যুক্তির নিরিখে কুরআন – পাচ

 ১৫) কুরআনে বৈজ্ঞানিক তথ্য:

কুরআন কারিমের আর এক বিস্ময়কারীতা হচ্ছে এ গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক তথ্যাবলীর উপস্থিতি। যা কিনা আধুনিক বিশ্ব, বিশেষ করে বস্তুবাদের অনুসারীদের মুখে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। 

কুরআনে উল্লেখিত এসকল বিষয়াবলী নিয়ে
লেখালেখি এবং বইয়ের সমাহার এত প্রচুর যে নতুন করে আর তা লিখা নিস্প্রয়োজন। তবে
আমার আলোচ্য বিষয়ের সমাপ্তি টানার আগে এ প্রসংগে বিজ্ঞানীমহলের কিছু সাক্ষ্য
এবং আত্ন-উপলব্ধির কথা  তুলে ধরা
প্রনিধানযোগ্য মনে করছি।

ফরাসি চিকিৎসাবিদ ড: মরিস বুকাইলি (জন্ম
১৯ জুলাই ১৯২০ – মৃত্যু ১৭
ফেব্রুয়ারী ১৯৯৮) তার ‘The Bible, The Quran and Science’ বইতে (যা এপযন্ত পৃথিবীর প্রায় সতেরোটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে) লিখেছেন:

“কুরআনের বাণীতে বিজ্ঞান- সংক্রান্ত
বহুবিদ সুনিদির্ষ্ট বক্তব্য আমাকে গোড়াতেই বিশেষভাবে বিস্মিত করেছিল। সেই থেকে এ
যাবতকাল আমি কুরআনের বিজ্ঞান-সংক্রান্ত এইসব বিষয়ের অর্থ ও তাৎপয নির্ণয়ে নিরত
রয়েছি। স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছি, কোনো এক ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে কুরআনের বিভিন্ন
বৈজ্ঞানিক বাণীর অর্থ ও বিশ্লেষণ খুজে বের করা আদৌ সম্ভব নয়। উল্লেখ্য যে, বিভিন্ন
বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য সম্বলিত কুরআনের বাণী সংখ্যায় সুপ্রচুর। আর এসব বাণী
অবতীর্ণ ও সংকলিত হয়েছিল তেরশত বছরেরও আগে। অথচ এত বিভিন্নমুখী বৈজ্ঞানিক
তথ্য-সম্বলিত হয়েও সেসব বাণী আধুনিক বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে কিভাবে যে এত বেশী
সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারল, সে বিষয়টিই আমাকে বিস্মিত করেছে সবচেয়ে বেশী।

গোড়াতে ইসলাম সম্পর্কে আমার কোনো
আস্থা কিংবা বিশ্বাস যা-ই বলা হোক – তেমন কোন
কিছুই ছিলনা। সুতরাং সম্পুর্ণ খোলা মন নিয়ে আমি কুরআনের বাণীসমুহ পরীক্ষা
নিরীক্ষায় ব্যাপৃত হয়েছিলাম এবং সম্পুর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভংগি নিয়েই আমি হাত
দিয়েছিলাম এ দুরহ গবেষণাকর্মে। সত্যি কথা বলতে কি, এ কাজে কোনো কিছুর প্রভাবের কথা
যদি বলতে হয় তা হলে স্বীকার করতেই হবে যে, যৌবনে আমি যে শিক্ষাটা পেয়েছিলাম – সেটাই আমার উপরে সবিশেষ প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল। আমি দেখেছিলাম,
পাশ্চাত্যে সাধারণত মুসলমানদের কথা উঠলেই তাদের ‘মোহামেডান’ বলে চিহ্নিত
করা হয়। এর তাৎপয একটাই, এই মোহামেডান শব্দের দ্বারা একথাই বোঝাতে চাওয়া হয় যে,
ইসলাম ধর্মটা আসলে জনৈক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত ধর্ম, সৃষ্টিকর্তার সাথে এ ধর্মের কোনোও
সম্পর্ক নেই, থাকতেও পারেনা। অর্থাৎ এ ধর্ম আদৌ স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত কোনো ধর্ম
নয়। এই অবস্থায় পাশ্চাত্যের আর দশজন মানুষের মত আমিও স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম
সম্পর্কে ওই একই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে নিশ্চিন্ত ছিলাম। তা ছাড়াও ইসলাম সম্পর্কে
নানা ধরণের ভ্রান্ত ধারণা পাশ্চাত্যজগতে বহুল পরিমাণে ছড়িয়ে রয়েছে। বস্তুত আমি
বিস্মিত না হয়ে পারিনা, যখন দেখি সাধারণ মানুষ তো বটেই, পাশ্চাত্যের যেকোনো
বিশেষজ্ঞও যেকোনো আলাপ আলোচনাকালে ইসলাম সম্পর্কে ওই একই ধরনের ভ্রান্ত ধারণা কি
অবলীলায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে কি পান্ডিত্যপূর্ণভাবেই না তুলে ধরে থাকেন।

সুতরাং আজ আমাকে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার
করে নিতে হচ্ছে যে, পাশ্চাত্যজগতের নিকট থেকে প্রাপ্ত এই ভ্রান্তিপুর্ণ ধারণার সম্পুর্ণ
বিপরীত ভিন্ন আরেক ধারণা আমার কাছে স্পষ্ট না হওয়া পযন্ত ইসলাম সম্পর্কে আমি
সম্পুর্নরুপেই অজ্ঞ ছিলাম .....................।

এ বিষয়ে আমি মরহুম বাদশাহ ফয়সলের নিকট
কৃতজ্ঞতার ঋণে আবদ্ধ হয়ে রয়েছি। আজ আমি তার
বিদেহী আত্নার উদ্দেশ্যে সালাম জানাই এবং গভীর শ্রদ্ধাপ্লুত চিত্তে স্মরণ করি তার
সাথে আমার সাক্ষাতকারের এই পুণ্যময় স্মৃতি। সেই সফরে ইসলাম সম্পর্কে তার বক্তব্য
শুনবার এক সম্মানজনক বিরল সুযোগ আমি পেয়েছিলাম এবং এক বৈঠকে আমি তার কাছে আধুনিক
বিজ্ঞানের আলোকে কুরআনের কতিপয় ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ-সংক্রান্ত সমস্যার কথাও
উত্থাপন করেছিলাম। সেই স্মৃতি এখনও আমার সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসছে।...........

সেই থেকে
একটা বিষয় আমার নিকট পরিস্কারভাবে ফুটে উঠেছে যে, ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যজগতে
(এবং শিক্ষিতসমাজে) আমরা যে ধারণা গড়ে তুলেছি তার সাথে আসল ইসলামের ব্যবধান সত্যি
বিরাট। সেই থেকেই আমি আরবী ভাষা (যে ভাষা আমি বলতে পারতামনা) শিখবার অপরিহায
প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি। ..............।

আরো একটি
বিষয় আমাকে বিস্মিত করে রেখেছিল, তা হল প্রাকৃতিক বিষয়-সংক্রান্ত কুরআনের ওইসব
বর্ণনা যা আধুনিক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরোভাবে সংগতিপূর্ণ। অথচ
মুহাম্মাদের (সা) সময়ে জন্মগ্রহণকারী কোনো মানুষের পক্ষেই ওইসব প্রাকৃতিক বিষয়
সম্পর্কে ধারণা লাভ আদৌ সম্ভব ছিলনা। ................।

কুরআনের
বিভিন্ন আয়াতে বিশ্বসৃষ্টি, জ্যোতিবিজ্ঞান, ভুমন্ডলে গঠনে ব্যবহৃত বিভিন্ন
উপাদানের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ, পশুপ্রজাতি, উদ্ভিতজগত এবং মানব-প্রজনন প্রভৃতি
বিষয়ে এত অধিক আলোচনা রয়েছে যে, অভিভুত না হয়ে পারা যায়না।

সবচেয়ে
বড় কথা, এসব বিষয়ের আলোচনায় বাইবেলের ভুলের পরিমাণ যেখানে পবতপ্রমাণ, সেখানে
কুরআনের কোনো আয়াতের একটি ভুলও আমি খুজে পাইনি।

বিস্ময়ে
বিমুঢ় হয়ে পদে পদেই আমাকে থেমে যেতে হয়েছে এবং প্রতিটি পযায়ে নিজেকেই আমি জিজ্ঞেস
না করে পারিনি যে, সত্যি সত্যিই কোনো মানুষ যদি এ কুরআন রচনা করে থাকেন, তাহলে
সপ্তম শতাব্দীতে বসে কিভাবে তিনি জ্ঞান বিজ্ঞানের এতসব বক্তব্য এত সঠিকভাবে রচনা
করতে পারলেন? আর  সেসব বক্তব্যই বা কিভাবে
আজকের যুগের সবাধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য-জ্ঞানের সাথে এতটা সামঞ্জস্যপুর্ণ হতে পারল?

ফ্রান্সে
তখন রাজত্ব করছিলেন রাজা ডাগোবার্ট (৬২৯-৬৩৯ খৃষ্টাব্দ)। আর ঠিক সেই সময়ে আরব
উপদ্বীপের বুকে বসে সেখানকার এক বাসিন্দা বিশেষ বিশেষ বিষয়ে কিভাবে
জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন সব বাণী প্রচার করছিলেন – যেসব
বাণী ও বক্তব্য সেই সময়ের থেকে তো বটেই – সহস্রাধিক বছর পরের জ্ঞান-বিজ্ঞানের
থেকেও অগ্রগামী” ?

                  (বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান। পৃ: ১৬২-১৬৫) রুপান্তর:
আখতারুল আলম)

(চলবে)           

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None