কালবৈশাখীর তাণ্ডব ! (ছোটগল্প)

মাথা বনবন করে ঘুরছে আলীম মিয়ার । চোখের পানির চেয়ে বুকের গোপন ব্যাথাই বেশী কাবু করে তুলছে আলীমকে । জীবনের শুরু যেদিন থেকে তার কষ্টের শুরুও সেই আদিকালের । জন্ম হয়েছিল কলাপাতার ছাউনী দেয়া এক ভাঙ্গাচোরা বেড়াঘরে । জন্মের পর তার কান্নার শব্দ নাকি কেউ শুনেনি কালো বৈশাখীর সাঁ সাঁ শব্দে হারিয়ে গিয়েছিল তার কান্নার চিত্‍কার । তাকে নিয়ে ব্যস্ততা ছিলনা কারো সবাই ঘরদোর বাঁচাতে ব্যস্ত । সদ্য জন্মদাত্রী মাও জীবনের তাগিদে বাচ্চাকে নিয়ে দুলতে থাকা ঘর থেকে বের হয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল আর বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাথা গোঁজার একমাত্র জায়গাটিও পড়ে গিয়েছিল ।
হাড় জিরজিরে ছোট দুই বোন অসুস্থ বাবা আর অসহায় মায়ের দিকে তাকিয়ে সেই কোন ছোটবেলায় ভাড়ায় রিক্সা চালাতে শুরু করেছিল আলীম ঠিক মনে নেই । তবে প্রথম দিন রিক্সা চালাতে গিয়ে এক ভুড়িওয়ালা লোকের পান্জাবীতে ছিটেকাঁদা লাগানোর জন্য যে কষে থাপ্পর খেয়েছিল তা মনে পড়লে আজো ডান গালটা টনটন করে ওঠে । মা অনেক জিজ্ঞাসা করলেও সেদিন কান্নার কারন বলতে পারেনি আলিম ।
তারপর কেটে গেছে অনেক সময় । আলিম এখন ২ সন্তানের বাবা । ছেলে দুটিকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন আলিমের । তারা লেখাপড়া করবে বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হবে । তখন আর আলিম রিক্সা চালাবে না । তাই অনেক কষ্ট সত্বেও ছেলে দুটোকে সংসারের কাজে লাগায় না ।
রাতের বেলা আলিমের পায়ে বিষ তেল মাখে খোদেজা বিবি । এই পা দুটির অবিরাম ঘূর্ণন গতিতে সংসারের চাকা ধীরে ধীরে ঘোরে এর উপর নির্ভর করেই ছোট বোন দুটিকে কোন রকমে বিয়ে দিয়েছে বাবা মায়ের চিকিত্‍সা করেছে বাবা মারা যাওয়ার পর এখনও ৫ টি মানুষের সংসার চালাচ্ছে ।
ছেলে দুটিকে লেখাপড়া করাতে গিয়ে আর সংসারের ঘানি টানার পর আজও একটি রিক্সা কিনতে পারেনি আলিম তাই প্রতিদিন তিরিশ টাকা ভাড়া দিতে হয় । বেড়ার ঘরটিও মেরামত করা হয় না বছর তিনেক ধরে । তাছাড়া বাজারের এ অগ্নিমূল্যের দিনে সংসার চালাতেই হাঁপিয়ে উঠতেছে আলিম । তবু ছেলে দুটোকে নিয়ে আশার ফানুসে ভর করে এখনও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সে ।
গত মাসে আলিম একদিন বাড়ি এসে দেখে ছোট ছেলেটা তোতলা মুখে বলছে বাবা আমাদের আম গাছে মৌল ধরছে , এ কথা শুনে মন খারাপ হয়ে যায় আলিমের অনাগত দিনগুলোর কথা ভেবে । ঘরের ছনগুলো মাঝে মাঝে হাঁ করে তাকিয়ে আছে ভাবে যে করেই হোক আগামীবার এগুলো ঠিক করতে হবে ।
বসন্তের গোধূলীবেলায় আম গাছের মৌল ধীরে ধীরে ছোট ছোট আমে পরিণত হয় । চলে আসে বৈশাখ আলিমের জন্মের সাথে যার দারুণ সখ্য যে আড়াল করেছিল আলিমের কান্না !
সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ক্লান্ত আলিম এখন গভীর ঘুমে মগ্ন । বাইরে কাল বৈশাখী তার তান্ডব দেখিয়ে যাচ্ছে আপন গতিতে । খোদেজা বিবির চিত্‍কার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গে আলিমের । ঘুম থেকে উঠে কিছু বুঝতে পারেনা আলিম দেখে ঘর দুলতেছে । ঘরের পশ্চিম দিকের বাঁশের খুটি হঠাত্‍ শব্দ করে ভেঙ্গে যায় । দিগ্বিদিকশুন্য হয়ে ঘর থেকে ছুটে বের হয় আলিম । পাশের বাড়ির দেউড়িতে আশ্রয় নিয়ে খোদেজা ও বড় ছেলেটাকে দেখে বুক ছ্যাত করে ওঠে আলিমের কিয়ামতের তান্ডবের মত কালবৈশাখীকে অগ্রাহ্য করে ছুটে যায় ঘরের দিকে আলিমের কাছে ছোট ছেলেকে না দেখে বুক ফাটা চিত্‍কার করে পিছু নেয় খোদেজাও ।
তিন দিন পর পেটের দায়ে রিক্সা নিয়ে বের হয় ছেলে হারানোর শোকে ভারাক্রান্ত আলিম । চৌরাস্তায় আজে একটার বদলে দুইটা রিক্সা ! দুইটার মালিকেরা কেউ কারো দিকে তাকায় না অন্য দিকে মুখ করে দুজনেই চোখ দিয়ে জল ঝরছে অবিরাম । একজনের স্বপ্ন নষ্টের বেদনা আর অন্যজনের খাতা কলম ছেড়ে রিক্সার হ্যান্ডেল ধরে বাবার স্বপ্ন পূরনে ব্যর্থতার বেদনা ।
তাদের চোখের জলে ভাগ্যলিপির প্রতি অভিযোগের ভাষা আর বুকের ভিতরে চলছে থেমে যাওয়া কালবৈশাখীর দুরন্ত তাণ্ডবলীলা ।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

গল্পটা সত্যিই খুব হৃদয়স্পর্শী। ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।

-

আড্ডার দাওয়াত রইল।

> > > প্রতি শুক্রবার আড্ডা নতুন বিষয়ে আড্ডা শুরু হবে।

আপনার ঘটনা বর্ণনায় ও বিষয় নির্বাচনে আমি মুগ্ধ। ধন্যবাদ। আরো আশা করছি।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

সালাম

*****

-

▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬
                         স্বপ্নের বাঁধন                      
▬▬▬▬▬▬▬▬ஜ۩۞۩ஜ▬▬▬▬▬▬▬▬

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)