দায়ী ইলাল্লাহর গুনাবলী। পর্ব ৩

দায়ী ইলাল্লাহর গুনাবলী। পর্ব ৩
৩- জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্টত্ব অর্জন।
একজন দায়ী ইলাল্লাহ তথা আল্লাহর পথে আহবানকারীকে অবশ্যই জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্টত্ব অর্জন করতে হবে। যাতে করে দুনিয়ার অন্যান্য বাতিল মতবাদগুলোর মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্টত্ব প্রমান করা যায়। যেন মানুষের সামনে এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, মানুষের রচিত মতবাদের চেয়ে আল­াহর প্রেরিত বিধান ও তার রাসুলের আদর্শ অতীব উত্তম এবং এটাই মুক্তির পথ। প্রবৃত্তি পুজারীদের আবিস্কৃত সকল মতবাদ সম্পর্কে
বিস্তারিত জ্ঞানই শুধু নয় এ সকল মতবাদ সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত থাকার কারনে মানবগোষ্ঠী কি কি সমস্যার সম্মুখীন তা বোঝাবার মত পান্ডিত্য অবশ্যই আল­াহর পথের দা’য়ীকে অর্জন করতে হবে।  
শাইতান উদ্ভাবিত এমন অনেক শিক্ষাব্যবস্থা এ দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত আছে যা অন্ধকারেরই নামান্তর, আলো নয়। সে শিক্ষাব্যবস্থার প্রণেতাগন অর্হীভিত্তিক শিক্ষানীতিকে আলো বলতে নারাজ। যদিও আল­াহ তার দ্বীনকে নুর তথা আলোর সাথে তুলনা করেছেন (দ্রষ্টব্য: সুরা আন-নিসা ১৭৪, সুরা আল-আনআম ৯১) অতএব, কেন আলো সে পথে নেই তা বোঝানোর জন্যে ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন পান্ডিত্যের যাতে সেসকল ধারণার অন্তসারশুন্যতা প্রমাণ করা সম্ভব হয় এবং বস্ত্তবাদের বদলে ইসলামের প্রাধান্য ও উপযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সর্বসাধারণের জন্যে তিনি হবেন জ্ঞানের খনি তুল্য যা থেকে মানুষ জ্ঞান আহরন করবে। তিনি হবেন সেই প্রদীপের ন্যায় ঘন ঘোর অমাবশ্যায় যে প্রদীপ পথহারা মুসাফিরকে পথ দেখিয়ে চলে।

বৃটিশদের দ্বারা এ উপমহাদেশ করতলগত হওয়ার পর তাদের সেক্যুলার  শিক্ষাবিদ লর্ড মেকলে এই বলে তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিল যে, ’’এ জাতিকে (মুসলিমদেরকে) যদি পদানত রাখতে হয় তাহলে কুরআন থেকে তাদেরকে দূরে রাখতে হবে। তবে যেহেতু এটা কঠিন কাজ তাই এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা, এমন একটা পদ্ধতি আমাদের উদ্বাবন করতে হবে যাতে কুরআন তাদের কাছে থাকবে বটে কিন্তু তারা কুরআনের কাছে থাকবেনা।’’
এর পরের ইতিহাস সবার জানা। লর্ড মেকলেকে দিয়েই শিক্ষানীতি প্রণীত হয়। সত্য সত্যই তাদের শিক্ষা ও শাসনে কুরআন মুসলিমদের কাছে রইল বটে কিন্তু তারা কুরআনের কাছে রইলনা। তারা শিখল, ইসলাম একটা ধর্মের নাম, যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান একেকটা ধর্ম। অন্যান্য ধর্মের মত এ ধর্মেও রয়েছে বেশকিছু প্রথা ও কালচার যা কিনা বৃদ্ধ হলে পালন করতে হয়, কিংবা এগুলো পালন করা ভাল। গুরুজনেরা এগুলো পালন করেন। তাদেরকে বোঝানো হল, কুরআন এক পবিত্র গ্রন্থ যা গীতা, বাইবেল কিংবা বেদ-পুরাণের মত সুর করে পড়তে হয়।  কুরআন সম্পর্কে এই ধারণাও মুসলিমদের মধ্যে বদ্বমুল হয়ে গেল যে, এ গ্রন্থ সকলে বুঝবেনা। বুঝা সকলের দরকারও নেই।
আরও বোঝানো হল যে, ইসলাম এমন এক ধর্মবিশ্বাসের নাম যা মানুষকে বস্ত্তগত উপায়-উপকরন অবলম্বনে বাধা প্রদান করে এবং বিজ্ঞানবিরোধী করে তোলে। অথচ কোন নাবী-রাসুলের জীবনেতিহাসে এমন নযীর নেই যে তারা রিযিকের জন্য বস্ত্তগত উপায়-উপকরন অবলম্বন না করে আকাশপানে চেয়ে থেকেছেন। কুরআনের বক্তব্য - তোমরা নামাজ সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথেই যমিনের বুকে রিযিকের জন্য বের হয়ে যাও। (দ্রষ্টব্য: সুরা আল  জুম’আ ১০)
বলাই বাহুল্য, জ্ঞানের এ দৈন্যতা ও ভ্রান্তির অবসান করানোর দায়িত্ব আল­াহর পথে আহবানকারীদের।
একদিকে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি এবং অন্যদিকে তথ্য সন্ত্রাসের কারনে ইসলামী উম্মাহ আজ যে যুলুম ও অপবাদের সম্মুখীন তা মোকাবেলা করার মত ইলমী যোগ্যতাও এ পথের পথিককে অর্জন করতে হবে।
স্রষ্টাকে জানা ও তার সাথে সম্পর্ক সহাপনের জন্যও জ্ঞান অর্জন জরুরী, আল­াহ বলেন।
’’বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই আল­াহকে ভয় করে।’’ (সুরা ফাতের ২৮)
সৃষ্টিজগতে আল­াহর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কুসংস্কার এবং মূর্খতাপ্রসুত ধারনা-বিশ্বাস দূর করার জন্যও জ্ঞান অর্জন জরুরী। ঢাকা শহরে একবার নযীরবিহীন পানিবদ্বতার সৃষ্টি হয়, তার কারন সম্পর্কে মুর্খ ধার্মিকেরা বলাবলী করলো - এটা আল­াহর গজব। কিন্তু জ্ঞানী ধার্মিকেরা বললেন, এর প্রধান কারন:  অসৎ নেতৃত্ব, ঘুষ এবং দুর্ণীতি। দুর্ণীতির কারনেই সুয়ারেজ লাইনগুলো সচল ও ক্রটিমুক্ত রাখা সম্ভব হয়নি, অর্থাত ভরাট হয়ে গেছে, দুর্ণীতির কারনেই যার যেমন খুশি মাটি ভরাট করা ঠেকানো যায়নি তাই শহর থেকে পানি নিস্কাশনের সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, এর ফলশ্রতিতেই এই পানিবদ্বতা।
দ্বিতীয় বক্তব্যটিই সঠিক।  অথচ মুর্খ ধার্মিকেরা ফস করে বলে দিলেন - এটা আলা­হর গজব।

আল­াহর পথে যিনি মানুষকে ডাকবেন, তার প্রেরিত দ্বীন বোঝাবেন তাকে এরুপ মুর্খ ধার্মিক হলে চলবেনা
আলা­হর গজব কেন আসে, আল­াহ এর কি প্রতিবিধান দিয়েছেন - এসব বোঝানোর যোগ্যতা এই পথের পথিকের থাকতে হবে।
সুদ হারাম - এই কথাটি একজন আরবীভাষীকে যত সহজে বুঝানো সম্ভব একজন বাংলাদেশীকে যে কিনা ধর্মহীন বস্ত্তবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে, বুঝানো কিন্তু সহজ নয়। তার কাছে ইসলামের অর্থনীতির আলোচনাতো অবাক অবাক লাগবে।  আলা­হর পথে আহবানকারীকে এটা বুঝতে হবে যে, লোকদের সামনে ইসলামের প্রকৃত রুপকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেই তারা সেক্যুলারিজম কিংবা কম্যুনিজমের দিকে ঝুকছে।
আমাদের দেশেতো আল­াহর পথের দা’য়ীকে এমন লোকদেরও সম্মুখীন হতে হয় যারা মনে করে যে, ’’এ বিশ্ব সংসার প্রাকৃতিক নিয়মে আপনা আপনি চলছে, মানুষের যা কিছু প্রয়োজন তা সবই প্রকৃতি দান করে চলেছে। মানুষ তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিবলে প্রকৃতির উপর রাজত্ব করছে। রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতির নীতি নির্ধারন করছে মানুষ, আইন তৈরী হচ্ছে মানুষের দ্বারা এখানে স্র্ষ্টা বা এজাতীয় উচ্চতর কোন কিছুর সামনে তার জওয়াবদিহী কিংবা সেই সত্তা থেকে আইন বিধান গ্রহনের প্রশ্ন অবান্তর। তাছাড়া ধর্ম বরাবরই প্রগতির অন্তরায়। বিজ্ঞান ও প্রগতির এ যুগে ধর্মীয় আইন বাধা সৃষ্টি করবে কোন অধিকারে’’?
এমন লোকদেরও মোকাবেলা করতে হয় যারা ধারণা করে (যদিও প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়না) ’’পৃথিবী বন্তুর নিয়মে পরিচালিত হয়, এজন্যে কোন সার্বজনীন সত্তা বা ইশ্বরের প্রয়োজন নেই’’।
পৃথিবী বন্তুর নিয়মে পরিচালিত হয়না বরং এর পেছনে রয়েছে অতি কুশলী ও বিজ্ঞানময় এক সত্বা এটা বোঝাবার জন্যে শুধুমাত্র কুরআন, হাদিসের তত্বগত জ্ঞান যথেষ্ট নয়।
যে দায়ীত্বের কথাগুলো উপরে বর্ণিত হল তা যদি মানুষ, (যে মানুষকে আল্লাহ খলীফা করে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন) পালন না করে তাহলে আল্লাহর কোনই ক্ষতি হবেনা। ক্ষতিতে নিমজ্জিত হবে মানুষই। দুনিয়ার ক্ষতি হচ্ছে এই যে, যালিম, পাপাচারী ও আল্লাহদ্রোহী লোকেরা তাদের উপর নেতৃত্ব করবে। আর আখিরাতের ক্ষতি হবে এই যে, তখন আল্লাহ বলবেন: আমি তোমাকে খলীফা করে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলাম, তুমি যে সেখানে খলীফার দায়ীত্ব পালন করেছ তার কোন প্রমাণতো তোমার আমলনামায় নেই বরং তোমার আমলনামা প্রমাণ দিচ্ছে যে, তুমি সেখানে শয়তান ও অনুসারীদের প্রতিনিধিত্ব করেছ।  
শাইতান বলেছিল: আমি আদাম সন্তানের সামনে থেকে আসবো, পিছন থেকে আসবো, ডান থেকে আসবো, বাম থেকে আসবো - - একথাগুলো নিছক কথার কথা নয়। অনেক অর্থবহ শাইতানের এ উক্তি। আধুনিক জাহিলিয়াত আর মিডিয়া জগতের পরতে পরতে শাইতানের উক্ত চ্যালেঞ্জের প্রমাণ আমরা দেখছি। এসব দেখেও যদি কারুর জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত না হয় তাহলে তা বড়ই আফসোসের কথা।
সর্বশেষে আল্লাহর ঘোষনাটিও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি: "আবার সেই সময়ের কথা একটু স্মরণ কর যখন তোমাদের রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন ,ুআমি পৃথিবীতে একজন খলীফা- প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে চাই ৷চ তারা বললো ,ুআপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে নিযুক্ত করতে চান যে সেখানকার ব্যবস্থাপনাকে বিপর্যস্থ করবে এবং রক্তপাত করবে? আপনার প্রশংসা ও স্তুতিসহকারে তাসবীহ পাঠ এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা তো আমরা করেই যাচ্ছি৷ চ আল্লাহ বললেন,ুআমি জানি যা তোমরা জানো না ৷ (সুরা আল বাকারা 30)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (3টি রেটিং)

গুরুত্বপূর্ণ পোষ্ট শেয়ার করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ!!

আরো চাই!!

''সাদামেঘ''

’’এ জাতিকে (মুসলিমদেরকে) যদি পদানত রাখতে হয় তাহলে কুরআন থেকে তাদেরকে
দূরে রাখতে হবে। তবে যেহেতু এটা কঠিন কাজ তাই এমন একটা শিক্ষাব্যবস্থা, এমন
একটা পদ্ধতি আমাদের উদ্বাবন করতে হবে যাতে কুরআন তাদের কাছে থাকবে বটে
কিন্তু তারা কুরআনের কাছে থাকবেনা।’’

আজাদীর পর আজাদী আসলো কিন্তু এতদ অঞ্চলের মুসলমানগণ আজো বৃটিশ শিক্ষাবিদ লর্ড মেকলের গোলামী করে যাচ্ছে শিক্ষার ক্ষেত্রে। এ যেন এক অভিশাপ।

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (3টি রেটিং)