কি ছিল সেসব চিঠিতে..

কি ছিল সেসব চিঠিতে..

ষষ্ঠ হিজরীর শেষ দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হোদাইবিয়া থেকে ফিরে আসার পর বিভিন্ন বাদশাহ ও আমীরের নামে চিঠি প্রেরণ করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। চিঠিগুলো অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, সকল চিঠি একই ধরণের ছিলনা। যেমন হাবাশার বাদশাহ নাজ্জাশীর প্রতি লিখা চিঠির ভাষা আর পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ (কিসরা), মিসর সম্রাট জুরাইজ ইবনু মাত্তা (মুকাওকিস) প্রমুখকে লিখা চিঠি এক নয়। 

পারস্য সম্রাট কিসরাকে রাসুলুল্লাহ সা: লিখেন:

“পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ এর পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার নামে। সালাম সে ব্যক্তির প্রতি যিনি হেদায়াতের আনুগত্য করেন এবং আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসুলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, আল্লাহ ছাড়া ইবাদাতের যোগ্য কেউ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তার কোন শরিক নেই, মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসুল। আমি আপনাকে এক আল্লাহর প্রতি আহবান জানাচ্ছি, কারন আমি সকল মানুষের প্রতি আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত। যারা বেচে আছে তাদের পরিণাম সম্পর্কে ভয় দেখানো আমার দায়িত্ব। কাজেই আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। যদি এতে অস্বীকৃতি জানান, তবে সকল অগ্নী উপাসকের পাপও আপনার উপর বর্তাবে”। 

মিসর সম্রাট মুকাওকিসকে লিখা হয়:

“পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর বান্দা ও তার রাসুল মুহাম্মাদ এর পক্ষ থেকে মুকাওকিস আযম কিবতের নামে। তার প্রতি সালাম যিনি হেদায়াতের আনুগত্য করেন। আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। ইসলাম কবুল করলে আল্লাহ আপনাকে দু’টি পুরস্কার দেবেন। আর যদি ইসলাম গ্রহণ না করেন তবে কিবতের অধিবাসীদের পাপও আপনার উপর বর্তাবে। হে কিবতীরা এমন একটি বিষয়ের প্রতি এসো যা আমাদের এবং তোমাদের জন্যে সমান। আমরা আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো ইবাদাত করবোনা এবং তার সাথে কাউকে শরিক করবোনা”।

এ চিঠিগুলোকে যারা নিছক ইতিহাস হিসেবে দেখেন, তাদের জন্য হয়তো এতে কিছুই নেই। কিন্তু অন্তরের চোখ যাদের অন্ধ নয়, মনুষ্য সমাজের মুল সমস্যাবলী নিয়ে যারা চিন্তাভাবনা করেন তারা একবাক্যে স্বীকার করবেন যে – “কাজেই আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। যদি এতে অস্বীকৃতি জানান, তবে সকল অগ্নী উপাসকের পাপও আপনার উপর বর্তাবে”। 

“আর যদি ইসলাম গ্রহণ না করেন তবে কিবতের অধিবাসীদের পাপও আপনার উপর বর্তাবে”। - এ কথাগুলোতে অতি বড়ো এক শিক্ষা এবং দিক নির্দেশনা নিহিত রয়েছে।

গাড়ী যেমন সদা সেদিকেই চলতে থাকে যেদিকে তার ড্রাইভার চালিয়ে নিয়ে যায় এবং এর আরোহীগন ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় সেদিকেই চলতে বাধ্য হয়, মানবসমাজও ঠিক তেমনি।

আপনি যদি একান্ত খোলা মন নিয়ে এ পৃথিবীবাসীর দু:খ দুর্দশার কারন অনুসন্ধান করেন, তাহলে দেখবেন যে, এর মুলে রয়েছে পাপী, অসৎ ও আল্লাহদ্রোহী লোকদের শাসন বা নেতৃত্ব। এহেতু যৌক্তিক কারনেই সবার আগে শাসকদের কাছে চিঠি লিখা হয়েছে।

ইতিহাস পযালোচনা করলে দেখা যায়, এ পৃথিবীতে যাদের দ্বারা নাবী/রাসুলগন বেশী নিযাতিত ও বয়কটের শিকার হয়েছেন তারা ছিলো সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিগন। এ কর্তা ব্যক্তিগনই নাবী রাসূলদের জীবনকে দুবিসহ করে রাখতেন। যাদের হাতে আল্লাহর প্রেরিত নাবী রাসুলগন শহীদ হয়েছেন (সুরা আল বাকারা ৯২, সুরা আলে ইমরান ২১) সেসব হন্তাগন সকলেই ছিলো সমাজ ও রাষ্ট্রের সব্বোচ পযায়ে আসীন।  

সুতরাং যে প্রজা তার শাসকের দন্ডের ভয়ে কিংবা আল্লাহবিরোধী আইন বিধানের কারনে অথবা ভ্রান্ত শিক্ষানীতি হেতু সত্য পথের কোন খোজই পেলনা তাকে ধরে আল্লাহ শাস্তি দেবেন ইসলামে দাখিল না হবার কারনে – এটি ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। এখানে ন্যায় ও ইনসাফের দাবীতো হচ্ছে এ যে, যে নেতৃত্ব বা শাসকের প্রতিবন্ধকতাহেতু প্রজাগন সত্য পথ সম্পর্কে অবহিত হতে পারেনি সে নেতৃত্ব বা শাসকবৃন্দকে আগে পাকড়াও করতে হবে।

তাই বলা হয়েছে - “কাজেই আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। যদি এতে অস্বীকৃতি জানান, তবে সকল অগ্নী উপাসকের পাপও আপনার উপর বর্তাবে”।   

চিঠিগুলো যেন আলোর ফোয়ারা। এতে আরো ইংগিত দেয়া হয়েছে: 

১) ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব কোনো আনন্দের জিনিস নয়। এটি কি – তার ব্যাখ্যা এখানে নিস্প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “দুনিয়াতে দশজনেরও নেতা ছিল, এমন ব্যক্তিকে কিয়ামাতের দিন এরুপ অবস্থায় উত্থিত করা হবে যে, তার দু’হাত তার গলার সাথে বাধা থাকবে, অত:পর হয় তার ন্যায়পরায়ণতা ও আল্লাহভীরুতা তাকে এ অবস্থা থেকে মুক্ত করবে, নয়তো তার অন্যায় অবিচার তাকে এ অবস্থায়ই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে” (মুসনাদ আহমাদ ও ইবনু হিব্বান)   

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 5 (টি রেটিং)