নব বিবাহিত পুত্র/কন্যার প্রতি বাবার নসিহত

আমার প্রিয় কন্যা,

সবার আগে এক কোম্পানী মালিকের উত্থান পতনের কাহিনী তোমাকে শোনাবো, আমি নিজে যার প্রত্যক্ষদর্শী।

কোম্পানীটির প্রতিষ্ঠা ১৯৯৪ সালে জেদ্দায়। এক্সিকিউটিভ ম্যানেজারের ব্যক্তিগত গুনাবলী, সততা ও দক্ষতায় তিন বৎসরের মধ্যেই সারা সৌদী আরবে এর ৮টি শাখা ওপেন হয় এবং ষ্টাফসংখ্যা ২০ থেকে ২৫০ এ গিয়ে পৌছে। এত দ্রুত ব্যবসায়িক সাফল্যে মালিক পক্ষের খুশীর অন্ত ছিলনা। লভ্যাংশও ছিল অকল্পনীয়। এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার একটানা প্রায় বারো বছর এ সাফল্য ধরে রাখেন।

কিন্তু সফলতা ও সমৃদ্ধির এ জোয়ার হঠাৎ-ই একদিন থমকে দাড়ায়।

কেন, সেটাই বলছি।

একজন কর্মকর্তা নিয়োগ নিয়ে এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার এবং সেলস ম্যানেজারের মধ্যে দ্বন্ধ বাধে। সেলস ম্যানেজারের মনে আল্লাহভীতির অভাব ছিল। সে গোপনে (প্রায় বছরব্যাপী কাঠ খড় পুড়িয়ে) মালিক পক্ষ এবং বিশেষভাবে ডাইরক্টর বোর্ডের প্রেসিডেন্টকে এক্সিকিউটিভ ম্যানেজারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে। লভ্যাংশ প্রদানে জালিয়াতির অভিযোগও করা হয়। যা ছিল অসত্য।

যাহোক, সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট সেই এক্সিকিউটিভ ম্যানেজারকে পদচ্যুত করেন এবং তিনি নিজে কোম্পানীর সবকিছু দেখাশোনা ও এক্সিকিউশনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটিই কোম্পানীর জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। 

তোমরা হয়তো ভাবছো, প্রেসিডেন্ট তাহলে মোটেই ভাল মানুষ ছিলেননা। না, ব্যাপার তেমনটি নয়। তিনি এতো ভাল মানুষ ছিলেন যে, আমরা তাকে খাইরুল কুরুনের (সবোত্তম যুগ) মানুষদের সাথে তুলনা করতাম।

কিন্তু একটি ভুল তিনি করতেন। তাহলো “অসংযত বাক”। রেগে গেলে তিনি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতেন। আর কটু কথা (যা ব্যবসায়ীদের জন্য প্রায় হারাম) বলে ফেলতেন। (তার হাই ব্লাড প্রেসারও এজন্য কিছু দায়ী ছিলো)। সামান্য কারনে তিনি অধীনস্তদের সামনেই কর্মকর্তাদেরকে এটা সেটা বলতেন। কর্মকর্তাদের জন্য যা ছিল অপমানকর। ফলে দু’বছরের মাথায় অভিজ্ঞ ও সৎ মানুষগুলো (যাদের প্রায় সকলেই ছিল সেলস ডিপার্টমেন্টে) ইস্তফা দিয়ে চলে যায়।

 

এখানেই শেষ নয়, অসংযত বাক তথা জিহবার আঘাতের ভয়ে ডিলারসহ অন্যান্য লোকেরাও তাকে এড়িয়ে চলতো। মার্কেট ছিল কমপিটিটিভ। তাই এ অবস্থার প্রভাব পড়ে ব্যবসাতে। কারন, ব্যবসায়ের জন্য ‘সুবচন’ অপরিহায শর্ত। প্রভাতের জ্বল জ্বল করা কিরণ আভা ছড়ানো অবস্থায়ই একদিন কোম্পানী সুয অস্তমিত হয়ে যায়। তিনি ব্যবসাকে গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হন।

 

আর, এভাবে, কেবলমাত্র একটি দোষ অর্থাৎ জবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম হওয়ায় এতো ভালো মানুষ হয়েও ডাইরেক্টর বোর্ডের প্রেসিডেন্ট জীবন যুদ্ধে হেরে যান। 

অতএব, হে আমার প্রিয় কন্যা, তুমি যত ভালোই হও। জবানকে যদি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারো, তাহলে তোমার সকল ভাল কাজ বৃথা হয়ে যাবে।       

আমার প্রিয় পুত্র

তোমার অভিযোগ, তোমার স্ত্রীর রাগ বেশী। কিন্তু তুমি লক্ষ্য করেছ কি, তোমার সার্ট পেন্টটি সে তার অন্তরের সমস্ত ভালবাসা আর একাগ্রতা দিয়ে যেভাবে ধুয়ে ইস্ত্রী করে দেয়, সেভাবে সে তার আপন শাড়ীটিও ধোয়না।

প্রিয় পুত্র, “হতে পারে তার একটি দোষ তোমার অপছন্দ কিন্তু আল্লাহ তার সাথেই তোমার অনেক কল্যাণ রেখেছেন” (১) 

প্রিয় পুত্র

পেটে সন্তান ধারণ, প্রসবের কষ্ট এবং আরও নানা উপসর্গ নিয়ে নারী জীবন বয়ে চলে। অতএব, পৃথিবী যেন এসময়ে তোমাকে সবোত্তম স্বামী হিসেবে দেখে। 

আমার প্রিয় পুত্র

পরিবার নামক সংগঠনটিকে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর নিমিত্ত আল্লাহ তায়ালা পুরুষকে নেতা এবং পরিচালক বানিয়েছেন। এটা এজন্যে যে, পুরুষের তুলনায় নারীরা দৈহিক শক্তিতে দুবল। 

এখানে এ যুক্তি অন্বেষণ করোনা যে, পুরুষদেরকে বোধ করি নারীদের একধাপ উপরে স্থান দেয়া হয়েছে। না, ব্যাপার এরকম নয়। কুরআন বরং নারীদেরকে পুরুষের জোড়া/সংগী বলেছে। প্রভু নয়। দেখো: সুরা তাহরিম ১০-১২, সুরা নিসা ৪, তাওবা ৭১, আরাফ ১৮৯ 

মাখলুক হিসেবে আল্লাহর নিকট পুরুষ ও নারী উভয়ে সমান।

 

আমার প্রিয় কন্যা,

যে পল্লব বাতাসের ঝাপটায় নুয়ে পড়তে জানে, সে পল্লবই একদিন বৃক্ষ হয়ে ফুলে ফলে সুশোভিত হয়। আর, যে মরা বৃক্ষের মতো দাড়িয়ে থাকে সে প্রথম ঝাপটাতেই ভেংগে যায়। 

অতএব হে আমার নয়নমনি, যদি কখনো ডান দিক থেকে ঝড় আসে তাহলে বা’দিকে নুয়ে পড়ো, আর বাম দিক থেকে এলে ডান দিকে। 

কিন্তু কদাপি শুকনো গাছের মতো হয়োনা, তাহলে ভেংগে যাবে। অত:পর আমরা আর জোড়া লাগাতে পারবোনা।

হে আমার প্রিয় পুত্র

কষ্টে ও নিপীড়নে আল্লাহরই জন্যে ধৈয ও ক্ষমার নীতি অবলম্বন করো – দুনিয়া তোমার হবে। পাবে আখিরাতও।  

আমার প্রিয় পুত্র

আপন বাবা, মা ও আত্বীয় স্বজনকে ছেড়ে ছুড়ে সে আজ তোমার আংগিনায় এসেছে, এই আশায় যে, এখানে সে নীড় বাধবে। বিষয়টি খেয়ালে রেখো। আর এটাও ভাবো যে, তোমার আপন সহোদরাও অন্যত্র নীড় বাধতে গিয়েছে।

আমার প্রিয় কন্যা

আল্লাহ তায়ালা নুহ এবং লুত (আলাইহিমাস সালাম) এর স্ত্রীকে অভিসম্পাত করেছেন, তাদের কর্মনীতির কারনে (সুরা আত তাহরিম ১০)। আবার প্রশংসা করে সুসংবাদ দিয়েছেন ফিরআউনপত্নী আছিয়া এবং ঈসার (আ) মাতা মারিয়ামকে (সুরা আত তাহরিম ১১-১২)। 

অতএব, ভেবে নাও, তুমি কার মতো হবে।

হে আমার প্রিয় কন্যা

জীবিকা অন্বেষনের চিন্তা (যা থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে রেহাই দিয়েছেন) তোমার স্বামীকে সারাদিন পেরেশান ও তপ্ত করে রাখে - বিষয়টি খেয়ালে রেখো। ঐ মহিলার মতো হয়োনা, যে আগুনে পানি ঢালার বদলে আরও তা উসকে দেয়। 

প্রিয় কন্যা, 

স্বামীর নাশোকরী করোনা, অল্পে তুষ্ট থেকো। দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হবে। 

টীকা:

(১) (সুরা আন নিসা, ১৯)

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (2টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 4 (2টি রেটিং)