমার বাসার তালা খুলে চেক করবে।"

মারজুক জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকে। " আরে নাহ, এটা তো স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকলো না। সরকার যখন খুশি আমার বাসায় ঢুকবে??"

"নাহ, যখন তখন তো ঢুকবে না। বরং যখন দরকার তখনই ঢুকবে।" মামার জবাব।

" কেমনে শিওর হইলেন মামা? "

" সরকারের কি আর কোন কাজ নাই নাকি?"

এপর্যায়ে মাহমুদ ভাই যোগ দেয়, "দেখেছ মারজুক, কেমন একটা consolidating approach? এই পুরো বিশ্বব্যবস্থাই  একটা সেন্ট্রাল সিস্টেমের আওতায় চলে আসছে। সবকিছুই একটা মেইনফ্রেম থেকে যেন কন্ট্রোল্ড হবে সামনের দিনে। The Arrival এ কিন্তু এই কথাগুলোই বারবার বলা হয়েছে। "

এইসব কথা শেষ হয়ে এল, কারন মাহমুদ ভাই ও মামা তাদের সান্ধ্য অভিযানে বের হবেন। আমি ও মারজুক ও বের হয়ে এলাম বাসা থেকে। বাইরে এসে মনটা ভরে গেল এক্কেবারে। ব্যাপক এক পশলা বৃষ্টির পর নতুন চকচকে রাস্তাঘাট। মারজুক ভাই আর আমি হাটতে থাকলাম।

হাটতে হাটতে আমরা দৈনিক বাংলার কাছাকাছি এসে চৌরাস্তায় দাড়ালাম। পাশেই একলোক ছোট্ট ডেকচি নিয়ে বিরিয়ানি বিক্রি করছিল। আমি পারতপক্ষে রাস্তার খাবার খাইনা। মারজুক ভাই আবার এসব ব্যাপারে আমার উল্টো।Ratatouille দেখার পর থেকে মারজুক ভাই তারা এই "খাদক" প্রকৃতির ব্যাখা দেন এভাবে "I do not like food, I just love them" ।

যাই হোক, আমি ওনাকে খ্যাপানোর কোন চান্স মিস করি না। ওনার এই ডায়ালগ শুনার সাথে সাথে আমি অবধারিত ভাবেই বলি, "আরে, আপনি ফুডরে লাভ করবে কি? আপনি তো তাদের ভক্ষন করতেই লাইক করেন। You are nothing but a ভক্ষক Laughing out loud "। মারজুক ভাই কৃত্রিম রাগের ভান করেন।

চৌরাস্তায় দাড়িয়ে মারজুক ভাই একপ্লেট বিরিয়ানির অর্ডার দিলেন। ডিম বিরিয়ানি=২৫ টাকা, মুরগি বিরিয়ানি= ৩৫ টাকা। আমরা মুরগি বিরিয়ানি নিলাম। মোড়ে আসার পথেই দুইটা চকোলেট দুধ কিনে খেতে খেতে আসছিলাম। খাওয়া এখনো শেষ হয়নি, তার মাঝেই আল্লাহ কপালে বিরিয়ানি লিখে রাখছেন। এক লোকমা বিরিয়ানি সাথে চকোলেট দুধ থেকে ছোট্ট ছোট্ট সিপ। খাটি বাংলায় বলতে হয় "সাধু...সাধু"

আমাদের আয়েশ করে খাওয়া দেখে আশে পাশের পানদোকানদার, ফার্মেসি ওয়ালা ও পথচারিরা কিছুক্ষন মজা পেলেও অল্প সময়ে তারা বুঝে ফেলল এটা এদের নতুন ঘটনা না। প্রায়ই তারা এরকম "রাত্রিকালীন অভিযানে" বের হন।

খাচ্ছি আর গল্প করছি এটা সেটা নিয়ে। কানাডার তালা চাবি ব্যবস্থাপনা নিয়ে খানিক আলাপ হলো। দ্যা এরাইভালের সাথে যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা ও হলো। খাওয়ার শেষ দিকে এসে দেখি একটা কার আমাদের বিরিয়ানি বিক্রেতার ডেকচির গা ঘেষে দাড়িয়ে আছে। ব্যাপার কি? ওহ, ওটা মোড় ঘুরানোর চেষ্টা করছে। বিরিয়ানিওয়ালা তার ডেকচি নিয়ে এক্কেবারে রাস্তার মোড়েই দাড়িয়েছে। তাই কিছুক্ষন পরপরই রাস্তায় একটু একটু জ্যাম লেগে যাচ্ছিল।

"নেজাম দেখ, এই যে এই ভদ্রলোক রাস্তার পাশে দাড়িয়ে ব্যবসা করছে, এটা এই বাংলাদেশেই সম্ভব। কানাডায় কস্মিনকালও না।" মারজুক ভাই বলে।

"তা তো অবশ্যই। একটা বিষয় দ্যাখেন, এই লোকটা প্রকৃতপক্ষ ঐ ট্যাক্স পেয়িং ড্রাইভারের রাস্তায় স্মুথলি চলার অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে। বাংলাদেশ এটাকে allow করলেও কানাডা কখনোই এই ভুল (?)করবে না। "

" বাহ, নতুন perspective। তাহলে আমরা প্রতিনিয়ত কত অধিকার ছেড়ে দিচ্ছি। ঐযে পানওয়ালা ফুটপাতে দোকন সাজিয়েছে শত শত পথচারির অধিকার মেরে। কিন্তু কোন পথচারি একবারের জন্যও ফীল করেনা এই ব্যাপারটা। আচ্ছা, এটা কি সহমর্মিতা না অসচেতনতা?"

" অসচেতনতা হতে পারে। সে যাই হোক, আপনি তো ব্যাপারটা বুঝেছেন, আপনি কি এই অধিকারটা ক্লেইম করবেন? করবেন না। কারন এটাই বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ এরকম না হয়ে একটা "কানাডীয় বাংলাদেশ" হলে এই বিরিয়ানি ওয়ালা বা পানওয়ালা কারোরই বেচে থাকার কথা ছিল না। একজন কানাডীয়ান না হয়ে এখন কিন্তু আমার ইচ্ছা করছে আমার এই "সহমর্মী এবং বোকা বাংলাদেশ"কে ভালবাসতে। চিন্তা করেন তো, কানাডার মতো এতো কঠিন সমাজব্যবস্থা হলে এদেশের লোকসংখ্যা কবেই ৪ কোটিতে নেমে আসত!"

মারজুক মাথা নাড়লেন, একমত। আমরা খাবার শেষ করে হাত ধুয়ে বাসার ফিরতি পথ ধরলাম।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (3টি রেটিং)

অনেক স্বল্পতা আমাদের, অনেক অনিয়ম-দূর্নীতি, অনেক দারিদ্র্যতাও; তারপরও কোথাও কোথাও যেন এদেশেরই আমরা স্বাধীন, এদেশেই প্রাণের প্রশান্তি লুকিয়ে।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

আপনাকে ফাইভ স্টার দিতে লগইন করলাম। গল্প লেখার হাত খুব ভালো আপনার।

আসসালাম।

নিয়াজ শাহেদী ভাই দেশে আসছেন শুনেছি
আপনি দয়া করে আমার নাম্বারটি দেবেন
০১৮১৯-৫১৫১৪১
আর বলবেন সালাম দিয়েছেন।


মা'আসসালাম।

পৌঁছে দিলাম।

পোষ্টের ছবি সেটিংটা খুব চমৎকার হয়েছে। লেখাটিও। ধন্যবাদ।

-

দৃষ্টি আমার অপার সৃষ্টি ওগো.... ! @ www.fazleelahi.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.3 (3টি রেটিং)