হেরাক্লিয়াসের ঘটনা

হেরাক্লিয়াস কিসরার মতো ছিলেননা

আল্লাহর নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চিঠি যখন পারস্য সম্রাট কিসরার কাছে পৌছে তখন সে রাগে ও অহংকারে চিঠিটি টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলে, আর বলে “কে এই ব্যক্তি যে কিনা নিজের নাম আমার নামের আগে লিখার দু:সাহস দেখাল। বাযানকে (তৎকালীন ইয়েমেনের গভর্ণর) লিখো, এ লোকটিকে যেন গ্রেফতার করে আমার কাছে পাঠিয়ে দেয়”।

কিন্তু রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস কিসরার মতো ছিলেননা। রাসুলুল্লাহর চিঠি যখন তার নিকট পৌছে (পারস্যের সাথে যুদ্ধে জয়লাভের পর হেরাক্লিয়াস তখন বাইতুল মাকদিসে অবস্থান করছিলেন) অত্যন্ত তাজিমের সাথে তা তিনি গ্রহন করেন। শুধু তা-ই নয় মাদীনার দুতের সম্মানে বিরাট জাকজমকপুর্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেন এবং আদেশ জারী করেন: “এ অঞ্চলে মাক্কার আর কোন ব্যক্তি থাকলে তাকে আমার কাছে আনা হোক”। ঘটনাক্রমে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বাণিজ্যিক সফরে ওখানে ছিল।

আবু সুফিয়ানকে আনা হলো। হেরাক্লিয়াস কুরাইশদলের সকলকে লক্ষ্য করে বললেন: আমি ওকে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করবো, যদি সে কোন ভুল বা মিথ্যা তথ্য দেয়, তাহলে আমাকে বলে দেবে। 

আবু সুফিয়ান পরবর্তীতে বলেছিলো: “আমি যদি আশংকা না করতাম যে, সাথীরা আমার মিথ্যার জারিজুরি ফাস করে দেবে তাহলে আমি এই সুযোগে কিছু মনগড়া কথা বলে দিতাম্”।

কিন্তু আল্লাহ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে দিলেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তার কট্রর দুশমনের মুখ দিয়েও সত্য কথাই বেরুলো।

হেরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন:

যে লোকটি নবু্য়াতের দাবী করছে তার বংশ মযাদা কেমন?

তিনি উচ্চ বংশ মযাদার অধিকারী।

তিনি যা বলেন, এরকম কথা কি তার আগে তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ বলেছিলো?

না।

তার পিতা পিতামহের মধ্যে কেউ কি সম্রাট ছিলেন?

না।

ধনী লোকেরা তার অনুসারী হচ্ছে নাকি নি:স্ব দুবল লোকেরা?

নি:স্ব দুবল লোকেরা।

তাদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে?

বেড়েই চলেছে।

এ দ্বীনে প্রবেশের পর কেউ কি বীতশ্রদ্ধ হয়ে মুরতাদ হয়?

না।

তিনি যা বলেছেন তা বলার আগে কেউ কি তাকে কখনে মিথ্যা বলার জন্য অভিযুক্ত করতো?

না।

তিনি কি চুক্তি অংগীকার ভংগ করেন?

জ্বি না। তবে বর্তমানে তার সাথে আমরা এক সন্ধিসুত্রে আবদ্ধ রয়েছি। এ ব্যাপারে তিনি কি করবেন আমরা জানিনা। 

তোমরা কি তার সাথে কখনো যুদ্ধ করেছো?

হ্যা।

তোমাদের এবং তার যুদ্ধ কেমন ছিলো?

কখনো তিনি আমাদেরকে পরাজিত করেন, আবার কখনো আমরা তাকে পরাজিত করি।

তিনি তোমাদের কি কাজের আদেশ দেন?

তিনি আদেশ দেন যে: তোমরা আল্লাহকে ইলাহরুপে গ্রহণ কর। তার সাথে কাউকে শরিক করোনা। তোমাদের পিতা পিতামহ যা বলতেন সেসব ছাড়ো। তিনি আমাদেরকে সত্যবাদিতা, পরহেযগারী, খারাপ ও নোংরা কাজকর্ম পরিহার, পাক পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা এবং আত্বীয়স্বজনদের সাথে ভালো ব্যবহারের কথা বলেন।

এবার হেরাক্লিয়াস তার দোভাষীকে বলেন: এ লোকটিকে (আবু সুফিয়ানকে) বলো: আমি যখন নবুয়াতের দাবীদারের বংশ মযাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি তখন সে বলেছে, তিনি উচ্চ বংশের। নিয়ম হচ্ছে, নাবী রাসুল উচ্চ বংশেই জন্মগ্রহন করে থাকেন।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি: তার আগে তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ এ ধরণের কথা বলেছিলো কিনা। সে বলেছে, না বলেনি। যদি সে অন্য কারো বলা কথারই পুনরাবৃত্তি করতো তাহলে আমি বলতাম – সে অন্যদের বলা কথারই প্রতিধ্বনি করছে।

আমি জিজ্ঞেস করেছি: তার বাপ দাদাদের মধ্যে কেউ বাদশাহ ছিলো কিনা। সে বলেছে: না, ছিলোনা।

যদি তার বাপদাদাদের মধ্যে কেউ বাদশাহ থাকতো তাহলে আমি বলতাম – এ লোক বাপদাদার বাদশাহী লাভের আকাংখা করছে।

সে বলেছে: এর আগে কেউ কখনো তাকে মিথ্যা বলতে দেখেনি। কাজেই মানুষের ব্যপারে 

যিনি মিথ্যা কথা বলেননা, সবশক্তিমান আল্লাহর ব্যপারে তিনি মিথ্যা বলবেন, এটা হতেই পারেনা।

সে বলেছে: নি:স্ব ও দুবল লোকেরা তার অনুসারী হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে নি:স্ব ও দুবলেরাই নাবী রাসুলদের অনুসারী হয়ে থাকে।

সে বলেছে এ দ্বীন গ্রহনের পর আর কেউ তা ত্যাগ করেনা। প্রকৃতপক্ষে ইমানের সজীবতা অন্তরে প্রবেশের পর এরকমই হয়ে থাকে।

ওহে আবু সুফিয়ান! তুমি যা বলছো যদি এসব কিছু সত্য হয়ে থাকে, তবে তিনি শীঘ্রই আমার দু’পায়ের নীচের জায়গারও মালিক হয়ে যাবেন। আমি জানতাম, এ নাবী আসবেন। কিন্তু আমার ধারণা ছিলোনা যে, তার আগমন তোমাদের মধ্যে ঘটবে। হায়, যদি আমি নিশ্চিত হতে পারতাম যে, আমি তার কাছে পৌছতে পারবো, তবে তার সাক্ষাতের কষ্ট স্বীকার করতাম এবং তার দু’চরণ ধুয়ে দিতাম”।

গ্রন্থঋণ : ১) আর রাহীকুল মাখতুম। ২) মানবতার বন্ধু মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ সা:। আরও দ্রষ্টব্য: বুখারী, ২য় খন্ড।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)