এখানে যুক্তি, বুদ্ধি বিরোধী কথা নেই

আপনি যদি সহীহ উৎস থেকে কুরআন, সুন্নাহর কথাগুলো অধ্যয়ন করেন, তাহলে দেখবেন,  যুক্তি ও আকল সমর্থন করেনা – এমন কোনো আদেশ নিষেধ এতে নেই। কিন্তু মানুষ বুঝতে ভুল করে। নীচে এরই কিছু উদাহরণ আমি পেশ করছি:

এক:

একবার আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) জানতে পারলেন যে, আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) লোকদেরকে বলছেন: ‘নামাযের মধ্যে পুরুষের সামনে দিয়ে যদি কোনো মহিলা, গাধা এবং কুকুর অতিক্রম করে তাহলে নামায নষ্ট হয়ে যাবে’। এ কথা শুনে তিনি খুব রেগে গেলেন এবং বললেন: তোমরা আমাদের নারীদেরকে কুকুর আর গাধার সমান করে দিলে? আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকতাম, ঘুমিয়ে থাকতাম (ঘরে পযাপ্ত জায়গা না থাকার কারনে) আর তিনি নামায পড়তে থাকতেন। যখন সিজদায় যেতেন, হাত দিয়ে টোকা দিতেন আর আমি পা সরিয়ে নিতাম। তিনি উঠে গেলে আবার পা ছড়িয়ে দিতাম (বুখারী, ৬ষ্ট খন্ড, পৃ: ৭৩) অনেক সময় প্রয়োজন হলে শরীর কাত করে সামনে দিয়ে বের হয়ে যেতাম (বুখারী, বাব আস সারীর)

(সুত্র: সীরাতে আয়িশা রা: পৃ: ২৯১, সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ)

দুই:

“স্বজনদের কান্নাকাটিতে মৃতের শাস্তি হয়” কথাটি হাদীস হিসেবে এদেশে প্রচার করা হয়। অথচ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথাটি এভাবে বলেননি। এটা বলা তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিলনা। 

সাহাবীদের মধ্যে কথাটি বুঝার ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্ধ দেখা দিলে তারা উম্মুল মু’মিনীন আয়িশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নিকট গেলেন। উম্মুল মু’মিনীন বললেন; 

“আল্লাহ আবু আবদির রহমানকে (আবু হুরাইরা) ক্ষমা করুন। তিনি মিথ্যা বলেননি কিন্তু ভুল করেছেন। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে এই যে, এক ইয়াহুদী মহিলা মারা গেলে তার স্বজনেরা বিলাপ শুরু করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা দেখে বললেন: ঐদিকে ঐ মহিলাটির আযাব হচ্ছে আর এদিকে এরা বিলাপ করছে”। (অর্থাৎ এমনটি করা মুর্খতা)

(মুসলিম, কিতাবুল জানায়েয)

উম্মুল মু’মিনীন আরও বললেন: “আত্বীয়ের কান্না মাইয়েতের শাস্তির কারন নয়। মাইয়েতের শাস্তি হচ্ছে তার কৃত পাপের কারনে। প্রত্যেককে তার স্ব-স্ব পাপের শাস্তি ভোগ করতে হবে। একজনের পাপের কারনে অন্যজন শাস্তি পাবেনা”। 

অত:পর আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: “একজনের পাপের বোঝা অন্যজন বহন করবেনা” (সুরা আল ইসরা ১৫)

(নোট: প্রিয়জনের মৃত্যুতে অশ্রু আসা দোষের নয়। দোষ যেটা তা হচ্ছে: বিলাপ করা, কাপড়চোপড় ছেড়া, মাটিতে হাত চাপড়ানো, শারিয়াত বিরোধী কথাবার্তা মুখে আনা ইত্যাদি। তবে মৃত ব্যক্তি যদি বিলাপ করার রীতি পদ্ধতির উদ্ভাবক হয়ে থাকে তাহলে সে শাস্তি প্রাপ্ত হবে।)

(সুত্র: সীরাতে আয়িশা রা: সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ: পৃ: ২৭৮,২৭৯)

তিন:

একবার আয়িশা রা: এর কানে এলো যে, আবু হুরাইরা রা: বলছেন: “জারজ শিশু তিনজনের (জন্মদাতা, জান্মদাত্রী, জারজ) নিকৃষ্টজন”। 

শুনে আয়িশা রা: বললেন: এটা ঠিক নয়। বাস্তবতা এই যে, এক মুনাফিক ছিলো, সে রাসুল সা: কে গালমন্দ করতো। লোকেরা বললো: হে আল্লাহর রাসুল, সে শুধু মুনাফিকই নয়, জারজও। রাসুল সা: বললেন, কিন্তু তিনজনের নিকৃষ্টজন সে-ই। অর্থাৎ জারজ হলেও সে তার বাবা, মায়ের চাইতেও নিকৃষ্ট। এটা একটা বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা কথা। এটা সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। 

কেননা আল্লাহ বলেছেন: “কেউ কারও পাপের বোঝা বহন করবেনা” (সুরা আল ইসরা ১৫)

অর্থাৎ অপরাধ মা-বাবার, সন্তানতো নির্দোষ। সুতরাং সে নিকৃষ্ট হতে যাবে কেন? (ইসাবা। সুয়ুতি রহ: হাকেমের উদৃতিতে)

চার:

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর একটি বর্ণনা আছে, রাসুল সা: দুই বার তার প্রভুর দর্শন লাভ করেছেন। তাবেঈ মাসরুক (রহ) আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন: আম্মাজান, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি সত্যই আল্লাহকে দেখেছেন?

আয়িশা রা: বিস্ময়ের স্বরে বললেন: পুত্র, তোমার কথা শুনে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। যে তোমাকে এধরণের কথা বলেছে, সে ঠিক বলেনি। এরপর তিনি নীচের আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:

“কোনো দৃষ্টিই তাকে দেখতে পায়না, কিন্তু তিনি সবকিছু দেখতে পান...” (সুরা আল আনআম ১০৩)

তিনি আরও তিলাওয়াত করলেন:

“কোনো মানুষেরই এই শক্তি নেই যে, সে আল্লাহর সংগে কথা বলবে। তবে অহীর মাধ্যমে কিংবা পর্দার অন্তরালে” (সুরা আশ-শুরা ৫১)

আরও কিছু হাদিস থেকে আয়িশা রা: এর মতের সমর্থন মেলে। সহীহ মুসলিমে এসেছে: রাসুল সা: বলেছেন: “আল্লাহতো নুর (জ্যোতি), আমি কিভাবে তার দেখা পাবো”।

(সুত্র: সীরাতে আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। পৃ: ২৮৩,২৮৪। সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ)

শেষ কথা/উপসংহার: 

আল্লাহর দ্বীন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, মযাদা ভুলুন্ঠিত করে – এমন কোনো কথা প্রচার বিজ্ঞজনদের কাজ হতে পারেনা। কারন, হতে পারে, যে হাদিসটি আজ ওয়াজের মাহফিলে কিংবা মাসজিদের মিম্বারে মানুষকে শোনানো হচ্ছে তা একদিন এমন মহলে হাস্যস্পদের বিষয় হবে বস্তুবাদের অমানিশা যাদের হৃদয় মনকে অন্ধকার করে রেখেছে।

আপনার রেটিং: None

Rate This

আপনার রেটিং: None