বার্ডেন অফ প্রুফ। পর্ব চার

বার্ডেন অফ প্রুফ । পর্ব চার

৪- পরীক্ষার্থী যাতে ভাল ও মন্দ, সত্য এবং মিথ্যার পার্থক্য অনুধাবন করতে পারে সে জ্ঞান  তাকে প্রদান করা হয়েছে। জ্ঞান প্রদানের জন্য স্রষ্টা  দু'টু  বিজ্ঞতাপুর্ণ পন্থা অবলম্বন করেছেন:

(ক) প্রতিটি মানব সন্তানের সহজাত প্রকৃতিতে তা সন্নিবেশ করা হয়েছে যা বালেগ হওয়া মাত্রই  সে লাভ করে থাকে এবং মৃত্যুর পুর্বমুহুর্ত কিংবা চেতনাহীন হবার আগ পর্যন্ত সে জ্ঞান তার বলবত থাকে। এরই ভিত্তিতে মানব সমাজে ভাল খারাপের ধারণা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। স্রষ্টার এ বিধান ও ব্যবস্থাপনার কারনেই নাবালেগ, পাগল, বা হুশ জ্ঞানহীন লোকদের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়না। মনোবিজ্ঞানেও এসব কথা চুড়ান্তভাবে স্বীকৃত । সুরা আশ শামস এর ৮ নং আয়াতে মানব শিশুকে জ্ঞান প্রদানের এ ব্যাপারটি উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে: "তারপর তার পাপ ও তার তাকওয়া তার প্রতি ইলহাম করেছেন।" তাফসীর সমুহে এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে বলা হয়েছে: "
" ইলহাম শব্দ পারিভাষিক অর্থে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন কল্পনা বা চিন্তাকে অবচেতনভাবে বান্দার মন ও মস্তিষ্কের গোপন প্রদেশে নামিয়ে দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়৷ মানুষের প্রতি তার পাপ এবং তার নেকী ও তাকওয়া ইলহাম করে দেয়ার দু'টি অর্থ হয়৷ এক, স্রষ্টা তার মধ্যে নেকী ও গোনাহ উভয়ের ঝোঁক প্রবণতা রেখে দিয়েছেন৷ প্রত্যেক ব্যক্তিই এটি অনুভব করে৷ দুই , প্রত্যেক ব্যক্তির অবচেতন মনে আল্লাহ এ চিন্তাটি রেখে দিয়েছেন যে, নৈতিকতার ক্ষেত্রে কোন জিনিস ভালো ও কোন জিনিস মন্দ এবং সৎ নৈতিক বৃত্তি ও সৎকাজ এবং অসৎ নৈতিক বৃত্তি ও অসৎকাজ সমান নয়৷ ফুজুর (দুস্কৃতি ও পাপ) একটি খারাপ জিনিস এবং তাকওয়া (খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকা) একটি ভালো জিনিস, এ চিন্তাধারা মানুষের জন্য নতুন নয়৷ বরং তার প্রকৃতি এগুলোর সাথে পরিচিত৷ স্রষ্টা তার মধ্যে জন্মগতভাবে ভালো ও মন্দের পার্থক্যবোধ সৃষ্টি করে দিয়েছেন৷ একথাটিই সূরা আল বালাদে এভাবে বলা হয়েছে: " আর আমি ভালো ও মন্দ উভয় পথ তার জন্য সুম্পষ্ট করে রেখে দিয়েছি৷" (১০ আয়াত) সূরা আদদাহরে নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: " আমি তাদেরকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি, চাইলে তারা কৃতজ্ঞ হতে পারে আবার চাইলে হতে পারে অস্বীকারকারী৷" (৩ আয়াত) একথাটিই সূরা আল কিয়ামায় বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে: "মানুষের মধ্যে একটি নফসে লাওয়ামাহ (বিবেক) আছে৷ সে অসৎকাজ করলে তাকে তিরস্কার করে৷ (২ আয়াত) আর প্রত্যেক ব্যক্তি সে যতই ওজর পেশ করুক না কেন সে কি তা সে খুব ভালো করেই জানে৷ (১৪- ১৫ আয়াত)এখানে একথাটি ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে যে, মহান আল্লাহ স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত ইলহাম করেছেন প্রত্যেক সৃষ্টির প্রতি তার মর্যাদা ভুমিকা ও স্বরূপ অনুযায়ী৷ যেমন সূরা ত্বা-হা'তে বলা হয়েছে: " যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে তার আকৃতি দান করেছেন, তারপর তাকে পথ দেখিয়েছেন৷" (৫০ আয়াত) যেমন প্রাণীদের প্রত্যেক প্রজাতিকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ইলহামী জ্ঞান দান করা হয়েছে৷ যার ফলে মাছ নিজে নিজেই সাঁতার কাটে৷ পাখি উড়ে বেড়ায়৷ মৌমাছি মৌচাক তৈরি করে৷ চাতক বাসা বানায়৷ মানুষকেই তার বিভিন্ন পর্যায় ও ভূমিকার ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ইলহামী জ্ঞান দান করা হয়েছে৷ মানুষ এক দিক দিয়ে প্রাণী গোষ্ঠীভুক্ত৷ এই দিক দিয়ে তাকে যে ইলহামী জ্ঞান দান করা হয়েছে তার একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মানব শিশু জন্মের সাথে সাথেই মায়ের স্তন চুষতে থাকে৷ আল্লাহ যদি প্রকৃতিগতভাবে তাকে এ শিক্ষাটি না দিতেন তাহলে তাকে এ কৌশলটি শিক্ষা দেবার সাধ্য কারো ছিল না৷ অন্যদিক দিয়ে মানুষ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী৷ এদিক দিয়ে তার সৃষ্টির শুরু থেকেই আল্লাহ তাকে অনবরত ইলহামী পথনির্দেশনা দিয়ে চলছেন৷ এর ফলে সে একের পর এক উদ্ভাবন ও আবিস্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার বিকাশ সাধন করছে৷ এই সমস্ত উদ্ভাবন ও আবিস্কারের ইতিহাস অধ্যয়নকারী যে কোন ব্যক্তিই একথা অনুভব করবেন যে, সম্ভবত মানুষের চিন্তা ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে দু'একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রত্যেকটি আবিস্কার আকস্মিকভাবে শুরু হয়েছে৷ হঠাৎ এক ব্যক্তির মাথার একটি চিন্তার উদয় হয়েছে এবং তারই ভিত্তিতে সে কোন জিনিস আবিস্কার করেছে৷ এই দু'টি মর্যাদা ছাড়াও মানুষের আর একটি মর্যাদা ও ভূমিকা আছে৷ সে একটি নৈতিক জীবও৷ এই পর্যায়ে আল্লাহ তাকে ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার শক্তি এবং ভালোকে ভালো ও মন্দকে মন্দ জানার অনুভূতি ইলহাম করেছেন৷ এই শক্তি, বোধ ও অনুভূতি একটি বিশ্বজনীন সত্য৷ এর ফলে আজ পর্যন্ত দুনিয়ায় এমন কোন সমাজসভ্যতা গড়ে ওঠেনি যেখানে ভালো ও মন্দের ধারণা ও চিন্তা কার্যকর ছিল না৷ আর এমন কোন সমাজ ইতিহাসে কোন দিন পাওয়া যায়নি এবং আজো পাওয়া না যেখানকার ব্যবস্থায় ভালো ও মন্দের এবং সৎ ও অসৎকর্মের জন্য পুরস্কার ও শাস্তির কোন না কোন পদ্ধতি অবলম্বিত হয়নি৷ প্রতিযুগে, প্রত্যেক জায়গায় এবং সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রত্যেক পর্যায়ে এই জিনিসটির অস্তিত্বই এর স্বভাবজাত ও প্রকৃতিগত হবার সুস্পষ্ট প্রমাণ৷ এছাড়াও একজন বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ স্রষ্টা মানুষের প্রকৃতির মধ্যেই এটি গচ্ছিত রেখেছেন, একথাও এ থেকে প্রমানিত হয়৷ কারণ যেসব উপাদানে মানুষ তৈরি এবং যেসব আইন ও নিয়মের মাধ্যমে জড় জগত চলছে তার কোথাও নৈতিকতার কোন একটি বিষয়ও চিহ্নিত করা যাবে না৷ (তাফহীমুল কুরআন, ১৯শ খন্ড, পৃ: 129-130)।

স্রষ্টা মানুষকে যে ব্রেইন প্রদান করেছেন অন্য কোন প্রাণীকে তা দেননি। মানুষকে যে জ্ঞান, যে চিন্তা ও চেতনাশক্তি এবং যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেয়া হয়েছে অন্য কোন জীবকে তা দেয়া হয়নি। মানুষ যেভাবে কথা বলে, বক্তৃতা করে, পড়াশুনার জন্য স্কুল কলেজে যায়, কলম দিয়ে লেখে, সংবাদপত্র ছাপায়, সিনেমা টেলিভিশন দেখে, ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যবহার করে অন্য কোন প্রাণী তা করেনা। মানুষ যেভাবে তার জ্ঞান ও টেকনোলজি দিয়ে এক নিমিষে হাজার হাজার প্রাণী কিংবা মানুষ হত্যা করতে পারে অন্য কোন প্রাণী তা পারেনা। উদ্ভাবনী জ্ঞান ও প্রতিভা দিয়ে মানুষ যেভাবে এ ন্যাচারাল বিশ্বকে ভোগ ব্যবহার করছে অন্য কোন প্রাণী তা করতে সক্ষম নয়। এককথায় আল্লাহর এ সৃষ্টিজগতে মানুষ এক পৃথক সৃষ্টি। অন্যসকল প্রাণী থেকে এক পৃথক মর্যাদা, গুনাবলী, যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্য প্রদান করে এ জীবকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
জ্ঞানের ও প্রতিভার রাজ্যে মানুষকে এভাবে প্রাধান্য দানের পর স্রষ্টা তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন:
"আমি কি তাকে দু'টু চোখ, একটি জিহবা এবং দু'টু ঠোট দেইনি" (সুরা আলবালাদ ৮,9)
অর্থাত " আমি কি তাকে জ্ঞান ও বুদ্ধির উপকরণগুলো দেইনি ? দু'টি চোখ মানে গরু ছাগলের চোখ নয়, মানুষের চোখ৷ যে চোখ মেলে তাকালে চারদিকে এমন সব নিশানী নজরে পড়বে, যা মানুষকে প্রকৃত সত্যের সন্ধান দেবে এবং তাকে ভুল ও নির্ভুল এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝিয়ে দেবে ৷ জিহবা ও ঠোঁট মানে নিছক কথা বলার যন্ত্র নয় বরং যে ব্যক্তি কথা বলে এবং ঐ যন্ত্রগুলোর পেছনে বসে যে ব্যক্তি চিন্তা যোগায় তারপর মনের কথা প্রকাশ করার জন্যে তার সাহায্য গ্রহণ করে"৷ (তাফহীমুল কুরআন 19শ খন্ড, পৃ:18)

(খ) স্রষ্টা মানুষের হেদায়াত কিংবা পথভ্রষ্টতার বিষয়টি শুধুই তার আপন স্বভাব সন্নিহিত জ্ঞান ও প্রকৃতির (যা উপরে উল্লেখিত হয়েছে) হাতে ছেড়ে দেননি এবং আখিরাতেও তার পুরস্কার অথবা শাস্তি দেয়ার ব্যাপারটি শুধুমাত্র তার স্বভাবগত পথ নির্দেশের উপর নির্ভর করা হয়নি বরং একটি সুষ্ঠ, যথার্থ ও ন্যায়ভিক্তিক পরীক্ষাকর্ম সমাধা করার জন্য তিনি তার পক্ষ থেকে গাইডসহ (কিতাব) নাবী রাসুলও পাঠিয়েছেন যাতে করে কর্মের ফলাফল তথা পরিণতির সংবাদও পরীক্ষার্থীকে অবহিত করানো যায় এবং বিচার দিবসে যেন পরীক্ষক তথা স্রষ্টার চুড়ান্ত প্রমাণ পেশ করার পথে কোনই বাধা বা সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ না থাকে।
পৃথিবীর বুকে প্রেরিত নাবী রাসুলগন এবং আসমানী কিতাবসমুহ তার প্রমাণ এবং দুনিয়াতে মানুষ প্রেরণের শুরুতেই স্রষ্টা তা করেছেন। যার পুনরোল্লেখ রয়েছে কুরআনেও। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদাম এবং হাওয়া আলাইহাস সালামকে এখানে প্রেরণের প্রাক্কালে তিনি বলেছেন:
"আমরা বললাম, তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও৷ এরপর যখন আমার পক্ষ থেকে  হিদায়াত (দুনিয়াতে চলার বিধান) তোমাদের কাছে পৌছুবে তখন যারা আমার সেই হিদায়াতের অনুসরণ করবে তাদের জন্য কোন ভয়, দুঃখ বা দু:শ্চিন্তার কারন নেই৷(সুরা আলবাকারা 38)
"আর বললেন, তোমরা (উভয় পক্ষ অর্থাৎ মানুষ ও শয়তান) এখান থেকে নেমে যাও, দুনিয়াতে তোমরা পরস্পরের শত্রু থাকবে৷ অত:পর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়াত (দুনিয়াতে চলার বিধান) পৌছবে তখন যে ব্যক্তি আমার সেই হেদায়াত মেনে চলবে সে বিভ্রান্ত হবে না, দুর্ভাগ্যপীড়িতও হবে না৷  (সুরা ত্বহা 123)

চলবে।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)

কঠিন বিষয় হলেও ভালো লাগছে।

ধন্যবাদ।
এ যুগের সংশয়বাদী তরুণদের (ইসলামবিদ্বেষী ওয়েবসাইট গুলো দ্বারা যারা বিভ্রান্ত হচ্ছে) প্রশ্নাবলীর জওয়াব দেবার মানসে এ লেখাটি শুরু করেছি। অবশ্য লেখার শুরুতে আমিও দ্বন্ধে ভুগছিলাম, লিখবো কি লিখবোনা। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো আমার এক নিকটআত্বীয়ের কথা যে বাংলাদেশের কতিপয় নাস্তিক লেখকদের সাইন্স ফিকশন (বই) পড়ে নামাজ ছেড়ে দিয়েছে।

আমার সে আত্বীয়টির কথা নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে। হ্যা আল্লাহর কৃপায় আমি তাকে আবার মু'মিন বানিয়েছি। এখন সে তার একান্ত একাকীত্বে যার সান্নিধ্য পেতে চায় সে আমাদের মহান প্রভু আল্লাহ।
- বিনীত, আতাউর রহমান সিকদার

ভালো লাগলো আপনার অভিজ্ঞতা। লেখালেখি নিয়ে কখনো দ্বিধা করবেন না। এইটা সবচেয়ে জরুরী ইসলামের জন্য।
নেটে ইসলাম নিয়ে বাংলায় কন্টেন্ট এখনও অপ্রতুল।

হাত খুলে লিখে যান। সময়ের সাথে সাথে সাবলীলতাও বাড়বে। আল্লাহ আপনার লেখা এবং নিয়তে বারাকাহ দিন।

অনুপ্রেরণা লেখালেখির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঠিক, কিন্তু আমাদের জন্য লেখনীর ব্যাপারে আরো এক ধাপ এগিয়ে ভাবতে হবে।
বলে রাখছি যে, আমি নিজেও এ ধাপটি পেরুতে পারিনি এখনো। তবে চেষ্টা করছি, তাই আপনার জন্য লেখার দুঃসাহস করেছি।

-

"নির্মাণ ম্যাগাজিন" ©www.nirmanmagazine.com

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (2টি রেটিং)