বইপাগল চন্দনের গল্প

বই মানুষকে আলোকিত করে আনন্দ দেয়। তবে সেই আনন্দ একেকজনের কাছে একেক রকমের হয়। শুধু বই পড়ে যিনি এখন সবার কাছে সুপরিচিত তিনি হলেন চন্দন। পুরো নাম মীর মো. হাবিবুর রহমান চন্দন (৫২)। অজপাড়া-গাঁ থেকে তিনি বইয়ের টানে ছুটে আসেন শহরে। সেখানকার বিভিন্ন লাইব্রেরী ঘুরে কেনেন পছন্দের যতসব বই। বই-বই-বই। বই পড়াই তাঁর নেশা ধ্যান-জ্ঞান সবকিছুই। বই নিয়ে পাগলামির কারণে একদিন তাঁর স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যায়। সিলেবাস বহির্ভূত বই পড়ার কারণে একাডেমিক শিক্ষাও শেষ হয়নি তাঁর। তবুও তিনি বই পড়া থেকে সরে দাঁড়াননি। চন্দনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর ইউনিয়নের ঊরদিঘী গ্রামে। বাবা হারেছ মিয়া একজন সাধারণ কৃষক। কেবল বই নিয়ে মেতে থাকায় পরিবারের অন্যরাও তার প্রতি নাখোশ। হুমায়ূন আহমেদ-এর উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র মিসির আলী যেমন যুক্তিতে বিশ্বাস করে, চন্দনও ঠিক সেরকম। বই পড়া নিয়ে চন্দনের যুক্তি হলো, জীবনে আনন্দ থাকতে হবে। আনন্দ ছাড়া পানসে জীবনের কোনোই মূল্য নেই। বই পড়েই সে আনন্দ পাওয়া যায়। তিনি জানান, লেখক-সাহিত্যিকদের আমি শ্রদ্ধা করি। আর তাই সব সময় চেষ্টা করি ভালো ভালো বই পড়তে। পড়া বইগুলোর অধিকাংশেরই বিষয়বস্তু বা কাহিনী তার মুখস্থ। শুধু তাই নয়, প্রথম শ্রেণী থেকে স্নাতক পর্যন্ত বাংলা পাঠ্যবইয়ের ছোটগল্পের নাম বললে তিনি তার লেখক ও কাহিনী পুরোপুরি বলে দিতে পারেন। বাংলা সাহিত্যের ক্যাসিকেল সব বই-ই তাঁর পড়া। এ পর্যন্ত দুই শতাধিক বই পড়েছেন তিনি। এরপরও বই পড়া নিয়ে কোন কান্তি নেই তাঁর। এই বই পড়ার কারণে চন্দনকে আড়ালে ‘পাগল’ বলে মন্তব্য করেন কেউ কেউ। ১৯৮৩ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারেননি চন্দন। পাঠ্যবই বাদ দিয়ে কেবল অন্য বই পড়ার কারণে তার এ দশা। তাই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার দিকে আর এগোতে পারেননি। প্রায় ১০/১২ বছর আগের কথা, তার পরিচিত এক লোক অদ্বৈত্ত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বইটি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাকে নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুরি পর্যন্ত নিয়ে ফাঁকি দিয়ে চলে যায়। পনের বছর আগে বিয়ে করেছিলেন কটিয়াদী উপজেলার নাগের গ্রামের খান বাড়ির তায়েবা খাতুন তাসলিমাকে। শুধু বই নিয়ে পড়ে থাকায় তার স্ত্রী একদিন ভুল বুঝে তাকে ছেড়ে চলে যায়। বউ তাকে ছেড়ে গেলে কি হবে, তবুও বইকে তিনি ছাড়তে পারেননি। বাবার রেখে যাওয়া কৃষিজমি চাষ করে সংসার চলে চন্দনের। কেবল বই কেনার জন্য স্থানীয় বাজারে একটি ছোট হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান খুলে বসেছেন তিনি। এ ব্যবসার আয়ের পুরোটাই তিনি ব্যয় করেন বই কেনার পেছনে। কোন উপলক্ষে কেউ তাকে কোন উপহার দিতে চাইলে, তাদেরকে বই উপহার দিতে বলেন। ঈদে নতুন জামা-কাপড় না কিনে সে টাকায় বই কিনেন তিনি। অতিমাত্রায় বই পড়ার কারণে এলাকায় তিনি ‘বইপাগল’ হিসেবে পরিচিত।
প্রতিবছর একুশে বইমেলা এলে তিনি নতুন বইয়ের খোঁজখবর নেন। প্রতিবছরই মেলায় যেতে চান তিনি। কিন্তু আর্থিক অসঙ্গতির কারণে সব সময় যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। যে বছর না যেতে পারেন, মনটা কাঁদে। এসময় জেলা শহরের বইয়ের দোকানগুলোতে এসে নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকে মেলা যেতে না পারার কষ্ট ভোলার চেষ্টা করেন তিনি। চন্দন বলেন, প্রতিদিন বই না পড়লে আমার অস্বস্তি লাগে।
বই পড়ার বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃ’ উপন্যাসের আত্মহননকারী নারী ও রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ছুটি, পোষ্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালার ফটিক, রতন ও মিনির কথা মনে হলে তার এখনো কান্না পায়। বিভূতি ভূষণের ‘পথের পাঁচালী’র দুই ভাইবোন অপু-দুর্গার সখ্য তাকে খুব আনন্দ দিয়েছে। তবে দুর্গার মৃত্যুতে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন। উপন্যাসটি শেষ করে সেদিন রাতে তিনি কিছুই খেতে পারেননি। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত হলো চন্দনের স্বপ্নের নায়ক। শ্রীকান্তের জন্য তার খুব মায়া হয়। এইতো সেদিনও আবারও পড়েছেন আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবি’ পড়ে শোষিত মানুষের সংগ্রামের প্রতি তার শ্রদ্ধা বাড়লেও তিনি রক্তারক্তি পছন্দ করেন না। সব মিলিয়ে চন্দনের জীবন বইকেন্দ্রিক ও বই প্রেমিক।
সূএ:নতুনখবর

ছবি: 
আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)

কুরআন নামক বইটি বইপাগলের হাতে পৌঁছেছে?

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 3 (টি রেটিং)