দায়ী ইলাল্লাহর গুনাবলী। পর্ব ৯

দায়ী ইলাল্লাহর গুনাবলী। পর্ব ৯
আরও কতিপয় চারিত্রিক সুষমা:

১-  সর্বাবস্থায় ন্যায়ের উপর অটল থাকা:
ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠায় আল্লাহর পথের এ পথিক সম্পর্কে তার জানের শত্রুরাও এ নিশ্চয়তা পোষণ করবে যে, এ ব্যক্তি যাই বলুক, যাই করুক ন্যায় ও ইনসাফের পথ থেকে কখনো সে বিচ্যুত হবেনা। তার চরম বিরুদ্ধবাদীরাও এ স্বাক্ষ্য প্রদান করবে যে এ ব্যক্তি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, হটকারিতা, প্রতিশোধস্পৃহা কিংবা বন্ধুত্ব বা স্বজনপ্রীতিকে নিজের অন্তরে স্থান দেবেনা।

এ পৃথিবীর বুকে নাবী রাসুলগন যে ম্যাসেজ ও বিধানাবলী আল্লাহর পক্ষ থেকে এনেছেন তা ভিন্ন দ্বীতিয় কোন সত্য এ মনুষ্যজগতে নেই এবং নাবী রাসুলগনের অনুসরন ভিন্ন ভাল মানুষ হওয়ারও কোন পথ বা পন্থা এ ইহজগতে নেই কিন্তু তথাপিও মহান আল্লাহ এ পথের পথিকদেরকে ঠিক ততটুকুই প্রতিশোধ নিতে অনুমতি দিয়েছেন যতটুকু অন্যায় বা অবিচার তার উপর উপর করা হয়েছে। অর্থাত কুফরী শক্তির যুলুম অবিচার ও অপকর্ম যতই সীমা ছাড়িয়ে যাক না কেন, তারা যখন আপনার হাতে পরাভুত হবে তখন যেন প্রতিশোধ স্পৃহায় আপনি ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে পড়েন। তখন শান্তি বিধান যেন অপরাধের তুলনায় বেশী না হয়ে যায়।  যেমন সুরা আল মায়িদার ৮ আয়াতে এসেছে:
"হে ঈমানদারগণ ! সত্যের ওপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ও ইনসাফের সাক্ষদাতা হয়ে যাও৷ কোন দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এমন উত্তেজিত না করে দেয় যার ফলে তোমরা ইনসাফ থেকে সরে যাও৷ ইনসাফ ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠিত করো৷ এটি আল্লাহভীতির সাথে বেশী সামঞ্জস্যশীল৷ আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো৷ তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন"৷ (আল মায়িদাহ ৮)  

বিষয়টি হ্রদয়ংগম করার জন্য আলী ইবনু আবী তালিব রাদিয়াল্লাহ আনহুর জীবনের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি:
এক যুদ্ধে আলী রা: এক কাফিরকে পরাজিত করে তার বুকে চেপে বসে যেই তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছেন অমনি কাফিরটি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মুখে থুথু নিক্ষেপ করে। মানুষ মাত্রই এতে ক্রোধান্বিত হওয়ার কথা। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর চেহারায়ও তা প্রকাশ পেল। সকলেই ভাবল হয়তো কাফিরটিকে এখনই কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হবে কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আলী রা: কাফিরটিকে ছেড়ে দিয়ে তার বুকের উপর থেকে উঠে গেলেন। কাফিরটি অবাক হয়ে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মুখের দিকে চেয়ে রইল। আলী রা: বললেন: তুমি আল্লাহর বান্দাদের উপর যুলুম করতে, আল্লাহর বদলে নিজের প্রভুত্ব কায়েম করার মানসে তুমি যুদ্ধ করতে এসেছিলে একারনে আমি তোমাকে হত্যা করতে উদ্দ্যত হয়েছিলাম এবং তা ছিল একমাত্র আল্লা্হরই জন্য। কিন্তু যখনই তুমি আমাকে থুথু নিক্ষেপ করলে তখন আল্লাহর দ্বীনের চাইতে ব্যক্তিগত ক্রোধ আমার উপর প্রবল হল, অন্তরের এহেন অবস্থায় যদি আমি তোমাকে হত্যা করতাম তাহলে তা হত ব্যক্তিগত ক্রোধের জন্য এবং এর ফলস্বরুপ হাশর দিবসে আমাকে হত্যাকারীরুপে গন্য করা হত। তাই তোমাকে হত্যা না করে ছেড়ে দিয়েছি।  

২- আপন মর্যাদার পরিপন্থী পথ, পদ্ধতি পরিত্যাগ করা:
এ পথের পথিককে অবশ্যই এমনসব পদ্ধতি অবলম্বন কিংবা সভা সমাবেশ অথবা অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরী যার কারনে আল্লাহর দ্বীনের কিংবা তার নিজের মর্যাদা ক্ষুন্ন হবার আশংকা থাকে। "আমরা তাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিলে তারাও আমাদের মাহফিলে/অনুষ্ঠানে আসবে" কথাটি আপাত: দৃষ্টিতে সুন্দর শোনায় বৈকি, কিন্তু কুরআন এধরনের পদ্ধতিকে সমর্থন করেনা। এটি হচ্ছে মাক্কার সেই কাফিরদের প্রস্তাবের মত, যখন তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছিল: "আপনি একটা সময়ব্যাপী আমাদের দেবদেবীকে সমর্থন/পুজা করবেন, বিনিময়ে আমরাও ঐ সময়ব্যাপী আপনার রবের পুজা করব"।  

যে ব্যক্তি শুনতে প্রস্তুত নয় তাকে শোনানোর জন্য ব্যকুল হওয়া, পলায়নকারীদের পেছনে ছুটে বেড়ানো, তোষামোদ করে অহংকারী লোকদের আকৃষ্ট করার চেষ্ঠা করা দায়ী ইলাল্লাহর কাজ হতে পারেনা। অনুরুপভাবে তাকে এমনসব কথা, কাহিনী কিংবা হাদিস বলা থেকেও বিরত থাকা জরুরী যার সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। যদি তিনি এটা করেন তাহলে তিনি আল্লাহর দ্বীনকেই শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করলেন না, নিজের মান মর্যাদাকেও ধুলায় লুন্ঠিত করলেন।

৩-তাড়াহুড়ার পরিবর্তে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা:
একজন আল্লাহর পথে আহবানকারীর এ ক্ষমতা নেই যে তিনি কারুর অন্তরে হেদায়াত ঢেলে দিতে পারেন আবার অপরদিকে শাইতানেরও এ ক্ষমতা নেই যে, সে জোর করে কাউকে নাস্তিক বানিয়ে দেবে। তাদের প্রত্যেকেরই কেবল এতটুকু ক্ষমতা আছে যে, তারা তাদের নিজ নিজ পথের দিকে মানুষকে ডাকতে পারে।
কোন নাবীরও এ ক্ষমতা ছিলনা যে তারা নিজ নিজ ইচ্ছা অনুসারে মানুষকে মু'মিন বানিয়ে দেবেন।

যেমন সুরা আল হিজর এর ৪২ আয়াতে আল্লাহ বলেন:
"অবশ্যি যারা আমার প্রকৃত বান্দা হবে তাদের ওপর তোমার কোনো জোর খাটবে না৷ তোমার জোর খাটবে শুধুমাত্র এমন বিপথগামীদের ওপর যারা তোমার অনুসরণ করবে"

সুরা ইবরাহীমের 22 আয়াতে এসেছে:
"আর যখন সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে তখন শয়তান বলবে, “সত্যি বলতে কি আল্লাহ তোমাদের সাথে যে ওয়াদা করে ছিলেন তা সব সত্যি ছিল এবং আমি যেসব ওয়াদা করেছিলাম তার মধ্য থেকে একটিও পুরা করিনি৷ তোমাদের ওপর আমারতো কোন কর্তৃত্ব ছিল না, আমি তোমাদেরকে আমার পথের দিকে আহবান জানানো ছাড়া আর কিছুই করিনি এবং তোমরা আমার আহবানে সাড়া দিয়েছিলে৷ এখন আমার নিন্দাবাদ করো না, নিজেরাই নিজেদের নিন্দাবাদ করো৷ এখানে না আমি তোমাদের অভিযোগের প্রতিকার করতে পারি আর না তোমরা আমার৷ ইতিপূর্বে তোমরা যে আমাকে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা ও কতৃত্বের শরীক করেছিলে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই"৷  

সুরা আল গাশিয়ার ২১ আয়াতে এসেছে:
"আপনি উপদেশ দিয়ে যেতে থাকুন, আপনিতো শুধুমাত্র একজন উপদেশদাতা এবং পথপ্রদর্শক, তাদের উপর বলপ্রয়োগকারী নন"।

শেষ নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এ ধরায় আসেন তখন জাহিলিয়াতের চরম পংকে নিমজ্জিত ছিল আরবের লোকেরা। জীবন্ত কবর দেয়া হত কন্যা সন্তানদের। দরিদ্র ও নি:স্ব মানুষগুলো ছিল বাজারের ঐ পন্যের ন্যায় যা পয়সার বিনিময়ে এক ক্রেতার হাত থেকে অন্য ক্রেতার হাতে যায়। ছিল অগণিত দেব দেবী। প্রভাবশালী সমাজপতিরা এসব দেব দেবদেবীর ভয় দেখিয়ে মানুষের উপর প্রভুত্ব করতো। ইহুদীদের সুদী ব্যবসার চক্রবৃদ্ধির অক্টোপাশে আবদ্ধ ছিল নিম্ন মধ্যবিত্তদের জীবন। আরবের শস্যশ্যামল এলাকার প্রায় সবটাই দখল করে রেখেছিল সাম্রাজ্যবাদী রোম ও পারস্যের শাসকেরা। কিন্তু এত কিছুর পরও অলৌকিক উপায়ে আল্লাহর দ্বীন বিজয় কিংবা অতি প্রাকৃতিক কোন পদ্ধতিতে ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের কোন ব্যবস্থা আল্লাহ করেননি বরং তার নাবীকে বলেছেন: "যে বিষয়ের হুকুম আপনাকে প্রদান করা হয়েছে (অর্থাত আল্লাহর পথে ডাকা) প্রথমে আপনি তা করতে থাকুন ...... (আল হিজর94) ।

যে দিক নির্দেশনাগুলো উপরের এ আলোচনা ও আয়াতগুলো থেকে আমরা পাই তা হচ্ছে:
(ক) দ্বীন কায়েমের জন্য হুশহারা হয়ে দায়ীর চরিত্রবিরোধী কর্মে লিপ্ত না হওয়া।
(খ) বস্তুবাদী মানসিকতা পরিহার করা।
(গ) দ্বীনের দাওয়াত কুরআনিক পদ্ধতিতে আঞ্জাম দেবার পর দা'য়ীকে দায়ীত্বমুক্ত ঘোষণা করা হবে,  
নাফরমানদের নাফরমানীর জন্য তাকে পাকড়াও করা হবেনা।
(ঘ) সর্বাবস্থায় পারলৌকিক বিজয় ও মুক্তির বিষয়টি সামনে রাখা, দুনিয়াবী বিজয় নয়।

চলবে

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (6টি রেটিং)

জাযাকাল্লাহ্ খায়ের।
অনেক ভালো লাগলো এ ধারাবাহিকটি। নি‍য়মিত আশা করছি।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

জাযাকাল্লাহ

অনেক শিক্ষনীয় লেখা

পরবর্তীটির অপেক্ষায়

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4.7 (6টি রেটিং)