আসহাবু কাহাফের ঘটনা

এ ঘটনাটি এতই প্রসিদ্ধ এবং এর স্বপক্ষে ভুতাত্বিক ও ঐতিহাসিক যুক্তিপ্রমাণ
এতটাই শক্তিশালী ও অখন্ডনীয় যে, কোন স্বাভাবিক, সুস্থ মস্তিস্ক ও নীতিবান লোকের
পক্ষে তা অস্বীকার করা সম্ভব নয়।   

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে,
ইতিহাসটি উল্লেখিত হয়েছে আল কুরআনুল কারিমে এবং এটিই ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যে
যথেষ্ট হতে পারে জ্ঞানবানদের জন্য। সুরা আল কাহাফের 9 থেকে
26 আয়াত পযন্ত সংক্ষিপ্তাকারে ঘটনাটির বর্ণনা এসেছে।

নীচে তাফসীরগ্রন্থের
উদৃতি তুলে ধরা হচ্ছে:

এ কাহিনীর প্রাচীনতম বিবরণ পাওয়া গেছে জেমস সারোজি নামক সিরিয়ার একজন
খৃষ্টান পাদরীর বক্তৃতামালায়৷ তার এ বক্তৃতা ও উপদেশবাণী সুরিয়ানী ভাষায়
লিখিত৷ আসহাবে কাহফের মৃত্যুর কয়েক বছর পর ৪৫২ খৃষ্টাব্দে তার জন্ম হয়৷
৪৭৪ খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে তিনি নিজের এ বক্তৃতামালা সংকলন করেন৷ এ
বক্তৃতামালায় তিনি আসহাবে কাহফের ঘটনাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন৷ আমাদের
প্রথম যুগের মুফাসসিরগণ এ সুরিয়ানী বর্ণনার সন্ধান পান৷

ইবনে জারীর তাবারী তাঁর তাফসীরগ্রন্থের বিভিন্ন সূত্র মাধ্যমে এ কাহিনী উদ্ধৃত করেছেন। অন্যদিকে
এগুলো ইউরোপেও
পৌঁছে যায়৷ সেখানে গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় তার অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তসার প্রকাশিত হয়৷ গিবন তার "রোম সম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস" গ্রন্থের ৩৩ অধ্যায়ে ঘুমন্ত সাতজন শিরোনামে ঐসব উৎস থেকে এ কাহিনীর যে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন তা আমাদের মুফাসসিরগণের বর্ণনার
সাথে এত বেশী মিলে যায় যে, উভয় বর্ণনা একই উৎস থেকে গৃহীত বলে মনে হয়৷

যেমন যে বাদশাহর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আসহাবে কাহফ গুহাভ্যন্তরে আশ্রয় নেন আমাদের
মুফাসসিরগণ তাঁর
নাম লিখেছেন ' দাকায়ানুস ' বা ' দাকিয়ানুস' এবং গিবন
বলেন, সে ছিল কাইজার ' ডিসিয়াস' (
Decious) এ বাদশাহ ২৪৯ থেকে
২৫১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রোম সম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা
করে এবং ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের ওপর নিপীড়ন নির্যাতন চালাবার
ব্যাপারে তার আমলই সবচেয়ে বেশী দুর্ণাম কুড়িয়েছে৷ যে নগরীতে এ ঘটনাটি ঘটে
আমাদের মুফাসসিরগণ তার নাম লিখেছেন 'আফসুস' বা 'আসসোস'৷

অন্যদিকে গিবন তার নাম লিখেছেন 'এফিসুস'
(Ephesus)। এ নগরীটি এশিয়া মাইনরের পশ্চিম তীরে রোমীয়দের সবচেয়ে বড় শহর ও বন্দর নগরী ছিল৷ এর ধ্বংসাবশেষ বর্তমান তুরস্কের 'ইজমীর' ( স্মার্ণা) নগরী থেকে ২০-২৫ মাইল দক্ষিণে পাওয়া যায়৷ (দেখুন
২২২ পৃষ্ঠায়)৷ তারপর যে বাদশাহর শাসনামলে আসহাবে কাহফ জেগে উঠেন আমাদের মুফাসরিগণ
তার নাম লিখেছেন  'তেযোসিস' এবং গিবন বলেন, তাদের নিদ্রাভংগের ঘটনাটি কাইজার দ্বিতীয় থিয়োডোসিস  (Theodosius ) এর আমলে ঘটে৷ রোম সাম্রাজ্য খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে নেয়ার পর ৪০৮ থেকে ৪৫০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি রোমের কাইজার ছিলেন৷ উভয় বর্ণনার সাদৃশ্য এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে আসহাবে কাহফ ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর তাদের যে সাথীকে খাবার আনার জন্য শহরে পাঠান তার নাম আমাদের মুফাসসিরগণ লিখেছেন ' ইয়ামলিখা' এবং গিবন লিখেছেন  'ইয়াসলিখুস' ( lamblchus)।

 ঘটনার বিস্তারিত বিবরণের ক্ষেত্রে উভয় বর্ণনা একই রকমের ৷
এর সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে,
কাইজার ডিসিয়াসের
আমলে যখন ঈসা আলাইহিস সালামের অনুসারীদের ওপর চরম নিপীড়ন নির্যাতে চালানো হচ্ছিল তখন এ
সাতজন যুবক একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন৷ তারপর কাইজার থিযোডোসিসের রাজত্বের
৩৮ তম বছরে অর্থাৎ প্রায় ৪৪৫ বা ৪৪৬ খৃষ্টাব্দে তারা জেগে উঠেছিলেন৷ এ সময় সমগ্র রোম সাম্রাজ্য ছিল ঈসা আলাইহিস সালামের দীনের অনুসারী৷

 আসহাবে কাহাফের ঘটনাটি ঘটে এফিসোস (Ephesus ) নগরীতে৷ খৃষ্টপূর্ব প্রায় এগারো শতকে এ নগরীটির পত্তন হয়৷
পরবর্তীকালে এটি মূর্তিপূজার বিরাট কেন্দ্রে পরিণত হয়৷ এখানকার লোকেরা চাঁদ বিবির পূজা করতো৷ তাকে বলা হতো ডায়না (diana)৷ এর সুবিশাল মন্দিরটি প্রাচীন যুগের দুনিয়ার অত্যাশ্চর্য বিষয় বলে গণ্য হতো৷ এশিয়া মাইনরের লোকেরা তার পূজা করতো৷ রোমান সাম্রাজ্যেও তাকে উপাস্যদের মধ্যে শামিল করে নেয়া হয়৷ হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের পর যখন তাঁর দাওয়াত রোম সাম্রাজ্যে পৌঁছুতে শুরু করে তখন এ শহরের কয়েকজন যুবকও শিরক থেকে তাওবা করে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে৷ খৃষ্টীয় বর্ণনাবলী একত্র করে তাদের ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ গ্রেগরী অব টুরস (Gregory of tours ) তাঁর গ্রন্থে (Meraculorum liber) বর্ণনা করেছেন তার সংক্ষিপ্তসার নিম্নরূপ:

 তারা ছিলেন সাতজন যুবক৷ তাদের
ধর্মান্তরের কথা
শুনে কাইজার ডিসিয়াস তাদেরকে নিজের কাছে ডেকে
পাঠান৷ তাদের জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের ধর্ম কি? তারা জানতেন, কাইজার ঈসার অনুসারীদের রক্তের পিপাসু৷ কিন্তু তারা কোন প্রকার শংকা না করে পরিস্কার বলে দেন, আমাদের রব তিনিই যিনি পৃথিবী ও আকাশের রব৷ তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদকে আমরা ডাকি না৷ যদি আমরা এমনটি করি তাহলে অনেক বড় গুনাহ করবো৷
কাইজার প্রথমে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, তোমাদের মুখ বন্ধ করো, নয়তো আমি এখানেই তোমাদের হত্যা করার ব্যবস্থা করবো৷ তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তোমরা এখনো
শিশু৷ তাই তোমাদের
তিনদিন সময় দিলাম৷ ইতিমধ্যে যদি তোমরা নিজেদের মত বদলে ফেলো এবং জাতির ধর্মের দিকে ফিরে আসো তাহলে তো ভাল, নয়তো তোমাদের শিরশ্ছেদ করা হবে৷ এ তিন দিনের অবকাশের সুযোগে এ সাতজন যুবক শহর ত্যাগ করেন৷ তারা কোন গুহায় লুকাবার জন্য পাহাড়ের পথ ধরেন৷ পথে একটি কুকুর তাদের সাথে চলতে থাকে৷ তারা কুকুরটাকে তাদের পিছু নেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য বহু চেষ্টা করেন৷ কিন্তু সে কিছুতেই তাদের সংগ ত্যাগ করতে রাযী হয়নি৷ শেষে একটি বড় গভীর বিস্তৃত গুহাকে ভাল আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিয়ে তারা তার মধ্যে লুকিয়ে পড়েন৷ কুকুরটি গুহার মুখে বসে পড়ে৷ দারুন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত থাকার কারণে তারা সবাই সংগে সংগেই ঘুমিয়ে পড়েন৷ এটি ২৫০ খৃষ্টাব্দের ঘটনা৷ ১৯৭ বছর পর ৪৪৭ খৃষ্টাব্দে তারা হঠাৎ জেগে উঠেন। তখন ছিল কাইজার দ্বিতীয় থিয়োডোসিসের শাসনামল৷ রোম সাম্রাজ্য তখন
খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং এফিসোস শহরের লোকেরাও
মূর্তিপূজা ত্যাগ করেছিল৷

 এটা ছিল এমন এক সময় যখন রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের মধ্যে
মৃত্যু পরবর্তী জীবন এবং কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে জমায়েত ও হিসেব নিকেশ হওয়া সম্পর্কে প্রচণ্ড মতবিরোধ চলছিল৷ আখেরাত অস্বীকারের ধারণা লোকদের মন থেকে কিভাবে নির্মূল করা যায় এ ব্যাপারটা নিয়ে কাইজার নিজে বেশ চিন্তিত ছিলেন৷ একদিন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন যেন তিনি এমন কোন নিদর্শন দেখিয়ে দেন যার মাধ্যমে লোকেরা আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে৷ ঘটনাক্রমে ঠিক এ সময়েই এ যুবকরা ঘুম থেকে জেগে ওঠেন৷ জেগে ওঠেই তারা পরস্পরকে জিজ্ঞস করেন, আমরা কতক্ষণ ঘুমিয়েছি ? কেউ বলেন একদিন, কেউ বলেন দিনের কিছু অংশ৷ তারপর আবার একথা বলে সবাই নীরব হয়ে যান যে এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন৷ এরপর তারা জীন (Jean )
নামে নিজেদের একজন
সহযোগীকে রূপার কয়েকটি মুদ্রা দিয়ে খাবার আনার জন্য শহরে পাঠান।  লোকেরা যাতে চিনতে
না পারে এ জন্য তাকে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেন৷ তারা ভয় করছিলেন, লোকেরা আমাদের ঠিকানা জানতে পারলে আমাদের ধরে নিয়ে যাবে এবং ডায়নার পূজা
করার জন্য আমাদের বাধ্য করবে৷ কিন্তু জীন শহরে পৌঁছে সবকিছু বদলে গেছে দেখে
অবাক হয়ে যান৷ তিনি দেখেন সবাই ঈসায়ী হয়ে গেছে এবং ডায়না দেবীর পূজা কেউ
করছে না৷ একটি দোকানে গিয়ে তিনি কিছু রুটি কিনেন এবং দোকনদারকে একটি রূপার
মুদ্রা দেন৷ এ মুদ্রার গায় কাইজার ডিসিয়াসের ছবি ছাপানো ছিল৷ দোকানদার এ
মুদ্রা দেখে অবাক হয়ে যায়। সে জিজ্ঞস করে, এ মুদ্রা কোথায় পেলে ?
জীন বলে এ আমার
নিজের টাকা, অন্য কোথাও থেকে নিয়ে আসিনি৷ এ নিয়ে দু'জনের মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি হয়৷ লোকদের ভীড় জমে ওঠে৷ এমন কি শেষ পর্যন্ত
বিষয়টি নগর কোতায়ালের কাছে পৌঁছে যায়৷ কোতোয়াল বলেন, এ গুপ্ত ধন যেখান থেকে এনেছো সেই জায়গাটা কোথায় আমাকে বলো৷ জীন বলেন,কিসের গুপ্ত ধন ? এ আমার নিজের টাকা৷ কোন গুপ্তধনের কথা আমার জানা নেই৷ কোতোয়াল বলেন, তোমার একথা মেনে নেয়া যায় না৷ কারণ তুমি যে মুদ্রা এনেছো, এতো কয়েক শো বছরের পুরানো৷ তুমি তো সবেমাত্র যুবক, আমাদের বুড়োরাও এ মুদ্রা
দেখেনি৷ নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন রহস্য আছে৷ জীন যখন শোনেন কাইজার ডিসিয়াস মারা গেছে বহুযুগ আগে তখন তিনি বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন কিছুক্ষণ পর্যন্ত তিনি কোন কথাই বলতে পারেন না৷

তারপর আস্তে আস্তে বলেন, এ তো মাত্র কালই আমি এবং আমার ছয়জন সাথী এ শহর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম এবং ডিসিয়াসের জুলুম থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলাম৷ জীনের একথা শুনে কোতোয়ালও অবাক হয়ে যান৷ তিনি তাকে নিয়ে যেখানে তার কথা মতো তারা লুকিয়ে আছেন সেই গুহার দিকে চলেন৷ বিপুল সংখ্যক জনতাও তাদের সাথী হয়ে যায়৷ তারা যে যথাযর্থই কাইজার ডিসিয়াসের আমলের লোক সেখানে পৌঁছে এ ব্যাপারটি পুরোপুরি প্রমাণিত হয়ে যায়৷

এ ঘটনার খবর কাইজার ডিসিয়াসের কাছেও পাঠানো হয৷ তিনি নিজে
এসে তাদের সাথে দেখা করেন এবং তাদের থেকে বরকত গ্রহণ করেন৷ তারপর হঠাৎ তারা সাতজন গুহার মধ্যে গিয়ে সটান শুয়ে পড়েন এবং তাদের মৃত্যু ঘটে৷ এ সুস্পষ্ট নিদর্শন দেখে লোকেরা যথাযর্থই মৃত্যুর পরে জীবন আছে বলে বিশ্বাস করে৷ এ ঘটনার পর কাইজারের নির্দেশে গুহায় একটি ইবাদতখানা নির্মাণ করা হয়৷

 এ কাহিনীটি আল্লাহ নিজেই স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে কুরআন মজীদে বর্ণনা করেননি৷ বরং মক্কার কাফেরদের জিজ্ঞাসার জবাবে বর্ণনা করেছেন৷ আর আহলি কিতাবরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পরীক্ষা করার জন্য মক্কার কাফেরদেরকে তাঁর কাছ থেকে এমন ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করার পরামর্শ দিয়েছিল যে সম্পর্কে আরববাসীরা মোটেই কিছু জানতো না৷

 (তাফহীমুল কুরআন, সুরা আল কাহাফ - সংক্ষেপিত)।

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)

Rate This

আপনার রেটিং: None গড় রেটিং: 1 (টি রেটিং)