আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে ১

আকাশ ও পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা, মাটি, পানি, বাতাস, বায়ু মন্ডল, জীব জন্তু, গাছপালা ও বন জংগল ইত্যাদির গবেষণালব্ধ জ্ঞান আমাদেরকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোন ব্যাপার এটি নয় বরং এর পেছনে জ্ঞানবান কোনও এক সত্তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। 

আধুনিক বিজ্ঞান এ সত্য আজ স্বীকার করে নিয়েছে যে, প্রাণের উৎপত্তি, বিকাশ ও তাদের জীবন ধারণের জন্য মাটিতে, বায়ুমন্ডলে একটা পরিমিত পর্যায়ে কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফেট, সালফার, অক্সিজেন, জলীয়বাস্প এবং তাপমাত্রা থাকতে হবে। যদি পরিমাণ নির্ধারণের হিসাব নিকাশে ভুল হয় তাহলে মাটি উদ্ভিদ লতা গুল্ম জন্মাতে ব্যর্থ হবে।

অনুরুপভাবে শুধুমাত্র চন্দ্র, সুর্য, পৃথিবী এবং এ সৌরমন্ডলের গবেষণাও আমাদেরকে বলে দেয় যে, কেউ একজন সেকেন্ড মিনিট, ঘন্টা এবং ইঞ্চি, কিলোমিটার হিসেব করে এগুলো স্থাপন করেছে। যদি হিসেবে সামান্যও ভুল হতো তাহলে এগুলো চলমান থাকতোনা, একটার সাথে আরেকটার সংঘর্ষ ঘটে সৃষ্টির সাথে সাথেই তা আবার ধ্বংসও হয়ে যেত।

যেমন উদাহরণস্বরুপ: সুর্যকে পৃথিবী থেকে যে দুরত্বে এবং যে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে যদি এ থেকে সুর্য কয়েক মিটার দুরে চলে যায় তাহলে ক্ষনিকের মধ্যে এখানকার মানুষ ও প্রাণীকুল শীতল বরফে পরিণত হবে। আবার যদি সুর্য খানিক কাছে চলে আসে তাহলে সীমাতিরিক্ত তাপমাত্রার কারনে পৃথিবীর সমুদয় প্রাণীকুল মৃত্যুবরণ করবে, হারিয়ে যাবে সাগর, নদী, বিলীন হবে বরফের অস্তিত্ব। শুধু খা খা করবে শুস্ক মাটি। শুধু তাই নয়, প্রাণীকুলের উৎপত্তি ও তাদের জীবনধারণের জন্যে যে মাত্রার উষ্মতা, তাদের শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য যে মাত্রার অক্সিজেন, কার্বনডাইঅক্সাইডের প্রয়োজন তাও যেন তাদের স্ব স্ব চাহিদা অনুযায়ী অতি বিজ্ঞতার সাথে কেউ সরবরাহ করে যাচ্ছে এবং কিভাবে, কোথায় তারা খাদ্য অন্বেষন করবে তাও যেন জন্মলাভের সাথে সাথেই কেউ তাদেরকে বলে দিচ্ছে। মুরগীকে কেউ যেন নির্দেশনা দিচ্ছে যে, তুমি ডিম পাড়ার পর তার উপর বসে এতটা দিন তাপ দাও, তাহলে তা থেকে বাচ্চা বেরুবে। আবার এটাও বলে দেয়া হচ্ছে, একটি ডিম পাড়ার পরই তাতে তাপ দেয়ার জন্য বসে যেওনা, কমপক্ষে 10/12টি হলে তারপর তাপ দিতে বসবে। মুরগীর এ বিষয়টিতো আমাদের সাধারণ জ্ঞান গবেষণার কথা। অর্থাৎ এমনটা হওয়া বাঞ্চনীয় এবং আবশ্যিক, না হলে সৃষ্টিজগতে প্রাণের বংশ রক্ষা হবেনা।

সৃষ্টির শুরু থেকে সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক এব্যবস্থা অবলম্বনের কারনেই পৃথিবীতে জীবন ও জীবের বংশ বৃদ্ধির ধারা চালু রয়েছে। সৃষ্টিকর্তার অহীর সাথে আমরা যদি আমাদের এ সাধারণ জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলগুলো মিলিয়ে দেখি তাহলে বিস্ময়ে বিমুঢ় হতে হয় এটা লক্ষ্য করে যে, আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রকৃতপক্ষে তা-ই করেছেন। আল কুরআনুল কারিমে সুরা আন নাহলের 68 নং আয়াতে তিনি মৌমাছিদের প্রতি ইলহাম করার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন এভাবে: "আর দেখো তোমার রব মৌমাছিদেরকে একথা অহীর মাধ্যমে বলে দিয়েছেনঃ  তোমরা পাহাড়-পর্বত, গাছপালা ও মাচার ওপর এবং ছড়ানো লতাগুল্মে নিজেদের চাক নির্মাণ করো"৷

   

অনুরুপভাবে সৃষ্টিজগত সংক্রান্ত এসবের গবেষণাও প্রমাণ দিচ্ছে যে, যিনি এসব কাজ করছেন তিনি সাধারণ কোন সত্বা নন, সৃষ্টির কোন কিছুর সাথে তার তুলনা চলেনা, তার জ্ঞানসীমায় প্রবেশ করে এমন সাধ্যও কারোর নেই, তিনি শুধু জীববিদ্যা, ভুবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিদ্যার জ্ঞান রাখেননা বরং ইত্যাকার সকল বিদ্যার স্রষ্টাই হচ্ছেন তিনি, তারই নির্দেশনায় অনু গঠিত হয়, তারই নির্দেশনায় পদার্থ ক্রিয়া করে, তারই নির্দেশনায় নিস্প্রাণ বস্তুতে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। এসব কথা কোন কাব্যিকের কাব্য নয় বরং বিজ্ঞানের আবিস্কার যা পরীক্ষার্থীর হ্রদয়মনে স্রষ্টা সম্পর্কে অনুসন্ধিতসা জাগ্রত করতে যথেষ্ট ছিল।  

গ্রহ উপগ্রহ এবং নক্ষত্রমন্ডলীর অবস্থানও কতইনা বিস্ময়কর। ইঞ্চি-কিলোমিটার হিসেব করে পৃথিবী থেকে চাদকে এমন এক দুরত্বে স্থাপন করা হয়েছে এবং তার জন্যে এমন এক কক্ষপথ নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে করে চাদ নদী সমুদ্রের পানিকে আকর্ষণ করে জোয়ার ভাটার সৃষ্টি করতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যদি এর হিসেবে কোনও এদিক সেদিক হতো তাহলে হয় সাগরবক্ষের পানি পৃথিবীর স্থলভাগকে প্লাবিত করে এখানকার প্রাণীকুলের সলিলসমাধি ঘটাতো নয়তোবা পৃথিবীর সমুদয় পানি বিষাক্ত হয়ে পড়তো। আরও অবাক ব্যাপার হচ্ছে এই যে, আমাদের সৌরজগত সুপারনোভা বিস্ফোরণের মারাত্মক ক্ষতি সীমার বাইরে অবস্থান করছে অতি সুক্ষ এবং ক্রটিবিহীন এ পরিচালনব্যবস্থার কারনে। যদি আমাদের সৌরজগত গ্যালাক্সির অন্য কোনো অবস্থানে থাকত তবে পৃথিবী এত বছর ধরে টিকে থাকতে পারত না।

মাইকেল ডেন্টন তার ‘ Nature’s Destiny’ বইটিতে বলেন :

"Thanks to the creation of our solar system in this special position, life—and human life—can be sustained on Earth. This is the reason why we can investigate the universe we live in and observe the unequalled, supreme, spectacular artistry in God’s creation".  

আল্লাহ আরও বলেন:

"দৃঢ় প্রত্যয় পোষণকারীদের জন্য পৃথিবীতে বহু নিদর্শন রয়েছে"৷ (সুরা আযযারিয়াত 20)

অর্থাৎ "নিদর্শন অর্থ সেসব নিদর্শন যা আখেরাতের সম্ভাবনা এবং তার অবশ্যম্ভাবিতা ও অনিবার্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে৷ পৃথিবীর অস্তিত্ব এবং তার গঠন ও আকার-আকৃতি। সূর্য থেকে তাকে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে এবং বিশেষ কোণে স্থাপন, তার ওপর উষ্ণতা ও আলোর ব্যবস্থা করা, সেখানে বিভিন্ন মুওসূম ঋতুর আগমন, প্রস্থান, তার ওপর বাতাস ও পানি সরবরাহ করা, তার অভ্যন্তর ভাগে নানা রকমের অগণিত সম্পদের ভাণ্ডার সরবরাহ করা, তার উপরিভাগ একটি উর্বর আরবণ দিয়ে মুড়ে দেয়া এবং তার পৃষ্ঠদেশে ভিন্ন ভিন্ন রকমের অসংখ্য ও অগনিত উদ্ভিতরাজি উৎপন্ন করে দেয়া, তাতে স্থল, জল ও বায়ুতে বিচরণকারী জীবজন্তু ও কীট-পতঙ্গের অসংখ্য প্রজাতির বংশধারা চালু করা, প্রত্যেক প্রজাতির জীবন ধারণের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ ও উপযুক্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করা, সেখানে মানুষকে অস্তিত্ব দানের পূর্বে এমন সব উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা করা যা ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে কেবল তার দৈনন্দিন প্রয়োজনই পূরণ নয় বরং তার তাহযীব তামাদ্দুনে ক্রমবিবর্তনের  ক্ষেত্রে সহযোগিতাও করতে থাকবে, এসব এবং এ ধরনের এত অগণিত নিদর্শনাদি আছে যে, চক্ষুষ্মান ব্যক্তি পৃথিবী ও এর পরিমণ্ডলে যে দিকেই দৃষ্টিপাত করে তা তার মনকে আকৃষ্ট করতে থাকে৷ যে ব্যক্তি তার বিবেক-বুদ্ধির দরজা বন্ধ করে দিয়েছে,  কোনক্রমেই বিশ্বাস করতে চায় না, তার কথা ভিন্ন৷

তবে যার হৃদয়-মন সংকির্ণতা ও পক্ষপাত মুক্ত এবং সত্যের জন্য অবারিত ও উন্মুক্ত সে এসব জিনিস দেখে কখনো এ ধারণা পোষণ করবে না যে, এসবই কয়েকশ' কোটি বছর পূর্বে বিশ্ব-জাহানে সংঘটিত একটি আকস্মিক মহা বিষ্ফোরণের ফল৷ বরং এসব দেখে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাবে যে, এ চরম উন্নত মানের এ বৈজ্ঞানিক কীর্তি মহাশক্তিমান ও মহাজ্ঞানী এক আল্লাহরই সৃষ্টি৷

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None